advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আমাদের হৃদয়ে

ড. শেখ মেহেদী হাসান
১৪ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২২ ১২:৪২ এএম
advertisement

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, দিনটি ছিল শুক্রবার। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। সব ক্যাম্পাস সেজেছিল উৎসবের আমেজে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই প্রস্তুত স্বাধীনতার মহান স্থপতিকে অভিবাদন জানাতে। ভোরের সূর্য উঠেছে, কিন্তু তখনো বিশ^বিদ্যালয় পরিবারের অনেকেই জানেন না প্রিয় নেতাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যারা নবীন রাষ্ট্রটির অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে চেয়েছিল, তারা নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে। তবু এই বিয়োগান্ত ঘটনায় জাতির অস্তিত্ব ও মননে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়, তা এখনো পুরো উপশম করা সম্ভব হয়নি। এক কাপুরুষোচিত ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের শিকার জাতির পিতা, তার পরিবারের সদস্যসহ যারা সেদিন শহীদ হয়েছেন, আমরা তাদের সবাইকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।

বঙ্গবন্ধু যখন ১৯৪৯ সালে আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা নানান দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করে। তারা ধর্মঘট করলে বঙ্গবন্ধু তাতে সমর্থন দেন ছাত্র হিসেবে। কিন্তু সমর্থন দেওয়াতে তাকেসহ কয়েকজনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। সবাই জরিমানা দিয়ে ছাত্রত্ব গ্রহণ করে কিন্তু বঙ্গবন্ধু ন্যায্য আন্দোলন জরিমানা দিয়ে ছাত্রত্ব গ্রহণ করেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যাওয়ার ২৮ বছর পর ফের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে চ্যান্সেলর হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা বঙ্গবন্ধুর। তার আগের দিন ১৪ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের জন্য কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন করে রাখা হয়েছিল। ১৫ আগস্ট তার ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে আসা হয়নি। ভোরের আলো ফোটার আগেই ধানম-ির ৩২ নম্ব^র সড়কে ঐতিহাসিক বাড়িটিতে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল, একই সঙ্গে তার সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেল এবং বঙ্গবন্ধুর দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে। দেশের বাইরে থাকায় সেদিন বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। সেই কালরাতে আরও প্রাণ হারান বঙ্গবন্ধুর অনুজ শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনিসহ বেশ কয়েকজন নিকটাত্মীয়। বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে গিয়ে ঘাতকদের হাতে প্রাণ দিয়েছিলেন তার সামরিক সচিব কর্নেল জামিল উদ্দীন আহমেদসহ কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মচারী। আসলে সেদিন ঘাতকরা কেবল একজন শেখ মুজিবকেই হত্যা করেনি, তাদের লক্ষ্য একটি রাষ্ট্র তথা বাংলাদেশকে হত্যা করা। তারা সাময়িকভাবে কিছুটা সফলও হয়েছিল।

advertisement

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠিত হলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয় এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তারা হলেন লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর বজলুল হুদা, লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি) ও লে. কর্নেল একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার)। দীর্ঘদিন পর জানা যায়, বঙ্গবন্ধু হত্যার দ-প্রাপ্ত অন্যতম আসামি আবদুল মাজেদ ভারতের কলকাতায় পালিয়ে ছিলেন। সেখান থেকে ফিরিয়ে এনে ২০২০ সালের ১০ এপ্রিল তার মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। এখনো পাঁচ আসামি খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এএম রাশেদ চৌধুরী, মোসলেম উদ্দিন ও এসএইচ নূর চৌধুরী বিদেশে পলাতক। অপর আসামি আজিজ পাশা বিদেশে পলাতক অবস্থায় মারা যান। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাকি আসামিদের ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক প্রয়াস অব্যাহত আছে। তাদের মধ্যে রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে, নূর চৌধুরী কানাডায়, শরিফুল হক ডালিম স্পেন ও মোসলেম উদ্দিন জার্মানিতে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।

advertisement 4

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা তিনটি বইÑ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং ‘আমার দেখা নয়াচীন’ পাঠ করলে এ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। ছাত্রাবস্থায়ই তার মধ্যে মানবিক গুণ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং ক্যারিশম্যাটিক রাজনীতি বোধের প্রকাশ দেখা যায়।

বঙ্গবন্ধু অসীম ত্যাগ, তিতিক্ষা, সাহস, প্রজ্ঞা, বলিষ্ঠ এবং আপসহীন নেতৃত্ব দিয়ে বাঙালি জাতিকে অসাম্প্রদায়িক সংগ্রামী জাতিতে পরিণত করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন একই আদর্শে বিশ্বাসী তার একান্ত রাজনৈতিক সহচর তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী, কামারুজ্জামান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রমুখ। আর ছিল বাঙালি শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র-শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের জনগণ। তিনি সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন একটি সুখী-সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। দেশের মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিই ছিল তার ধ্যানজ্ঞান ও সাধনা।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বঙ্গবন্ধু নিরন্তর দুঃসাহসিক ভূমিকা পালন করেছেন। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে নিহিত রয়েছে অসাম্প্রদায়িকতা ও লড়াকু চেতনা। এ চেতনা গৌরবোজ্জ্বল ও মর্যাদাপূর্ণ করার দায়িত্ব দেশের প্রতিটি নাগরিকের। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রাণপুরুষ। লাল-সবুজের পতাকায় তিনি হয়ে আছেন চিরস্মরণীয়, বরণীয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, একুশ ও একাত্তরের চেতনাকে ধারণ করেই সব সংকট কাটিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমৃদ্ধ হবে বাংলাদেশ। আমাদের হৃদয়ে ধারণ করতে হবে, বঙ্গবন্ধু কোনো দলের নন, সমগ্র জাতির।

ড. শেখ মেহেদী হাসান : গবেষক ও গল্পকার

advertisement