advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

নারীর জয়ের মাধ্যমেই বন্ধ হবে নারীবিদ্বেষ

ড. জোবাইদা নাসরীন
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০৪ এএম
advertisement

যাত্রী ছিলাম স্বয়ং আমিই। মগবাজার থেকে বাংলামোটর রিকশায় পার হতে লাগল পাক্কা এক ঘণ্টার মতো। অথচ হেঁটে গেলে ৫-৭ মিনিটের পথ। কিন্তু রাস্তায় হাঁটাও যাচ্ছে না। আমার মতো অনেকে বসে আছেন। কেউ রিকশায়, কেউ বাসে আর কেউ নিজেদের প্রাইভেট গাড়িতে। রাস্তায় প্রচুর মানুষ। গত বুধবারের ঢাকায় দুপুর থেকেই শুরু হয় ব্যাপক যানজটের।

advertisement 3

এই তথ্য শুনে হয়তো অনেকেই বলবেন, ঢাকার যানজটের তথ্য কিংবা অভিজ্ঞতা তো প্রতিদিনের। এটি আলাদা করে বলার কী আছে! কিন্তু কিছু যানজটেও যে মানুষের সুখ থাকে সেটি এই প্রথম অনুভব করলাম। কারণ সেদিনের যানজটে প্রথমবারের মতো দেখা গেল কেউই খুব একটা বিরক্ত হচ্ছেন না। আমার রিকশাচালক ছিলেন মোটামুটি বয়স্ক। কোথায় আমার ওপর রাগ করবেন, সেটি না করে তিনি বারবার আমাকে নানাকথা বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেন যে, আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা গন্তব্যে পৌঁছে যাব।

advertisement 4

বোকামিটা কিন্তু আমিই করলাম প্রথমে, বললাম, আচ্ছা আজকে এ রকম জ্যাম কেন? বয়স্ক রিকশাচালক হেসে বললেন, ‘আপনি জানেন না আজ তো আমগো মাইয়ারা আসতেছে।’ আমি বললাম, কোন মেয়েরা?’ কোথা থেকে আসতেছে? তিনি কিছুটা বিরক্ত নিয়ে বললেন, কেন জানেন না আমগো মাইয়ারা কাপ জিতেছে?’ তার বিরক্তির কারণ অন্য। এত বড় একটা ঘটনা কিন্তু আমি জানি না এবং তাকে একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছি। এবার আমার কাছে সব স্পষ্ট হয়ে গেল। সেই রিকশাচালকের মুখেও আনন্দের আভা। এজন্য এই জ্যামে তিনি বিরক্ত নন।

আমাদের মেয়েরা সাফ ফুটবলে মেয়েদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে এবং সেই ট্রফি নিয়ে দেশে ফিরেছেন। এ দেশের মানুষ ফুটবলের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। ছেলেরা তো ফুটবল থেকে ছিটকে গেছে বহু আগেই। বাংলাদেশে খেলাধুলাকেন্দ্রিক একমাত্র উত্তেজনা এবং আবেগের জায়গা হলো ক্রিকেট। তাই আমাদের সব মনোযোগ ওখানেই ছিল এবং আছে।

কিন্তু হঠাৎই যেন আমাদের খুশির বাড়তি ঝলক। ফুটবলে আমরা আবারও গর্জে উঠেছি। তার ওপর আবার মেয়েদের ফুটবল। বহুদিন পর বাংলাদেশে খেলাধুলায় এমন অর্জন আসলে উত্তেজনার মাখামাখিতে ভরারই কথা। কিন্তু এই উন্মাদনা আর উত্তেজনা ছিল অন্যরকমের। ট্রফি জেতা ফুটবলাররাও এতটা হয়তো ভাবতে পারেননি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ তাদের ঘিরে এতটা আবেগী হবেন, এতটা হয়তো তারা ভাবেননি।

কেনই বা ভাববেন? কিংবা কেনই বা ভাববেন না। এই দুইয়ের প্রেক্ষাপট কী? প্রথমটির প্রেক্ষাপট হলো যে দেশে দুদিন পরপর নারীর পোশাক ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়, নারীর টিপ নিয়ে সাম্প্রদায়িকতার আঁচড় লাগে, হরহামেশাই নারীবিদ্বেষী কথাবার্তা জারি থাকে, সে দেশে খেলাধুলায় নারীর এই অর্জন মানুষ আসলে কীভাবে নেবে? এটি নিয়ে আবার কোন ধরনের রাজনীতি হবে? খেলাকে কেন্দ্র করে নারীর পোশাক বিতর্ক আবারও বাতাস পাবে কিনা? নারীর খেলা নিয়ে আবার অন্য কোনো ধরনের রাজনীতি হবে কিনা?

কিন্তু দ্বিতীয়টির উত্তর হয়তো অনেকটাই সহজ। দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে, দেশের নাম চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বারবার ধ্বনিত হয়েছে- সেটিই যেন মানুষের কাছে প্রধান হয়ে উঠেছে। হিসাবটা এখানে সবকিছু ছাপিয়ে ‘দেশ’-এর প্রতি ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়েছে। এ দেশের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে, দেশ সবার আগে। এর বাইরে আর কিছুই নেই।

তাই ছাপিয়ে গেছে সোনার মেয়েদের এই অর্জন। এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেল, অনেকেই বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে লিঙ্গভিত্তিক বেতন বৈষম্যের সমালোচনা করে লিখেছেন এবং আমরা আরও জানতে পেরেছি যে, এই নারী ফুটবলাররা অনেকেই এসেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এবং অপেক্ষাকৃত দুর্গম অঞ্চল থেকে। অনেকের বাড়িঘরের ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। সবটাই যেন এক ইতিবাচক বাংলাদেশে।

এই অর্জন নিয়ে কোথাও কেউ দ্বিমত পোষণ করছেন না। রাজনৈতিক দলগুলোরও এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। সবাই যেন সেই সোনার মেয়েদের গ্রহণ করতেই প্রস্তুত ছিল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গেল বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে কাজ করতে থাকা নির্মাণশ্রমিকরাও তাদের কাজ রেখে সেই মেয়েদের বরণ করতে ছুটে এসেছিলেন বিমানবন্দরে। শুধু তাই নয়, সেই ছাদখোলা বাসটি যতক্ষণ পর্যন্ত না চোখের আড়াল হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত সেই শ্রমিকরা হাততালি দিয়ে গেছে। কেন শ্রমিকরা কাজ ফাঁকি দিয়ে এতটা সময় ধরে হাততালি দিয়েছে সেই বিষয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি, কেন রাস্তায় রাস্তায় কাজকর্ম ফেলে সবাই এই ফুটবলে সেরা নারীদের বরণ করছিল, কেউ এটি নিয়ে উচ্চবাচ্য করেনি। বরং চিত্র দেখে মনে হয়েছে, এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। সর্বশেষ ২০০৩ সালে পুরুষ ফুটবলাররা সাফ ফুটবল জয় করেছিল। তার পর আর কখনো এত বড় সাফল্য বাংলাদেশের ঘরে আসেনি। ২০০৩ থেকে ২০২২, বছরের হিসাবে ১৯ বছর। আর আনন্দের হিসাবে আরও বড় সময়। তাও এসেছে মেয়েদের হাত ধরে।

কেন মেয়েদের সাফল্যে আমরা আরও বেশি গর্বিত হবো? কারণ আমাদের দেশে একটা বয়সের পর সামাজিক কারণে মেয়েদের খেলাধুলাই বন্ধ করে দেওয়া হয়। যারা এর মধ্য দিয়েই সব চ্যালেঞ্জ উপেক্ষা করে খেলাধুলা চালিয়ে যায় তাদের অনেকেই আবার শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে না। বিয়ে, পারিবারিক এবং সাংস্কৃতিক চাপ মেয়েদের খেলাধুলার জগতে পেশাদার খেলোয়াড় হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে উৎসাহ দেয়। তার মধ্যে আবার হালে নারীর পোশাক এবং নারীবিদ্বেষী বক্তব্যও অনেকটাই যেন নারীর খেলাধুলায় বাড়তি অনুৎসাহ এবং ভয় যোগ করায়। যার কারণে মেয়েরা ঝরে পড়ে যায়।

বেশ বড় ধরনের একটা অর্জন আমাদের হয়েছে মেয়েদের ফুটবলে। এখন এই সাফল্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে আর কী কী করণীয় সেই বিষয়ে আমাদের সবচেয়ে মনোযোগ দেওয়া উচিত। কারণ সাফল্য পাওয়া যেমন কঠিন, সাফল্য ধরে রাখা আরও কঠিন। এই মেয়েদের ঝরে যাওয়া রোধের পাশাপাশি আরও নারীরা যেন যুক্ত হয়ে এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে সেই বিষয়ে এখন আরও বেশি পদক্ষেপ নিতে হবে।

শুধু তাই নয়, ক্রীড়াঙ্গনে নারী খেলোয়াড় এবং পুরুষ খেলোয়াড়দের বেতন বৈষম্যসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাকেন্দ্রিক জারি থাকা বৈষম্য খুব দ্রুতই ঘোচাতে হবে। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে বৈষম্য জারি রেখে আমরা মেয়েদের সাফল্য ধরে রাখতে পারব না। বরং আমি বলব অন্য কথা। আমি মনে করি মেয়েদের ক্ষেত্রে সুযোগ আরও বাড়ানো উচিত। তা হলে মেয়েরা আরও উৎসাহ পাবে এবং পরিবারসহ অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে তাদের চ্যালেঞ্জ অনেকটাই কমে যাবে। মেয়েদের নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করার সুযোগ দিতে হবে এবং সে ক্ষেত্রে সব ধরনের চেষ্টা ফুটবল ফেডারেশনকেই করতে হবে।

আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, শুধু ফুটবলেই নয়, অন্য খেলাও নারী যেন স্বচ্ছন্দে, বাধাবিহীনভাবে খেলতে পারে সেটিও আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। আর এই অর্জনগুলো হয়তো কাজ করবে এ দেশের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা পোষণ করা নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের বিপরীতে।

আমাদের আনন্দিত করতালি যেন দীর্ঘায়িত হয়। অভিনন্দন কাপজয়ী খেলোয়াড় এবং পুরা টিমকে।

ড. জোবাইদা নাসরীন : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement