advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সীমান্তে আতঙ্ক- সামরিক শক্তি বৃদ্ধি জরুরি

ড. শফিকুল ইসলাম
২১ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০২:৩৪ এএম
advertisement

গত ২৮ আগস্ট বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু বাজার এলাকায় মিয়ানমার থেকে ছোড়া দুটি মর্টার শেল বাংলাদেশের প্রায় আধা কিলোমিটার ভেতরে ঘুমধুম সীমান্তে পড়ে। উভয় মর্টার শেল অবিস্ফোরিত পাওয়া গেছে। তাই এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এ ঘটনার পর সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। বিজিবির সদস্যরা মর্টার শেল দুটি ঘিরে ফেলেন এবং নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করেন। মিয়ানমারের কাছে বাংলাদেশ কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার কর্তৃক সীমান্তে বাড়াবাড়ি থামেনি। কারণ এর পর ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর ৯টি মর্টারের গোলা বাংলাদেশের ভূখ-ের অভ্যন্তরে পড়ে। তা নিয়ে পুরো বাংলাদেশ তো আতঙ্কে রয়েছে। ওই এলাকার মানুষ খুবই আতঙ্কে আছে।

সীমান্তে অবিস্ফোরিত মর্টার শেল দুর্ঘটনাজনিত, নাকি ইচ্ছাকৃতÑ তা আগে খতিয়ে দেখা হবে। তবে এখন মিয়ানমার সরকার বলছে, এগুলো তাদের ইচ্ছাকৃত নয়। ঘুমধুম সীমান্তসহ আশপাশ এলাকায় এই পরিস্থিতির জন্য মিয়ানমার এবার আরাকান আর্মির পাশাপাশি রাখাইনের সশস্ত্র সংগঠন আরসার ওপর দায় চাপিয়েছে। দেশটি বলেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান ‘আন্তরিক সম্পর্ক’ নষ্ট করার স্বার্থে এ দুইপক্ষ মিলে সীমান্ত এলাকায় চলমান পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এই ধরনের সীমান্তে উসকানি কোনোভাবেই সহ্য করা যাবে না। এ জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে। আবার মিয়ানমারের উসকানিতে পা দেওয়া যাবে না। আমাদের কৌশলগতভাবে এ বিষয়টি মোকাবিলা করতে হবে।

advertisement 3

একদিকে বান্দরবান এলাকায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে বিজিবি, অন্যদিকে অবিস্ফোরিত মর্টার শেল দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে স্থানীয়রা। তারা বলেছেন, দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় রাখাইন রাজ্যে সীমান্তজুড়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে আরাকান সেনাবাহিনীর লড়াই চলছে। যদি এটি সত্যি হয়, তা হলে ভালো। তবে এসব উসকানির পেছনে মিয়ানমারের অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে। আমাদের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে সরকারকে এ বিষয়ে সমাধান করতে হবে। মাঝে মধ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার ও যুদ্ধবিমানকে সীমান্তে চক্কর দিতে দেখা যায়। অনেক সময় বাংলাদেশ সীমান্তে অতিক্রম করে যায় হেলিকপ্টার। তা খুবই দুঃখজনক।

advertisement 4

জিরোলাইন আশ্রয়শিবিরে ৬২১টি রোহিঙ্গা পরিবারের ৪ হাজার ২০০ সদস্য রয়েছেন। গুলির শব্দে তারা আরও ভয় পায়। তাদের বাংলাদেশের ভেতরে পাঠানোর একটি ষড়যন্ত্র হতে পারে। এবার বাংলাদেশ সরকারকে কঠোর সতর্ক থাকতে হবেÑ যাতে একজন রোহিঙ্গাও বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে। কারণ যারা প্রবেশ করছে, তাদের যন্ত্রণা যে ভয়াবহÑ তা আমরা টের পাচ্ছি। তাই এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থায় থাকতে হবে। সম্পূর্ণ জিরো টলারেন্স নীতি প্রয়োগ করতে হবে। বর্তমানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে জোর তৎপর চালাচ্ছে বাংলাদেশ। এটি থামানোর জন্য মিয়ানমার এই ধরনের ষড়যন্ত্র করতে পারেÑ যাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের কূটনৈতিকভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ ১০-১২ লাখ রোহিঙ্গা আমাদের সমাজ ও পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক। তারা নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে। তা আমাদের জনগণের জন্য মারাত্মক হুমকি।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ যে পথে আছে, তা ঠিক আছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। মিয়ানমারের ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। আমাদের স্বার্থে সংঘর্ষে না জড়িয়ে অন্যান্য বিকল্প পথ যা আছে, ওই বিষয়ে কাজ করতে হবে। যেমনÑ চীন ও ভারতসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে এ বিষয়ে আমাদের যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবেÑ যাতে মিয়ানমারের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেন বুঝতে পারে, মিয়ানমার এসব ইচ্ছাকৃত করছে। সরকারের কূটনীতির সঙ্গে সামরিক যে প্রস্তুতি বা প্রস্তাবগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে দ্রুত কাজ করতে হবে। কারণ আমাদের উন্নয়ন যা হয়েছে, তা প্রশংসনীয়। কিন্তু আমাদের সময় আসছে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করার। সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মতো সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এখানে যাতে আগামী বাজেটে বেশি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নে যে পর্যায়ে আছি, এ জন্য আমাদের সামরিক শক্তি প্রদর্শনে উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সামরিক শক্তি প্রয়োগ না করলেও সামরিক শক্তি প্রদর্শন করার মতো ক্ষমতা দেখাতে পারত এবং মিয়ানমারকে ভীতি প্রদর্শন করা যেত। কারণ মাঝে মধ্যে ভীতি প্রদর্শন অনেক কাজে আসে। এটির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে কঠোর বার্তা দেওয়া যায়। আমাদের সরকার বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটি ভালো দিক। তা একান্ত প্রয়োজনীয়। তথ্য অনুসারে মিয়ানমার ছোটখাটো একটা গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। তাই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এমনিতেই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এ জন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতি চালিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে সামরিক কূটনীতি চালাতে হবেÑ যাতে আমরা কোনোদিকে পিছিয়ে না পড়ি।

মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সীমানা আইনের লঙ্ঘন করে যাচ্ছে। এর দায় মিয়ানমার সরকারকে নিতে হবে। আমাদের আন্তর্জাতিকভাবে এ রকম পলিসি নিতে হবেÑ যাতে অন্যান্য দেশ মিয়ানমারের ওপর চাপ দেয়। এতে আমাদের কূটনৈতিক সফলতা আসবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কূটনৈতিক তৎপরতা অনেকগুণ বৃদ্ধি করতে হবেÑ যাতে আমরা কূটনৈতিকভাবে পিছিয়ে না পড়ি। ভবিষ্যতে মিয়ানমারকে কীভাবে এ ধরনের কর্মকা- থেকে দূরে রাখা যায়, ওই চেষ্টা আমাদের চালাতে হবে।

সব সময় শুনে আসছি, সীমান্তে হত্যা হয়েছে। কিছুদিন আগে এক তরুণকে সীমান্তে হত্যা করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতÑ উভয় দেশ একমত হয়েছে সীমান্ত হত্যা জিরোতে নিয়ে আসবে। এটি খুবই সুখবর। আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু ভারত এই বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে। তা খুবই ইতিবাচক। কিন্তু এখন মিয়ানমার যা শুরু করছে, তা খুবই বাড়াবাড়ি। এই বাড়াবাড়ি এখানে থামাতে হবেÑ যাতে ভবিষ্যতে আর সীমান্ত এলাকার মানুষের যেন ঘুম হারাম না হয়। কারণ অনেক দিন ধরে সীমান্তে বসবাসকারী মানুষ খুবই আতঙ্কে রয়েছে।

কিছুদিন আগে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু সীমান্তে বিস্ফোরণে স্থানীয় এক বাংলাদেশি তরুণ গুরুতর আহত হয়েছেন। তার বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এই ছেলে আর সুস্থ পা ফিরে পাবে কিনা, এ আশঙ্কা থেকে যায়। শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর জখম হয়েছে। কোনো ছেলের জীবন ধ্বংস মানে একটি পরিবার ধ্বংস। এ জন্য অবশ্যই মিয়ানমার সরকার দায়ী। বাংলাদেশ সরকারকে সামরিক শক্তির বিষয়ে উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

শুধু ব্রিজ আর রাস্তাঘাট করলেই দেশের সার্বিক উন্নয়ন হয় না। আমাদের অর্থনৈতিক ও সামরিকÑ উভয় দিকে উন্নত হতে হবে। একটি দেশ যদি সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী না হয়, তা হলে ওই দেশের মানুষ নিরাপদ নয়। কারণ যে কোনো সময় অন্য দেশ এই ধরনের সীমান্তে আতঙ্ক ছড়াতে পারে। আহত ওই ছেলের ভবিষ্যৎ খুবই সংকটে পড়ে গেল। এ ঘটনায় সীমান্তে লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সীমান্তের কাছে স্থানীয় কৃষকদের ধান ও শাকসবজির ক্ষেত আছে। তাই স্থানীয় প্রশাসনকে খুবই তৎপর থাকতে হবে এবং ওই এলাকায় বসবাসকারী লোকদের সতর্ক করতে হবেÑ যেন তারা সাবধানে চলাফেরা করেন।

ড. শফিকুল ইসলাম : সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

advertisement