advertisement
Dr Shantu Kumar Ghosh
advertisement
Dr Shantu Kumar Ghosh
advertisement
advertisement

রাজশাহীর হাটে-ঘাটে আম উৎসব

আমজাদ হোসেন শিমুল রাজশাহী ও ডাবলু কুমার ঘোষ চাঁপাইনবাবগঞ্জ
১৬ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৬ মে ২০১৯ ০৯:১৫

বাহারি ফলের সমাহারে ভরপুর থাকে মধুমাস জ্যৈষ্ঠ। মাসের প্রথম দিনেই গতকাল বুধবার রাজশাহীতে গুটিজাতের আম নামানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে আমপাড়া উৎসব। দাম বেশি থাকায় আমচাষিদের মুখে ছিল সাফল্যের হাসি। তবে অধিক দামের কারণে আম কিনতে গিয়ে ফিরে গেছেন অনেকেই।

অন্যদিকে আমের জন্য বিখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিরা শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় ব্যস্ত। সপ্তাহ দু-এক পরই বাজারে উঠবে এ জেলার আম। তখন দামটা কমে আসবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজশাহীর পবা উপজেলার মথুরা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মধুমাসের প্রথম দিনেই বেশকিছু গাছ থেকে গুটি আম পাড়া হচ্ছে। এগুলো সবই প্রায় আগাম জাতের।

পরে প্লাস্টিকের ক্যারেটে করে সে আম তোলা হচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশাভ্যানে। এর পর নিয়ে যাওয়া হয় নির্দিষ্ট মোকামে। রাজশাহীর সবচেয়ে বড় আমের আড়ত বানেশ্বর বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, প্রথম দিন গুটিজাতের আম উঠেছে খুব অল্প পরিমাণে। তবে ক্রেতারা দাম শুনেই ফিরে যাচ্ছেন।

আমিনুল ইসলাম নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘রোজার মধ্যে আজ (গতকাল) রাজশাহীর আম ভাঙা শুরু হয়েছে ভেবে বানেশ্বরে কিনতে এলাম। কিন্তু এসে দেখি আমের দামে আগুন। প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। অথচ দুই-চারদিন পর এ আম বিক্রি হবে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজিতে।’ বানেশ্বর বাজারে আম বিক্রি করতে আসা চাষি নূরুল আমিন বলেন, ‘আমার বাগানের পাঁচটি গাছ থেকে গুটিজাতের আম পেড়ে বাজারে নিয়ে আসা হয়েছে। আমের দামও বেশ ভালো হওয়ায় আমি খুশি।’

তবে প্রথম দিন ক্রেতার সংখ্যা কম হলেও শেষ পর্যন্ত সব আমই বিক্রি হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। বাঘার আমচাষি নজরুল ইসলাম বলেন, ‘গাছের গুটিজাতের আম পরিপক্ব হওয়ায় মধুমাস জ্যৈষ্ঠের প্রথম দিনেই দুটি গাছের আম ভেঙে বাজারে নিয়ে এসেছি কেবল বাজার যাচাইয়ের জন্য। ১৪ মণ আম বেশ চড়া দামেই বিক্রি করেছি। তাই অনেক ভালো লাগছে।’

আমচাষি খন্দকার মিনারুল ইসলাম বলেন, ‘নির্ধারিত দিন থাকলেও আজ নয়, ২২ মের পর আমি গুটি আম পাড়ব। কারণ এর আগে আমার গাছের আমে পরিপক্বতা আসবে না। আর স্বাদও হবে অনেক কম। তাই অন্যরা ভাঙলেও আমি আজ আম পাড়িনি।’

রাজশাহী জেলা প্রশাসক (ডিসি) এসএম আবদুল কাদের বলেন, ‘আম ভাঙার বিষয়টি মনিটরিংয়ের জন্য সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা চেয়ারম্যান ও কৃষি কর্মকর্তাদের এরই মধ্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরু আজ (গতকাল)। রসালো ফলের সমারোহের বার্তা দেওয়া এ মধুমাসের শুরুতেই রাজশাহীর গাছ থেকে আম নেমেছে। প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময় অনুযায়ী বুধবার থেকে শুরু হয় আমপাড়ার উৎসব।’ জ্যৈষ্ঠের আগমন মানেই বাজারে রসালো ফল। আমের পাশাপাশি রাজশাহীর বাজারে দেশীয় বিভিন্ন ফল সৌরভ ছড়াচ্ছে। আম ও লিচু ছাড়াও এখন পাওয়া যাচ্ছে জাম, জামরুলসহ নানা প্রকারের দেশি ফল।

এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলার ৩১ হাজার ৮২০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন। এখন আম পরিপক্ব হওয়ার শেষ সময়, আর আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাগানগুলোয় থোকায় থোকায় ঝুলছে গোপালভোগ, বৃন্দাবনি, ক্ষীরসাপাত, বৌ-ভুলানি, রানী পছন্দ, দুধসর, ল্যাংড়া, মোহনভোগ, লক্ষণভোগ, আ¤্রপালি, ফজলি, সুরমা ফজলি, বারি-৪, গৌড়মতি, আশ্বিনাসহ বিভিন্ন জাতের সুস্বাদু সব আম। সপ্তাহ দু-এক পরই বাজারে উঠতে শুরু করবে মৌসুমি এ ফল।

রাসায়নিক দিয়ে আম পাকানো রোধে গত ৯ এপ্রিল উচ্চ আদালতের নির্দেশে জেলার বাগানগুলোয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকায় এবার ফল পাড়ার সময়সীমা বেঁধে না দেওয়ায় খুশি চাষিরা।

কানসাটের আমচাষি মো. তোহরুল ইসলাম জানান, চলতি বছর প্রায় শতভাগ গাছে মুকুল এলেও ফাল্গুন মাসে অনাকাক্সিক্ষত বৃষ্টিতে তা জ্বলে যায় এবং গুটি অবস্থায় ‘মিজ’ পোকার আক্রমণে উৎপাদনে প্রভাব পড়ে। ভোলাহাটের চাষি সোলাইমান আলী জানান, মৌসুমের শুরুতে শিলাবৃষ্টি, চলমান দাবদাহসহ বৈরী আবহাওয়ায় গেলবারের চেয়ে এবার জেলায় আমের উৎপাদন অনেকটাই কম। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি, লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া ও বাজারদর নিয়ে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন। তবে ঘূর্ণিঝড় ‘ফণীর’ বৃষ্টি প্রচ- দাবদাহ অবস্থা থেকে কিছুটা হলেও আমের জন্য উপকার বয়ে আনে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক ড. মো. সাইফুল আলম জানান, আর নতুন কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা না দিলে, সার্বিক উৎপাদনে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। রোজার পরই এবার আম বাজারজাত হওয়ায় এবার কৃষকরা ভালো দাম পাবেন। এ ছাড়া গত এক বছরে ২ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমচাষের আওতা বেড়েছে।

জেলা প্রশাসক এজেডএম নুরুল হক বলেন, ‘চলতি বছর উচ্চ আদালতের নির্দেশক্রমে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আম বাগানগুলোয় কঠোর নজরদারির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ কারণে ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে কেউ অপরিপক্ব আম পাকাতে এবং গুদামজাত করতে পারেনি। তাই এ বছর আম পাড়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে না। দেশবাসীকে আশস্ত করতে চাই, এবার ভোক্তারা বিষমুক্ত ও নিরাপদ আম খেতে পারবেন কোনো শঙ্কা ছাড়াই।’