advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ছোট উদ্যোক্তাদের পাশে আর্থিক খাত

ড. আতিউর রহমান
২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৪:১০ পিএম
advertisement

কোভিড ১৯-এর তীব্র সংকটকালে আমরা দেখেছি অনানুষ্ঠানিক খাতের ছোট উদ্যোক্তারা কী বিপদেই না পড়েছিলেন, বিশেষ করে লকডাউনের সময় তাদের বেচাকেনা একদম বন্ধ হয়ে যায়। যারা রাস্তার পাশে চা বিক্রি করতেন, রিকশা বা ভ্যান চালাতেন- তাদের কর্মকা- একদম থেমে যায়। তারা তাদের পুঁজি ভেঙে চলার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে শহর ছেড়ে তাদের কেউ কেউ গ্রামে চলে যান। গ্রামবাংলা তাদের বিমুখ করেনি। অকৃষি খাতে নয়া উদ্যোক্তা হওয়ার প্রচেষ্টায় তারা লিপ্ত হন। পরে লকডাউন উঠে গেলে দুটি টিকা নিয়ে তাদের অনেকেই নগরে আবার ফিরে এসেছেন। নতুন করে দোকানপাট চালু করার উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু হাতে তেমন পুঁজি নেই। তবু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছেন।

অন্যদিকে মধ্যবিত্তের সংসারেও লেগেছে অর্থকষ্টের ধাক্কা। করোনাকালে অনেকেরই কাজ চলে গেছে। তবে তাদের শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার করে নতুন উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করেছেন। বিপুলসংখ্যক তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে কোভিড সংকটকালে। তারা ঘরে রান্না করে অনলাইনে বিক্রি করার উদ্যোগ নিয়েছেন। গ্রাম থেকে মাছ, চাল, সবজি, মুরগি এনে অনলাইনে বিক্রি করছেন। অনেক শিক্ষিত তরুণ গ্রামে গরুর খামার, মাছের চাষ ও সবজির আবাদে মনোযোগী হয়েছে। এই নয়া উদ্যোক্তারা গ্রাম ও শহরের সেতুবন্ধন হিসেবে অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছে। তারা সবাই ডিজিটাল অর্থায়নকে কাজে লাগিয়েছেন। প্রায় সবারই মোবাইল কিংবা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের হিসাব রয়েছে। দ্রুত লেনদেনের জন্য এই ধারার আর্থিক সেবার সুযোগ তারা নিচ্ছেন। এখন প্রায় ১৮ কোটি মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব রয়েছে বাংলাদেশে। প্রতিদিন তিন হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে। মাসে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে এমএফএসের মাধ্যমে। মানুষ ঘরে বসেই বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল শোধ করছে, অনলাইনে কেনাকাটার বিল পরিশোধ করছে। গার্মেন্টকর্মীরা নিয়মিত টাকা পাঠাচ্ছেন গ্রামে। প্রতিদিনই রিকশাচালকরা টাকা পাঠাচ্ছেন তাদের পরিবারের কাছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও প্রচুর টাকা লেনদেন হচ্ছে। ব্যাংক এখন আরটিজিএস এবং ইএফটিএনের মাধ্যমে বিপুল অঙ্ক নিমেষেই স্থানান্তর করছে।

advertisement 3

বলা যেতে পারে, আধুনিক লেনদেনব্যবস্থায় বাংলাদেশের মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। এই লেনদেনের পাশাপাশি যেসব ছোট উদ্যোক্তা নিজ চেষ্টায় গড়ে উঠেছেন, তাদের খানিকটা ঋণের ব্যবস্থা করার প্রয়োজন খুব করে অনুভব করছিলাম। তারা ইলেকট্রনিক কেওয়াইসি করেই মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাব খুলেছেন। কিন্তু তাদের অনেকেরই নেই ট্রেড লাইসেন্স। সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা কিংবা স্থানীয় সরকার অফিস থেকে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করা চাট্টিখানি কথা নয়, বিশেষ করে কোভিডকালেই অনেক গৃহবধূ ও তরুণী নিজ উদ্যোগে ফেসবুক অথবা হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে ঘরে বসেই অনেক নয়া নয়া ব্যবসা শুরু করে দিয়েছেন। তাদের নেই ট্রেড লাইসেন্স, নেই ব্যবসা করার মতো ব্যাংক হিসাব। অথচ তাদের দরকার খানিকটা পুঁজি। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে কিছু অর্থ চেয়ে নিয়ে কিংবা নিজের সঞ্চয় ভাঙিয়ে হয়তো শুরু করেছেন শাড়ি বা অন্যান্য পোশাক কিংবা খাবার বিক্রির ব্যবসা। সেই ব্যবসা আরেকটু বৃদ্ধি করতে চাই খানিকটা পুঁজি। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার হাঙ্গামা অনেক। তাই অনেক দিন ধরেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিলাম তাদের জন্য কিছু করার। এর আগে সিটি ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংককে বিকাশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ন্যানোক্রেডিট বা ক্ষুদে ঋণের অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অনেক নয়া উদ্যোক্তা এই ঋণের সুযোগ পেয়ে খুবই খুশি। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই বাংলাদেশ ব্যাংক ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা এবং তাদের ছোট ছোট ঋণের ব্যবস্থা করতে এগিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, একক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন করতে পারবেন।

advertisement 4

‘পারসোনাল রিটেইল অ্যাকাউন্ট’ বা ‘প্রাইভেট রিটেইল অ্যাকাউন্ট’ নামের এই অ্যাকাউন্ট খুলতে একজন ছোট ব্যবসায়ীকে জমা দিতে হবে কেবল ই-কেওয়াইসির জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র। অ্যাকাউন্ট খুলতে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও পেশার প্রমাণ প্রয়োজন। পেশাগত পরিচয়পত্রের জন্য ট্রেড লাইসেন্স বাধ্যতামূলক নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা প্রাসঙ্গিক ব্যবসায়িক সমিতি দ্বারা জারি করা একটি বৈধ নথি প্রয়োজন হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে- দেশের সব ব্যাংক, এমএফএস এবং পিএসপি পরিষেবা প্রদানকারীরা বিনামূল্যে এই অ্যাকাউন্ট খুলবেন। অর্থাৎ এমন অ্যাকাউন্ট খুলতে বাড়তি কোনো খরচও হবে না। অ্যাকাউন্ট খোলার পর এই ছোট ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের কাছে যখন ঋণ চাইবেন, তখন ওই অ্যাকাউন্টে তাদের লেনদেনের তথ্য যাচাই-বাছাই করে ঋণ দেওয়া হবে। এই অ্যাকাউন্টগুলো এমএফএসে থাকলেও এগুলোর ক্যাশ আউট চার্জও তুলনামূলক কম হবে। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা থেকে বলা যায়- ছোট উদ্যোক্তাদের অর্থায়নকে সহজ করার জন্য নতুন নতুন উদ্ভাবনী সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করার পরই এ নতুন সুবিধা চালু করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যেমন- মুদি ব্যবসায়ী, ভাসমান খাদ্য বিক্রেতা, বাস-সিএনজি-রিকশাচালক, রাস্তার বিক্রেতা, ফেসবুকে বিভিন্ন পণ্য এবং সেবার বিক্রেতা বা বিভিন্ন প্রান্তিক পেশায় নিয়োজিত সেবা প্রদানকারীরা এ অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন। তবে একবারেই আদর্শ সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে- এমন আশা করা ঠিক নয়।

নতুন এই সুবিধা চালু হওয়ার পর যারা এ সেবা দিচ্ছেন এবং যারা নিচ্ছেন, সব অংশীজনের অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তাদের মতামতের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় গবেষণা ও মনিটরিংও অব্যাহত রাখতে হবে। এসবের ভিত্তিতে সময়ে সময়ে নিয়ম-নীতিতে প্রয়োজনীয় রদবদল করার মানসিকতা নিয়েই আমাদের এগোতে হবে। যেমন- ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাথমিকভাবে এ রকম একেকটি অ্যাকাউন্টের মাসিক লেনদেনের সীমা ১০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর এককালীন স্যাটাস সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা হবে বলে ঠিক করা হয়েছে। সুবিধাটি চালু হওয়ার পর গ্রাহকদের চাহিদা এবং ব্যাংকারদের সুবিধা-অসুবিধাগুলোর বিবেচনায় এই সীমাগুলো পুনর্বিবেচনা করে বৃদ্ধি করতে বা কমাতে হবে। মোবাইল আর্থিক সেবার ক্ষেত্রেও আমরা শুরুতে লেনদেনের যে সীমা ও নিয়ম-নীতি নিয়ে যাত্রা করেছিলাম, বর্তমানে এতে অনেক পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা হয়েছে। আধুনিক ডিজিটাল আর্থিক সেবা দিয়ে ব্যাংকিং খাতকে এগিয়ে নিতে হলে এভাবেই কাজ করতে হবে।

আমার ধারণা, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অভিযানে এক নয়া মাত্রা যোগ করবে। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক পঁচিশ হাজার কোটি টাকার একটি নয়া পুনর্অর্থায়ন কর্মসূচি কুটির ক্ষুদে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য চালু করেছে। ব্যাংকগুলোকে ২ শতাংশ হারে তহবিল জোগাবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর সঙ্গে ৩ শতাংশ স্প্রেড যোগ করে গ্রাহক পর্যায়ে ৭ শতাংশ হারে ঋণ দিতে পারবে ব্যাংকগুলো। এই ঋণ কর্মসূচি যাতে সফল হয়, এ জন্য ব্যাংকগুলোকে উৎসাহী করতে একটি ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমও চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থ বরাদ্দও দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ঠিকমতো মনিটর করলে এবং ব্যাংকগুলোকে মোটিভেট করতে পারলে চলমান এ সংকটকালে এই পুনর্অর্থায়ন ছোটখাটো উদ্যোক্তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা রাখতে বিশাল ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস। বাংলাদেশ ব্যাংক এই তহবিল আরও বৃদ্ধি করতে প্রস্তুত বলেও জেনেছি।

এই তহবিলের একটি অংশ (ধরুন ১০) যদি ওপরে বর্ণিত ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য দিতে আগ্রহী হয়, তা হলে নয়া উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা সহজ হবে। কোভিড সংকট-উত্তর এ দুঃসময় সারাবিশ্বেই মন্দা ধেয়ে আসছে। এই মন্দার দমকা হাওয়া বাংলাদেশেও লাগছে। এ কারণেই আমাদের বাঁচার পথ আমাদেরই খুুঁজে নিতে হবে। ছোট উদ্যোক্তাদের ট্রেড লাইসেন্সবিহীন যে ব্যাংক হিসাব খোলা ও ক্ষুদ্র ঋণের কথা বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, তা যদি দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়- তা হলে সমাজের পাটাতনের নিচের তলা আসলেই মজবুত হয়ে যাবে। এর সঙ্গে যদি কৃষি উন্নয়নে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া যায়, তা হলে দুইয়ে মিলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এক নয়া রূপ গ্রহণ করবে। কোভিডকালে এ কৌশলের কারণেই বাংলাদেশ তার অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ধারা এতটা গতিময় করে রাখতে পেরেছে। সময় এসেছে এই গতিময় উন্নয়ন ধারাকে আরও বেগবান করার। এ জন্য আমাদের উদ্ভাবনী কৃষক ও এই ক্ষুদে উদ্যোক্তাদের হাতে যদি প্রয়োজনীয় পুঁজি তুলে দেওয়া যায়, তা হলে তারা অসাধ্য সাধন করতে পারবেন। তারাই আমাদের বেশি বেশি কর্মসংস্থান দেন। তাদের কাছ থেকেই শিল্পপণ্যের চাহিদা উৎপন্ন হয়। তাদের সন্তানরাই গার্মেন্টে কাজ করে। তাদের সন্তানরাই প্রবাসে কষ্ট করে আয়-রোজগার করে দেশে ডলার পাঠায়। তাই বাংলাদেশ ব্যাংককে ধন্যবাদ ছোট ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের চাহিদা মেটাতে যে সৃজনশীল রেগুলেটরি উদ্যোগ নিয়েছে, সে জন্য।

আমাদের মনে রাখা চাই- আর্থিক অন্তর্ভুক্তিই আর্থিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে পারে। সামনে যে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকির কথা জাতিসংঘ থেকে বলা হচ্ছে, তা মোকাবিলার জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এসব উদ্যোগ খুবই প্রাসঙ্গিক হতে পারে। এর পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে আরও নিশ্ছিদ্র ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নিতে হবে। এ ঘোর সংকটকালে আমাদের মতো করে উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করেই আমাদের বাঁচতে হবে।

 

ড. আতিউর রহমান : বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

advertisement