advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ডেঙ্গু ঠেকাতে চাই নতুন রাজনীতি

চিররঞ্জন সরকার
২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:৪৮ এএম
advertisement

করোনার দাপট কিছুটা কমলেও নতুন আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গু। গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চারশ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাদের অনেকেই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন। কেউ কেউ মারা যাচ্ছন। অথচ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এখনো তেমন কোনো বিশেষ উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।

advertisement 3

রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি হলেও তা শুধু এখানেই থেমে নেই। এ বছর ৫০টি জেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ডেঙ্গু রোগীর যে হিসাব দিচ্ছে, বাস্তবে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সারাদেশে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই সরকারের।

advertisement 4

দুই দশকের বেশি সময় ধরে ডেঙ্গু বাংলাদেশে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে আছে। ২০০০ সালের পর থেকে প্রতিবছর বহু মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে, মানুষ মারাও যাচ্ছে। করোনা মহামারী শুরুর বছর ২০২০ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা কম ছিল। কিন্তু গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২৮ হাজার ৪২৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর মধ্যে ১০৫ জনের মৃত্যু হয়। এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ১২ হাজার ছাড়িয়েছে। প্রায় অর্ধশত মানুষের মৃত্যুও হয়েছে। কিন্তু ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী কার্যকর কোনো উদ্যোগ স্বাস্থ্য বিভাগের বা অন্য কোনো বিভাগের নেই। তারা রুটিনমাফিক কাজ করছেন, মর্জিমাফিক কথা বলছেন। মানুষের জীবনের মূল্য না থাকলে যা হয় আর কী!

দেশে ডেঙ্গুর এই প্রাদুর্ভাব নতুন নয়। প্রতিবছর এই সময় সে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর দাপায়, প্রাণ কাড়ে, প্রতিবছর ডেঙ্গুর খবর সংবাদপত্রজুড়ে থাকে। প্রতিবছরই নিয়ম করে একই কথা ফিরে বলতে হয় : ডেঙ্গুর মোকাবিলায় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও স্বাস্থ্য দপ্তর কী কী করছে, কতটা করছে, ঠিকমতো ও ঠিক সময়ে করছে কিনা।

বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে থেকে প্রস্তুত হয়ে থাকা জলাশয় ও যে যে জায়গায় জল জমতে পারে, পূর্বানুমানে সেগুলো পরিষ্কার করার বন্দোবস্ত করা, জনবসতি জঞ্জালমুক্ত রাখা ও সর্বোপরি ডেঙ্গু, তার উপসর্গ ও চিকিৎসা নিয়ে তৃণমূল স্তরে গিয়ে প্রচার অভিযান- এগুলো উপেক্ষিতই থাকছে। প্রতিবছর একই অভিযোগ, একই অবহেলা, এ-ই কি তবে ভবিতব্য?

এর আগে ২০১৭ সালে ঢাকা শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগতত্ত্ববিদ কে কৃষ্ণমূর্তিকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়ার জন্য। সরকারের কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে কে কৃষ্ণমূর্তি ‘মিডুটার্ম প্ল্যান ফর কন্ট্রোলিং অ্যান্ড প্রিভেন্টিং এডিস–বর্ন ডেঙ্গু অ্যান্ড চিকুনগুনিয়া ইন বাংলাদেশ’ নামের ২২ পৃষ্ঠার একটি পরিকল্পনা দলিল তৈরি করেন। ওই দলিলে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মূল্যায়ন করার পাশাপাশি রোগতত্ত্ববিদ, কীটতত্ত্ববিদ, অণুজীববিজ্ঞানী, তথ্য-শিক্ষা-যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে ‘র‌্যাপিড রেসপন্স টিম’ গঠন করতে বলা হয়েছিল। ১২টি মন্ত্রণালয়কে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে বলা হয়। ওই পরিকল্পনার কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৯ সালের মধ্যে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা ছিল। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ বাস্তবায়ন করা হয় না। এমনকি নিজেদের রুটিন কাজটাও ঠিকঠাকমতো করা হয় না। নগরীতে কিছু কিছু এলাকায় মাঝে মাঝে মশক নিধন ওষুধ ছিটানো হয়, মেয়র সাহেবরা হঠাৎ হঠাৎ দু-চার জায়গা পরিভ্রমণ করে এক-দুজনকে জরিমানা করেন, হম্বিতম্বি করেন। এর বাইরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ কখনো দেখা যায় না।

ভুল পুনরাবৃত্ত হলে তা আর ভুল নয়, মূর্খামি- প্রবাদবাক্য। কর্তৃপক্ষের মূর্খতা নাগরিক দুর্ভোগ ও জীবনহানির কারণ হলে তার চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কিছুই নয়। কিন্তু ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবই কর্তৃপক্ষ তথা সরকারেরই দায়, এই মনোভাবও ক্ষতিকর। সচেতন হতে হবে নাগরিককেও। জ্বর মানেই তা ভাইরাল, এই মৌসুমে একটু-আধটু হয় বলে অবহেলাও নাগরিক অসচেতনতা, বাড়ির পাশে খোলা জায়গা, নর্দমা বা বাগানে নিজেরাই জঞ্জাল ফেলা, ফুলের টব বা ডাবের খোসায় জল জমতে দেওয়াও নাগরিক কা-জ্ঞানের পরিচয় নয়। সরকারের ব্যবস্থাপনায় গলদ আছে ঠিক কথা, কিন্তু নাগরিক জীবনযাত্রায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনেক কিছুই কর্তৃপক্ষের সার্বিক নজরদারি এড়িয়ে যেতে পারে। তা নিয়ে সতর্ক হতে হবে নাগরিককেও। এই সচেতনতার বিকল্প নেই।

যে কোনো মৃত্যুই বড় বেদনার, বিশেষ করে ডেঙ্গুতে শিশু, তরুণদের মৃত্যু। অথচ আমরা যেন ধরেই নিয়েছি যে, প্রতিবছর বর্ষাকালে ও বর্ষার আগে-পরে কিছু প্রাণ অকালে ঝরে যাবে। তাই শহরের অজস্র জায়গাকে আমরা মশক বাহিনীর জন্য ‘অভয়ারণ্য’ হিসেবে গড়ে তুলেছি। রাজপথে খানাখন্দ, যত্রতত্র না-বোজানো গর্ত, তা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। রাস্তার গর্তে বৃষ্টির জল জমে, জমা জলে দ্রুত লয়ে ডিম পাড়ে মশকবাহিনী। মশার ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে ভোর আর সন্ধ্যায় পায়ে হুল ফুটিয়ে যায়। একজন থেকে দশজনের শরীরে ভাইরাস ছড়ালে রোগ ছড়ানোর দায়টা কার- পথের, মশার, সিটি করপোরেশন, নাগরিকদের, না সরকারের?

আমরা সরকার আর সিটি করপোরেশনের ওপর আমাদের রাগ-ক্ষোভ প্রকাশ করি। পারলে লাঠিসোটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি। হ্যাঁ, তাদের ওপর হয়তো ঝাঁপিয়ে পড়াই উচিত। কিন্তু নিজেদের দায়িত্বটাও কি আমরা কখনো ঠিকঠাকমতো পালন করি? নিয়ম করে সাফ করি নিজের বাড়ির ছাদের বা বারান্দার টবে, বালতিতে জমা জল? আমরা বাড়ির ময়লা ফেলি যেখানে-সেখানে, ফুলদানির জল একভাবে পড়ে থাকে দিনের পর দিন। মাত্র আধা ইঞ্চি জমা জলেও ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার মশা ডিম পাড়ে, বছরভর এ নিয়ে কমবেশি প্রচার চালায় পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ। বর্ষা এলেই ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু নিয়ে নানা জায়গায় চোখে পড়ে বড় বড় হোর্ডিং, দেখেও কি দেখি আমরা? জ্বর হলেই, ‘ও কিছু না, ভাইরাল ফিভার’ ধরে নিই। হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার পরীক্ষা করাতে গড়িমসি করেন বহু মানুষ। সেটা তার নিজের জন্য, সেই সঙ্গে সবার জন্য বিপদ ডেকে আনে। এ বছর ভয়ঙ্কর আকার নিতে চলেছে ডেঙ্গু, এমন আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

কোভিডের একের পর এক ভয়ঙ্কর ঢেউ, এতগুলো মর্মান্তিক মৃত্যু চোখের সামনে দেখেও আমরা বুঝলাম না যে, রোগ রুখে দেওয়ার উপায় আমাদের হাতেই আছে, তা প্রয়োগের ইচ্ছা আর উদ্যম থাকা দরকার। এবং সেই উদ্যম বজায় রাখতে হবে সারা বছর, সব কাজে। বড় বড় নির্মাণ করতে গিয়ে একটা এলাকার জলনিষ্কাশন ব্যবস্থা রুদ্ধ হয়ে যায়। যেসব চক্র বৈধ বা অবৈধ নির্মাণ করতে গিয়ে গোটা এলাকার মানুষকে এভাবে বিপদে ফেলে, সেসব ঘুঘুর বাসা ভাঙতে মাঝে মাঝে হুঙ্কার দিলে কাজ হয় না। বেআইনি নির্মাণের সঙ্গে শহরের জলনিষ্কাশন ব্যবস্থার শুধু নয়, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও নির্দিষ্ট নানা রোগব্যাধি প্রতিরোধের সম্পর্ক গভীর। বেআইনি নির্মাণকে ‘জনস্বাস্থ্য সমস্যা’ বলে দেখা দরকার।

আরেকটি কথা। ভাইরাসঘটিত জটিল রোগগুলো একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কোভিডের ভয় স্তিমিত হওয়ার পর থেকে ‘জাতীয় ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি’ নিয়ে শাসকের চোখে আঙুল, কানে তুলো। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ এই ঘোষণার কথা এখন আর কোনো রাজনৈতিক দল উচ্চারণ পর্যন্ত করে না। স্বাস্থ্য খাতে, বিশেষত জনস্বাস্থ্যে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো দূরের কথা। স্বাস্থ্যও এখন পণ্য। ‘ফেলো কড়ি, নাও বড়ি’ নীতিতে ধুঁকছেন দেশের কোটি কোটি মানুষ।

রোগ প্রতিরোধে ব্যর্থতার কালো টিকা মাথায় নিয়েই দেশ এগোচ্ছে অনির্দিষ্ট গন্তব্যে। রাজনৈতিক সংঘাত বাড়ছে। শাসক দল শক্তি প্রয়োগের নীতি নিয়ে টিকে থাকতে চাইছে। কিন্তু মানুষের প্রাণ রক্ষায় চোখে পড়ার মতো কোনো কর্মসূচি নেই। ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যাওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রাণের সুরক্ষা আরও বড়। ডেঙ্গুর চিকিৎসায় রক্তের অণুচক্রিকা বা প্লেটলেট প্রায়ই অপরিহার্য। রোগী বাড়ছে, প্লেটলেটের অভাবও দেখা দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দরকার পাড়া-মহল্লায় রক্তদান শিবির। ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দল খেয়োখেয়ি না করে আগামী এক মাস নিয়মিত পাড়ায় পাড়ায় রক্তদান শিবিরের আয়োজন করতে পারে। কোথায় ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল? কিংবা কৃষক-শ্রমিক-যুব সংগঠনগুলো? হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের বাঁচাতে রক্তের জন্য হাহাকার চলছে। এমন অবস্থায় রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

জনকল্যাণে বা মানুষকে বাঁচানোর নতুন রাজনীতি যদি এখনো শুরু করা না হয়, তা হলে মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোকে সমর্থন করবে কীসের জন্য?

চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক

advertisement