advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা কক্সবাজারে

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৩ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০১৯ ০০:২৫
advertisement

সরকার পর্যটন নগরী কক্সবাজারে ১৭টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প করতে যাচ্ছে। এসব বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজারে বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে আসবে। এখান থেকে যে দূষিত পদার্থ বের হবে, তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে। গতকাল শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এমন আশঙ্কার কথা বলেন।

বক্তারা বলেন, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের ২৫ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ১৭ হাজার ৯৪৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম ১৭টি প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথা বলা হচ্ছে। মানুষ, পারিপার্শ্বিক জীববৈচিত্র্য, সামুদ্রিক অভয়ারণ্য, পাহাড়ি বনাঞ্চল, ভূ-প্রকৃতি, সমুদ্রসৈকত এবং বিস্তৃত কৃষিজমির জন্য এটি হবে হুমকিস্বরূপ। পর্যটন নগরী কক্সবাজারের মূল শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে উল্লিখিত পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতাসম্পন্ন সবকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থান।

পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১০ বছরে যদি সব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয় তবে ৪০ বছরের স্থায়িত্বকালে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র যে দূষণ ছড়াবে তাতে এই অঞ্চলের বাসিন্দা ও প্রাণিকুল চরম বিপদাপন্ন হয়ে পড়বে এবং বন ও সমুদ্রের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য অপূরণীয় স্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

পরিকল্পিত ১৭টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে আনুমানিক ৭২ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড, কয়েক হাজার টন কয়লাজাত ছাই, বিষাক্ত পারদ, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড ইত্যাদি নির্গত হওয়ার পাশাপাশি অন্য ধাতব ও রাসায়নিক দূষণ ঘটবে। এর ফলে এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে। দূষণের কারণে দেশের প্রধান পর্যটন অঞ্চল কক্সবাজারের অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে পড়বে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, তথ্যানুসন্ধানী একটি দল পর্যায়ক্রমে ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল, ২০১৮ সালের ১৪ আগস্ট এবং ২০১৯ সালের ৩ এপ্রিল কক্সবাজার, সোনাদিয়া, মহেশখালী, মাতারবাড়ি, পেকুয়া এবং বাঁশখালী অঞ্চল পরিদর্শন করে। তথ্য অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তথ্যানুসন্ধানী দলের সদস্যরা স্থানীয় বাসিন্দা ও সুশীল সমাজের নেতাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন। তারা বিভিন্ন সময়ে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রস্থল, বৃহৎ আকারের শিল্প ও স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন। এই দল প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্তচিত্র, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও তথ্য, সরকারি প্রতিবেদন যার মধ্যে রয়েছে অতিসম্প্রতি সংশোধিত পিএসএমপি ২০১৬, একটি পরিবেশগত প্রভাবমূল্যায়ন এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ উৎস থেকে প্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণ করেছে।

এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে গবেষণা চালানোর পর দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের উদ্বেগ প্রকাশের জন্য আজকের এই সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করছি।

বক্তারা বলেন, সিংহভাগ বিদেশি অর্থায়নে বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারে বিশ্বের সর্ববৃহৎ কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনায় ইতোপূর্বে প্রকাশ করা হয়নি এমন তথ্য উঠে এসেছে গবেষণায়। এই গবেষণার প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে জমি অধিগ্রহণ এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বন্দর নির্মাণের কারণে পরিবেশের কী ভয়াবহ বিপর্যয় সাধিত হবে এবং এ জন্য কতটা চড়ামূল্য দিতে হবে সেই তথ্য উদঘাটন ও প্রকাশ করা।

গবেষণা থেকে যেসব তথ্য জানা গেছে, কয়লাভিত্তিক ১৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ১১টি বড় পাবলিক পার্ক, বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য, জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং সংরক্ষিত সমুদ্র এলাকা। ১৩টিই স্থাপন করা হবে বন্যাপ্রবণ মাতারবাড়ি ও মহেশখালী দ্বীপের ১০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে। মহেশখালী দ্বীপে ৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা এই দ্বীপকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প-গুচ্ছে পরিণত করবে।

২০৩১ সাল নাগাদ কক্সবাজারের বিদ্যুৎকেন্দ্র্রগুলো থেকে প্রতিবছর ৭২ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবেÑ যা আলবেনিয়া, আর্মেনিয়া, ভুটান, কম্বোডিয়া, কঙ্গো, লাওস, মিয়ানমার, নেপাল, সেনেগাল এবং জাম্বিয়া এই ১০টি দেশে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইডের মোট পরিমাণের চেয়েও বেশি। জাপানের অর্থায়নে মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বন্দরের নির্মাণ কার্যক্রম ও জমি অধিগ্রহণের ফলে গত ৫ বছরে স্থানীয় বাসিন্দা, স্থানীয় অর্থনীতি এবং পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। কোহেলিয়া নদী মৃত প্রায় এবং ভাটার সময় লবণ ও মাছ পরিবাহী নৌযানগুলো উপকূল এলাকা থেকে মূল ভূমিতে যেতে পারে না। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের অন্যান্য কাজের দরুণ সৃষ্ট সংঘাতে মানুষকে অনেক দুর্গতি পোহাতে হয়েছে।

নতুন তথ্য, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় ঝড়, সাইক্লোন, বন্যা এবং ভূমিক্ষয়ের আশঙ্কা এখন আগের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি। উপকূলীয় নিম্নাঞ্চল এবং কক্সবাজারের যেসব দ্বীপে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে সেসব স্থান অত্যন্ত উষ্ণ এলাকায় পরিণত হবে এবং মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হবে।

অনন্য পর্যটনকেন্দ্র, মৎস্য শিকার, চিংড়ি ও লবণ উৎপাদনের সক্ষমতার জন্য কক্সবাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। অত্যন্ত উচ্চমানের এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের ওপর ২ লাখ ৪৭ হাজার মানুষের, যাদের ওপর আরও ১২ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ নির্ভরশীল, কর্মসংস্থান নির্ভর করে। এরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

advertisement