advertisement
advertisement
advertisement

দেশে দেশে আর্জেন্টিনা ব্রাজিল নিয়ে উন্মাদনা

সুমন মজুমদার
২৫ নভেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০২২ ০৯:১৭ এএম
advertisement

বিশ্বকাপ ফুটবল এলে গোটা বাংলাদেশ যেন দুটি দলে ভাগ হয়ে যায়। একদল গলা ফাটান ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের হয়ে, তো আরেক দল উন্মাদনা শুরু করে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে। কখনো কখনো উভয় দলের সমর্থকদের মধ্যে এই উন্মাদনা সহিংসতার পর্যায়েও রূপ নেয়। চলতি বিশ্বকাপেও ব্রাজিল আর্জেন্টিনার খেলা নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে তুমুল উত্তেজনা। এরই মধ্যে গত ২২ নভেম্বর সৌদি আরব বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচের সময় উত্তেজনায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কুমিল্লায় এক তরুণ মারাও গেছেন। আবার ওই ম্যাচে আর্জেন্টিনা হেরে যাওয়ার পর রাজধানীর অদূরে সাভারে বিপক্ষ দলের সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। নির্মল বিনোদনের উৎস

advertisement

খেলা নিয়ে মানুষের এমন আচরণ কখনো কারও কাম্য হতে পারে না। তবে উভয় দলের সমর্থকদের তা কে বোঝাবে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখনো লাগাতার চলছে কাদা ছোড়াছুড়ি ও ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ। একেবারে ভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন দুটি দেশের খেলা নিয়ে এমন উত্তেজনা গোটা পৃথিবীতে সত্যি বিরল। বিশ্বকাপে খেলা দলগুলোর থেকে র‌্যাংকিংয়ে বহু পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের সমর্থকদের ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে ফুটবল প্রেম এখন আলোচিত হয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও। গত শুক্রবারও ওয়াশিংটন পোস্ট বাংলাদেশে ব্রাজিল আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উন্মাদনা নিয়ে রিপোর্ট করেছে।

advertisement 4

তবে নান্দনিক ফুটবল উপহার দেওয়ার জন্য ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক শুধু বাংলাদেশে নয়, ছড়িয়ে আছে বিশ্বের আরও অনেক দেশে। কিন্তু বিশ্বকাপ এলে সেসব দেশে কি বাংলাদেশের মতো এমন উত্তেজনা ছড়ায়? সম্প্রতি মিডল ইস্ট আই প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়, যেসব দেশ বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নিচ্ছে, তাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে নিজেদের দল নিয়ে উত্তেজনা থাকা স্বাভাবিক। এর বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কিছু দেশে বিশ্বকাপ এলে যে উত্তেজনা তৈরি হয় তা দেখার মতো। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে এই উন্মাদনা বেশি। অথচ এই দলগুলো বিশ্বকাপ খেলা থেকে এখনো অনেক দূরে রয়েছে। এসব দেশের বহু অভিবাসী শ্রমিক রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। তারাই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিশ্বকাপ এলে উত্তেজনা তৈরি করেন। এবারের বিশ্বকাপেও কাতারে বাংলাদেশি ও ভারতীয় সমর্থকদের প্রিয় দলের সমর্থনে রাস্তায় উল্লাস করতে দেখা গেছে। এমনকি তারা খেলা দেখার জন্য করেছেন বিরাট আয়োজনও। কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজন প্রকল্পের সিইও নাসের আল খাতের বলেন, আমাদের দেশে অনেক ফুটবল সমর্থক রয়েছে যারা দক্ষিণ এশিয়া থেকে এসেছেন। তারা ফুটবল ভালোবাসেন এবং ফুটবলের প্রকৃত ভক্ত।

শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশগুলোতেও বিশ্বকাপ জ্বর ছড়িয়ে পড়েছে। এসব দেশেও অধিকাংশ সমর্থন পাচ্ছে ল্যাটিন আমেরিকান দুই জায়ান্ট ব্রাজিল আর্জেন্টিনা। ফেসবুক-টুইটারে চলছে তর্ক বিতর্ক ও যুক্তি-পাল্টা যুক্তি। বাংলাদেশ ছাড়া এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোতে বিশ্বকাপ উত্তেজনা কেমন দেখা যাক-

ভারত : প্রতিবেশী দেশ ভারতেও বাংলাদেশের মতো ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা শিবিরে ভাগ হয়ে গেছেন ফুটবলপ্রেমীরা। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, আসাম, ত্রিপুরার মতো রাজ্যগুলোয় উত্তেজনা অনেক বেশি। কেরালায় এ নিয়ে উন্মাদনা এত বেশি যে রাজ্যের বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে এখন শোভা পাচ্ছে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, লিওনেল মেসি, ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলে, কাকা, রবার্তো কার্লোস, রোমারিও, নেইমার, পর্তুগাল তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিশাল বড় বড় ব্যানার, পোস্টার, গ্রাফিতি। বিভিন্ন গলির মোড়ে মোড়ে লাগানো হয়েছে ব্রাজিল আর্জেন্টিনার পতাকা। পাড়া মহল্লায় বড় টিভিতে আয়োজন করে খেলা দেখছেন সবাই। এর মধ্যে কাতার বিশ্বকাপ শুরুর দিনই রাজ্যের কোল্লাম জেলায় শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বাদানুবাদে জড়িয়েছিলেন ব্রাজিল আর্জেন্টিনা সমর্থকরা। এক পর্যায়ে রড ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে চাড়াও হন তারা। যে মারামারির ঘটনা এরই মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। মারামারিতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন মারাত্মক আহতও হয়েছেন।

কেরালার মতো পশ্চিমবঙ্গেও চলছে ফুটবল জ্বর। ফুটবল পাগল বাঙালি ব্রাজিল আর্জেন্টিনার সমর্থনে প্রিয় দলের পতাকার আদলে দেওয়াল রঙ করার পাশাপাশি লাগিয়েছেন ব্যানার পোস্টার হোর্ডিং। উত্তর কলকাতার অলি গলি ভরে গেছে প্রিয় তারকাদের নানা ধরনের ছবিতে। কোথাও ব্রাজিল আর্জেন্টিনার পাশাপাশি দেখা গেছে জার্মানি, ফ্রান্সের পতাকাও।

পাকিস্তান : পাকিস্তানেও প্রিয় ফুটবল তারকাদের ছবি, ব্যানার, হোর্ডিং দিয়ে পাড়া, মহল্লা ভরে ফেলেছেন ফুটবলপ্রেমীরা। অলিগলিতে বিক্রি হচ্ছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা। মুসলিম দেশ হিসেবে কারও কারও সমর্থন পাচ্ছে কাতার, সৌদি আরব, মরক্কো, ইরানের মতো দলগুলো। গত ২১ নভেম্বর তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সিতে প্রকাশিত এক খবরে জানানো হয়, চলতি মাসেই অস্ট্রেলিয়াতে টি-২০ ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছিল পাকিস্তান। কিন্তু সে উত্তেজনা এখন অতীত। এখন গোটা পাকিস্তান ভাসছে ফুটবলের জোয়ারে। করাচির মালির জেলাকে পাকিস্তানে বলা হয় মিনি কাতার। কারণ এখানকার বহু তরুণ কাতারে কাজ করেন। সেই সূত্রে এই জেলায় ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তেজনা অনেক বেশি। স্থানীয় ফুটবলার নাসির বালুচ জানান, তাদের এখানে ব্রাজিলের সমর্থন সবচেয়ে বেশি। এর পরেই সমর্থনের দিক থেকে অবস্থান জার্মানির। নাসিরের বিশ্বাস এবার বিশ্বকাপে ব্রাজিল তারকা নেইমার তার ঝলক দেখিয়ে নিশ্চয়ই কাপ জিতে নেবেন। করাচি ছাড়াও লাহোর, ইসলামাবাদ, মুলতানসহ পাকিস্তানের বহু এলাকায় ফুটবল বিশ্বকাপ জোরেশোরেই উপভোগ করছেন মানুষ।

শ্রীলংকা : দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ শ্রীলংকাতেও উত্তেজনা তৈরি করেছে বিশ্বকাপ। দেশটির অনলাইন পোর্টাল আদাদিরানা জানায়, রাজধানী কলম্বো, রত্নাপুরা, গল, বাদুল্লার মতো শহরগুলোতে ফুটবলপ্রেমীরা জমিয়ে বিশ্বকাপ উপভোগ করছেন। কেউ কেউ বাড়ির ছাদে উড়িয়েছেন প্রিয় দলের পতাকা। এমনকি শ্রীলংকা পর্যটন ব্যুরো আনুষ্ঠানিকভাবে ফিফা বিশ্বকাপ ফ্যানদের জন্য বিশেষ ভ্রমণ প্যাকেজও ঘোষণা করেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার এই চার দেশ ছাড়াও নেপাল, ভুটানের ফুটবলপ্রেমীরাও বিশ্বকাপ উপভোগ করছেন। মালদ্বীপে ব্রাজিল আর্জেন্টিনা সমর্থকরা পৃথকভাবে ট্রাক ও মোটরসাইকেল র‌্যালি করেছেন। পতাকা নিয়ে হয়েছে মিছিলও। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াতেও বিশ্বকাপ উত্তেজনা ছড়িয়েছে। নিউজ ফ্লেয়ার বলছে, ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া প্রদেশের সবচেয়ে বড় শহর জয়াপুরার অলিগলি ভরে গেছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেনের পতাকায়। এমনকি স্থানীয় তরুণরা সেখানে খেলা দেখার জন্য গড়ে তুলেছেন ‘বিশ্বকাপ গ্রাম’ নামে আলাদা একটি জায়গা। যেখানে বড় পর্দায় প্রিয় দলের খেলা দেখতে পারেন সমর্থকরা।

advertisement