advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মাহাথিরকে ভুলে যাওয়া যাবে না

ড. কাজল রশীদ শাহীন
২৩ নভেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২২ ০৯:২০ এএম
advertisement

যারা মনে করছেন গত শনিবারের নির্বাচনে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মাহাথির মোহাম্মদ নামের বাতিঘর নিভে গেছে। যবনিকাপাত ঘটেছে মালয়েশিয়া পাল্টে দেওয়া বিস্ময়কর এক রাজনীতিকের। আদতে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। এ কথায় অনেকেই হয়তো আহত হবেন। কিন্তু এটাই সত্য। পুরো বিষয়টাকে একটু তলিয়ে দেখলেই এর নাগাল পাওয়া যাবে। হ্যাঁ, এ কথা আক্ষরিকভাবে সত্য যে, ১৯ নভেম্বরের নির্বাচনে মাহাথিরের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। জামানতটা পর্যন্ত খোয়া গেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে হয়েছেন চতুর্থ। শুধু নিজেই ডোবেননি, দলকেও ডুবিয়েছেন। পুরো মালয়েশিয়ায় তার দল পায়নি একটি আসনও। সাদা চোখে এই হিসাব-নিকাশ দেখে যে কেউ বলতেই পারেন, নির্বাপিত হয়েছে মাহাথির মোহাম্মদ নামের প্রদীপ। কিন্তু না এটা তার মতো বিশাল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কাছে কেবলই আপাত এক সত্য। উপরিতলের বুদবুদ বিশেষ।

আমাদের মনে আছে নিশ্চয়, মাহাথির টানা ২২ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আরও মনে থাকার কথা যে, নির্বাচনে তার হারের কোনো রেকর্ড নেই। এবারই প্রথম, হয়তো শেষও। কেননা শতায়ু পূরণ হতে বাকি আছে আর মাত্র দুই বছর। শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকলেও সময়ের অভিঘাতকে অস্বীকার করা যাবে না কোনোভাবেই। শনিবারের নির্বাচনে তার পরাজয়ের পেছনে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যে কারণকে মুখ্য বলে মনে করছেন, সেটি হলো তার বয়স। সম্ভবত এ কারণেই ভোটাররা ব্যক্তি ও দল উভয় দিক থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আমরা মনে করি, এই পরাজয় তার দলের জন্য কিছুটা বিপর্যয়ের হলেও একজন মাহাথির মোহাম্মদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো অর্থ বহন করে না। কেন করে না, সেই প্রশ্নের উত্তর জানার আগে দেখে নেওয়া যাক, তার রাজনৈতিক পরিভ্রমণ।

advertisement

মাহাথির একজন ডাক্তার। সিঙ্গাপুর থেকে এ বিদ্যা শেষ করে দেশে ফিরে সরাসরি যুক্ত হয়েছিলেন এ পেশায়। এমনকি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পরও। রাজনৈতিক ব্যস্ততা যখন প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়িয়েছেন এখান থেকে। আধাখেঁচড়া করে কিছু করার এবং সবকিছু কুক্ষিগত করে রাখার লোভী মানসিকতা যে তার নেই, তার নজির পরবর্তীকালেও খুঁজে পাওয়া যায়। রাজনৈতিক যাত্রাটা মোটামুটি এ রকম।

advertisement 4

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে। ব্রিটিশসহ সব ঔপনিবেশিক শক্তি পৃথিবীর দেশে দেশে গুটিয়ে নিচ্ছে তাদের পাততাড়ি। এবং নিতে তারা বাধ্যও। পেছনে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কারণ তো রয়েছেই। আরও রয়েছে মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মুচলেকা। যুদ্ধে ব্রিটেনকে নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়ার শর্তই ছিল, বিজয়ী হলে যুদ্ধ শেষে ঔপনিবেশিক দেশগুলোকে তারা স্বাধীনতা দেবে। বিশ্ব রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তের এই সময়েই মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন ২১ বছর বয়সী একজন ডাক্তার মাহাথির মোহাম্মদ। বেছে নেন ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএমএনও) নামের রাজনৈতিক দলটি। যার হয়ে তিনি ১৯৬৪ সালে নির্বাচন করে প্রথমবারের মতো পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন।

রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে বড় রকমের ধাক্কা খান দলের তরফে। মালয় সম্প্রদায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে ১৯৬৯ সালে দল থেকে বহিষ্কার হন, সংগত কারণে পার্লামেন্টের সদস্য পদও হারান। দল অবশ্য এক বছরের মধ্যেই ফিরিয়ে নেন মাহাথিরকে। ১৯৭২-এ নির্বাচিত হন ইউএমএনও দলের সুপ্রিম কাউন্সিলে। দুবছর পর ১৯৭৪ সালে পার্লামেন্ট সদস্য পুনর্নির্বাচিত হন। এর পর উনি যেন পেয়ে যান আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ। খুলে যায় রাজনৈতিক সোপানের সব দ্বার। শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ঠিক দুবছর পর ১৯৭৬-এ হন উপপ্রধানমন্ত্রী। পাঁচ বছরের মাথায় ১৯৮১-র জুনে নির্বাচিত হন ইউএমএনও দলের প্রেসিডেন্ট, জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তার পর নিজে পরিণত হন রূপকথার নায়কে। মালয়েশিয়াকে তৈরি করেন রূপকথার গল্পের মতো করে। ২০০৩ সালে স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেন ক্ষমতা। এশিয়ায় দীর্ঘ সময়ের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর তকমাটা পেয়ে গেছেন ততদিনে।

মাহাথির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে সদর্থক অর্থেই পাল্টে দেন মালয়েশিয়াকে। তৃতীয় বিশ্বের একটা দেশের শনৈঃশনৈ এত উন্নতি, পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠা সারাবিশ্বকে বিস্ময়াভিভূত করে তোলে। পৃথিবীর দেশে দেশে বেশিরভাগ রাজনৈতিক নেতা যেখানে মুখের কথায়, গালভরা বুলিতে আর রঙিন স্বপ্নের ফুলঝুরিতে নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদন করেন; মাহাথির সেখানে ছিলেন পুরো ব্যতিক্রম। তিনি কথা বলেছেন কম, কাজ করেছেন বেশি। নীরবে-নিভৃতে দেশ গড়ার কাজে তার মতো রাজনৈতিক নেতা সত্যিই তুলনারহিত।

মাহাথিরের হাত ধরেই মালয়েশিয়া বিশ্বের ১৮তম অর্থনৈতিক শক্তির দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এশিয়ার অর্থনীতিতে তার অবস্থান একেবারে প্রথমদিকে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য যোগাযোগব্যবস্থায় দেশটির উন্নতি কেবল চমক জাগানিয়া নয়, টেকসই ও জনবান্ধব। ঔপনিবেশিক শক্তির পতনের পর পৃথিবীতে যে কয়েকটি দেশ বিস্ময়করভাবে উন্নতির শীর্ষ মডেলে পরিণত হয়েছে এবং উন্নতিকে জনগণের সর্বোচ্চ সুবিধার স্তরে নিয়ে যেতে পেরেছেন মালয়েশিয়া তার অন্যতম। দারিদ্র্যপীড়িত একটা দেশকে বদলে দিয়ে নাগরিক সুবিধায় সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়ার নায়কের বিরুদ্ধে অভিযোগও ছিল ঢের। বিরোধী শিবিরে তো বটেই, নিজের দলের মধ্যেও এই অংশ শক্তিশালী ছিল। মাহাথিরের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা ব্যক্তি ও স্বরকে তিনি দমন করতেন কঠোরভাবে। কিন্তু সেসবের কোনোটাই শেষাবধি গুরুতর প্রশ্ন দাঁড় করাতে পারেনি। মাহাথির কাজ দিয়ে প্রমাণ করেছেন লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে, সত্যিকারার্থে জনগণের জন্য কিছু করতে চাইলে কখনো কখনো অপ্রিয় হওয়ার ঝুঁকি নিতে হয়। সমালোচনাকে মান্যতা দিয়েই নিজের কাজে লক্ষ্যাভিসারী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

মাহাথিরের রাজনৈতিক জীবনে সাফল্য যতটা, সার্থকতাও ঠিক ততটাই। একজন রাজনীতিবিদের এভাবে সার্থক হওয়ার গল্প পৃথিবীর ইতিহাসে খুব বেশি নেই। লক্ষণীয়, মাহাথির উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে গুলিয়ে ফেলেননি। উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে মুখোমুখি দাঁড় করাননি। উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে তিনি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে মান্যতা দিয়েছেন। এবং এই মান্যতাই তাকে মালয়েশিয়ার ইতিহাসে তো বটেই, পৃথিবীর ইতিহাসে অনুকরণীয় একজন রাজনীতিকে পরিগণিত করেছে।

মাহাথির মোহাম্মদ যেমন সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উদাহরণযোগ্য উন্নয়ন সাধন করেছেন, তেমনি শিক্ষা-স্বাস্থ্য-যোগাযোগে রীতিমতো বিপ্লব সাধন করেছেন। পাশাপাশি কেবল স্থাপনা দিয়ে দেশ ভরিয়ে তোলেননি। প্রয়োজনীয় স্থাপনার সর্বোচ্চ ব্যবহারিক সুবিধাকে নিশ্চিত করেছেন। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিষ্ঠানের শক্তিতে দাঁড়ানোর রসদ জুগিয়েছেন। প্রতিষ্ঠান তৈরির ক্ষেত্রে তিনি বিশে^র সর্বশ্রেষ্ঠ মানদ-কেই প্রয়োগ করেছেন এবং ক্রমাগত চর্চার মধ্য দিয়ে সেসবকে গতিশীল রাখার জন্য মেধাসম্পন্ন মানুষও তৈরি করেছেন। এসবে মাহাথির যে সার্থক হয়েছেন তার প্রমাণ ২০১৮-র নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবারও প্রধানমন্ত্রী পদে ফিরে আসা এবং ২০২২-র নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হওয়া।

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর রাষ্ট্রনায়কদের বড় সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা হলো, তারা প্রতিষ্ঠানের শক্তিতে বিশ্বাস করেন না। ক্ষমতায় থাকতে তারা এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি করেন না, যা তারা ক্ষমতা থেকে সরে গেলে আবারও ক্ষমতায় আসার পথ জারি থাকবে। উপরন্তু তারা এমন সব কার্যক্রম করেন যা তারা একবার ক্ষমতা থেকে বিচ্যুত হলে পরে ক্ষমতায় আসার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। নিজের জালে নিজেই আবদ্ধ হয়ে যান। মাহাথির এখানেই ব্যতিক্রম। তিনি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন। প্রতিষ্ঠান চালানোর মতো মেধাবী মানুষ তৈরি হওয়ার যাবতীয় সুযোগ অবারিত রাখেন।

প্রতিষ্ঠানের শক্তি কতটা গুরুত্ববহ এবং তাৎপর্যবাহী তার প্রমাণ আমরা দেখেছি গতবারের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে কাজ করে বলেই শত চেষ্টা করার পরও একজন ট্রাম্পের কূটকৌশল চূড়ান্ত অর্থে কোনো কাজে লাগেনি। প্রতিষ্ঠান তার শক্তি বলেই ট্রাম্পের যাবতীয় ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দেওয়ার মতো জুতসই কাজটি করতে সক্ষম হয়েছে।

মাহাথিরও তার দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে কেবল চোখ ধাঁধানো উন্নয়ন করেননি, দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো বিকশিত ও গতিশীল হওয়ার যাবতীয় সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছেন।

প্রতিষ্ঠানের শক্তি বলেই মালয়েশিয়া এখন বিশ্বজুড়ে রূপকথার এক গল্প। মাহাথির মোহাম্মদ সেই গল্পের নায়ক। মালয় দেশটি তার গল্পের বৈভবে এবং নায়কের ঋজুতায় সারাবিশ্বে আদৃত আছে- থাকবে অনাগতকাল। এ রকম একজন নায়কের পরাজয় আদতে তার জয় অনুসন্ধানের গল্পেই খুঁজতে হবে। মনে রাখতে হবে মাহাথির এমন কোনো পদ্ধতির পৃষ্ঠপোষণা ও বাস্তবায়ন করেন না, যা তার আসা-যাওয়ায় কোনোরকম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। বাগড়া দিতে পারে জন-আকাক্ষার প্রত্যাশা পূরণে। মাহাথিররা জনগণের শক্তিতে-প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতায় বিশ্বাস ও আস্থা রাখেন, অন্য কিছুতে নয়। এতে যদি জয় আসে ভালো, পরাজয় এলেও কলঙ্কের কিছু নয়। জয়-পরাজয়ের নিক্তিতে মাহাথিরকে খারিজ করা হলে তা হবে দুর্বল চিত্তের বহির্প্রকাশ। বিশাল অর্জনকে আড়াল করার অপচেষ্টা। রূপকথাসম মালয়েশিয়াকে ও তার নায়ককে দরদি মন দিয়ে না বোঝার খাসলত।

ড. কাজল রশীদ শাহীন : সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও গবেষক

advertisement