advertisement
advertisement
advertisement

ট্রটসেনবার্গের অর্থনীতিকথা এবং ফুলবানুর পেটের ভুখ

মাহফুজুর রহমান
২৬ জানুয়ারি ২০২৩ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৬ জানুয়ারি ২০২৩ ০৯:৪৪ এএম
advertisement

বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের ৫০ বছর পূর্তি হয়েছে। এই উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অপারেশনস) অ্যাক্সেল ভ্যান ট্রটসেনবার্গ এসেছিলেন। সুন্দর অনুষ্ঠান হয়েছে। তিনি অনেক কথা বলেছেন। গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি যেভাবে এবং যে গতিতে এগিয়ে গেছে, তার প্রশংসা করেছেন। বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ থেকে অন্যতম দ্রুত প্রবৃদ্ধির দেশে পরিণত হওয়ার গল্প তিনি বলেছেন। তার কথায় স্পষ্টভাবেই উচ্চারিত হয়েছে, বাংলাদেশ হলো উন্নয়নের সেরা গল্প।

বিশ্ব অর্থনীতির উন্নয়নের প্রেসক্রিপশনদাতা একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান যখন এভাবে কথা বলেন, তখন আমাদের গৌরব হয়। আমার একা নয়; এই গৌরব আমাদের সবার, এমনকি নিভৃত গ্রামের ফুলবানুরও।

advertisement

ফুলবানু রিলিফের একটি কম্বল পেয়েছে। কম্বলটি গায়ে দিয়ে শরীরে বেশ ওম নিয়ে সে বিছানায় শুয়েছে। কিন্তু তার পেটে খিদে অনুভূত হচ্ছে। কিন্তু কেন? ফুলবানু কি আজ ভাত খায়নি? এ কথায় পরে আসছি।

advertisement 4

অ্যালেক্স ব্যস্ত মানুষ, অল্প সময়ের জন্যই বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি তার সংক্ষিপ্ত সময়ের ভ্রমণে আরও কিছু কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ এখন অকল্পনীয় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে আছে। বিশ্বে ঘটে যাওয়া বা বিদ্যমান তিনটি বিষয়কে তিনি এই চ্যালেঞ্জের পেছনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হচ্ছে কোভিড-১৯, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ। এ তিনটি বিষয়ের জন্য বাংলাদেশ দায়ী নয়। তাই বাংলাদেশ যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলতে পারবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি যেহেতু একবার এগোতে শিখেছে, সেহেতু এগোতেই থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশে দুর্নীতি হচ্ছে (বালিশকাণ্ড স্মরণ করা যেতে পারে), বাংলাদেশে ব্যাংক লুট হচ্ছে (হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ইত্যাদির সঙ্গে আবদুল হাই বাচ্চুকেও স্মরণযোগ্য), বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণে টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে (কানাডার বেগমপাড়া ও মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম উৎকৃষ্ট উদাহরণ)। এসব অপরাধের কথা এখন দেশের মানুষের মুখে মুখে প্রচারিত হচ্ছে। নির্বাচনের বছরে সরকারের দুর্বলতাগুলো অনেকেই বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে মহাসমারোহে প্রচার করে থাকেন। তবে এসব অপরাধ থামানো যাচ্ছে না কেন?

অ্যালেক্স অবশ্য বাংলাদেশের অর্থনীতির কেবল প্রশংসা করেই বসে থাকেননি। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হতে চায়। অ্যালেক্স বলেছেন, দেশকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে অনেক সংস্কার করতে হবে। সংস্কারের পরামর্শ বিশ্বব্যাংকের নতুন নয়। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে এর আগেও ব্যাংকিংসহ বহু খাতে ব্যাপক সংস্কার করেছে বাংলাদেশ। অ্যাক্সেলের বক্তব্য অনুসারে এ দেশে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হলে শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। রাজস্ব-জিডিপি বৃদ্ধি করতেও সংস্কার করতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন হলেই কেবল তা টেকসই হতে পারে। দেশের জনগণের একটা বড় অংশের জীবনের মান উন্নীত করতে না পারলে এই ধরনের উন্নয়ন চূড়ান্ত বিবেচনায় কাজে আসবে না। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেওয়ার জন্যও অ্যালেক্স তাগাদা দিয়েছেন।

এই তো আবার ফুলবানুর কথা চলে আসে। রিলিফের কম্বল গায়ে দিয়েও ফুলবানুর ঘুম আসছে না কেন? তার একান্তই ছোট সংসার। নিভৃত গ্রামে ছোট্ট কুটিরে বাস করে সে। ঘরের আশপাশে সামান্য একটু জায়গায় সবজি চাষ করেছে ফুলবানু। কয়েকটি হাঁস-মুরগি লালন-পালন করে সে। আশপাশের বাড়িতে মাঝে মধ্যে ফরমায়েশ খাটে। আয় অতি সামান্য। এই আয়ে কীভাবে চলে ফুলবানু? এ কথা সেও ভালো করে বলতে পারে না। তার পরও এতদিন চলেছে। এখন সব জিনিসের দাম হু হু করে বাড়ছে। কিন্তু ফুলবানুদের আয় বাড়ছে না। এই অবস্থাতেও বেঁচে থাকার কৌশল জানে ফুলবানু। আর তা হলো দিনে এক বা দুবেলা উপোস করা। ছোটকাল থেকে তো এ হাতিয়ার ব্যবহার করেই বেঁচে আছে সে। গত কয়েক বছর একটু ভালো চলেছিল। তিনবেলা পেট ভরে ভাত খেয়েছে ফুলবানুসহ দেশের গরিব মানুষ। এখন হয়তো আবার সেই পুরনো উপোস আমলে ফিরে যাবেন তারা।

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনটি বিষয়ের ওপর খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন। এগুলো হলো নারীর ক্ষমতায়ন, মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও জলবায়ু অভিযোজন।

অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধÑ বলেছেন অর্থমন্ত্রী। এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা প্রয়োজন উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা চেয়েছেন তিনি। আর বিশ্বব্যাংকের সহায়তা পেতে হলে তাদের দেওয়া সংস্কারের শর্ত মানতে হবেÑ এ কথা কে না জানে? তা হলে বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন হবে, হতে হবে। ফুলবানুরা ক্ষমতাবান হবে। ফুলবানু, তোমার খিদের কি কিছুটা উপশম হয়েছে? চুপ করে আছ কেন? একটা কিছু বলো।

পণ্যমূল্য বাড়ছে। বন্যার স্রোতের মতোই বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি হচ্ছে। কেবল বাংলাদেশেই নয়, সারাবিশ্বেই পণ্যমূল্য বাড়ছে। নীতি সুদহার বৃদ্ধি করার জন্যই নাকি এরূপ হচ্ছে। রপ্তানি বৃদ্ধি করতে হলে বৈদেশিক মুদ্রার দাম বৃদ্ধি করতে হয়। আমাদের দেশে ডলারের দাম বাড়ছে। ডলার তো পাওয়াই যাচ্ছে না। যারা আমদানি করেন, বিদেশে চিকিৎসা করান বা বিদেশে একটু-আধটু বেড়াতে যানÑ তাদের অনেক পেরেশানি হচ্ছে। ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশের টাকা তো আর বিদেশে চালানো যায় না!

দাম বাড়ছে। চালের দাম, নুনের দাম, তেলের দাম, আলুর দাম, কাপড়ের দাম, ... দাম। সামনে রমজান আসছে। পবিত্র মাহে রমজান। মুসলমানদের সিয়াম সাধনার মাস। এ দেশে শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমান। তারা রোজা রাখবেন। তাই সে সময় যাতে পণ্যমূল্য না বাড়ে, এ জন্য সরকার ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। রংপুরের কালেক্টরেট ক্রিকেট গার্ডেন কর্নারে মাসব্যাপী শিল্প ও বাণিজ্যমেলার উদ্বোধন শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্শি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেছেন, রমজানে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফুলবানুদের জন্য একটা বিরাট সুখবর। রমজান শুরু হওয়া পর্যন্ত কোনোমতে টিকে থাকতে পারলে অন্তত এক মাস নিশ্চিত থাকা যাবে। পণ্যমূল্য আর বাড়বে না। সে সময় বাজার নিয়ন্ত্রণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাঠে থাকবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

ইউক্রেনে যুদ্ধ থাকলে, বিশ্বের জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নীতি সুদহার বৃদ্ধি করলে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে, মূল্যস্ফীতি হবেÑ এটা সর্বজন স্বীকৃত। বাংলাদেশের ফুলবানুরা অবুঝ নয়। এটুকু তারা বুঝতে পারে এবং হাসিমুখে একবেলা-দুবেলা উপোস করার জন্য প্রস্তুত থাকে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ফুলবানু ও তাদের সন্তানরা এটা প্রমাণ করেছে। কিন্তু অনেক ভাগ্যবান মানুষের মুখ থাকবে বাংলাদেশে আর লেজ থাকবে কানাডায়, এ দেশের সম্পদ মহাসমারোহে বিদেশে পাচার করে স্ত্রী-সন্তানদের আয়েশি জীবনযাপনের সুযোগ করে দেবেÑ এটি জানতে পারলে ক্ষুধার্ত ফুলবানুদের একটু কষ্ট লাগে। দুই পকেটে দুদেশের পাসপোর্ট নিয়ে যারা ঘুরে বেড়ান, দুর্নীতি করে বা ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করে পাচার করেনÑ তাদের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান আরও শক্ত হওয়া দরকার। আমাদের সম্পদ যদি দেশেই থাকে, আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করেও আমাদের সব চাহিদা পূরণ না হয়Ñ তা হলে ফুলবানু ও আমরা সবাই মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মতোই সম্মিলিত কষ্ট করতে রাজি আছি। তবে চুরি করে টাকা উপার্জন করা অসৎ মানুষের চর্বির চাপে ঝুলে পড়া মুখচ্ছবি সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেয়।

দেশের মানুষের আজ প্রধান দাবি হচ্ছেÑ দুর্নীতি বন্ধ করুন, টাকা পাচার বন্ধ করুন। এ দুটি কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করা গেলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে সঠিক পথে দুর্বারগতিতে আগের মতোই এগিয়ে যাবে, এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেনÑ ‘বিশ্ব অর্থনীতির অবস্থা এখন ততটা খারাপ নয়, কয়েক মাস আগে যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির হার কমতে শুরু করেছে।’ তিনি বলেন, ‘তবে উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। অর্থনীতি আবার খারাপের দিকে ঘুরতে পারে।’

আমরাও অর্থনীতি, পণ্যমূল্য, টাকা পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ে আশা ও আশঙ্কার দ্বন্দ্বে আছি। নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী হয়তো কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে অর্থনীতিকে আবার সঠিক পথে আনবেনÑ এটিই আমাদের প্রত্যাশা। ফুলবানু, তুমি খিদে নিয়েই আরও কিছুদিন অপেক্ষা করো।

মাহফুজুর রহমান : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

advertisement