advertisement
advertisement
advertisement

ব্রিটিশ আইনবিদের সাক্ষাৎকার
রাজা হিসেবে কেমন হবেন তৃতীয় চার্লস

জাহাঙ্গীর সুর
১০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১১:২৪ এএম
স্টিফেন ক্লিয়ার ব্রিটিশ আইনবিদ। পুরোনো ছবি
advertisement

আমাদের সময় : ব্রিটিশ রাজসিংহাসনে নতুন রাজা আসীন হয়েছেন। আপনি কি মনে করেন, এই রাজা যুক্তরাজ্যে এবং বিশ্বে নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছেন?

স্টিফেন ক্লিয়ার : রাজতন্ত্র যদি টিকে থাকতে চায়, তা হলে একে অবশ্যই জাতীয় জীবনের কেন্দ্রে দৃঢ়ভাবে বিরাজ করতে হবে। জনমনে আস্থাশীল হিসেবে বিরাজ করা চাই। সচেতন হওয়া চাই মানুষের মনমানসিকতা ও নৈতিকতা সম্পর্কে। পাশাপাশি, সাংবিধানিক নীতিকেও সম্মান করা অব্যাহত রাখতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, আমরা মহামান্য রাজা তৃতীয় চার্লসকে আরও সক্রিয় রাজা হিসেবে দেখতে পাব। এ আশা আমরা করতেই পারি। তবে এও আশা রাখি, তিনি এমন একজন রাজা হবেন, যে কোনো পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক নিয়মকে সম্মান করে চলবেন। উদাহরণস্বরূপ রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনি সাংবিধানিক নিয়মকে সম্মান করবেন।

advertisement

আমি বলব, অবশ্যই এ এক নতুন যুগের সূচনা। তবে তিনি মূলত ‘শাসননীতির গ্রন্থ’ই অনুসরণ করবেন, যে নীতিশাস্ত্র তার মা, রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের রাজত্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল।

advertisement 4

আমাদের সময় : রাজা তৃতীয় চার্লস কি তার মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন, নাকি তিনি যুক্তরাজ্য এবং কমনওয়েলথ রাজ্য শাসন করার ক্ষেত্রে নিজস্ব আদর্শ, নিজ-নীতি অনুসরণ করবেন? আপনার কী মনে হয়?

স্টিফেন ক্লিয়ার : কমনওয়েলথ রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে, আমরা আশা করতে পারি, তিনি সামাজিক পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে আরও সচেতন হবেন। যেমনটা আগে তাকে আমরা দেখেছি। যেমন ধরুন কীভাবে দাসত্বের উত্তরাধিকারকে মোকাবিলা করা দরকার- এ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কাগালিতে কমনওয়েলথের সরকারপ্রধানদের সভায় প্রিন্স অব ওয়েলস হিসেবে চার্লস মন্তব্য করেছিলেন এই বলে, ‘এত এত লোকের দুঃখ-কষ্টের কথা শুনে আমার যে কী গভীর বেদনাবোধ হচ্ছে, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। দাসত্বের স্থায়ী প্রভাব সম্পর্কে আমার বোঝাপড়া আরও দরকার, এও অনুভব করি।’

একইভাবে, প্রিন্স উইলিয়াম জামাইকা সফরে স্বীকার করেছিলেন যে, ‘দাসত্বের ভয়াবহ নৃশংসতা আমাদের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করে’ এবং দাসপ্রথা ছিল ‘ঘৃণ্য... এবং এটি কখনোই হওয়া উচিত নয়’। ওই সফরে তিনি একইভাবে এও বলেছিলেন যে, কমনওয়েলথ রাষ্ট্রগুলো চাইলে স্বতন্ত্রভাবে তাদের নিজস্ব পথ বেছে নিতে পারে, যদি ভালো মনে করে, তবে রাজশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলার সিদ্ধান্তও নিতে পারে।

যদিও আগামীতে কমনওয়েলথ থেকে রাষ্ট্রগুলোর একে একে প্রস্থান অনিবার্য বলে মনে হয়। এ ধরনের কৌশল আদতে রাজতন্ত্রের আধুনিকীকরণ, প্রজন্মের পরিবর্তনের প্রতিফলন এবং রাজতন্ত্রকে আরও প্রগতিশীল হিসেবে দেখানোর চেষ্টার অংশ। পাশাপাশি সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে রাজতন্ত্র রয়েছে, তাও বোঝানোর কৌশল। এর মূল লক্ষ্য রাজতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রাসঙ্গিকতা প্রতীয়মান কার এবং রাজশাসন টিকিয়ে রাখা।

আমাদের সময় : আপনি কি মনে করেন, রাজা তৃতীয় চার্লস তার মায়ের মতো রাজনৈতিকভাবে ‘নিরপেক্ষ’ এবং সাংবিধানিকভাবে ‘সঠিক’ থাকবেন?

স্টিফেন ক্লিয়ার : সংক্ষেপে বলতে পারি, রাজা তৃতীয় চার্লসকে অবশ্যই সাংবিধানিকভাবে মহামান্য রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। সাংবিধানিক রাজতন্ত্র টিকে থাকার জন্য রাজাকে অবশ্যই একজন অবিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হতে হবে এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। অন্যথায়, যখন একজন রাজা অত্যধিক স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা প্রয়োগ করার চেষ্টা করেন, তখন কী ঘটে, ইতিহাস আমাদের সে উত্তর দেয়।

উদাহরণস্বরূপ, রাজা প্রথম চার্লস ১৬৪২ সালে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে সংসদ সদস্যদের গ্রেপ্তার করতে চেয়েছিলেন। তখন রাজা ও সংসদকর্তাদের মধ্যে উত্তেজনা ও দ্বন্দ্ব দেখা গিয়েছিল। সেই বিপ্লব, এবং অলিভার ক্রোমওয়েলের অধীনে স্বল্প সময়ের জন্য যুক্তরাজ্য যে একটি ‘প্রজাতন্ত্র’ হয়ে উঠেছিল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যখন একজন ব্রিটিশ রাজা তার ক্ষমতা নির্বিচারে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেন তখন কী ঘটে। এর পর ১৬৬০ সালে রাজা দ্বিতীয় চার্লস সিংহাসনে আসীন হলেন, রাজতন্ত্র পুনরুদ্ধার হলো, কিন্তু ১৬৬১ সালে ঘোষণা করতেই হলো, একজন রাজা সংসদের সম্মতি ছাড়া আইন করতে পারবেন না; এর পর ১৬৮৯ সালে বিল অব রাইটস পাস হয়, এর পর থেকে রাজা বা রানি যুক্তরাজ্যের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সংসদের ইচ্ছা মেনে নিতে বাধ্য।

আমাদের সময় : রাজা তৃতীয় চার্লসের পক্ষে ক্ষমতা ব্যবহার করে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ ও কারসাজি করার আশঙ্কা রয়েছে?

স্টিফেন ক্লিয়ার : রাজা রাষ্ট্রের প্রধান হলেও, ‘সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে’ আইন প্রণয়ন ও পাস করার ক্ষমতা নির্বাচিত সংসদের কাছেই থাকে। রাজা জনের শাসনামল এবং ১২১৫ সালে ম্যাগনা কার্টা চুক্তি অনুসারে, যুক্তরাজ্যে রাজতন্ত্র আইন দ্বারাই সীমিত। যদিও একটি বিল আইনে পরিণত হওয়ার আগে রাজা বা রানির থেকে ‘রাজকীয় সম্মতি’ নিতে হয়, যুক্তরাজ্যে এটি এখন নিছক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজা বা রানির কাছ থেকে কোনো প্রকৃত ইনপুট নেওয়া হয় না। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুসারে তিনি সব সময় সংসদে পাস করা বিলটি আইনে রূপ দিতে সম্মতি প্রদানে বাধ্য।

আমাদের সময় : আপনি কি মনে করেন, রাজা তৃতীয় চার্লস সংসদ ভেঙে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?

স্টিফেন ক্লিয়ার : সংসদ ভাঙার ঘটনা ঘটে একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে। সর্বোচ্চ আদালতের দ্বিতীয় মিলার রায়ে এমনটাই সাংবিধানিক নিয়ম। সংসদীয় বিধি ২০১১ অনুসারেও প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই কেবল সংসদ ভাঙা যাবে। কিন্তু সংসদীয় বিধি ২০২২ অনুযায়ী সংসদ ভেঙে দেওয়ার এবং তলব করার জন্য রাজা বা রানিকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা রাজা বা রানির বিশেষ ক্ষমতার পুনরুজ্জীবন। যা হোক, সাংবিধানিকভাবে ও বাস্তবে রাজা শুধু প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধেই এ ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।

কিন্তু, রাজা তৃতীয় চার্লস যে সীমার বাইরে যেতে পারেন, সে কথা কেউ কেউ ভাবতে পারেন। যুক্তি হিসেবে তারা হয়তো রাজনৈতিক ইস্যুতে প্রাক্তন প্রিন্স অব ওয়েলসের আগের স্পষ্টভাষার কথা উল্লেখ করতে পারেন (উদাহরণস্বরূপ, তথাকথিত ‘ব্ল্যাক স্পাইডার মেমো’র কথা বলা যায়)। কিন্তু আমি বলব, সাবেক প্রিন্স অব ওয়েলস, এখন যিনি রাজা, তিনি সাংবিধানিক পরিবর্তন সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন এবং তিনি তা অনুসরণ করেই এগোবেন বলে আমি মনে করি।

রানির জন্য প্রযোজ্য ছিল যে সাংবিধানিক নিয়মাবলি, এখন পর্যন্ত তা নতুন রাজার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়নি। ভবিষ্যতের সংস্কার ও ‘রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ’-এর প্রশ্নে সাবেক যুবরাজ এটা স্পষ্ট করেছেন, তিনি জানেন তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা প্রয়োজন এবং তাকে অবশ্যই স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে। ২০১৮ সালে তার ৭০তম জন্মদিনের সাক্ষাৎকারে এ উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়ে চার্লস বলেছিলেন, ‘আমি অতটা বোকা নই। আমি বুঝতে পারি, সার্বভৌম হওয়া এক স্বতন্ত্র চর্চা। আমি জানি, কীভাবে রাজতন্ত্র পরিচালনা করা উচিত। সফলতার জন্য, আগে যেমন ছিলাম তেমনই থাকব, এটা ভুল ভাবনা। কারণ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি।’ এর থেকে বোঝা যায়, রাজপরিবারের টিকে থাকার জন্য তাকে যে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে, তা তিনি বোঝেন। কারণ, এখন তিনিই রাজা।

আমাদের সময় : একজন রাজা চাইলে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন। তো, ইউক্রেনে যে সামরিক আগ্রাসন চালাচ্ছে রাশিয়া, সেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে তিনি সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন বলে আপনি মনে করেন?

স্টিফেন ক্লিয়ার : এটা সত্য যে, যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় রাজা বা রানির ঘোষণার মাধ্যমে। রাজা তৃতীয় চার্লস যুক্তরাজ্যের সশস্ত্র বাহিনীর নতুন কমান্ডার-ইন-চিফও হয়েছেন। যাই হোক, আবারও আমি সাংবিধানিক কনভেনশনের কথা বলব : ক্রাউন তার প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পরামর্শ পাওয়ার পরই তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করবেন। প্রকৃতপক্ষে, কিছু সাংবিধানিক ভাষ্যকারের যুক্তি হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেই কনভেনশনের পরিসর বাড়ানো হয়েছে। নতুন নিয়ম করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রথমত হাউস অব কমন্সে যুদ্ধ ঘোষণার প্রস্তাবে ভোটাভুটির আহ্বান জানানোর পর সেই মোতাবেক যুদ্ধ ঘোষণা করার জন্য ক্রাউনকে পরামর্শ দেবেন। সম্ভবত নতুন রাজার শাসনামলে সেই সাংবিধানিক নিয়ম অব্যাহত থাকবে।

আমাদের সময় : নতুন রাজা অদূর ভবিষ্যতে কোন কোন বাস্তব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে চলেছেন?

স্টিফেন ক্লিয়ার : নতুন রাজার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্থিতাবস্থা বজায় রাখা। অনেক ব্রিটিশ ও কমনওয়েলথ নাগরিক রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ছাড়া আর কিছুই যেন জানতে চান না। আমিও মনে করি, রানি এমন একজন সত্ত্বা ছিলেন, যা যুক্তরাজ্যকে ঐক্যবদ্ধ করে রেখেছিল। রানির জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল, এমনকি স্কটিশ জাতীয়তাবাদীরাও, যারা যুক্তরাজ্য থেকে স্কটিশ স্বাধীনতার পক্ষে প্রচার চালায়, তারাও এ কথা বলে থাকে- রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে একটি কাল্পনিক স্বাধীন স্কটল্যান্ডের রাষ্ট্রপ্রধান হতে হবে। তো, রাজা তৃতীয় চার্লসের জন্য সেই ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে অবিরত থাকাই আসল চ্যালেঞ্জ। কমনওয়েলথের ক্ষেত্রে, রানির প্রয়াণের পর রাষ্ট্রগুলো কি ব্রিটিশ রাজশাসনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অব্যাহত রাখতে চায় কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক জমে উঠতে পারে। কারণ, রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মধ্যে জনপ্রিয়তায় বেশ ব্যবধান আছে।

বাবস্তবিক অর্থে, তার ৭০ বছরের রাজত্বজুড়ে, গ্রেট ব্রিটেন ও উত্তর আয়ারল্যান্ড রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল যেন। তিনি উদযাপনের সময় যেমন, তেমনি শোকের সময়েও দেশের পক্ষে কথা বলতেন। নতুন রাজার জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, আমাদের জাতীয় জীবনের কেন্দ্রে রানি যেমন ধ্রুব নক্ষত্র হয়ে ছিলেন, তেমনি দৃঢ়ভাবে বিরাজ করতে হবে নতুন রাজাকে। জনমনে আস্থাশীল নেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে তার।

আমাদের সময় : গুরুত্বপূর্ণ মতামত এবং মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা। ভালো থাকবেন।

স্টিফেন ক্লিয়ার : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আগামীতেও কথা হবে, আশা রাখি।

 

 

advertisement