advertisement
advertisement
advertisement

জনশূন্য করাই পুতিনের লক্ষ্য

ড. মাহবুব হাসান
২৩ জানুয়ারি ২০২৩ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২৩ ০৮:৩১ এএম
advertisement

আগামী মাসে (২৪ ফেব্রুয়ারি) এক বছর পূর্ণ হবে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের। এই আক্রমণের পেছনে কী কারণ নিহিত ছিল, তা কেউ স্পষ্ট করে বলতে পারেন না। সাদা চোখে মনে হয় যে, রাশিয়া তার ইউক্রেনীয় রুশদের বাঁচানো ও তাদের জন্য মুক্তভূমি গড়ে দেওয়ার জন্যই এ অভিযানের সূচনা করেছিল। এখন সেটি আর মনে হচ্ছে না। এই এক বছরে রাশিয়া তার বিপুল সেনা ও সামরিক-বেসামরিক সম্পদ হারিয়ে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে বলে মনে হয়। কী সেই পরিকল্পনা? রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন কিছুদিন আগে বলেছেনÑ ইউক্রেন যদি পরিকল্পনা পরিবর্তন না করে, তা হলে তার অস্তিত্বই বিপন্ন হতে পারে। এ কথাটা সাদামাটা মনে হয়। মনে হয় রাজনৈতিক সভার বক্তব্য। কিন্তু আমরা তো পত্রিকায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংকট নিয়ে লেখা পড়ে এবং পুতিন বা জেলেনস্কির বক্তব্য শুনে-পড়ে বুঝতে পারি কার সংকট কেমন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় অ্যালিদের তৎপরতা দেখেও কিছুটা আঁচ করতে পারি।

ইউক্রেনের একটা বড় অংশে দুইপক্ষের সেনাদের ‘উল্লেখ করার মতো লড়াই’ নিয়ে কথা বলেন মার্ক মিলে। আমেরিকার শীর্ষ এই জেনারেল বলেন, ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভ থেকে দক্ষিণ খেরসন ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাখমুত পর্যন্ত দুইপক্ষের লড়াই চলছে। এসব এলাকার দৈর্ঘ্য এক হাজার কিলোমিটারের বেশি।

advertisement

জেনারেল মার্ক মিলে বলেন, ‘এখনো বিস্তীর্ণ অঞ্চলে লড়াই চলছে। এর মানে, রাশিয়ার অনেক সেনা এখনো ইউক্রেনে আছেন। এ জন্য সামরিক দৃষ্টিতে আমার মনে হচ্ছে, এ বছর রাশিয়ার সেনাদের বিতাড়িত করাটা খুব কঠিন। তবে এর মানে এই নয় যে, সম্ভব নয়। আমি শুধু বলতে চাচ্ছি যে, সম্ভব হলেও সেটি হবে খুবই কঠিন।’

advertisement 4

কয়েকদিন আগে আমেরিকার জয়েন্ট স্টাফপ্রধান জেনারেল মার্ক মিলি বলেছেন, এ বছর রাশিয়ার সেনাদের ইউক্রেন থেকে তাড়ানো প্রায় কঠিন। জার্মানিতে বসে মার্ক মিলি ও তার ইউরোপীয় সহযোগীদের বৈঠক চলছেÑ ইউক্রেনকে কী রকম সামরিক সাহায্য বা অস্ত্র দেওয়া যায়, তার আলোচনার টেবিলে তিনি এ কথা বলেন। তার মানে, আগামী এক বছরও যে ইউক্রেন যুদ্ধের নির্মমতায় ভুগবে, তাতে সন্দেহ নেই। আর এই সূত্রে আরও কোটির মতো ইউক্রেনীয় দেশ ছেড়ে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোয় আশ্রয় নিতে বাধ্য হবেÑ তাতেও কোনো ভুল নেই। এদিকে পুতিন বাহিনী সামরিক অস্ত্রের ঘাটতিতে পড়ছে বলেই মনে হয়। তারা স্থলযুদ্ধের দিকেই ঝুঁকছে।

এ থেকে ইঙ্গিত মিলছে, রাশিয়ার অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুদ কমে আসছে। আবার একই সঙ্গে দনবাস অঞ্চলে স্থলযুদ্ধের তীব্রতা তারা বাড়িয়েছে। এর অর্থ হলো, রাশিয়া এখন স্থলযুদ্ধের দিকে মনোনিবেশ করছে। এর মধ্য দিয়েই রাশিয়ান বাহিনী ইউক্রেনের নতুন নতুন ভূখণ্ড নিজেদের আয়ত্তে নেওয়ার আশা করছে। রাশিয়া সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে বদলের ঘটনাই বলে দিচ্ছে, দনবাস অঞ্চলে রাশিয়া আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে। অক্টোবরে খেরসনে বিপর্যয়ের পর সেনাবাহিনীতে নতুন সেনা নিয়োগ করে খুব সফলতার সঙ্গে সেই শূন্যতা পূরণ করেছেন পুতিন ( একটি জাতীয় দৈনিক, ১৭ জানুয়ারি ২০২৩)।

আসলে রাশিয়ার সংকট গোলাবারুদ ও অস্ত্রের, নাকি অন্যকিছুÑ তা বোঝা কঠিন। তবে রাশিয়ার মূল পরিকল্পনা বোধহয় ইউক্রেনকে জনশূন্য করা। একটি দেশ যদি যুদ্ধমুক্ত হয়েও খোঁড়া হয়ে যায়, তা হলে সেই দেশ পুনর্গঠনের জন্য মানুষ পাওয়া কঠিন। কারণ ইউক্রেনকে জনশূন্য করতেই যেন মাটি পোড়া নীতি নিয়েছে পুতিন।

যুদ্ধ যে অমানবিক লোভের এক দানবীয় অভিযান, সেটিই আবারও প্রমাণ করতে যাচ্ছেন ভøাদিমির পুতিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন মানবতাবিরোধী সংঘর্ষের দেখা আমরা পেয়েছি ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তানে। আর ১৯৭১ সালে আমরা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিলাম। ৩০ লাখ মানুষ হত্যার পর তারা পরাজিত হয়ে ফিরে গেছে। যারা যুদ্ধবন্দি হয়েছিলেন, তারাও ক্ষমা পেয়ে ফিরেছেন। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের ক্ষতের ওপর উদগ্র উদ্যমে বাংলাদেশ মাথা উঁচু ও কোমর সোজা করে দাঁড়িয়েছে। সেটি সম্ভবের কারণ হলো, জনবহুল দেশ আমাদের এবং দেশ গড়ে তোলার জন্য পর্যাপ্ত উদ্যম ও ভালোবাসা। কিন্তু ইউক্রেনের সেই লোকবল নেই বা সেই লোকবল যাতে না থাকে, ওই নির্মম কৌশলই নিয়েছে পুতিন। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ইউক্রেন তার এক কোটি অধিবাসীকে ইউরোপ ও রাশিয়ায় অভিবাসী হতে দেখেছে। এই যুদ্ধে আরও মানুষ সহায়-সম্পদহীন হয়ে বাস্তুচ্যুত হবে। আশ্রয় নেবে ইউক্রেনের সীমান্তলগ্ন দেশগুলোয়। আর তাদের বড় একটি অংশ দেশে ফিরবে না বা ফিরতে চাইবে না। তারও রয়েছে নানা কারণ। এর মধ্যেই যারা আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন দেশে, তাদের একটি অংশ সেসব দেশে কাজ শুরু করে দিয়েছে। একটি জনমিতি পরিসংখ্যায় চোখ রাখা যাক। ওয়াশিংটনে বসবাসরত অস্ট্রেলিয়ান-আমেরিকান সংবাদকর্মী জন পি রুহেল লিখেছেন, ‘...ইউরোপে আশ্রয় নেওয়া অনেক ইউক্রেনীয় আর কখনই দেশে ফিরবেন না। রাশিয়াতেও যারা আশ্রয় নিয়েছেন, তারাও ফিরবেন না। জনসংখ্যার বিশাল ঘাটতির কারণে সেসব খালি জায়গা পূরণ করে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করা ইউক্রেন সরকারের জন্য কঠিন এক বিষয় হয়ে উঠবে। যুদ্ধ যত দিন দীর্ঘায়িত হবে, পরিস্থিতি ততই খারাপ হতে থাকবে।’ রুহেনের এ অভিমতকে অস্বীকার করা যায়। কিন্তু বাস্তবতা এটাই।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরু হলে ইউরোপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকটে পড়ে। এরই মধ্যে কয়েক লাখ শরণার্থী দেশে ফিরলেও ২০২২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিবন্ধনকৃত ইউক্রেনীয় শরণার্থীর সংখ্যা ৭৯ লাখ আর রাশিয়ার আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীর সংখ্যা ২৯ লাখ। রাশিয়া ছাড়াও পোল্যান্ড (১৫ লাখ), জার্মানি (১০ লাখ) ও চেক প্রজাতন্ত্রও (৫ লাখ) বড় আকারের শরণার্থীর চাপ নিজেদের কাঁধে নিয়েছে। ইতালি, স্পেন, রোমানিয়া, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য এক লাখের বেশি ইউক্রেনীয়কে আশ্রয় দিয়েছে।

এসব শরণার্থী খুব শিগগিরই দেশে ফিরবেন, বাস্তবে এ ধরনের কারণ দেখা যাচ্ছে না। গত জুনে উইলসন সেন্টার পরিচালিত এক জরিপের ফল থেকে জানা গেছে, ২৪ শতাংশ ইউক্রেনীয় শরণার্থী দেশে ফিরতে ইচ্ছুক। কিন্তু তারা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকতে চান। ৪৮ শতাংশ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরই ফিরতে চান এবং ৮ শতাংশ বলেছেন, তারা কখনই আর ইউক্রেনে ফিরতে চান না। গত ডিসেম্বরে জার্মান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এক জরিপ থেকে জানা গেছে, দেশটিতে আশ্রয় নেওয়া ৩৭ শতাংশ ইউক্রেনীয় সেখানেই স্থায়ীভাবে থেকে যেতে চান অথবা কমপক্ষে কয়েক বছর বাস করতে চান। গত মার্চে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের সুরক্ষার ব্যাপারে যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে তারা আগামী তিন বছর ইইউ দেশগুলোয় বসবাস, কাজ ও পড়াশোনার সুযোগ পাবেন।

ইউক্রেন অভিবাসীদের সেসব দেশে বাস করার মানসিকতা থেকেই এটা প্রমাণ হয় যে, সাধারণ মানুষ চায় যুদ্ধের মতো নির্মমতার বাইরে সহজ-সরল ও নিরবচ্ছিন্ন সামাজিক জীবনÑ যেখানে সামরিক নেতাদের অমানবিক নির্দেশে হত্যাযজ্ঞ চলবে না। ইউক্রেন আর দখল করতে চায় না রাশিয়া, চায় ইউক্রেনকে জনশূন্য করতে। এতে রাশিয়ার লাভ হচ্ছে, তার পাশে ইউক্রেন যাতে আর কখনই উন্নত দেশ হয়ে উঠতে না পারে।

যারা ইউক্রেন ছেড়ে রাশিয়ায় ঢুকেছে, তাদের অধিকাংশই রুশ। আর রুশদের জন্য রাশিয়াই বড় ও ভালো দেশ বলে মনে হয়। যারা পশ্চিমাঞ্চলের পোল্যান্ডে গেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে তারা সেখানেই পুনর্বাসিত হবেন। ভাষা ও ধর্ম তাদের এক বা একাধিকÑ সেটি বড় বাধা নয়। তবে কালচারাল বিভেদ হয়তো সামান্য বৈষম্য তৈরি করতে পারে। এই বহুমাত্রিক ডিসক্রিমিনেশন পৃথিবীর দেশে দেশে রাজনৈতিক বিভিন্নতার মতোই রয়েছে। সেটি কোনো সমস্যার মূল কেন্দ্র হয়ে উঠবে না।

যা এখন সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে, তা হলো পৃথিবীর রাজনৈতিক সীমান্ত ও মানবতার বিরুদ্ধে অস্ত্রের ঝিলিক। আর সেটিই হবে সব থেকে মর্মবিদারী ঘটনা। একটি দেশকে যদি জনশূন্য করে ফেলা যায়, তা হলে ওই দেশ দখল করে বা সেই পোড়া নীতিতে ছারখার করে কী লাভ পাবেন পুতিন?

মানবতা হরণের এমন কঠিন নীতি ও পদক্ষেপকে অবশ্যই থামানো উচিত। এ জন্য আমেরিকা প্রশাসন যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেটিকে সাধুবাদ জানালেও শেষ পর্যন্ত তাদের সামরিক বাণিজ্যই প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। শুধু আমেরিকানদের নয়, গোটা ইউরোপই ইউক্রেনকে সাহায্য করছে। কারণ সেখানে মানবতা রক্ষার তাগিদের পেছনেই আছে সামরিক বাণিজ্য। এই বাণিজ্যের নেশা মানবতাকে ভোঁতা করে দিচ্ছে। সেটি জেলেনস্কির যেমন দায়, তেমনি পুতিনেরও। তবে এ ক্ষেত্রে পুতিনের দায়ই বেশি। কারণ তিনি অভিযানের নির্দেশদাতা এবং মানুষ হত্যার জন্য এ যুদ্ধ তিনিই পরিকল্পনা করেছেন।

ড. মাহবুব হাসান : কবি ও সাংবাদিক

advertisement