advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা(২য় পর্ব)

ড. এ কে আব্দুল মোমেন
১১ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৯:১০ এএম | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০১:১১ পিএম
ড. এ কে আব্দুল মোমেন
advertisement

স্থিতিশীল রাজনীতির সুফল ভোগকারী আরেকটি ছোট্ট দেশ হলো সিঙ্গাপুর। এশিয়ার ‘চার বাঘ’ খ্যাত ছোট দেশগুলোর একটি হলো সিঙ্গাপুর। বাকি তিন দেশ হচ্ছে হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান। সম্প্রতি বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অর্থনীতির র‌্যাঙ্কিংয়ে সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও হংকংকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করা সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বিজনেস স্কুল আইএমডির র‌্যাঙ্কিং এমনটা জানাচ্ছে। একেকটি দেশ টেকসই প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং নাগরিকদের কল্যাণ কর্মসূচি বৃদ্ধির পরিবেশ কতটা নিশ্চিত করতে পারছে, তা বিশ্লেষণ করে এ ক্রম সাজানো হয়ে থাকে। র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে সিঙ্গাপুরের উঠে আসার পেছনে দেশটির সরকারের স্থিতিশীলতা, উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমিকের প্রাপ্যতা, অনুকূল অভিবাসন আইন এবং নতুন নতুন ব্যবসার সুপরিকল্পিত উদ্যোগ কাজ করেছে। প্রশ্ন হলো সিঙ্গাপুরের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি অতি ক্ষুদ্র দেশ যেখানে কাদা আর সমুদ্রের খোলা আকাশ ছাড়া কিছুই ছিল না সেটা অর্থনৈতিকভাবে এত উচ্চতায় উঠে এল কীভাবে?

সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় দলটি হলো পিপলস অ্যাকশন পার্টি। ১৯৫৪ সালে একটি ছাত্রসংগঠন থেকে স্বাধীনতাপন্থী এ দলের জন্ম হয়েছিল। দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান ইউ সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি টানা তিন দশক সরকারপ্রধান ছিলেন। দীর্ঘ তিন দশকের শাসনামলে নিজের প্রচেষ্টা ও যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে এক প্রজন্মেই সিঙ্গাপুরকে তৃতীয় বিশ্ব থেকে প্রথম বিশ্বে তুলে আনতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। এ কারণে তাকে জাতির স্থপতি বলা হয়। লি কঠোরভাবে ও সুশৃঙ্খলভাবে একদলীয় শাসন ধরে রেখেছিলেন। স্থিতিশীল একদলীয় শাসন দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মসৃণভাবে এগিয়ে নিতে পেরেছিলেন। যেভাবে লি একক হাতে দেশের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করেছেন এবং বাস্তবায়ন করেছেন, তা যদি বারবার হাত বদল হতো, তা কখনোই সম্ভব হতো না হয়তো। এখনো তার ছেলে শক্ত হাতে দেশকে বিশ্বের অভাবনীয় সাফল্যের দেশে পরিণত করে চলেছেন।

advertisement 3

মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম উন্নত দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির মানুষের বর্তমান মাথাপিছু আয় ৩৭ হাজার ৪৯৭ মার্কিন ডলার। জিডিপির আকার ৪২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আধুনিক এ আরব আমিরাতের রূপকার ছিলেন শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। বর্তমান সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও সামাজিক উন্নয়নের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি তার সুদীর্ঘ ১৮ বছরের শাসনামলে। ২০০৪ সালে দেশটির প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা গ্রহণ করে ২০২২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এ দীর্ঘ সময়ে দেশকে ঢেলে সাজিয়েছেন ইচ্ছে মতো।

advertisement 4

স্থিতিশীল রাজনীতির সুফল ভোগকারী অপর দুটি দেশ হলো কম্বোডিয়া ও রুয়ান্ডা। রুয়ান্ডাকে বর্তমানে বলা হয় সিঙ্গাপুর অব আফ্রিকা। বিগত দুই দশকে রুয়ান্ডার অর্থনীতি ব্যাপকভাবে উন্নত হয়েছে। বিশেষ করে দেশটি শিল্পায়নের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে। এক সময় যে রুয়ান্ডার মানুষ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সাথে নিয়মিত লড়াই করতো, উপনৈবেশিকদের সৃষ্টি জাতিগত বিভেদ; হোটি ও টুসসির আত্নঘাতি ‘‘আত্মহত্যা’র কারণে ভবিষ্যত ছিল অন্ধকার, তারা এখন স্বপ্ন দেখছে উন্নত ও আধুনিক জীবনের। রুয়ান্ডার মানুষকে এ স্বপ্ন দেখিয়েছেন দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট পল কাগামী বস্তুত ১৯৯৬  সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে এখনো দেশটি শাসন করছেন । তার এ দীর্ঘ ২৬ বছরের শাসনে (উপরাষ্ট্রপতি ও রাষ্ট্রপতি) পুরো চেহারাই বদলে গেছে রুয়ান্ডার অর্থনীতির। মানুষের আয় যেমন বেড়েছে, বেড়েছে জীবন যাত্রার মানও। অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মান অর্জনের পথে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে রুয়ান্ডা। কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে একইরকম চিত্র। দেশটির প্রধানমন্ত্রী হুন সেন ১৯৯৮ সাল থেকে এখনো দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। কম্বোয়িার অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। তার দীর্ঘ ও স্থিতিশীল শাসনামলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে কম্বোডিয়ার অর্থনীতি।

পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ আর সুষম উন্নয়নের জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা একান্ত জরুরি। তবে শুধু একটি দেশের স্থিতিশীলতা নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও থাকতে হবে। কেননা, এক দেশের অশান্তি অন্য দেশকে আক্রান্ত করে। সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বরাবরই স্বক্রিয় ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুও গভীরভাবে অনুধাবন করতেন, উন্নয়নের জন্য শান্তি অপরিহার্য। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার আমলে যে স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে, তার সুফলও পাওয়া যাচ্ছে হাতে হাতে। বিগত ১৩ বছরের ধারাবাহিক শাসনামলে শেখ হাসিনা সরকার দেশকে উন্নতির চরম শিখরের দিকে নিয়ে চলেছেন। এক সময় যা অকল্পনীয় ছিল এ দেশে, তা এখন পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের ঘরের দোরগোড়ায়। স্বাধীনতার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ। বতর্মানে দারিদ্র্যর হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। বতর্মান সরকার কর্তৃক দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠির জন্য বিভিন্ন ভাতা চালু, তাদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি - যেমন আশ্রয়ণ প্রকল্প, ঘরে ফেরা, কম্যুনিটি ক্লিনিক স্থাপনের মত কর্মসূচি দারিদ্র্য বিমোচন এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। কৃষক ও কৃষি-বান্ধব নীতি গ্রহণের ফলে দেশ দ্রুত খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করেছে।  ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে ২০০৯ সালে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে শেখ হাসিনার সরকার বিএনপি-জামায়াত এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২ বছরের আর্থিক ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে এবং সেই সময়কার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এক নতুন মাত্রা যোগ করতে সক্ষম হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আজ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে একটি সুপরিচিত নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চ হার অর্জনের পাশাপাশি নানা সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস, লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ, শিক্ষার হার ও গড় আয়ু বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ তার দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশিদেরই শুধু নয়, অনেক উন্নত দেশকেও ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। মাথাপিছু আয় ১২০০ মার্কিন ডলার অতিক্রম করায় বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালে বাংলাদেশকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যেখানে মাথাপিছু আয় ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার, ২০২১ সালে তা ২ হাজার ৮১৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র্যহারের ব্যাপক অগ্রগতি সূচিত হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১.৫ শতাংশ। বর্তমানে সেই দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২০.৫ শতাংশে এবং অতি দরিদ্রের হার ১০.৫ শতাংশ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের হিসেব মতে ২০১০ সালে দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসরত কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ছিল ৭৩.৫ শতাংশ। ২০১৮ সালে তা ১০.৪ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। ২০১৮ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে স্থান দিয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশের প্রমাণ মেলে তার বার্ষিক আর্থিক পরিকল্পনায়। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বিএনপি সরকারের শেষ বছরে বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৬১ হাজার কোটি টাকা। শেখ হাসিনা সরকারের ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাজেটের আকার ১১ গুন  বেড়ে দাড়িয়েছে ৬ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা রয়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয়। বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করেছে। পদ্মা সেতুর মত দেশের বৃহত্তর ব্রীজ নিজের টাকায় করে আত্নবিশ্বাস অনেক উর্দ্ধে নিয়ে গেছে, পাবনার রূপপুরে ২৪০০ মেগাওয়াটের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জনের জন্য ‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ নামে শতবর্ষের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সঙ্গে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রাগুলো সম্পৃক্ত করে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে। (চলবে)

লেখক : এ কে আব্দুল মোমেন
সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

advertisement