advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ধোঁয়াটে রাজনীতি বনাম সম্প্রীতির ধর্মীয় উৎসব

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৮:৫৭ এএম
advertisement

এই লেখাটিতে আমি মোটেও রাজনীতি প্রসঙ্গ আনতে চাইনি। তবে মূল আলোচনার বক্তব্যের সঙ্গে একটি তুলনীয় বিষয় চলে আসায় কিঞ্চিৎ উল্লেখ না করে পারছি না। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার হিংস্রতা দেখে মানুষ বিষণ্ণ হয়, উৎকণ্ঠিত হয়। আর এই সূত্রে ধর্মকে নেতিবাচকভাবে দেখতে থাকে। আসলে সুবিধাবাদীরাই ধর্মকে ঢাল হিসেবে সামনে রেখে সাম্প্রদায়িক মানুষকে ক্ষুব্ধ করে সুবিধার ফসল ঘরে তুলতে চায়। এসব ক্ষেত্রে বরাবরই রাজনীতি অঙ্গনের কুশীলবরা সক্রিয় থাকেন বেশি। গণতান্ত্রিক দেশের দলীয় রাজনীতিতে পক্ষ-বিপক্ষ থাকবেই। ক্ষমতার মোক্ষে পৌঁছতে দৌড়ঝাঁপ ও রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহৃত হবেই। কিন্তু তা দেশাত্মবোধকে বিসর্জন দিয়ে নয়। আমাদের ক্ষমতাবান দলগুলোর নিয়ন্ত্রকরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আধিকারিক হতেই বেশি পছন্দ করেন। যেন এখানেই সব মধু। সংসদে বিরোধী অবস্থানে থেকেও যে দেশ সেবা করা যায় তা কেউ বুঝতে চান না। পাশাপাশি ক্ষমতায় নানা কৌশলে যাওয়ার চেয়ে দেশের সম্মানকে সমুন্নত রাখা যে অনেক বড় তা আমাদের ‘দেশপ্রেমিক’ রাজনীতিকরা বুঝতে চান না। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক যুদ্ধ থাকতে পারে কিন্তু তাই বলে আমাদের মতো প্রতিপক্ষ দলের নেতারা প্রতিদিন নিয়ম করে বাদ-প্রতিবাদ যেভাবে করে যাচ্ছেন তাতে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য তেমন থাকছে না। জাতীয় নির্বাচনের উত্তাপ এক বছর আগেই আমাদের গায়ে লাগছে। নির্বাচন সামনে রেখে বরাবরের মতো রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা নাটক চলছে তা অভাবিত না হলেও রাজনৈতিক সৌন্দর্যের পরিচায়ক নয়।

বিএনপি এখন পর্যন্ত অনড় দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না বলে। ছোট ছোট অনেক দল নিয়ে ঐক্য গড়ে আন্দোলনের ওয়ার্মআপ করছে। বিএনপির আন্দোলন করে সরকার হটানোর কথা আমরা প্রায় এক যুগ ধরে শুনছি। এবার অন্তত জনদুর্ভোগের মতো দু-একটি ইস্যু নিয়ে পথে নেমেছে। তবে এসবকে বিচ্ছিন্ন জমায়েত বলেই ধরে নেওয়া যায়। পুরনো আচরণের মতো সরকারি দলের পেটোয়া বাহিনী প্রায়ই হামলা করছে আন্দোলনকারীদের ওপর। অর্থাৎ সব পক্ষই প্রমাণ করছে আমরা গণতন্ত্রচর্চা থেকে অনেক দূরে আছি।

advertisement 3

আমাদের রাজনীতি থেকে নীতি হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিলেও নির্বাচনী ঐক্য গড়ার চেষ্টা করছে বিএনপি। তাদের ভাষায়, তারা ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন প্রতিহত করবে। এভাবেই গণতন্ত্রের পথে হাঁটছি আমরা! আবার এমনই রাজনৈতিক আদর্শ আমাদের পাকিস্তানের পক্ষে সহানুভূতিশীল বিএনপি, স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত, মুক্তিযুদ্ধের ধ্বজাধারী ও বামপন্থি কয়েকটি দল আপাতত এক হয়েছে। অর্থাৎ বহিরাঙ্গে তেলে-জলে সব মিলে যাচ্ছে। অন্তরের খবর জানি না। জাতীয় পার্টি একাই হাঁটবে, সামর্থ্য যাই থাকুক। এর পেছনে রহস্য আছে বলেই সাধারণের ধারণা। সরকারে থাকায় সুবিধাজনক জায়গায় বসে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

advertisement 4

দল নির্বিশেষে পারস্পরিক শত্রুতাই এখানে বেশি প্রকাশ্য। ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যটাকে বড় না দেখে জনআস্থা পাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করলে পরস্পরের প্রতি রাজনৈতিক সম্প্রীতিই বাড়ানো যেত। এ দেশের সাধারণ মানুষ কিন্তু ধর্মীয় সম্প্রীতি ঠিকই বজায় রাখছে যুগ যুগ ধরে।

এই প্রসঙ্গ ধরে আমরা আসন্ন শারদীয় পূজার প্রসঙ্গ টানতে পারি। হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতে যাচ্ছে। আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যতটা স্পষ্ট আমি গত শতকের ৯০-এর দশকে কলকাতায়ও তেমনটি দেখিনি। তখন আমি গবেষণার কারণে অনেকটা দিন কলকাতায় ছিলাম।

আমার মনে পড়ছে কোভিডের আগের বছরের কথা। তখন ঈদুল আজহার দিন আমাদের একটি টিভি চ্যানেল সাধারণ মানুষের অনুভূতি জানতে চাওয়া নিয়ে অনুষ্ঠান করছিল। উন্মুক্ত লোকালয়ে অনুষ্ঠান। এক পর্যায়ে মাইক্রোফোনে এক ভদ্রমহিলা এলেন। শাঁখা-সিঁদুরে বোঝা গেল তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্য। সঙ্গে স্বামী ও দুই সন্তান আছে। অফিস ছুটি তাই আনন্দ করতে বেরিয়েছেন। মুসলমান প্রতিবেশীর মতো ঈদের আনন্দ তাকেও ছুঁয়ে গেছে। জানালেন রাতে তার স্বামীর মুসলমান বন্ধুর বাড়িতে ঈদের দাওয়াত খেতে যাবেন। তারা জানেন এদিন তাদের খাওয়ানোর জন্য ভিন্ন আয়োজন করা হবে। আসলে এটিই আবহমান বাংলার চিত্র।

আমাদের ছেলেবেলার কথা স্মরণে আনতে পারি; নারায়ণগঞ্জের বন্দরে অনেক হিন্দু পরিবারের বাস ছিল। এদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন পর্যায়ে ভারত চলে গেছেন। এসব বাড়িতে আমার বোনদের বান্ধবী অনেক দিদি ছিলেন। আদর-স্নেহ পেয়ে তাদের দূরসম্পর্কের মনে হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমরা ছোটরা যেমন করগুণে ঈদের অপেক্ষা করতাম, একইভাবে দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপুজা আর সরস্বতী পূজার জন্যও দিন গুনতাম। মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দেখা, ঢাকির জাদুকরী হাতে মনমাতানো ঢাকের বাদ্যে মাতোয়ারা হওয়া আর প্রসাদ খাওয়ার লোভ তো ছিলই। ঈদে কি অমুসলিম বন্ধুরা নিমন্ত্রিত হন না? একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন না?

ঈদের মতো মহরমের মিছিলেও এক সময় ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ ছিল। ইরাক-ইরানসহ অনেক দেশে শিয়া-সুন্নির মধ্যকার দ্বন্দ্ব হানাহানির পর্যায়ে চলে যায়। এদিক থেকে বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। আঠারো শতক থেকে ঢাকায় মহরম পালিত হচ্ছে। শিয়াদের তাজিয়া মিছিলে সুন্নি মুসলমানের অংশগ্রহণ এ দেশে স্বাভাবিকই ছিল। আঠারো-উনিশ শতকের নথিতে দেখা যায়, একটি সাংস্কৃতিক প্রণোদনা নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেও শরিক হতো মহরমের মিছিলে। বিশ্বাস ছিল কারবালার স্মৃতিতে দুলদুলের প্রতীক ঘোড়ার পায়ে দুধ ঢেলে মনোবাঞ্ছা করলে তা পূরণ হয়। অনেক হিন্দুও ইচ্ছে পূরণের আশায় দুলদুলের পায়ে দুধ ঢালত।

মুসলমান পীরের সমাধিতে হিন্দুর যাওয়া, প্রার্থনা করা এ দেশে একটি সাধারণ চিত্র। গ্রামগঞ্জের নানা জায়গায় এখনো ভাদ্রের শেষ বৃহস্পতিবার নদীতে কলার ভেলায় রঙিন কাগজের ঘর বানিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে ভাসানো হয়। এই ‘ভেলা ভাসানো’ উৎসবে হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়েরই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকে। সুন্দরবনের সঙ্গে জীবিকা জড়িয়ে আছে এমন মুসলমান বাওয়ালি, কাঠুরে বা জেলেরা বনের রক্ষাকর্ত্রী দেবী কল্পনায় বনবিবি আর ব্যাঘ্র দেবতা গাজীর নাম জপ করে। অন্যদিকে হিন্দু বাওয়ালি, কাঠুরে ও জেলে একই অধিকর্ত্রী দেবী হিসেবে বনদুর্গা আর ব্যাঘ্র দেবতা হিসেবে দক্ষিণ রায়ের নাম জপ করে।

এসব বাস্তবতা এ দেশের দীর্ঘকাল ধরে লালিত সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথাই প্রকাশ করছে। সমাজ ইতিহাস ও পুরাতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে আমি আমার লেখায় বহুবার বলার চেষ্টা করেছি যে, ইতিহাস-ঐতিহ্যের বাস্তবতাই বলে দিচ্ছে এ দেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার অপচ্ছায়া খুব স্বচ্ছন্দে ডানা মেলতে পারবে না। এ দেশের সাধারণ মানুষের মানসিক গড়ন সাম্প্রদায়িকতার ভেদবুদ্ধিকে সমর্থন করে না। তার পরও এ সত্য মানতে হবে, অন্ধকারের জীব যারা ধর্মকে আধ্যাত্মিকতার গাম্ভীর্য আর সৌন্দর্যে না দেখে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তারা কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানোর চেষ্টা করে। অন্যদল অতটা বুঝে নয়, বরং সাংস্কৃতিক অনগ্রসরতা ও কূপম-ূকতার কারণে ধার্মিক না হয়ে এক ধরনের ধর্মান্ধ হয়ে যায়। ধর্মচর্চার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় বাণীর মর্মার্থ অনুধাবন না করে অনালোকিত এবং সীমাবদ্ধ জ্ঞানের ধর্মনেতার বয়ান শুনে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে দেয়। প্রথম শ্রেণির ধর্ম-বণিকদের চেনা যায়, ফলে এদের প্রতিহত করাও সম্ভব। কিন্তু অতি ধীরে হলেও দ্বিতীয় শ্রেণির সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মানুষদের পক্ষে সমাজ কলুষিত করার ক্ষমতা বেশি বলে আমি মনে করি। প্রথমে তারা নিজ পরিবারকে প্রভাবিত করে, পরে প্রতিবেশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।

মানুষকে সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের চেষ্টা করতে হয় জানার জগৎ শানিত করে। আমি কাছে থেকে লক্ষ করেছি, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ধর্ম, সমাজ ও সাহিত্যের খোঁজ আমরা যতটা রাখি ওপারের মানুষ আমাদের সম্পর্কে তেমনটা রাখতে পারেন না। এর অনেক কারণ আছে। কলকাতায় কোনো বই বা জার্নাল প্রকাশিত হলে কলেজ স্ট্রিটের দোকানে আসার আগেই বাংলাদেশের বুক স্টলে চলে আসে। কালেভদ্রে বাংলাদেশের বইয়ের দেখা মেলে কলকাতার বইয়ের দোকানে। কলকাতার সব টিভি চ্যানেল আমাদের ড্রইংরুমে। আমাদের কোনো চ্যানেল দেখার তেমন সুযোগ নেই পশ্চিমবঙ্গে। আমার এক সংস্কৃতিকর্মী ছাত্র যথার্থই মন্তব্য করল সেদিন, এই যে রোজা আর ঈদ যায়, এ নিয়ে কলকাতার বেশিরভাগ টিভি চ্যানেল তেমন কোনো অনুষ্ঠান করার প্রয়োজন মনে করে না। অথচ আমাদের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া দুর্গাপুজোর বোধন থেকে বিসর্জন পর্যন্ত খবরে ও অনুষ্ঠানে মাতিয়ে রাখে। অর্থাৎ এ দেশের মানুষ দুই সম্প্রদায়ের অধিকার অভিন্ন ভাবতে অভ্যস্ত বলেই আমাদের মধ্যে এই স্বতঃস্ফূর্ততা রয়েছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, কলকাতার চ্যানেলে মুসলমানের উৎসবের খবর-প্রতিবেদন জায়গা করে নিতে যে পারছে না সে তথ্য আমরা পেলেও আমাদের চ্যানেল ওপারের মানুষ দেখতে না পাওয়ায় পুজো নিয়ে এ দেশে যে এত আয়োজন হয় তার খোঁজ আবার তারা পাচ্ছেন না। পেলে হয়তো কলকাতার চ্যানেলেও এর একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়ত।

আমার বরাবরই মনে হয়েছে, ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ ধরে রাখতে পারলে এ দেশের ধর্ম-বণিক রাজনীতিকদের অপতৎপরতা আর জঙ্গিবাদ কখনো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে না। এজন্য অনালোকিত জনগোষ্ঠীকে আলোতে আনতে হবে আবহমান বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে। ক্ষমতান্ধ রাজনীতি যদি রাজনৈতিক কৌশল ধরে রেখেও পারস্পরিক শত্রুতার বদলে সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারত তবে আলোকিত হতেন আমাদের রাজনীতিকরা। অন্ধকার দূরীভূত করতে আলোর প্রক্ষেপণই প্রয়োজন!

 

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

advertisement