advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

নাজনীন নাহার
নারীর নিরাপত্তা : সাইবার জগতে সচেতনতাই সতর্কতা

২৫ নভেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম
আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২২ ১০:৪৮ পিএম
advertisement

কল্পিত কেস স্টাডি-১ : তাহিতা ঘরের দরজা বন্ধ করে আছে সকাল থেকে। বাবা, মা, বড় ভাই সবাই দরজা ধাক্কাচ্ছে। কিন্তু তাহিতার কোনো উত্তর নেই। ফোনও বন্ধ। বাবা চিৎকার করে ধমক দিচ্ছেন, মা আদর করে বলছেন, কিন্তু কোনো উত্তর নেই তাহিতার। উপায় না পেয়ে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে চক্ষুস্থির সবার। বিছানায় এলোমেলোভাবে শুয়ে আছে তাহিতা। হাত ছড়ানো বিছানায় আর সেখান থেকে ঝরছে তাজা রক্ত। দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি এবং ২ সপ্তাহের চিকিৎসার পর বাসায় ফেরা তাহিতার। জানা গেল, তাহিতার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তার একান্ত ব্যক্তিগত কিছু কথোপকথন ও ছবি ছড়িয়ে দিয়েছে ফেসবুকে। যা খুব অল্প সময়ে শেয়ারের মাধ্যমে ছড়িয়ে গেছে তার সব বন্ধুর মাঝে এবং ¯ু‹লের ফেসবুক গ্রুপে। স্কুলে গেলে সবাই এগুলো নিয়ে তাকে আজেবাজে মন্তব্য করছিল, এর ফলে তাহিতার এই মানসিক বিপর্যয় ও আত্মহত্যার চেষ্টা।

কল্পিত কেস স্টাডি-২ : কদিন আগে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছিল সুস্মিতার। শেষ পর্যন্ত ফিরে পেয়েছে সে হারিয়ে যাওয়া আইডি। মেসেঞ্জার চেক করে ভীষণ মন খারাপ হলো সুস্মিতার। তার আইডি ব্যবহার করে অনেকের কাছেই টাকা চেয়ে মেসেজ পাঠানো হয়েছে। অনেকে বিকাশ নম্বরও চেয়েছে টাকা দেবে বলে। খুবই লজ্জা পেল সুস্মিতা। সমাধান হিসেবে নিজেই পেজে পোস্ট দিল সব জানিয়ে। তবে কজন পড়েছে সেটাই বিষয়।

advertisement

কল্পিত কেস স্টাডি-৩ : জয়ার বিকাশ অ্যাকাউন্টে একটা মেসেজ এলো যে, তার বিকাশ অ্যাকাউন্টে ৩৫০০ টাকা জমা হয়েছে। জয়া মনে করার চেষ্টা করে তার কি এমন কোনো টাকা আসার কথা? জয়া অনলাইনে বিজনেস করে এবং লেনদেন করে বিকাশে। অ্যাকাউন্টে প্রতিদিনই কিছু না কিছু পেমেন্ট আসে; ভাবল, কোনো ক্লায়েন্ট হয়তো পাঠিয়েছে। এর মাঝেই বেজে উঠল ফোন। একজন নারী খুবই কাতর কণ্ঠে বলল, ‘আমি ভুলে আপনার অ্যাকাউন্টে ৩৫০০ টাকা পাঠিয়েছি। আমার ট্রান্সজেকশন আইডি হলো...।’ জয়া মিলিয়ে দেখল, এসএমএস ঠিকই আছে। ওই নারী বলল, ‘দয়া করে একটু রিটার্ন করবেন।’ আমার জরুরি দরকার। জয়া বিকাশ অ্যাপস ব্যবহার করে না। তাই দ্রুত স্টেটমেন্ট দেখাও সম্ভব নয়। জয়া এসএমএসের ওপর ভিত্তি করেই টাকা পাঠিয়ে দিল। পরে হিসাব মিলিয়ে দেখল, তার অ্যাকাউন্টে কোনো টাকাই আসেনি। কিন্তু এসএমএসটি দেখে একদমই বোঝার উপায় নেই যে এটা নকল।

advertisement 4

ওপরে উল্লেখ করা ঘটনাগুলো হরহামেশাই ঘটছে আমাদের চারপাশে। এর প্রতিটি ঘটনাই বলে দিচ্ছে, অনলাইনে বা সাইবার জগতে নারী কতটা [অ]নিরাপদ! ইন্টারনেট সুবিধাসহ প্রযুক্তির নানামাত্রিক ব্যবহার যতই সহজলভ্য হচ্ছে, ততই সাইবার জগতে নারীদের ওপর সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে। বাংলাদেশে সাধারণত ১৬ থেকে ২৪ বছরের নারীরা সবচেয়ে বেশি সাইবার অপরাধের শিকার হয়। অনলাইনে নারীদের ৭৩ শতাংশ বুলিংয়ের শিকার হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা তাদের এ সমস্যা প্রকাশ করে না; বরং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। মেয়েরা সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে মামলা করে না। অন্যদিকে তারা জানেও না সাইবার সিকিউরিটি আইনের বিষয়ে, কোন অপরাধে কী ধরনের শাস্তি রয়েছে।

গত ৯ মাসে সাইবার অপরাধে মামলা হয়েছে ২০৫টি। যদিও বাস্তব ঘটনার শিকার হয়েছেন আরও বেশি নারী। মামলার সংখ্যা কম, কিন্তু প্রকৃত ঘটনা আরও বেশি। কারণ অনেকেই আইনের দ্বারস্থ হতে চান না। আইডি হ্যাক, স্পর্শকাতর তথ্য-ছবি-ভিডিও প্রকাশ, সাইবার স্পেসে যৌন হয়রানি ইত্যাদি অপরাধের শিকার হচ্ছেন নারীরা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যত বেশি আমাদের দেশে ডেটাবেজ ব্যবহৃত হবে, তত বেশি ঝুঁঁকি বাড়বে। কিছুদিন আগে আমাদের দেশে ই-কমার্সের জোয়ার বয়ে গেল। এই মাধ্যমে কেনাটাকা করতে গিয়ে অনেকেই তাদের ব্যক্তিগত তথ্য দিয়েছেন। এসব ই-কমার্স সাইটের কাছে এখন লাখ লাখ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া বিনোদনে জনপ্রিয়তা বেড়েছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের। আর এসব সেবা নিতে অনেকেই তাদের প্রাইভেট তথ্য দিয়েছেন। এসব ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে অনেকেই অনলাইনে হয়রানি করতে পারে, তা হয়তো জানা নেই আমাদের। সম্প্রতি ভারতের জিফাইভের বিরুদ্ধেও ৯ মিলিয়ন গ্রাহকের তথ্যফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। একই অভিযোগে অভিযুক্ত নেটফ্লিক্স, আমাজন প্রাইম ডিডিও এবং ডিজনিসহ বহু ওটিটি পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।

সাইবার জগতে নারীর ঝুঁকি বাড়ার বড় কারণ তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারে অসতর্কতা ও অসচেতনতা। অন্যদিকে সাইবার বা ইন্টারনেট ব্যবহারসংক্রান্ত সঠিক তথ্য না জানা। পাসওয়ার্ড শেয়ার করা, মোবাইলে সব সময় ফেসবুকে লগইন করা, বিশ্বাস করে ফোন বন্ধুদের হাতে দেওয়া, বুঝে বা না বুঝে ফেসবুকে ব্যক্তিগত ছবি শেয়ার করা, বন্ধুদের সঙ্গে ব্যক্তিগত ছবি ইনবক্স করা ইত্যাদি কারণে মেয়েরাই বেশি সাইবার বুলিংয়ের শিকার। তাই অনলাইন নিরাপত্তার বিষয়টি এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, সঠিক তথ্য জেনে ও মেনে নিরাপদ থাকা যায় সাইবার জগতে।

অনলাইনে নিরাপদ থাকতে প্রথমত প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাসওয়ার্ড তৈরি ও ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহারে হতে হবে সাবধান। জেনে-বুঝে সচেতনভাবে ব্যবহার করতে হবে ফেসবুক বা অন্য সব সোশ্যাল মিডিয়া। কোনো কিছু শেয়ার করার আগে জেনে নিতে হবে এর সত্যতা। না বুঝে ক্লিক করা যাবে না কোনো ছবি বা ইমেইলে আসা লিংক। এর পরও যদি কেউ দুর্ঘটনার শিকার হয় তা হলে তাকে অবশ্যই আইনের সহায়তা নিতে হবে। থানায় জিডি করে এবং সম্ভব হলে অনলাইনে রিপোর্ট করে আইনি সহায়তার জন্য অভিযোগ জানাতে হবে। এ ছাড়া দেশের পুলিশ বিভাগে ‘সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ নামক একটি সেবা চালু রয়েছে। কোনো ভিকটিম চাইলে দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে ৯৯৯-এ ফোন করেও এই সেবা নিতে পারেন। সাইবার স্পেসে সংঘটিত নারীর প্রতি হয়রানিমূলক অপরাধের অভিযোগ গ্রহণ, প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও আইনি সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ফেসবুক পেজ, ইমেইল নম্বর ও হটলাইন চালু রয়েছে। এর মেইল আইডি : পুনবৎংঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ.ড়িসবহ@ঢ়ড়ষরপব.মড়া.নফ। হটলাইন মোবাইল নম্বর : ০১৩২০০০০৮৮৮। সম্পূর্ণ নিরাপত্তার সঙ্গে ভিকটিমের তথ্য গোপন রেখে প্রয়োজনীয় সেবা ও আইনি সহায়তা দেওয়া হয় এর আওতায়।

এ ছাড়া রয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, যদিও এর কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। তবে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধসহ সব ধরনের অপরাধ দমন করতে হলে আইনের যথাযথ প্রয়োগে ইতিবাচক ফলাফল আশা করা যায়। মুশকিল হয় তখনই, যখন অপরাধীকে শনাক্ত করার পর ভিকটিম ব্যাকঅফ করে বা পিছিয়ে যায়। এই পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। সামাজিক ট্যাবু ভাঙতে হবে। নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। সাহস করেই নিতে হবে আইনের আশ্রয়।

নাজনীন নাহার : সভাপতি, বাংলাদেশ আইটি জার্নালিস্ট ফোরাম

advertisement