advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

আঁকাবাঁকা নদীর পাশে

ফারুখ আহমেদ
১২ মে ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১১ মে ২০২১ ২১:৪৭
advertisement

নদীর ভয়ঙ্কর রূপ বোঝা যায় ভাদ্র মাসে। সে সময় নদীর ভাঙন বেশি। শীত ও বর্ষা মৌসুম না থাকলে সত্যিকার অর্থে নদীকে বোঝা কঠিন হতো। শীত চলে গিয়ে বসন্ত চলছে। নদীর অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বর্ষা এলে নদী তার রূপ ফিরে পাবে। সেই অপেক্ষায় বসে না থেকে নদীর বর্তমান দেখতে এক সপ্তাহের মধ্যে সোমেশ্বরী থেকে জাদুকাটা ঘুরে এসেছি। তার আগে রেজু নদী ঘুরে তাকে নিয়ে একটা লেখাও লিখেছিলাম। আমার বাড়ির গা-ঘেঁষে চলা বুড়িগঙ্গায় তো প্রায় প্রতিদিনই যাচ্ছি। আমাদের একটা দল রয়েছে নদীযাত্রিক। তরুণ দল। সবাই নদীর জন্য ভাবে। নদীর জন্য কিছু করতে পারলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে। আসলে আমরা শিশুকাল থেকে নদীর কাছাকাছি। নদী নিয়ে অনেক স্মৃতি আমাদের। সে জন্য নদীর বর্তমান অবস্থায় কষ্টটাও বেশি আমাদের। একদিন নদীযাত্রিক ফেসবুক গ্রুপে লৌহজং নদীর একটা ছবি দেখলাম। কুচকুচে কালো পানির নদী নয়। ছবিতে নদী বোঝাই যায় না। না লিখে দিলে যে কেউ তাকে সরু ধানক্ষেত ভেবে নিত। এমন দৃশ্যে মনটা বিষণœতায় ছেয়ে যায়। সেই বিষণœতা থেকেই এক সকালে চলে গেলাম মির্জাপুর। বুড়িগঙ্গায় ভেসে লৌহজং যেতে পারলে সুখ পেতাম। সে ব্যবস্থা ও অবস্থা না থাকায় গুলিস্তান থেকে বাসে উঠে চন্দ্রা নেমে আরেক বাসে মির্জাপুর গিয়ে নামলাম। তার পর ১০ টাকার রিকশায় কুমুদিনী হাসপাতালের পাশ দিয়ে চলে এলাম লৌহজংয়ের তীরে। দৃশ্যটা মনোরম বা মনকাড়া নয়। প্রথম দেখায় শহরের ভেতর সরু খালই মনে হবে। কিন্তু এটা একটা নদী। এরই নাম একসময়কার খরস্রোতা লৌহজং। একটা বাঁশের সাঁকো পারাপারের জন্য নদীর ওপর। নিচে স্থির হাঁটুসমান লৌহজং। সেই কুচকুচে কালো পানিতে একটা নৌকা ডুবে আছে!

লৌহজং নদীর উৎস ধলেশ্বরী নদী। মোহনা বংশী বা বংশাই নদী। মোট ৮৫ কিলোমিটার লৌহজংয়ের জলপথ। নদীর যে অবস্থা, তাতে নৌকায় লৌহজং পুরোটা ঘুরে আসা সম্ভব না। দুই বছর আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী পথকেই বেছে নিলাম। হেঁটে হেঁটে নদী দেখব। কিন্তু ৮৫ কিলোমিটার না। সন্ধ্যার আগে পর্যন্ত যতটুকু পথ চলা যায়। কুমুদিনীর পাশ দিয়ে লৌহজংয়ের পাড় ধরে হাঁটা শুরু করলাম। আশ্চর্য হলেও সত্য, এখানে নদীপথে কোনো নৌকা চলাচল নেই। হাঁটছি, ছবি তুলছি আর ভাবছি সঙ্গী হিসেবে কাউকে পেলে মন্দ হতো না। হুট করে যেহেতু চলে এসেছি, সেহেতু কাউকে যোগদান করতে বলতে পারছি না, সে এখন সম্ভবও না। ২০ মিনিট হেঁটে পুষ্টকামরি এসে একটু চাঙ্গা হলাম। চাঙ্গা হওয়ার কারণ কীর্তন। বাংলা সংগীতের আদিধারা। কাছেই কোথাও কীর্তন হচ্ছে। ইতোমধ্যে পরিচয় হয়েছে দীলিপ রাজবংশীর সঙ্গে। তার কাছেই জানলাম পালবাড়ির কীর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস। তার পর কথা হয় লৌহজং নিয়ে। তারা রাজবংশী। কষ্টটা বেশি তাদের। নদীর আয়-উপার্জন নেই। সংসার চলে না। দীলিপ আমাকে প্রশ্ন করেন, এটাকে কি নদী বলে দাদা?’ ‘নদী মরে গিয়ে নৌকা চালানোর জায়গা বন্ধ করেছে, বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। দীলিপ রাজবংশী নদীর ওপারের আন্ধরা মাঝিপাড়ার বাসিন্দা। মাঝিপাড়ার সহজ মানে। গ্রামটিতে মাঝিদের বসবাস। পুষ্টকামরি থেকে আন্ধরার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে ছোট্ট একটা কোসা নৌকা। এখানে পানি কোমর পর্যন্ত। দীলিপদা ওপার আন্ধরায় যাবেন। আমি তার সঙ্গে নৌকায় উঠে আন্ধরা গিয়ে আবার ফেরত আসি পুষ্টকামরি। তার পর হণ্টন। হাঁটতে হাঁটতে দেখা হয় যমুনা রাজবংশীর সঙ্গে। নাম বলবেন না, কথা বলবেন না। কী একটা অবস্থা। পরে তো হড়হড় করে অনেক কিছু বললেন। তার আগে লম্বা ঘোমটা টেনে নিলেন। ‘আমি যেখানে খাড়ায়া আছি এই জায়গায় নদী আছিল। ওই যে নদী দেখতাছেন। নদীটা এইখানে ছিল না। ছিল আরও পিছনে। এই যে দার পরে। দারে মাটি আহে। এইভাবে নদী বইরা গেছে। ওই পার ভাঙছে এই পার বরছে। বিয়ার পর থেকাই এমন দেখতাছি।’ বলেই তিনি হাঁটা শুরু করেন। আমিও সামনে হাঁটি, পেছনে শিশুর দল। নয়ন রাজবংশী আমার ক্যামেরার ব্যাগটা নিয়ে আমাকে একটু হালকা করে। আমরা ব্রিজ পার হয়ে নদীর পাশ দিয়ে আরও সামনে এগিয়ে যাই। পেছনে পড়ে থাকে শিশুর দল আর পুষ্টকামরি। নয়ন আমার সঙ্গে থেকে যায়। এবার দুজন হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ করি একটু পর পরই নদীর ওপর বাঁধ। ছোট ছোট নালা। ময়লার স্তূপ। এসব কারণে কখনো কখনো আমাদের নদীর পাড় ছেড়ে মূল রাস্তায় উঠে আবার নদীর পাড়ে আসতে হচ্ছে। এসব প্রতিবন্ধকতার পর ছোট্ট চায়ের স্টল পেয়ে একটু থামি। চা পান করতে করতে কথা হয় শিক্ষক রমজান শেখের সঙ্গে। টাঙ্গাইলের প্রাণ এই লৌহজং নদী। একসময় সব ধরনের পণ্য আনা-নেওয়া নদীপথেই হতো। ঢাকাসহ সারা দেশের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল লৌহজং নদী। এখন নদী নেই। খালও বলা যাবে না। ভাই এটা এখন নালা। অথচ লঞ্চ-স্টিমারও নাকি আসত এই নদীতে, বলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব শিক্ষক। রমজান শেখের বুকভরা অনেক কথা। বুঝতে পারি অনেক কথা বলতে চান রমজান শেখ। কিন্তু আমার তো বসে থাকার উপায় নেই। রমজান শেখকে বিদায় বলে সামনে এগোই। দেখি সামান্য একটা উঁচু জায়গায় বসে দুজন শৌখিন মাছ শিকারি লৌহজংয়ের জলে ছিপ ফেলে ফাতনা টানের অপেক্ষায়। কাছে যাই, দেখি একজন দুটি বোয়াল ধরেছেন। আরেকজনের ডুলি শূন্য। একজন তৌফিক হোসেন, আরেকজন আমির হোসেন। দুজনের মাছ ধরার বয়স প্রায় দুই বছর। একসঙ্গেই মাছ ধরেন। মাছ যেই ধরুক, পরে দুজন ভাগ করে নেন। এত সব কথা দুজনের সঙ্গে গল্পে গল্পে জানতে পারি। বেড়া দিয়ে বেশিরভাগ জায়গা বা নদীর কুম আটকে দেওয়া হয়েছে। যারা আটকে দিয়েছেন তাদের অনেক শক্তি। আমরা কিছু বলতে পারি না। কোথাও কোথাও নদীতে মাটি ফেলে রাস্তা বানানো হয়েছে। ব্রিজ না। লৌহজং একটি আঁকাবাঁকা নদী। ৮৫ কিলোমিটার পথ একদিনে হাঁটা সম্ভব না। আজ অল্প একটু হেঁটে গেলাম। এর পর নদীযাত্রিককে সঙ্গে নিয়ে আসব।

advertisement