advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

সামীম আফজাল কী করেননি

হাসান আল জাভেদ
২৩ জুন ২০১৯ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ জুন ২০১৯ ০৩:২১ পিএম
advertisement

কী করেননি সামীম মোহাম্মদ আফজাল? মহাপরিচালক হওয়ার পর ১০ বছরে পুরো ইসলামিক ফাউন্ডেশনে চালিয়েছেন তার ‘শাসন’। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ার পরও ভাগ্নে-ভাতিজা-শ্যালিকাসহ নিকটাত্মীয়দের নিয়োগ দেন।

দুর্নীতি, অনিয়ম ও বিনা কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহিষ্কার ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। যা চেয়েছেন, তা-ই করেছেন। মন্ত্রণালয় কিংবা ফাউন্ডেশনের কারও কথায় গুরুত্ব দেননি। এক সপ্তাহ ধরে এই সামীম মোহাম্মদ আফজালের অব্যাহতির দাবিতে উত্তপ্ত ইসলামিক ফাউন্ডেশন। সংস্থাটির ২৭ পরিচালকের মধ্যে ২০ জনই সামীম মোহাম্মদ আফজালের অব্যাহতি চেয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছেন।

ঢাকাসহ জেলা ও বিভাগীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্দোলনে। এরই মধ্যে ‘অসুস্থতা’ দেখিয়ে তিনদিনের ছুটিতে গিয়ে বৃহস্পতিবার সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে দেখা করে সম্মানজনক বিদায়ে সম্মত হয়েছেন ইফা ডিজি। তবে কেনাকাটা-নিয়োগবাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে ইফা সামীম মোহাম্মদ আফজালকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিয়োগ পান সামীম মোহাম্মদ আফজাল।

এর পর ভুয়া সনদ/লিখিত পরীক্ষায় কম মার্ক পাওয়া সত্ত্বেও নিয়োগ দেন ভাগ্নে-ভাতিজা-শ্যালিকাসহ ঘনিষ্ঠজনদের। এ ১০ বছরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে স্বজন ছাড়াও সিন্ডিকেট তৈরি করে লাগামহীন দুর্নীতি, অনিয়ম, বিনা কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহিষ্কার আর স্বেচ্ছাচারীর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ে দুটি অভিযোগ জমা পড়েছে। মন্ত্রণালয় ও দুদক এ বিষয়ে আলাদাভাবে তদন্ত শুরু করেছে।

এ বিষয়ে জানতে সামীম মোহাম্মদ আফজালকে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিবার কল করা হলেও যোগাযোগ করা যায়নি। তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি। ম্যাসেজ পাঠানো হলেও কোনো জবাব দেননি। তবে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আবদুল্লাহ বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ রয়েছে। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তদন্ত করবে। তদন্তের পর জানা যাবে অভিযোগের সত্যতা।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালে নিয়োগের পর ভাগ্নি ফাহমিদা বেগমকে সহকারী পরিচালক, সিরাজুম মুনীরাকে মহিলা কো-অর্ডিনেটর অফিসার, ভাগ্নে এহসানুল হককে বায়তুল মোকাররম মসজিদের পেশ ইমাম, ভাতিজা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে সহকারী পরিচালক, শাহ আলমকে উৎপাদক ব্যবস্থাপক, রেজোয়ানুল হককে প্রকাশনা কর্মকর্তা, মিসবাহ উদ্দিনকে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, শ্যালিকা ফারজিমা শরমীনকে আর্টিস্টসহ নিকটাত্মীয়দের বিভিন্ন পদে নিয়োগের অভিযোগ সামীম মোহাম্মদ আফজালের বিরুদ্ধে।

নাসির উদ্দিন শেখ নামে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে নির্ধারিত কোটায় নিয়োগ না দিয়ে প্রকাশনা কর্মকর্তা পদে তার ভাতিজা রেজোয়ানুল হককে এবং চারুকলার ভুয়া সনদে শ্যালিকা ফারজিমা শরমীনকে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে ইফা কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। কারণ ডিজির ভাগ্নি ফাহমিদা বেগম লিখিত পরীক্ষায় ৬০ নম্বরের মধ্যে ৩০ পেলেও মৌখিক পরীক্ষায় তাকে ২৮ নম্বরের মধ্যে ২৭ দিয়ে পাস দেখানো হয়।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এক নিয়োগে ১০টি পদে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার মধ্যে আত্মীয়স্বজনদের অবৈধভাবে নিয়োগের কারণে তৎকালীন ইফা সচিব ড. আলফাজ হোসেন ওই নিয়োগের রেজুলেশনে স্বাক্ষরই করেননি। এ জন্য ড. আলফাজ হোসেনকে ছুটি দেখিয়ে পরিচালক ড. তাহের হোসেনকে সচিবের দায়িত্ব দিয়ে ওইসব নিয়োগ চূড়ান্ত করেন ইফা ডিজি। ডিজির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে বলা হয়, গত ১০ বছরে ইফায় ৬ শতাধিক কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। এ সময়ে নিয়োগে আর্থিক লেনদেন, স্বজনপ্রীতি, নিময়নীতি তোয়াক্কা না করেই দৈনিক ভিত্তিতে আড়াইশ কর্মচারী নিয়োগ দেন তিনি।

গত দেড় বছর আগে মসজিদভিত্তিক শিশু, গণশিক্ষায় কওমি ও আলিয়া নেসাবের ২০২০ জন শিক্ষক নিয়োগকালে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে তৎকালীন প্রকল্পপ্রধান জোবায়ের আহমেদ ক্ষুব্ধ হন। এ নিয়ে তৎকালীন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তখনকার সচিব মো. আবদুল জলিলের সঙ্গে ডিজির দ্বন্দ্ব হয়। যে কারণে ইবতেদায়ী পর্যায়ে নিয়োগ এখনো আটকে আছে। দুদক ও মন্ত্রণালয়ে আসা অভিযোগে বলা হয়, ইফা ডিজি সামীম মোহাম্মদ আফজাল নারিন্দার মশুরীখোলা দরবারের পীর শাহ মোহাম্মদ আহছানুজ্জামানের মুরিদ।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনে ‘বোগদাদী কায়দা’ আমপাড়া নামে যুগ যুগ ধরে পুস্তক ছাপা হলেও লেখক হিসেবে নতুন করে পীরের নাম বসিয়ে দেন ডিজি। এ জন্য পীরকে ১৪ লাখ টাকা রয়ালিটি দেওয়া হয়। ডিজি নিজেও ইফার প্রকাশনায় ২৫টি পুস্তক লিখে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এসব পুস্তক ইসলামিক ফাউন্ডেশেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ও সারাদেশে থাকা ইফা পরিচালিত পাঠাগারে কেনা বাধ্যতামূলক করেছেন। আবার ইফার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর প্রেসে বই ছাপিয়ে তাকে ৭০ লাখ টাকা আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়।

অভিযোগে বলা হয়, সামীম মোহাম্মদ আফজালের হিসেবে পরিচিত জালাল আহমেদকে সংস্থাটির তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ উপসচিবের পদে ৮ বছর রাখা হয়। ডিজির পর তিনিই একমাত্র কর্মকর্তা, যিনি একই পদে এত বছর থাকছেন। জালাল আহমেদ ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির পরিচালকের দায়িত্ব পেলেও তাকে একই পদে রাখা হয়। ডিজির দুর্নীতির সহায়ক হিসেবে পরিচিত পরিচালক হারুনুর রশিদ, তাহের হোসেন, সাহাবউদ্দিন খান ও হালিম হোসেন খান।

হারুনুর রশিদ ও তাহের হোসেন যথাক্রমে ২০১২ ও ২০১৩ সালের অবসরগ্রহণ করলেও ২০১৮ সাল পর্যন্ত তারা অফিস করে বদলিবাণিজ্যে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন সভায় এ সময়ে অংশ নিয়ে সম্মানী পেয়েছেন। অবসরগ্রহণের পর তারা সরকারি গাড়ি, চালক ও জ্বালানি ব্যবহার করেছেন। মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষায় ফিল্ড সুপারভাইজার নিয়োগে ডিজির ঘনিষ্ঠজন এবিএম শফিকুল ইসলাম ও মজিব উল্লাহ ফরহাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে সারাদেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ইফার অর্থায়নে ৫৬০ মডেল মসজিদ নির্মিত হচ্ছে। এসব মসজিদের জন্য সাইনবোর্ড তৈরি করা হয়। প্রতিটি সাইনবোর্ডের ব্যয় ধরা হয় ১ লাখ ১৪ হাজার টাকা। সারাদেশের জেলা অফিসারদের নির্দেশনা দিয়ে ঢাকা থেকে ডিজির স্ত্রীর বড় ভাই মনার মাধ্যমে কাজগুলো করানো হয়।

সূত্র বলছে, ২০১০ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রেসের মেশিন ক্রয়ে ১ কোটি ৭৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হলেও মেশিন কেনা হয় ৪৫ লাখ টাকায়। কাগজপত্রে প্রেসের মেশিনটিকে হাইডেলবার্গ জার্মানির দেখানো হলেও মূলত এটি চীনের তৈরি।

advertisement
advertisement