advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

গ্যাস সমস্যার সমাধান কোথায়

ইকবাল খন্দকার
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৯:১৩ এএম
advertisement

আমরা সেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি- এককালে আমাদের নাকি পুকুরভরা মাছ ছিল, গোয়ালভরা গরু ছিল, গোলাভরা ধান ছিল। না, এগুলো কোনো রূপকথা নয়; বানিয়ে বলা কোনো গল্প নয়। সত্যিই এক সময় আমাদের পর্যাপ্ত মাছ ছিল, গরু ছিল, ধান ছিল। তবে এই ‘ছিল’র তালিকায় যুক্ত ছিল আরও একটি জিনিসের নাম। হয়তো নামটি মাছ, গরু কিংবা ধানের পাশাপাশি উচ্চারিত হয়নি। কিন্তু এমন নয় যে, হতোই না। অবশ্যই উচ্চারিত হতো এবং বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই হতো। নিশ্চয়ই এতক্ষণে আপনারা বুঝে গেছেন কিসের কথা বলা হচ্ছে! জি, গ্যাস। এ কথা অনস্বীকার্য যে, এক সময় আমাদের প্রচুর গ্যাস ছিল। মাছ, গরু আর ধানের মতো গ্যাস দৃশ্যমান বস্তু নয় বলে আমরা হয়তো এর আধিক্য বা পর্যাপ্ততা চোখে দেখতে পেতাম না। তবে ছিল। এ কারণে গ্যাস নিয়ে তখন নানা রকম কৌতুকও হতো। এ কৌতুকটা নিশ্চয়ই একাধিকবার শুনেছেন।

এক লোক গেছেন ডাক্তারের কাছে। গিয়েই কোঁকাতে লাগলেন। ডাক্তার জানতে চাইলেন- সমস্যা কী? লোকটা বলল, সমস্যা গ্যাসের। আমার পেটে প্রচুর গ্যাস জমেছে। ডাক্তার হেসে বললেন, এটা কোনো সমস্যাই না। যে দেশে এত গ্যাস, সে দেশের একজন নাগরিক হিসেবে কিছু গ্যাস আপনার পেটে ঘাঁটি গাড়তেই পারে। এটি কোনো সমস্যা নয়। যদি আপনার পেটে গ্যাসের পরিবর্তে স্বর্ণ বা তেল ঘাঁটি গাড়ত, সেটি হতে পারত চিন্তার বিষয়- যেহেতু ওই জিনিসগুলো এ দেশে সেভাবে পাওয়া যায় না। চিন্তা করুন, এই কৌতুক কি এখন চলবে? সারাদেশে যেখানে গ্যাসের সংকট, সেখানে এই ধরনের কৌতুক বলতে গেলে গণরোষের শিকার হতে হবে না? আর যদি বলি এক সময় আমাদের প্রচুর গ্যাস ছিল, তা হলে গণরোষের শিকার হয়তো হতে হবে না। তবে গণসমালোচনার শিকার অবশ্যই হতে হবে। ইতোমধ্যে আমরা সেটি হয়েও গিয়েছি, হচ্ছি। কারণ গ্যাসের বিশাল ভা-ার আমরা ফুরিয়ে ফেলেছি অপচয় করে করে।

advertisement 3

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়- যখন আমরা আমাদের ভেজা মোজা শুকাতেই পারতাম না গ্যাসের চুলার উত্তাপ ছাড়া। মোজা তো তাও ছোট কাপড়, অল্প সময়ে শুকায়। বড় বড় কাপড়ও আমরা শুকাতাম গ্যাসের চুলায়। এ কারণে আমাদের চুলা জ্বালিয়ে রাখতে হতো সারারাত। আবার শীতকালে অনেকে ঘর গরম রাখার জন্য জ্বালিয়ে রাখতেন চুলা। নিতান্তই যদি নেভাতেন, সেটি দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কায়; গ্যাস অপচয় হচ্ছে- এই সচেতনতা বা দায়িত্ববোধ থেকে নয়। আর এখন? রান্না করার গ্যাসই পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণ এলাকা তো বটেই, অভিজাত এলাকাগুলোর বাসিন্দারাও হাহাকার করছেন গ্যাসের জন্য। যথাসময়ে রান্না করতে পারছেন না, খেতে পারছেন না। সকালের খাবার খাচ্ছেন দুপুরে, দুপুরের খাবার রাতে। আর কোনো কোনো সময় ঘরের খাবার কপালেই জুটছে না। খাবার কিনে আনতে হচ্ছে হোটেল-রেস্টুরেন্ট থেকে। এতে সংসারের খরচ বেড়েই চলেছে। ওই খরচ সামাল দিতে গিয়ে এখন কেবল হিমশিম খাওয়া নয়, রীতিমতো শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। আর শহর যে ছাড়বেন না, এখানে থেকে করবেনটা কী?

advertisement 4

সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ চাকরি করত কল-কারখানায়। গ্যাসের সংকট দেখা দেওয়ার পর এখন কল-কারখানার অবস্থা নাজুক। তাও এটি সংকটের প্রাথমিক ধাপ বলে হয়তো মালিকপক্ষ এখনো বন্ধের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না; বরং আশা করছেন, সংকট অচিরেই কেটে যাবে। কিন্তু আদৌ কি খুব সহসা এ সংকট কাটছে? যদিও কাটার কোনো লক্ষণ দেখছি না, তবুও ধরে নিলাম কাটবে- সেটি কবে? কারও কি উত্তর জানা আছে? নেই। আর যদি সংকট না কাটে, দীর্ঘস্থায়ী হতেই থাকে, হতেই থাকে- তা হলে কী হবে? মালিকপক্ষ কি কল-কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন না? বন্ধ না করলেও লোক তো অন্তত ছাঁটাই করবেন। এমনিতেই বেকার সমস্যায় গোটা দেশ জর্জরিত। যদি গ্যাস সংকটের চূড়ান্ত প্রভাব কল-কারখানার ওপর পড়ে আর দলে দলে শ্রমিক বেকার হতে থাকেন, তা হলে যে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে- তা সামাল দেওয়ার উপায় কী? একটি সময় ছিল- যখন দেশে কাজ না পেয়ে তরুণরা মা-বাবার কাছে আবদার করত বিদেশ যাওয়ার। মা-বাবা তাদের আবদার রাখতেনও। জমিজমা বিক্রি করে পাঠিয়ে দিতেন বিদেশে। কিছুদিন পরই দেখা যেত বিদেশ থেকে টাকা আসতে শুরু করেছে। এতে একটি পরিবারই শুধু সচ্ছল হতো না, দেশের অর্থনীতিও এগিয়ে যেত অনেকখানি। কিন্তু এখন সেসব সম্ভাবনার রাস্তা বন্ধ। কারণ জ্বালানি সংকট এখন মোটামুটি সারাবিশে^ই। দেশের কল-কারখানায় কাজ করা শ্রমিকরা বেকার হয়ে গেলে কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যাওয়ার কথা যে ভাববেন, ওই আশা এখন দুরাশা। এর মানে, আমরা এখন চার দেয়ালে বন্দি। আবার বিপদ ঘরেও, বাইরেও। এই বিপদের আরও একটি উদাহরণ দেওয়া যাক।

আমাদের তৈরি পোশাক খাত অনেক সমৃদ্ধ ছিল বরাবরই। বলা হয়ে থাকে, দেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রেখেছে এই খাত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভয়াবহ। কারণ গ্যাসের অভাবে অনেক নিট কারখানা বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে এবং তাদের ধরে রাখতে কাপড় কিনতে হচ্ছে চীন থেকে। এই যদি হয় অবস্থা, তা হলে তৈরি পোশাক খাতের ওপর আমাদের যে ভরসা ছিল এতদিন, তা আর কয়দিন থাকবে? আর একবার যদি পোশাক খাতের এই ভগ্নদশা আমাদের সামনে চলে আসে, তা হলে আমাদের মনও কি ভাঙবে না? মন শক্ত থাকলে যুদ্ধও জয় করা যায়। মন ভেঙে গেলে কীভাবে আমরা সামনের পথ পাড়ি দেব? আর মন যে শক্ত রাখব, কিসের ভরসায় রাখব? মিথ্যা সান্ত¡না দিয়ে মনকে বোঝালে কয়দিন বোঝানো যায়? সব কথার শেষ কথা, আমরা ভালো নেই। আমাদের দেশ ভালো নেই। আমাদের পৃথিবী ভালো নেই।

এই যে এত সংকট, এত নেতিবাচকতা, এত দুঃসংবাদ- এসব থেকে উত্তরণের উপায় কী? আদৌ কি কোনো উপায় আছে? ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলো বলতে পারে- এগুলো সরকারের ব্যর্থতা, সরকারের পতন ঘটলেই সব সংকট দূর হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা যারা সাধারণ মানুষ আছি, তারা কি ওসব কথা বিশ্বাস করতে পারি? সরকারের পতন হলে এবং নতুন কোনো দল ক্ষমতায় এলেই সংকট দূর হয়ে যাবে- এ নিশ্চয়তা আমাদের কে দেবেন? বলার জন্য শুধু বলা- একের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর রাজনীতি আর কত? কাদা ছোড়াছুড়ি দেখে আনন্দ পাওয়ার জন্যও ন্যূনতম মানসিক শান্তি লাগে। আমাদের সেই শান্তিটুকু নেই। আমরা শান্তি চাই। একটু ভালোভাবে বাঁচতে চাই। কে জানে, আগামীর সেই কঠিন সময়ে আমাদের এই চাওয়াটুকু আদৌ পূরণ হবে কিনা।

 

ইকবাল খন্দকার : কথাসাহিত্যিক ও টিভি উপস্থাপক

advertisement