advertisement
advertisement
advertisement

ক্ষমতা ও একজন জেসিন্ডা আরডার্ন

চিররঞ্জন সরকার
২৪ জানুয়ারি ২০২৩ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২৩ ১১:০১ পিএম
advertisement

ক্ষমতা এমন জিনিস- যা কেউ সহজে ছাড়তে চান না, এমনকি বাধ্য হলেও শেষ চেষ্টা করেন ক্ষমতায় টিকে থাকার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভোটে হেরেও ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করেছেন, ক্যাপিটল হিলের দখল নিতে সমর্থকদের ইন্ধন জুুগিয়েছেন। ব্রাজিলের সদ্য ক্ষমতা হারানো প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো যেমন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে মেনে নিতে নিতে পারছেন না, নির্বাচনে হারার পরও পরাজয় স্বীকার না করে বরং দেশব্যাপী সহিংসতাকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। শুধু ট্রাম্প কিংবা বলসোনারো নয়, দুনিয়ার কেউই আসলে পদ-ক্ষমতা ছাড়তে চান না; বরং কীভাবে পদ-ক্ষমতা পাওয়া যায়, পেলে তা আমৃত্যু আঁকড়ে থাকা যায়Ñ সেই চেষ্টা করেন। আমাদের দেশে তো পদ-পদবি-ক্ষমতার মোহ আরও প্রকট। এখানে কেউ কোনো দায়িত্বশীল পদ থেকে স্বেচ্ছায় বিদায় নিতে চান না; সামর্থ্য না থাকলেও না, শরীর-মন বিরুদ্ধ হলেও না, পরাজয়ের আশঙ্কা থাকলেও না। অনেককে তো ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হয়। সেখানে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্নের স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর খবর বিস্ময় জাগানিয়া বটে।

জেসিন্ডা আরডার্ন গত প্রায় ছয় বছর অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর হঠাৎ এই পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ হিসেবে যা বলেছেন, সেটি আরও বিস্ময়কর। তিনি বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে দেশকে আমার দেওয়ার আর কিছু নেই।’ এমন সহজ, সরল অথচ দায়িত্বশীল স্বীকারোক্তি দেওয়ার ক্ষমতা দুনিয়ায় কয়জনার আছে?

advertisement

জেসিন্ডা আরডার্ন জানান, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব কঠিন হওয়ার কারণে তিনি পদত্যাগ করছেন না। তিনি বিশ্বাস করেন, অন্যরা তার চেয়ে আরও ভালো কাজ করতে পারেন। তিনি একপর্যায়ে বলেন, তার মেয়ে নেভ এই বছর স্কুলে যাওয়া শুরু করবে। তিনি সেখানে উপস্থিত থাকার জন্য উন্মুখ। তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী ক্লার্ক গেফোর্ডকে তিনি বলেছেন, তাদের বিয়ের সময় হয়ে এসেছে।

advertisement 4

২০১৭ সালে ৩৭ বছর বয়সে জেসিন্ডা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নারী সরকারপ্রধান হয়েছিলেন তিনি। এর আগে ২০২০ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টির নেতা জেসিন্ডা আরডার্ন পরাজিত করেন ন্যাশনাল পার্টির প্রধান কলিন্সকে। সেটি ছিল নিউজিল্যান্ডের ৫৩তম পার্লামেন্ট নির্বাচন। করোনা ভাইরাস মহামারীর সফল ব্যবস্থাপনার কারণে জেসিন্ডা দ্বিতীয় মেয়াদে জয় পান।

দুই মেয়াদে নির্বাচিত জেসিন্ডা আরডার্নের প্রায় ছয় বছরের শাসনামলে নিউজিল্যান্ডের কোনো রাজনৈতিক দল তার বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক ব্যর্থতার অভিযোগ আনতে পারেনি, পারেনি কোনো দুর্নীতির অভিযোগ আনতে। আর্থিক সংকটের কারণে দলের জনপ্রিয়তায় কিছুটা ভাটা পড়লেও নিউজিল্যান্ডের মানুষের কাছে এখনো তিনি অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তিত্ব। এত সাফল্যের পরও দেশ ও জাতির প্রতি প্রচণ্ড দায়িত্ববোধই হয়তো তাকে এমন একটি কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে সাহস জুগিয়েছে। বর্তমান বিশ্বে এমন একজন সাহসী, দক্ষ, সৎ রাজনীতিবিদ ও প্রধানমন্ত্রী সত্যিই বিরল।

৪২ বছর বয়সী জেসিন্ডা সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমি চলে যাচ্ছি। কারণ কাজটি কঠিন। এ পদটি কী, তা আমি জানি। আমি জানি, এই পদের প্রতি সুবিচার করার মতো আর কিছু মজুদ নেই আমার কাছে। বিষয়টি একেবারেই সহজ। ভবিষ্যতের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমি যথেষ্ট সময় নিয়েছি। প্রচুর চিন্তা-ভাবনা করেছি। আশা করেছিলাম, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য হয়তো প্রাণশক্তি ফিরে পাব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেটি পাইনি এবং যদি আমার কাজ অব্যাহত রাখি, তা হলে নিউজিল্যান্ডের ক্ষতি করব।’ একজন সফল প্রধানমন্ত্রী এমন কথা বলছেন, ভাবা যায়! এমন রাজনীতিবিদও হন?

জেসিন্ডা আরডার্নের পদত্যাগ সত্যিই রাজনীতির ইতিহাসে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে জেসিন্ডা আরডার্নের দর্শন, উদারতা ও দক্ষতা তাকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। তিনি একজন আদর্শ রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন। তিনি সবচেয়ে কম বয়সী নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিউজিল্যান্ডের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আবার সরকারপ্রধানের কাজের চাপ সামলিয়ে সন্তান লালন-পালন করে তাক লাগিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সন্তানের জন্ম দেওয়ার ঘটনা বেশ বিরল। জেসিন্ডা আরডার্নের আগে মাত্র একজন নারীই প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে সন্তানের জন্ম দেন। তিনি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। এ দুই নারীকে সন্তান-পালন ও দেশ সামলানোর কঠিন কাজ একসঙ্গে চালিয়ে যেতে হয়েছে।

মা হিসেবে যে জেসিন্ডা আরডার্নের খাটুনি কম হয়নি, তা প্রকাশ পেয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিভিন্ন পোস্টে। সেখানে মানুষ দেখেছে মেয়ের জন্মদিনে সুন্দর একটি কেক বানাতে গিয়ে কতটা পরিশ্রম করেছেন তিনি। এমনকি জ্যাকেটে ডায়াপার ক্রিমের দাগ নিয়ে সারাদিন একের পর এক সরকারি বৈঠক করার ঘটনাও সবার সামনে হাসিখুশিভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত একজন রাজনীতিবিদকে তার ব্যক্তিগত জীবনে কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তা পদত্যাগ নিয়ে জেসিন্ডা আরডার্নের বক্তব্যে উঠে এসেছে। এ সময় তার গলা কাঁপছিল। তিনি বলেছেন, ‘রাজনীতিবিদরাও মানুষ। যতক্ষণ সম্ভব আমরা সবকিছু শুধু দিয়েই যাই। তার পর শেষ সময়টা চলে আসে। আমার জন্য এটা শেষ সময়। আমি জানি, এই দায়িত্বের জন্য আমাকে কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।’

জেসিন্ডা আরডার্ন সম্পর্কে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সঠিক মূল্যায়নটাই তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, এই বিশ্বে তিনি (জেসিন্ডা) এমন কিছু পার্থক্য গড়ে তুলেছেনÑ যা ‘পরিমাপযোগ্য নয়’।

জেসিন্ডা আরডার্ন ২০১৭ সালে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর একের পর এক কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন। বিশ্বের অন্যতম কঠোর লকডাউনের সঙ্গে করোনা মোকাবিলায় বিশ্বের সব দেশের আগে কৃতিত্বের দাবিদার তিনি। ২০১৯ সালে ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে চরমপন্থির গুলিতে ৫১ জন নিহত হওয়ার পর নিউজিল্যান্ডের বন্দুক আইন সংস্কার করেন। অপরাধীকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনেন। একই বছরের ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ড উপকূলে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে ২২ জন মারা যাওয়ার পর আবারও তার সহমর্মিতা দেখা গিয়েছিল। বিশেষ করে ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে নৃশংস হামলার পর তার মানবিক ভূমিকা তাকে সারাবিশ্বে অনন্য অসাধারণ নেতায় পরিণত করে।

কঠিন পরিস্থিতি সামলে নিউজিল্যান্ডকে নেতৃত্ব দিয়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন জেসিন্ডা। পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘নতুন চ্যালেঞ্জের জন্য আমাদের নতুন কাঁধের দরকার। ...আমার মনে হয়েছে, এটাই সরে যাওয়ার সেরা সময়। আরও চার বছর কাজ চালানোর মতো রসদ আমার কাছে নেই।’ প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর কারণ হিসেবে তিনি যা বলেছেনÑ তা কোনো রাজনীতিবিদ কখনো বলেননি, হয়তো বলবেনও না। প্রধানমন্ত্রীর গুরুদায়িত্ব পালনে তার নিজের আর কিছু দেওয়ার নেই। বিশেষ আর কিছু দেওয়ার নেই ভেবেই তিনি ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ালেন! একজন সত্যিকারের নেতাকে, দেশনেতাকে জানতে হয় ও বুঝতে হয়Ñ কখন তার দেওয়ার আছে আর কিছু দেওয়ার সামর্থ্য নেই। তিনি বুঝেছেন, তার ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া উচিত। এটাই তার মহত্ত্ব। এখানেই তিনি গ্রেট।

জেসিন্ডা আরডার্নের কাছ থেকে আমাদেরও অনেক কিছু শেখার আছে। আমাদের রাজনীতিতে দয়াময় ঈশ্বর তুলে না নিলে কেউ স্বেচ্ছায় অবসর নেন না। পদ-পদবি-ক্ষমতার জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে সবাই প্রস্তুত থাকেন। অসুস্থ, ক্লান্ত, অবসন্ন, এমনকি মৃত্যু পথযাত্রীরাও আমাদের দেশে নেতৃত্বের আসনে বসে থাকেন। নতুনদের জন্য স্বেচ্ছায় জায়গা ছেড়ে দেওয়ার দৃষ্টান্ত আমাদের দেশে নেই বললেই চলে। জেসিন্ডা যখন নিজের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নিয়ে অকপটে তা উদারচিত্তে স্বীকার করে নিচ্ছেন, আমরা তখন ছোটখাটো পদ-পদবি পেয়েই হয়ে উঠছি স্বেচ্ছাচারী। আমাদের কাছে ক্ষমতা মানেই আমৃত্যু তা আঁকড়ে থাকার সাধনা!

প্রধানমন্ত্রী ও দলীয়প্রধান থাকাকালে জেসিন্ডা আরডার্নের মানবিক এবং রাজনৈতিক ভূমিকা, বিভিন্ন সময়ে রাখা তার বক্তব্য, সাজপোশাক, পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণাকালে সাংবাদিকদের কাছে প্রদত্ত বক্তব্যের প্রতিটি বাক্য, শব্দচয়ন ছিল কত মার্জিত ও হৃদয়গ্রাহী! আমরা জেসিন্ডাদের কাছ থেকে কি কিছুই শিখব না?

চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক

advertisement