advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

অভাবের কাছে হেরে যাচ্ছিল মাতৃত্ব

রফিকুল ইসলাম,খাগড়াছড়ি
১৪ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২২ ১২:৫৩ এএম
খাগড়াছড়ির সেই মা সোনালি চাকমা ও ছেলে রামকৃষ্ণ চাকমা - আমাদের সময়
advertisement

অভাব সর্বগ্রাসী। মহান মাতৃত্বও হেরে যাচ্ছিল অভাবের কাছে। বলা হয়, পৃথিবীতে সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল মা। অভাবের কারণে সেই মায়ের কোল ছেড়েই বাজারে বিক্রি হতে যাচ্ছিল ছোট্ট শিশু রামকৃষ্ণ চাকমা। এটুকু বয়সে মায়ের আদর-যতœ ছাড়া তার চলবে না। মা ছাড়া কিভাবে বড় হবে, বোঝার কথা নয়। তাই মায়ের কথামতো, মায়ের সঙ্গে বাজারে যায় বিক্রি হতে। বিক্রিযোগ্য পণ্যের মতোই অবস্থান নেয় রাস্তার পাশে। এ পর্যন্ত লোমহর্ষক মনে হলেও তার পরের অংশটুকু স্বস্তির। শেষ রক্ষা হয়েছে। সমাজ এগিয়ে এসেছে। জনপ্রতিনিধিরা পাশে দাঁড়ালেন তার ও তার মায়ের। তাই বিক্রি হতে হয়নি। মায়ের কোলেই থেকে গেল রামকৃষ্ণ।

খাগড়াছড়ি জেলা সদরে গত বৃহস্পতিবার ঘটে এই ঘটনা। ঘটনাটি ইতোমধ্যে নেট দুনিয়ায় আলোড়ন তুলেছে। কিন্তু আসলেই মাতৃত্ব কি হেরে যেতে বসছিল অভাবের কাছে? খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া ইউনিয়নের পাকুজ্জাছড়ি গ্রামে রামকৃষ্ণ চাকমার বাড়ি। তার বয়স ছয়। তার মায়ের নাম সোনালি চাকমা।

advertisement

পরিবার জানিয়েছে, মৃগী রোগে আক্রান্ত মা সোনালি চাকমা। অনেকটাই ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছেন তিনি। এর ওপর সংসারে তীব্র অভাব। স্বামী তাকে ছেড়ে গেছেন অনেক আগে। আশ্রয় নিয়েছেন বাবার বাড়িতে। তাই একদিকে অভাব, আরেকদিকে অসুস্থতার কারণে ছেলের পরিচর্যা করতে পারছিলেন না মা। এ কারণেই ছেলেকে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন সোনালি।

advertisement 4

তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট রামকৃষ্ণ। বড় দুই ভাই থাকে বাবার সঙ্গে অন্যত্র। আর ছোট্ট রামকৃষ্ণ নিয়ে বাবার বাড়ির গোয়ালঘরের পাশে ছোট একটি কুঁড়েঘরে কয়েক বছর ধরে থাকেন সোনালি চাকমা। সোনালির বড় দুই ছেলেও তাদের খোঁজখবর নেন না। ফলে অভাব-অনটনে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে মা-ছেলের।

সোনালির পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভাব-অনটন সহ্য করতে না পেরে গত বৃহস্পতিবার খাগড়াছড়ির সাপ্তাহিক হাটে ছেলে রামকৃষ্ণকে বিক্রি করতে যান সোনালি। ১২ হাজার টাকার প্রস্তাবে দর কষাকষি চলছিল। মা কম দামে বিক্রি করতে চাচ্ছিলেন না। বিষয়টি কয়েকজনের নজরে আসে। তাদের মাধ্যমে খবরটি চলে যায় সদর উপজেলার কমলছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুনীল জীবন চাকমার কাছে। তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে বিক্রির চেষ্টা বন্ধ করেন এবং বিষয়টি ভাইবোনছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুজন চাকমাকে জানান। সুজন চাকমা গিয়ে সোনালি ও তার ছেলেকে পরিবারের জিম্মায় পাঠান। সুজন চাকমা আমাদের সময়কে জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে মা ও ছেলের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।

সন্তানকে বিক্রির খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রামকৃষ্ণের বাসায় যান সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য বাসন্তি চাকমা। তিনি জানান, তিনি পরিবারটির জন্য ছয় মাসের খাদ্যশস্য ও নগদ কিছু অর্থ দিয়েছেন। এ ছাড়া তাদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হবে বলে তিনি আশ^াস দেন।

সোনালির বিষয়ে খাগড়াছড়ির সিভিল সার্জন মো. ছাবের জানান, মৃগী রোগীদের মানসিক সমস্যাও হতে পারে। জেলা সদর হাসপাতালে এই রোগের ভালো ও বিনামূল্যে চিকিৎসা হয়। রামকৃষ্ণের মা সোনালি চাকমা চাইলে তাকে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে সহায়তা দেব।

এ বিষয়ে সোনালি চাকমা সাংবাদিকদের জানান, সন্তানকে বিক্রি করতে চাইলেও তার মঙ্গলের জন্যই তাকে ভালো ঘরে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘অভাবের সংসার। স্বামী ছেড়ে চলে গেছে অনেক দিন। ঘরে খাবার নাই। আমি অসুস্থ। ওষুধ কেনার টাকা নেই। কিভাবে বাঁচব ছেলেকে নিয়ে? তাই ছেলেকে ভালো পরিবারে দিতে চেয়েছিলাম, যাতে সে ভালো থাকে। ভালোভাবে বড় হতে পারে।’

 

advertisement