advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সম্মিলিত পদক্ষেপ জরুরি

হীরেন প-িত
২৩ নভেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২২ ০৯:৩১ এএম
advertisement

আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব মোকাবিলায় এরই মধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। চলমান বৈশ্বিক সংকট এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং বৈশ্বিক সংহতি। ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং এ যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট সংকটগুলো আমাদের সমাজ এবং অর্থনীতিতে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। করোনা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা এবং এসডিজি অর্জনের পথে যোগ করেছে নতুন চ্যালেঞ্জ। নিষেধাজ্ঞা এবং পাল্টা নিষেধাজ্ঞা বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে যুদ্ধরত, উন্নয়নশীল এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।

বৈশ্বিক মহামারী করোনা-পরবর্তী সময়ে যখন বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার সময়ে হঠাৎ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়। ২০২৩ সালে বৈশ্বিক মন্দা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশগুলোতে ইউরোপ, আমেরিকাসহ মূল্যস্ফীতির হার বাড়ছে।

advertisement

সম্ভাব্য বৈশ্বিক মন্দার কঠিন বলয় থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে তৈরি পোশাক, চামড়াপণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যের চাহিদা কমেছে। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মন্দা দেখা দিলে রপ্তানিতে এর বিরূপ প্রভাব দেখা দিতে পারে। এতে দেশের রপ্তানি খাত চলতি অর্থবছরে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। এ মন্দার প্রভাবে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আগামী অর্থবছরে কমে যেতে পারে।

advertisement 4

উচ্চ মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে নানা দেশের মুদ্রানীতি কঠোর করার পদক্ষেপ, চীনে শ্লথ প্রবৃদ্ধির গতি, পণ্য সরবরাহে ব্যাঘাত এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে খাদ্যে নিরাপত্তার ঝুঁকি বিশ্বকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানির প্রধান গন্তব্য উন্নত বিশ্ব। তাই উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রভাব পড়বে এ অঞ্চলসহ সারা পৃথিবীতে। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, আগামী বছর বিশ্বের প্রায় সব দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমবে। সেই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়তে পারে।

বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ দেশ আগামী বছর মন্দায় পড়তে পারে। পরপর দুটি প্রান্তিকে তাদের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি না হয়ে সংকুচিত হবে। করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে শুরু করলেও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে নতুন নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। শুধু নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নয়, এখন ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে অর্থ উন্নত দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

আমরা মনে করি, বিশ্বমন্দার প্রভাব যাতে বাংলাদেশে না লাগে, সেজন্য সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সমন্বিতভাবে কাজ করলে মন্দাবস্থা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। রিজার্ভ জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হচ্ছে। দেশের টাকা দেশেই থাকছে। মহামারী ও যুদ্ধের কারণে এখন আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে সারাবিশ্বে পরিবহন খরচ, জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল, গম, ভুট্টাসহ যেসব পণ্য আমদানি করতে হয়, সেসব জিনিসেরই সব দাম বেড়ে গেছে। জনগণের খাদ্য কেনা, ক্যানসারের ওষুধ কেনা, জনগণের মঙ্গলের জন্য আমাদের করতে হয়েছে। সার, জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ আমাদের কিন্তু ক্রয় করতে হচ্ছে। এর আগে দীর্ঘস্থায়ী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চলমান কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে বাংলাদেশ যাতে কখনই দুর্ভিক্ষ ও খাদ্যের অপ্রতুলতার মতো কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি না হয় সেজন্য দেশবাসীকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। আমাদের মাটি ও মানুষ আছে। তাই এখন থেকেই আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে, বাংলাদেশ যাতে কখনো দুর্ভিক্ষ বা খাদ্য সংকটে না পড়ে। আমরা আমাদের খাদ্য উৎপাদন বাড়াব। তার কথায় আমরা আশান্বিত হতে পারি। এর মধ্যে সুখবর হচ্ছে, আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। এখন ২ হাজার ৮২৪ ডলার। গত অর্থবছরে ছিল ২ হাজার ৫৯১ ডলার। বাংলাদেশ তার অসাধারণ উন্নয়নের মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। ‘উন্নয়নের একটি সফল ঘটনা হিসেবে’ বর্ণনা করেছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক কয়েক মাস ধরেই বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছে। সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি বিষয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসবে। এগুলো হলো- রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে, আমদানি করা খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে, রেমিট্যান্স কমতে পারে। পোশাকের চাহিদা কমবে। তবে সঠিকভাবে এগোতে পারলে এখানে কিছুটা ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। কারণ বাংলাদেশ যেসব পোশাক রপ্তানি করে সেগুলো খুব উচ্চমূল্যের নয়। বাংলাদেশ জনসংখ্যাবহুল দেশ। আর এই জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তর করা দেশের সার্বিক অগ্রগতির প্রশ্নে জরুরি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের মানুষ সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে প্রবাসী আয়। বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকলেও বৈশ্বিক মন্দায় তাতেও প্রভাব পড়তে পারে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের কোম্পানিগুলো পশ্চিমাদের কাছে যে রপ্তানি করে তাতে প্রবৃদ্ধি কম হলে এসব কোম্পানির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। বৈশ্বিক মন্দা দেখা দিলে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে সেটি প্রভাব ফেলবে। আমদানি করা পণ্যগুলোর দাম বাড়বে। নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিচ্ছে, তার মধ্যেও দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার আওতার মধ্যে যাতে থাকে সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্য স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি সব ধরনের কার্যক্রম ও পরিকল্পনায় এটা অত্যন্ত জরুরি। দেশে উৎপাদন, আমদানি ও প্রয়োজনীয়তার পরিমাণ, ভোগের পরিমাণ, বিকল্প ব্যবহার, বেসরকারি খাতে মজুদ, আপৎকালে মজুদ প্রবণতা প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে গবেষণার মাধ্যমে যতটা সম্ভব বস্তুনিষ্ঠ উপাত্ত সংগ্রহ করতে হবে এবং নিয়মিত ব্যবধানে সেগুলো হালনাগাদ করতে হবে। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব আমাদের মতো উন্নয়নশীল ও আয় বৈষম্যের দেশে খুবই মারাত্মক। স্বল্প আয়ের মানুষ তাদের আয়ের সিংহভাগ অর্থ ব্যয় করে খাদ্য সংগ্রহের পেছনে। মুদ্রাস্ফীতি তাদের খাদ্যের প্রাপ্যতা কমিয়ে ফেলে। পরিণতিতে তারা অনাহার-অপুষ্টির দুষ্টচক্রে প্রত্যাবর্তন করে। স্বল্প মেয়াদে মুদ্রাস্ফীতি কমাতে আমদানি একটি হাতিয়ার। তবে সরকারের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতাও থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, এর মধ্যে রিজার্ভ কমে গেছে। টিকে থাকতে হলে সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতি কার্যকর করতে হবে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, করোনা ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার কারণে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে কোটি কোটি মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য বাড়বে। করোনা ভাইরাস সংকটের অর্থনৈতিক পরিণতি বিশ্বের ৬ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ একেবারে দরিদ্র হয়ে যাবে। বিশ্বের ৫০টিরও বেশি উন্নয়নশীল দেশ ঋণখেলাপির বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। সুখী দেশের তালিকায় বাংলাদেশ আশাব্যঞ্জক অবস্থানে রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ক্রীড়াসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। দেশের বর্তমান যে সংকট এটা বৈশ্বিক কারণে। দেশের কৃষি জমির যদি যথাযথ ব্যবহার করা যায়, বাড়ানো যায় খাদ্য উৎপাদন। বিদেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানি আয় যদি বাড়ানো যায়, প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতা ঠিক থাকে, আমদানি ব্যয় কমিয়ে আনা যায়, দেশের মানুষ মিতব্যয়ী হয় এবং ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো পণ্যের দাম না বাড়ায়, এ ক্ষেত্রে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়, তা হলে দেশ অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে না। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পিত উদ্যোগ জরুরি, প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ। পাশাপাশি দুর্নীতি নির্মূলের দিকেও মনোযোগ দেওয়া উচিত। আমাদের দুর্ভাগ্য দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে বাংলাদেশ এখনো মুক্ত হতে পারেনি। বাংলাদেশ এক সময় দুর্নীতির জন্য পরপর পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। দুর্নীতির সেই কলঙ্কতিলক মোচন করতে আমরা সক্ষম হয়েছি এটা যেমন সত্য, একইভাবে সত্য যে, আমরা সমাজ-রাষ্ট্র থেকে দুর্নীতি নির্মূল করতে পারিনি। যার কারণে আমাদের আশানুরূপ উন্নতি-অগ্রগতি হয়নি। এটা আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ব্যাপারে তার রয়েছে জিরো টলারেন্স নীতি। ইতোমধ্যে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যেতে পারত। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি বড় বাধা। দুর্নীতির কারণেই আমরা পিছিয়ে রয়েছি। এ বাধা দূর করতেই হবে।

 

হীরেন পন্ডিত : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

advertisement