advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা(প্রথম পর্ব)

ড. এ কে আব্দুল মোমেন
১০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৮:৩৭ পিএম | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:৪৭ পিএম
ড. এ কে আব্দুল মোমেন
advertisement

বিশ্বপরিমণ্ডলে এক সময়ে ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশ বলে পরিচিত বাংলাদেশ আজ আর্বিভূত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচন নিশ্চিত করে একটি উন্নত ও আধুনিক রাষ্ট্র হওয়ার পথে জোরেসোরে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়লাভের পর বাংলাদেশের শাসনভার নিজের কাঁধে নিয়ে যে শান্তি ও প্রগতির রাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনাও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছেন সামনে। ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরীতা নয়’ বিশ্বশান্তির পক্ষে বঙ্গবন্ধুর এই অমোঘ নীতিই এখনো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র। এই মূলমন্ত্রের ওপর ভর করেই সব বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে দেশকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন এদেশের সর্বকালের সফল প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। তার শাসনামলের প্রতিটি পদে পদে রচিত হচ্ছে সফলতার ইতিহাস। শেখ হাসিনা সরকারের বিগত ১৩ বছরে অজস্র কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ শুধু এ দেশের দূরদর্শী কূটনৈতিক নেতৃত্বের কারণে।

বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির দুটো ফোকাসিং পয়েন্ট হলো ইকোনোমিক ডিপ্লোমেসি এবং পাবলিক ডিপ্লোমেসি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। উন্নয়নের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও ব্যাপকভাবে প্রয়োজন। আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক ও শান্তি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ এই বিষয়টাকে প্রাধান্য দিয়েই অগ্রসর হচ্ছে সামনে।

advertisement 3

শেখ হাসিনার বর্তমান শাসনামলে অর্থনৈতিক কূটনীতির কার্যক্রম আশাতীত সাফল্য অর্জন করেছে। এর বড় প্রমাণ হচ্ছে, গত এক বছরে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ৬৮ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। গত বছর বাংলাদেশের সমকক্ষ দেশগুলোর কেউই সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আহরণে এমন সাফল্য পায়নি। এদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির মূল লক্ষ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেওয়া 'ভিশন-২০২১' ও 'ভিশন-২০৪১' অর্জনে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, প্রবাসীদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও গতিময় করা গুণগত উৎকর্ষ সেবা দানের মাধ্যমে সকলের আস্থা অর্জন করা। এই সবগুলো লক্ষ্যকে সামনে রেখে পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি।

advertisement 4

অন্যদিকে পাবলিক ডিপ্লোমেসির উদ্দেশ্য হলো, সামাজিক অগ্রগতি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আর সন্ত্রাস দমনে সরকারের অভাবনীয় সাফাল্য এবং বঙ্গবন্ধুর আত্নত্যাগ ও শেখ হাসিনার ভিশনসমূহকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা। যাতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজ পরিবর্তিত হয় এবং বিশ্ববাসী জানে যে বাংলাদেশ আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয় বরং বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশই হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট গন্তব্য। কারণ, বাংলাদেশের রয়েছে গতিশীল ও সমৃদ্ধিময় অর্থনীতি। অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের পর রিটার্ন আসে দ্রুত। অন্যান্য দেশ থেকে বাংলাদেশের রিটার্ন অব ইনভেস্টমেন্ট তুলনামূলক খুব ভালো অবস্থানে রয়েছে।  বিদেশে প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিয়ে, বিদেশের বিভিন্ন নামী-দামী বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজকে সম্পৃক্ত করে, সে দেশের সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম, নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে  বাংলাদেশের সাফল্যের কাহিনী প্রচার করে উন্নত ভাবমূর্তি অর্জন জনকৌটনীতির মূল লক্ষ্য। এ কাজটি করার জন্য বাংলাদেশের প্রতিটি মিশনে “বঙ্গবন্ধু কর্ণার” চালু হয়েছে। যেমন  এক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেকে জানা ও বুঝার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশনের বাইরে “ইউএসআইএস” প্রতিষ্ঠান ছিল, যারা মার্কিন জীবনধারা, তাদের ইতিহাস, তাদের অর্জন এবং তাদের  গুণাবলীগুলো তুলে ধরতো। “বঙ্গবন্ধু কর্ণার” একইভাবে বাংলাদেশের  অর্জন, বঙ্গবন্ধুর আত্নত্যাগ, গণতন্ত্রের জন্যে সংগ্রাম, ন্যায়বিচার ও মানবধিকার অর্জনের জন্যে ত্যাগ, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগের সুযোগ ও পরিবেশ, উন্নত  অবকাঠামো, বিশাল কর্মক্ষম ও দক্ষ যুব সমাজ, আইটি ক্ষেত্রে স্বক্ষমতা, ইত্যাদি অর্থাৎ বাংলাদেশকে সম্ভাবনার অর্থনীতি হিসেবে বহির্বিশ্বে জানান দেয়া। নাগরিকদের সৃষ্টিশীলতা ব্যবহার করে দেশের কাজে লাগানো। প্রবাসীরা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন বৈকি।

এর সঙ্গে জরুরি বিষয়টি হলো আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা। দেশের অভ্যন্তরীণ অথবা বাইরের যে কোনো বৈরিতা মোকাবেলা করে দেশ এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা। কারণ কোনো অঞ্চল একবার অস্থির হয়ে উঠলে সেই এলাকার উন্নয়ন কর্মকান্ড বাধাগ্রস্ত হয়, সেই সমাজের শান্তি নষ্ট হয়। যার প্রভাব পড়ে অন্য সমাজ ও অন্য দেশেও। একটি শান্তিপূর্ণ দেশের স্থিতিশীল অবস্থাও নষ্ট হতে পারে পাশের দেশের অস্থিতিশীল অবস্থার কারণে। আঞ্চলিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহযোগীতার মানসিকতা না থাকলে কোনো দেশের একার পক্ষে উন্নয়নের সুফল ভোগ করা সম্ভব না। তাছাড়া আমাদের উন্নয়নের অর্জনগুলোকে ধরে রাখতে এবং টেকসই করতে প্রয়োজন আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা। এ কারণে সব সময়ই বাংলাদেশ বৈরীতার নীতি পরিহার করে চলছে। বঙ্গবন্ধু প্রদর্শিত সকলের সাথে সুসম্পর্কের নীতিই এখনো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল বক্তব্য। এর ওপর ভর করেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক অঙ্গনে অর্জিত হয়েছে অভূতপূর্ব সব সাফল্য। এর সুফল হিসেবেই ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত স্থলসীমানা ও সমুদ্রসীমা শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পন্ন হয়েছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও ভারত স্থলসীমানা চুক্তি ১৯৭৪-এর প্রটোকল স্বাক্ষর এবং ২০১৫ সালে স্থলসীমানা চুক্তির অনুসমর্থন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদীর্ঘ প্রচেষ্টারই সুফল। ইন্সট্রুমেন্ট অব রেটিফিকেশন এবং লেটার অব মোডালিটিস স্বাক্ষরের মাধ্যমে তৎকালীন ১১১টি ভারতের ছিটমহল বাংলাদেশের এবং আমাদের ৫১টি ছিটমহল ভারতের অংশ হয়ে যায়। ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে এর আগে নাগরিকত্বহীন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নাগরিকত্ব লাভ করে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নটিকে গুরুত্ব দিয়ে অনুসরণ করছে দেশের পররাষ্ট্রনীতি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য সুনির্দিষ্ট ভিশন নির্ধারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নতবিশ্বের তালিকায় উন্নীত করার লক্ষ্যে রূপকল্প ২০৪১ ঘোষণা করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এর আলোকে কার্যকর ও যুগোপযোগীনীতি গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনা করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকারের নীতি ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপসমূহ বিদেশি কূটনৈতিক মিশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম, সভা ও সেমিনারে তুলে ধরছে। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি অর্জন করেছে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা থাকা সত্ত্বেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান সরকারের দক্ষ নেতৃত্বে বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রায় ১১ বিলিয়ন থেকে ৫২ বিলিয়নে উন্নীত হয়েছে।

শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্ব ও সফল কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে ২০১২ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সমুদ্রসীমা নির্ধারণ সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি হয়। ঐতিহাসিক এই নিষ্পত্তিতে বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র-এলাকার ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। বিরোধ নিরসনে বিরল এ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানে উপনীত হওয়ার এ নীতি আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে প্রশংসিত করেছে। এ রায়ের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় সম্ভাবনাময় সকল সম্পদ আহরণের সক্ষমতাবৃদ্ধিতে ২০১৮ সালে ভারত ও চীনের সাথে ‘ব্লু ইকোনমি’ এবং ‘মেরিটাইম খাতের মান উন্নয়নে সহযোগিতা’ বিষয়ে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সেই সাথে এই বিশাল জলরাশিতে যে সমস্ত সম্পদ রয়েছে তার সঠিক ব্যবহারের জন্য (Delta-২১০০) ১০০ বছরের দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম কারণ হলো দেশের বর্তমান স্থিতিশীল রাজনীতি। সুদীর্ঘ ১৩ বছর ধরে সব ঝড়-ঝঞ্ঝা মোকাবেলা করে শক্ত হাতে দেশ চালাচ্ছেন শেখ হাসিনা। তার যোগ্য ও সুকৌশলী নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশ ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। অস্থিতিশীলতা একটা জাতিকে কতটুকু পিছিয়ে দিতে পারে, তার বর্তমান উদাহরণ হচ্ছে, আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইয়ামেন কিংবা লেবানন। এদেশ গুলোর জনজীবন  ও উন্নয়ন এখন বাধাগ্রস্থ। শান্তি ও স্থিতিশীলতায় ভাটা পড়লে উন্নয়ন ব্যাহত হয়। আমাদের দেশেও এর  প্রমান রয়েছে। ’৭৫-এর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের কারণে বাংলাদেশ ৩০ বছরের জন্য পিছিয়ে পড়ে। বাংলাদেশ যে ৪টি মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই দর্শনের অন্যতম একটি হলো গণতন্ত্র, যা ধ্বংস হয়ে গেল ১৫ আগস্টের ভোররাতে। গণতন্ত্র হয়ে গেল সামরিক গণতন্ত্র। তার সাথে মানুষের দৌরগড়ায় গুনগত উন্নত সেবা পৌছিয়ে দেয়ার জন্যে বঙ্গবন্ধুর সরকার যে “জেলায় জেলায় জেলা সরকার” প্রবর্তন করেন, তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে কাক্সিক্ষত সুফলটা পাওয়া যায় নি। ফলে জনগণের সবধরণের সেবা পাওয়ার জন্য এখনো মানুষকে কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। যদিও বর্তমান সরকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আন্তরিক হয়ে কাজ করছে। সামরিক শাসন একা চলতে পারে না। যখনই তার সঙ্গে প্রহসনের নির্বাচনের মতো গণতন্ত্রের সংমিশ্রণ ঘটানো হয়, তখন তা এতই বিপজ্জনক হয় যে, একটা রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। ১৯৭৫ এর পরে বাংলাদেশের অবস্থাও হয়ে পড়েছিল সেইরকম। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। বহু বাধা পেরিয়ে আজ বর্তমান অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। যে কোনো সংগঠন, প্রতিষ্ঠান- এমনকি রাষ্ট্রের উন্নয়নের মূল ভিত্তি হল স্থিতিশীলতা। সেই স্থিতিশীলতা আসে জনগণের মৌলিক শিক্ষা, দেশপ্রেম, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যমে। শেখ হাসিনার সরকার এর প্রত্যেকটি বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন সামনে।

স্থিতিশীল রাজনীতি একটি দেশকে কেমন করে উন্নয়নের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো এশিয়ার অন্যতম দেশ মালয়েশিয়া। ১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট ব্রিটিশদের কাছ থেকে  স্বাধীনতা অর্জন করে দেশটি। মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দেশ। যার মোট আয়তন ৩ লাখ ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার। মোট ১৩ টি প্রদেশ এবং তিনটি প্রশাসনিক অঞ্চল নিয়ে গঠিত এ দেশের জনসংখ্যা ৩২.৭ মিলিয়ন। মাথা পিছু আয় ১২ হাজার ১৫০ মার্কিন ডলার। ২০২০ সালে উন্নত রাষ্ট্র ঘোষণা করার টার্গেট অর্জন করতে সক্ষম না হলেও ২০৩০ সালে উন্নত রাষ্ট্র ঘোষণা করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। চীন, সিঙ্গাপুর, ব্রুনেই, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন  এবং থাইল্যান্ড  এর জল ও স্থল সীমান্ত ঘেরা মালয়েশিয়ার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রয়েছে শক্তিশালী অবস্থান।

মাহাথির মোহাম্মদ যেদিন মালয়েশিয়ার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, সেদিন দেশটি ছিল বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র রাষ্ট্র। তখন তার মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১৩০ ডলার। জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ২৫ শতাংশ। শিক্ষিতের হার ছিল ২০ শতাংশ। জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশ ছিল শহরবাসী ও শিল্পনির্ভর। কিন্তু দীর্ঘ ২২ বছরের শাসন শেষে মাহাথির যেদিন স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়েন, সেদিন দেশটির মাথাপিছু আয় ছিল ৩ হাজার ৩৩০ ডলার। শিক্ষিতের হার ৯৯ শতাংশ। পুরুষদের গড় আয়ু ৭১ বছর, নারীদের ৭৬ বছর। ১৯৮১ সালের ১৬ জুলাই ৫৫ বছর বয়সে ডা. মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং একটানা ২২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ৭৭ বছর বয়সে ২০০৩ সালের ৩১ অক্টোবর স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ও রাজনীতি থেকে বিদায় নেন। একটি পক্ষ সব দেশেই থাকে, যাদের কাজ হলো শুধু সমালোচনা করা। কিন্তু উন্নয়নের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সব সময় সব সমালোচনা গায়ে মাখলে চলবে না। নিজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঠিক রেখে দৃঢ়ভাবে পথ চলতে হবে, মাহাথিরের দীর্ঘ শাসন মূলত সেই জিনিসটাই দেখিয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। (চলবে)

লেখক: পররাষ্ট্রমন্ত্রী 

advertisement