advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

মা পৃথিবীতে নাই তুলনা...

ফয়সাল আহমেদ ও তারেক আনন্দ
৯ মে ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ৯ মে ২০২১ ০০:৪৩
advertisement

‘ওগো মা, তুমি শুধুই মা, পৃথিবীতে নাই তুলনা’। কথাগুলো সবাই বিনা বাক্যে মেনে নেবেন। মায়ের কোনো তুলনা নেই। সাবিনা ইয়াসমিন ও খালিদ হাসান মিলুর গাওয়া এই গানের কথা লিখেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সংগীত করেছেন আনোয়ার পারভেজ। আজিজুর রহমান পরিচালিত, প্রযোজিত ‘দিল’ ছবিতে গানটি ব্যবহৃত হয়েছে। এতে অভিনয় করেছিলেন শবনম, মিমি ও নাঈম। আজ বিশ্ব মা দিবস। যদিও মায়ের কোনো দিবস নেই। তার পরও এই দিনটিকে পালন করা হয়। মাকে নিয়ে আলোচিত পাঁচ গান ও চলচ্চিত্র নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন। লিখেছেন- ফয়সাল আহমেদ ও তারেক আনন্দ

 

পাঁচ গান

 

মাগো মা

বাংলা সিনেমার সাদাকালো যুগের গান এটি। নায়করাজ রাজ্জাক ঠোঁট মিলিয়ে গেয়েছেন ‘মাগো মা ওগো মা, আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা’ গানটিতে। খুরশিদ আলমের গাওয়া এই গানের গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার। সুর করেছিলেন সত্য সাহা। গানটি স্থান পেয়েছিল নির্মাতা দিলীপ বিশ্বাসের ‘সমাধি’ সিনেমায়।

 

এমন একটা মা দে না

১৯৭৪ সালে ফেরদৌস ওয়াহিদ কলেজে পড়েন। প্রয়াত শিল্পী ফিরোজ সাঁই ওয়াহিদকে একদিন ডেকে বললেন, একটা গান গাইতে হবে। গানটি লিখেছেন ও সুর করেছেন ডা. নাসির আহমেদ। গানটা শোনেন তিনি। খুবই পছন্দ হলো। ফিরোজ সাঁই বললেন, ‘গানটি তোমার গলায় খুব মানাবে। আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, তুমি শুধু টাকা জোগাড় করো।’ গানটি রেকর্ড করতে মোট খরচ হবে ৩৩০ টাকা। এত টাকা আমার কাছে নেই, জানান ফেরদৌস ওয়াহিদ। এর পর অবশ্য এগিয়ে আসেন ফেরদৌস ওয়াহিদের চার বন্ধু সাইফ, রুমী, শামীম ও এনায়েতুল্লাহ। নিজেদের টিফিনের টাকায় কাকরাইলের ইপসা রেকর্ডিং স্টুডিওতে গানটি রেকর্ড হয়। ১৯৭৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর বিটিভির বিশেষ সংগীতানুষ্ঠানে গানটি প্রচারিত হয়।

 

মায়ের একধার দুধের দাম

মাকে নিয়ে এ পর্যন্ত যত গান হয়েছে তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ গান ধরা যেতে পারে ফকির আলমগীরের এ গানটিকে। গানটি প্রসঙ্গে ফকির আলমগীর বলেন, একবার তিনি মাকে নিয়ে ফরিদপুরে যাচ্ছেন। আরিচাঘাটে যাওয়ার পথে অন্ধ এক বাউলের সঙ্গে দেখা হয়। দোতারা বাজিয়ে দেহতত্ত্বের গান গাইছেন। গানটা শুনেই তার কানে লেগে যায়। সঙ্গে সঙ্গে রেকর্ডার বের করে গানটা ধারণ করে নেন। পরে গানটি বিটিভির একটি অনুষ্ঠানে নিজের মতো তৈরি করে গেয়ে শোনান। এটি ১৯৭৭ সালের কথা। নব্বইয়ের দশকে অজিত রায় বিটিভির জন্য গানটি আবার রেকর্ড করান। এ গানটিই ফকির আলমগীরের ‘সখিনা-২’ অ্যালবামে সংযোজন করা হয়। এর পর গানটি আরও দুবার রেকর্ড হয়েছে। আলাউদ্দিন আলীর সংগীতায়োজনে ‘অবরোধ’ চলচ্চিত্রের জন্য এবং ফরিদ আহমেদের সংগীতায়োজনে দ্বিতীয়বার। আমার ‘সখীপুরের সখিনা’ অ্যালবামে গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়।

 

মা

এই গান আমাদের সংগীতে একটি ইতিহাস। ১৯৯৭ সালে প্রিন্স মাহমুদের মা মারা যান। চারদিকে কেবল মাকে খুঁজে বেড়াতেন তিনি। এ রকম একটা মানসিক কষ্টের ভেতরই ‘মা’ গানটি লিখেছেন। গানটি সুর করতেও খুব বেশি সময় লাগেনি। গেয়েছিলেন জেমস। তার মাও বেঁচে নেই। তাই মায়ের জন্য দুজনই নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন এই গানে। প্রয়াত শব্দ প্রকৌশলী মবিন রেকর্ডিংয়ের সময় জেমসের কণ্ঠে গানটি শুনে বলেছিলেন, এই গান মানুষের ভালো না লেগে পারে না।’ ১৯৯৯ সালে ‘এখনো দুচোখে বন্যা’ মিশ্র অ্যালবামে গানটি প্রকাশ হয়। এর পর সৃষ্টি হয় ইতিহাস। সবার মুখে মুখে ‘১০ মাস ১০ দিন ধরে গর্ভেধারণ’ কথার গানটি।

 

আম্মাজান

‘আম্মাজান আম্মাজান’ গানটি শোনেননি এবং পছন্দ হয়নি এমন মানুষ খুবই কম। এই গান যে একবার শুনেছেন সে কখনো ভুলবেন না। এই গান হৃদয়ের তৃষ্ণা মেটায়। ১৯৯৯ সালে গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল ‘আম্মাজান’ চলচ্চিত্রে। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে গানটি গেয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। এতে ঠোঁট মিলিয়েছেন মান্না।

 

 

পাঁচ সিনেমা

 

মরণের পরে

সাগর ও সাথী ভালোবেসে বিয়ে করেন। ঘরে আসে ৬টি সন্তান। মধ্যবিত্তের সংসারে বেশ ভালোই কাটছিল তাদের। হঠাৎ আসে দুর্যোগ। এক দুর্ঘটনায় হাত হারান সাগর। অন্যদিকে ক্যানসারে আক্রান্ত হন সাথী। দুজনেই সিদ্ধান্ত নেন সন্তানদের দত্তক দেওয়ার। একে একে সব সন্তান তাদের নতুন বাবা-মায়ের কাছে চলে যায়। সন্তানদের সঙ্গে বিচ্ছেদের কষ্টে সাথী মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকে। একদিন স্বপ্নে দেখে সন্তানরা আবার তার কাছে ফিরে এসেছে। এমনই হৃদয়গ্রাহী গল্প নিয়ে আজহারুল ইসলাম নির্মাণ করেন ‘মরণের পরে’। মূল ভূমিকায় শাবানার অভিনয় দর্শকদের আজও চোখে জল আনে। যোগ্য সঙ্গ দিয়েছিলেন আলমগীর। দুজনেই অনবদ্য অভিনয়ে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন।

 

হাঙর নদী গ্রেনেড

কিশোরী বয়সেই কিছুটা বয়স্ক স্বামীর সঙ্গে বিয়ে হয় বুড়ির, স্বামীর আগের সংসারে রয়েছে দুটি সন্তান, নিজের গর্ভেও আসে সন্তান, তবে সে বাকপ্রতিবন্ধী। স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর দুঃখ ভুলে সব সন্তানকেই তিনি মাতৃস্নেহে বড় করেন। একদিন শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, বড় ছেলে যুদ্ধে যায়, আরেক সন্তানকে চোখের সামনে পাকিস্তানিরা মেরে ফেলে। একদিন দুই মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচানোর জন্য নিজের প্রতিবন্ধী সন্তানকে তুলে দেন মিলিটারিদের হাতে। এ যেন এক মায়ের বীরত্বগাথা। সেলিনা হোসেনের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’। প্রধান ভূমিকায় সুচরিতা। অর্জন করেন নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

 

আম্মাজান

‘মা’কেন্দ্রিক সিনেমাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র কাজী হায়াতের ছবি ‘আম্মাজান’। নিজের সম্ভ্রমহানির পর মা হতবিহ্বল হয়ে যান, ছেলে বাদশা এই কষ্ট সইতে পারে না। মাকে সে নানা উপায়ে সুখী করতে চায়, একদিন মায়ের আবদারে বিয়ে করে। তার পর ঘটতে থাকে নানা ঘটনা, জড়িয়ে পড়েন বিবাদে। এই ছবিতে একজন মাতৃপাগল সন্তানের কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। নাম ভূমিকায় ছিলেন শবনম, আর সন্তান চরিত্রে প্রয়াত নায়ক মান্নার অভিনয় ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সম্পদ। দর্শকদের কাছে তিনি অন্তত এই ছবির জন্য অমর হয়ে থাকবেন।

 

উত্তর ফালগুনী

শ্রেণি বৈষম্য এবং উত্তর ফালগুনী সংগ্রামের এক করুণ চলচ্চিত্র হিসেবেই নির্মাতা অসিত রায় বানিয়েছিলেন তার সিনেমাটি। নিজের ক্যারিয়ারের সবচাইতে চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে এই সিনেমাতেই অভিনয় করেছিলেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। দ্বৈত চরিত্রে ওই সিনেমায় তিনি ছিলেন একজন মা, আবার একই সঙ্গে সেই সন্তানও। দারিদ্র্য নিপীড়নের হাত থেকে শুধু মেয়ের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন মদ্যপ স্বামীর আশ্রয় থেকে। হয়ে যান পরপুরুষের বিনোদনের খোরাক এক বাঈজি। শুধু মেয়ে সুপর্ণার ভরণপোষণ করার চিন্তা করেই দেবযানি কাজ করেন পান্নাবাই নামে এক বাঈজি হিসেবে। ষাটের দশকের কলকাতার প্রেক্ষাপটে এমন এক গল্প সাড়া ফেলে দিয়েছিল সর্বত্র। ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা বাংলা সিনেমার সাফল্য অর্জন করেছিল ১৯৬৩ সালে নির্মিত এই সিনেমা। পরে তিন বছর পর অসিত রায় হিন্দিতে সিনেমাটি পুনর্নির্মাণ করেন ‘মামতা’ নামে, সেখানেও অভিনয় করেছিলেন সুচিত্রা। মাতৃত্বের সংগ্রামের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে এই সিনেমাটি এখনো অনবদ্য।

 

হাজার চৌরাশি কা মা

চারু মজুমদারের ইশতেহারের ডাকে নকশালবাড়ি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল অসংখ্য শিক্ষিত তরুণ। কলকাতায় তখন সময়টা সত্তরের দশক। অন্য অনেক তরুণের মতো কলেজপড়ুয়া ব্রতীও গিয়েছিল সে আন্দোলনে। কিন্তু বাড়িতে খবর এলো, সে ফিরেছে লাশ হয়ে। লেখাপড়ায় ভালো, আদরের সন্তান ব্রতী নয় বরং হাজার চুরাশি নম্বর লাশের দায়িত্ব বুঝে নিতে বলা হয় তার মা সুজাতাকে। নকশালবাড়ি আন্দোলনে ছেলে হারানো এক মায়ের মর্মস্পর্শী এই গল্প লিখেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী, তার ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসে। সেই গল্প থেকেই ভারতে ১৯৯৮ সালে নির্মিত হয় ‘হাজার চৌরাশি কা মা’। প্রায় ১৮ বছর পর সেলুলয়েডে ফিরে শোকাহত সেই মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন জয়া বচ্চন। কলকাতায় ষাট থেকে আশির দশকের মধ্যে বামপন্থি নকশালদের আন্দোলনে পুলিশি অত্যাচার এবং গুলিবর্ষণে নিহত হয়েছিল এ রকম অসংখ্য তরুণ। গোভিন্দ নিহালানি নির্মিত ‘হাজার চৌরাশি কা মা’ পেয়েছিল সেরা ভারতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

advertisement