advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মেলেনি কূটনৈতিক স্বীকৃতি
আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতার এক বছর

অনলাইন ডেস্ক
১৫ আগস্ট ২০২২ ০৪:৫৪ পিএম | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২২ ০৭:১১ পিএম
এক বছরের শাসনকালে আফগানদের ভাগ্যে নতুন দুঃখ–দুর্দশা যুক্ত করেছে তালেবান
advertisement

আফগানিস্তানে কট্টরপন্থী তালেবান শাসনের বর্ষপূতি হলো আজ। দুই দশক পর ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট কাবুলের ক্ষমতায় নাটকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটে তাদের। অবশ্য তার আগে দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি চুক্তি হয়। এরপরই আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ক্ষমতায় তালেবানের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন হয়। একই সঙ্গে পতন ঘটে মার্কিন সমর্থিত আফগান সরকারের। ফলে তৎকালীন আফগান প্রধানমন্ত্রী আশরাফ গণিকে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে হয়।

পশ্চিমা বিশ্ব বলছে, তালেবান দোহার শান্তি চুক্তিতে দেওয়া শর্ত মানছে না। প্রতিনিয়ত নারী অধিকারের বিরুদ্ধে নতুন নতুন আইন জারি করছে। তালেবান আশ্রয় দিচ্ছে আরেক জঙ্গি গোষ্ঠী আল-কায়েদাকে। যদিও চুক্তিতে শর্ত ছিল, আল কায়েদাসহ কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন বা ব্যক্তিকে আফগানিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। ক্ষমতা দখলের পর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার লক্ষ্যে তালেবানের পক্ষ থেকে একাধিকবার বলা হয়, আফগানিস্তানে সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়া হবে না। কিন্তু তালেবান তার এ কথা রাখেনি। ফলে শাসনকালের এক বছরেও তালেবান সরকার পায়নি অধিকাংশ দেশের কূটনৈতিক স্বীকৃতি। যদিও প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তারা ‘মধ্যপন্থী নীতি’ পালনের কথা জানিয়েছিল।

তালেবান সরকারকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার আগে সতর্ক থাকছে দেশগুলো
advertisement 3

তালেবান সরকারের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের কারণেই অন্য দেশের কূটনৈতিক স্বীকৃতি পাচ্ছে না তারা। শুধু তাই নয়, সাহায্য পাঠালেও নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান, মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব, তুরস্ক, চীন কেউ তাদের স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে তালেবান প্রশাসন বহির্বিশ্বে দূতাবাস স্থাপন, কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করতে পারছে না। আগেরবার তালেবান সরকার পাকিস্তান, সৌদি আরব আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বীকৃতি পেয়েছিল। তবে এবার চিত্র অন্যরকম। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান তালেবান সরকারের বিষয়ে দেশগুলো সবার সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। ফলে কোনো কোনো দেশ সম্পর্ক রাখছে ঠিকই, কিন্তু নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে সতর্ক থাকছে। এ ক্ষেত্রে কেউই প্রথম হতে চায় না।

advertisement 4

ক্ষমতায় এসেই বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে হয় তালেবান সরকারকে। সে সময় চরম ভীতির মধ্যে ছিল সাধারণ জনগণ, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীরা, যা এখনো আছে। একটা সময় ব্যবসায়ীদের অনেকেই মালপত্র গুটিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। কর্মজীবী নারীদের একটা বড় অংশকে কর্মক্ষেত্র থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়। ওদিকে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে মূল্যস্ফীতি। খাদ্যদ্রব্যসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম এত বেশি বেড়ে যায় যে আফগানদের পক্ষে তা কেনা কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় দেশটির প্রয়োজন ছিল রিজার্ভের অর্থে খাদ্য কিনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। কিন্তু তালেবান সরকার তা করতে পারেনি। কারণ, অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের ব্যাংকে থাকা আফগান সরকারের সাড়ে ৯ বিলিয়ন ডলার আটকে যায়। এর মধ্যে ‘চমৎকার’ একটি বাজেট ঘোষণা করলেও অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি আফগানিস্তান।

তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ

তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশটিতে বিক্ষিপ্ত কিছু বিক্ষোভ দেখা গেছে। তবে ভিন্নমতাবলম্বীদের এসব বিক্ষোভ শক্ত হাতে দমন করেছে তালেবান। এর আগে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবানের প্রথম শাসনামলে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সর্বত্র আলোচিত ছিল। ওই সময় নিষিদ্ধ করা হয়েছিল মেয়েদের শিক্ষা। যদিও এবার ক্ষমতায় এসে ভিন্নভাবে দেশ পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছিল তালেবান। কিন্তু তারা পুরোপুরি কথা রাখেনি। তাদের সরকারে কোনো নারী সদস্য নেই। এমনকি এক বছরের শাসনকালে তারা সরকারি চাকরি থেকে যেসব নারীদের প্রত্যাহার করেছিল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের পুনর্বহাল করেনি। মাঝে ছেলেদের স্কুল খুলে দেওয়া হলেও মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ করে রাখা হয়।

 

তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলছেন, নারী শিক্ষা চালুর চেষ্টা তাদের আছে। তবে গত এক বছরে তারা বেশ কিছু নারী অধিকার বিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে নারীদের ৭২ কিলোমিটারের বাইরে পুরুষ আত্মীয় ছাড়া ভ্রমণ না করার বিষয়টি রয়েছে। তারা বলেছে, হিজাব না পরলে কোনো নারীকে ট্যাক্সিতে ওঠানো যাবে না। এ ছাড়া টিভি নাটকে নারীদের উপস্থিতি নিষিদ্ধ করাসহ আট দফা নির্দেশনা দিয়েছে তালেবান। নির্দেশনা অনুযায়ী, নিষিদ্ধ করা হয়েছে আফগানদের জন্য আপত্তিকর বলে বিবেচিত হতে পারে-এমন কমেডি ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান। টেলিভিশনের পর্দায় হাজির হওয়ার সময় নারী সাংবাদিক ও উপস্থাপিকাদের হিজাব পরতে বলা হয়েছে।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগ রয়েছে তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে

অপরদিকে দেশটির নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয় দৃশ্যত বন্ধ করে দিয়েছে তালেবান। এর জায়গায় তারা এমন একটি বিভাগ চালু করেছে, যার প্রধান কাজ কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন প্রয়োগ করা। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশটিতে নারী অধিকারকর্মীদের গ্রেপ্তার নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সাংবাদিকেরা প্রতিনিয়ত সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগ তুলছেন।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের প্রতিবেদন বলছে, ২০২১ সালের জুলাই মাসে দেশটিতে নিউজরুমে ১০ হাজার জন কাজ করতেন। গত বছরের ডিসেম্বরে কাজ করেছেন চার হাজার ৩৬০ জন। তালেবান শাসনের প্রথম তিন মাসে ৫৪৩টির মধ্যে ২৩১টি সংবাদমাধ্যম আচমকা উধাও হয়ে গিয়েছে। তবে তালেবানের হাতে সাংবাদিকদের হত্যার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তাদের কাছে নেই। জাতিসংঘের মতে, গত বছরের ১৫ আগস্ট থেকে এ বছরের ১৫ জুনের মধ্যে তালেবান কর্তৃপক্ষ ১৬০টি বিচারবহির্ভূত হত্যা, ১৭৮টি নির্বিচারে গ্রেপ্তার, ২৩টি আচমকা গ্রেপ্তার এবং প্রাক্তন সরকার ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নির্যাতনের ৫৬টি ঘটনা ঘটিয়েছে।

সম্প্রতি সেভ দ্য চিলড্রেনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালেবানের এক বছরের শাসনামলে দেশটির নারীরা আরও বেশি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ক্ষুধার পাশাপাশি হতাশায় তারা জর্জরিত। বিশেষ করে আগের দুই দশকে নারী শিক্ষা ও অধিকারের ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল, তা এক বছরে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।

ব্যানারে ‘১৫ আগস্ট একটি কালো দিন’ লিখে কাবুলে বিক্ষোভ করেছে নারীরা 

ফলে বর্ষপূতির ঠিক দুই দিন আগে কাবুলে নারীদের করা বিক্ষোভে একটি ব্যানারে লেখা ছিল, ‘১৫ আগস্ট একটি কালো দিন।’ ‘রুটি, রুজি আর স্বাধীনতার’ দাবিতে ৪০ জন নারীর সেই বিক্ষোভটি গুলি ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয় তালেবান সদস্যরা। এ সময় তাদের বেধড়ক লাঠিপেটা করা হয়। কেড়ে নেওয়া হয় মোবাইল ফোন। বিক্ষোভকারীদের একজন তখন বলেন, ‘এবার তারা আগের মতো আমাদের মারধর করেনি। তারা আকাশে গুলি ছুড়েছে। আমরা ভীত হলেও নারীদের অধিকারের দাবিতে লড়ছি। তারা যাতে কমপক্ষে মেয়েদের স্কুলগুলো খুলে দেয়।’

তালেবান সরকার বলছে, তারা ‘ইসলামি আইন’ ও আফগান সংস্কৃতির সীমানার মধ্যে থেকে নারীসহ সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করছেন। আর তাদের প্রতি যেহেতু জনগণের সমর্থন আছে, তাই তাদের সরকার জনগণের সরকার। এই সরকারের বৈশ্বিক স্বীকৃতি পাওয়া উচিত। তবে সত্যি তো এটাই, এক বছরের শাসনে আফগানদের ভাগ্যে নতুন করে দুঃখ–দুর্দশা যুক্ত হয়েছে।

advertisement