advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ডলার সাহেবের উল্লম্ফন থামানোর উপায় কী

মাহফুজুর রহমান
১৪ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২২ ০৯:১৩ এএম
advertisement

কিছুদিন থেকে মার্কিন ডলারের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গত মে মাসের মাঝামাঝিতে এই ডলার কেনা যেত ৮৬ টাকায়। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খোলাবাজারে এর দাম উঠে গেছে ১২০ টাকায়। বাংলাদেশ ব্যাংক তথা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো মিলেও ডলারের লাফানো থামাতে পারছে না। নগদ ডলারের এই ঘাটতি কেন হলো এবং কেনই বা এর দাম এভাবে বেড়ে চলেছে, তা একটু বিশ্লেষণ করা যাক।

এই নিবন্ধে আমি কেবল নগদ ডলার নিয়েই কথা বলব। বাংলাদেশে নগদ ডলার আগমনের চিত্রটি একটু খতিয়ে দেখা যাক। বিদেশ থেকে বাংলাদেশি (নিবাসী বা অনিবাসী) ও বিদেশি নাগরিকদের যে কেউ এ দেশে এলে শুল্ক বিভাগের কাছে ঘোষণা না দিয়ে ১০ হাজার মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ অন্য বৈদেশিক মুদ্রা আনতে পারেন। আবার বিদেশে প্রত্যাবর্তনকালে ঘোষণাপত্র ছাড়াই সর্বোচ্চ ১০ হাজার মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ অন্য বৈদেশিক মুদ্রা নিয়েও যেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তিনি আগমনকালে এ পরিমাণ মুদ্রা ঘোষণা ছাড়া এনেছিলেন বলেই ধরে নেওয়া হয়।

advertisement

মার্কিন ডলার দেশের ভেতরে নিয়ে আসার পর কেউ কেউ বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাউন্টারে ডলার ভাঙিয়ে থাকেন। ব্যাংকে সাধারণত ডলারের দাম একটু কম থাকে। বিনিয়োগ বা অন্য কোনো প্রয়োজনে যাদের সাদা টাকার দরকার হয়, তারাই প্রধানত ব্যাংকের কাউন্টারে ডলার ভাঙিয়ে থাকেন। এভাবে ব্যাংকের হাতে নগদ ডলার জমা হয়ে থাকে। তা পরে ব্যাংক গ্রাহকের প্রয়োজনে পাসপোর্টে অ্যান্ট্রি করে বিক্রি করে থাকে। সাধারণত ভ্রমণ কোটা বাবদ এই নগদ ডলার অধিক ব্যবহৃত হয়।

advertisement 4

বিদেশ থেকে নগদ ডলার নিয়ে কারা এ দেশে আসেন? বিদেশে চাকরিরত বাংলাদেশি নাগরিক দেশে বেড়াতে আসার সময় বা চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তনের সময় নগদ ডলার নিয়ে আসেন। বিদেশে যারা বেড়াতে কিংবা চিকিৎসা করাতে বা অন্য কোনো কাজে যান, তারাও ফিরে আসার সময় অব্যয়িত ডলার সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। বিদেশি পর্যটকরাও কোনো কোনো সময় নগদ ডলার নিয়ে আসেন। আবার স্থানীয় বাজার থেকে কেনা কোনো পণ্য প্রতিবেশী কোনো দেশে চোরাকারবারিদের মাধ্যমে পাচার হলে এর মূল্য হিসেবেও বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রবেশ করতে পারে। এর বাইরে নগদ ডলার সাধারণত এ দেশে আসে না। তবে অতীতে এ রকম ডলারের সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিদেশি ব্যাংকের সহায়তা নিয়ে বিদেশ থেকে নগদ ডলার আমদানি করেছিল।

এবার আসা যাক নগদ ডলারের চাহিদা কোথায়? অর্থাৎ কেন একজন নগদ ডলার কিনতে চান? প্রথমত, একজন যখন বিদেশে বেড়াতে যান তখন তার নগদ ডলারের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের প্রায় সব ব্যাংক থেকেই ক্রেডিট কার্ড ইস্যু হয় বটে তবে এসব কার্ড কখনো কখনো বিদেশে গিয়ে কাজ করে না। ফলে পর্যটকের মনে বিপদের একটা ভয় থেকে যায়। এ জন্য তারা সঙ্গে করে নগদ ডলার নিতে আগ্রহী হয়ে থাকেন। আমাদের দেশের অনেকেই এখনো টেকনোলজিবান্ধব নন। তাই তারা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে চান না। তাদের জন্যও নগদ ডলার দরকার। যারা বিদেশে পড়াশোনা করতে যান কিংবা চিকিৎসা করাতে যান বা ব্যবসায়িক কাজে বিদেশে যান, তাদেরও কিছু নগদ ডলারের প্রয়োজন হয়। এ দেশ থেকে প্রতিবছর লাখো ধর্মপ্রাণ মুসলমান পবিত্র হজ বা ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরবে যান। তারা প্রত্যেকেই সঙ্গে করে নগদ ডলার নিয়ে যেতে চান। তাই হজ মৌসুমে ডলারের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

অফিসিয়াল চ্যানেলে এ দেশে আসা বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের বাইরেও একটি খোলাবাজার সচল রয়েছে। আইএমএফের অনুরোধে বাজারের প্রকৃত ধ্বনির অনুরণন অনুভব করার জন্যই ব্যাংকের বাইরে এ ধরনের একটি খোলাবাজার রাখা হয়। সরকার স্পষ্টভাবে জানা সত্ত্বেও এরূপ খোলাবাজারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। সেখানে স্বাধীনভাবে লেনদেন পরিচালিত হয় এবং বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান ও চাহিদার সংবাদ সরকার অনুভব করে।

এবার আমাদের নগদ ডলারের বাজারের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। গত মে মাসের পর করোনা ভাইরাসের প্রভাব কিছুটা কমে এসেছে। বিভিন্ন দেশ তাদের বর্ডার খুলে দিয়েছে। এসব দেশে এখন বেড়াতে, পড়ালেখা করতে ও চিকিৎসা করতে যাওয়া যায়। যারা একান্ত ভ্রমণপিপাসু, তিন বছর ধরে যারা ঘরে বন্দিজীবন কাটিয়ে একটু বিদেশে যাওয়ার জন্য উসখুস করছিলেন তারা এ সময়টায় ব্যাগ টেনে নিয়ে বিমানে চেপে বসেছেন। তিন বছর ধরে যারা বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করাবেন বলে ঠিক করে রেখেছিলেন এবং করোনার জন্য যেতে পারছিলেন না, তারাও বিমানের সিটে আসন নিয়েছেন। বিদেশে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার জন্য সুযোগ পেয়েছেন, তারাও বিমানের সিট কিনে আসন নিয়েছেন। একই সঙ্গে চলে এসেছে পবিত্র হজ পালনের সময়। তাদের প্রত্যেকেই বৈদেশিক মুদ্রা কেনার জন্য খোলাবাজারে হাত বাড়িয়েছেন। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত নীতিমালার বাইরেও তাদের ডলারের চাহিদা রয়ে যায়। আবার বিদেশে চিকিৎসা লাভের জন্য সরকারের নীতিমালা অনুসারে কেউই প্রায় বিদেশে যেতে পারার কথা নয়। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হলে সরকারের নির্দেশে গঠিত তিন বা অধিক সংখ্যক সদস্যের একটি উঁচুপর্যায়ের চিকিৎসক দলকে ঘোষণা দিতে হবে যে, ‘রোগটির চিকিৎসা বাংলাদেশে সম্ভব নয় এবং আবেদনকারীর জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনেই তাকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া প্রয়োজন।’ ডাক্তাররা এ ধরনের সার্টিফিকেট প্রদান করতে চান না। আর এ জন্যই বিদেশে চিকিৎসা করতে আগ্রহীদের খোলাবাজারের দিকে হাঁটতে হয়। তারা টুরিস্ট ভিসায় বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করে আসেন। ফলে তাদের নগদ ডলার প্রয়োজন হয়।

বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে যারা বিদেশে কর্মরত ছিলেন, তারা করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর দেশে ফিরে এসেছিলেন। তখন তাদের সঙ্গে করে এনেছিলেন ডলার। এখন তারা আবার দ্রুত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছেন। যাওয়ার সময় প্রাথমিক চাহিদাগুলো পূরণের জন্য তাদের সঙ্গে করে কিছু ডলার নিতে হচ্ছে। এর মানে নগদ ডলার সরবরাহকারীদের একটা বিশাল অংশ এখন ক্রেতা হিসেবে বাজারে আসছে।

ওপরের আলোচনা থেকে এটি খুবই স্পষ্ট যে, বাজারে নগদ ডলারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ একান্তই কমে গেছে। ফলে দাম বাড়বে এটি খুব স্বাভাবিক। এর মধ্যে আবার বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন মানিচেঞ্জারের অফিসে হানা দিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করেছে, অনেককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে স্বাধীনভাবে বাজারে কাজ করতে পারছে না। অনেকেই ত্রাসের ভেতর আছেন। আর লাইসেন্সবিহীন অবৈধভাবে বাজারে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো সঙ্গত কারণেই আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে। তাদের কাছে জমা থাকা ডলারও তারা লুকিয়ে ফেলেছে। যারা এই বিপুল চাহিদা ব্যাংকের বাইরে থেকে মোকাবিলা করার কথা, তারা সবাই আতঙ্কে ব্যবসা গুটিয়ে চুপচাপ বসে আছেন। তাই বাজারে ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। একান্ত গোপনে কেউ কেউ লেনদেন করছেন। তাও করছেন বর্ধিত দামে। আবার অনেকেই খোলাবাজার থেকে ডলার কিনে লুকিয়ে রেখে আরও দাম বৃদ্ধির জন্য অপেক্ষা করছেন।

খোলাবাজারে ডলারের দাম কমিয়ে আনতে পারলে ব্যাংকেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাম কমবে। বর্তমানে ব্যাংক থেকে ডলার পাওয়া যায় না। কোনো ব্যাংকে পাওয়া গেলেও তা আকাশচুম্বী দামে। সরকার খোলাবাজারে এ ধরনের ত্রাস সৃষ্টি করে ডলারের দাম কমাতে পারবে বলে মনে হয় না, বরং উল্টো কাজটি করা হলে দাম নিচের দিকে আসতে পারে। মনে রাখতে হবে, খোলাবাজারে আসা ডলার কখনো ব্যাংকে যায় না। খোলাবাজারের বৈদেশিক মুদ্রা মানুষের বহুমুখী চাহিদা পূরণ করে। খোলাবাজার এই চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হলে মানুষ ব্যাংকের কাছে হাত পাতবে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারের রিজার্ভেও হাত পড়বে। তাই খোলাবাজারকে স্বাধীনভাবে চলতে দিয়ে তাদের সামনে অন্য একটি ঝুঁকি তুলে ধরা যেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক যদি বিদেশ থেকে কিছু নগদ ডলার আমদানি করার উদ্যোগ নেয়, তা হলে বাজার স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিচে নেমে আসবে। যারা নগদ ডলার অধিক লাভের আশায় লুকিয়ে রেখেছেন, তাদের কানে আমদানির এ খবরটি পৌঁছালে তারা শিগগিরই লুকিয়ে রাখা ডলার বাজারে ছেড়ে দেবেন। আবার মানিচেঞ্জারদের আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় স্বাধীনভাবে ব্যবসা করার সুযোগ দিলে তারাও বাজারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে। বর্তমান পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার জন্য ভীতি প্রদর্শনের পরিবর্তে উদারনীতি গ্রহণ করাই শ্রেয় হবে বলে মনে হয়। মার্কিন ডলারের মূল্য যাতে আর ওপরে ওঠার পরিবর্তে নিচের দিকে নেমে আসে, এদিকেই এখন বেশি মনোযোগ দিতে হবে। ডলারের মূল্য কমলে মূল্যস্ফীতিতেও লাগাম পড়বে।

মাহফুজুর রহমান : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও চেয়ারম্যান, এক্সপার্টস একাডেমি

advertisement