advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

দ্বন্দ্ব-সংঘাত রোধে দরকার সামাজিক বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ

মো. খোবাইর হোসেন
১০ জুন ২০২১ ২০:৩৫ | আপডেট: ১০ জুন ২০২১ ২০:৩৫
advertisement

দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুরোধে রাষ্ট্রীয় তৎপরতা থাকলেও দ্বন্দ্ব নিরসনে ব্যক্তি পর্যায়ে সামাজিক বুদ্ধিমত্তার (সোস্যাল ইন্টিলিজেন্স) ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।  সম্প্রতি আমার সহপাঠী সোহেল রানা জমিজমা সংক্রান্ত কলহের জের ধরে দুর্বৃত্তদের হাতে নির্মমভাবে খুন হয়। সোহেল রানা ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক। মৃত্যুর সময় সে বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী ও ছোট দুই সন্তান রেখে গেছে। আমাদের সমাজে সংঘাতের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি একটি ছোটখাটো ঘটনা। তবে আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই জাতীয় ঘটনা অহরহ ঘটছে, সেদিক থেকে এটি একটি গুরুতর বিষয়।

আমাদের বিবর্তিত এই সমাজে সম্পত্তির বণ্টন ও মালিকানা হস্তান্তর ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় আইন ও নীতিমালা থাকলেও ব্যক্তির সামাজিক বুদ্ধিমত্তার অভাবে সম্পদ বন্টন সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব ও সংঘাত কমানো সম্ভব হচ্ছে না। পেশির জোর বা টাকার জোর খাটিয়ে সম্পত্তি নিজের আওতায় নিয়ে আসার ধারণা ও বাস্তবতা আমাদের সমাজে বিরাজিত আছে। কিন্তু এই ধারণা যে শাশ্বত নয়-এটি আজও সঠিকভাবে বিবেচিত হয়নি এবং এ বিষয়ে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার সুযোগ রয়েছে।

ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের সমাজে পারিবারিক সম্পদের বণ্টন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও পারিবারিক কর্তাদের সমন্বয়ে এবং স্থানীয় মোড়লদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় মীমাংসিত হতো। কিন্তু রাষ্ট্রের কেন্দ্র থেকে স্থানীয় পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক তৎপরতা ও ক্ষমতার চর্চার সাথে সাথে স্থানীয় মীমাংসা ব্যবস্থা প্রায়ই অকেজো বা প্রতিয়মান শূন্য। স্থানীয় ক্ষমতার চর্চা বৃদ্ধির কারণে স্থানীয় মানুষকে ক্ষমতা প্রদানের পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহারের প্ররোচণা যোগায়। যার ফলশ্রুতিতে দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও অনাকাঙ্ক্ষি মৃত্যু বেড়েই চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ধারনাটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রচার এবং প্রসারের প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি।

সামাজিক বুদ্ধিমত্তার ধারণাটি আমরা যদি দুই ভাবে ভাগ করি, তাহলে দেখা যায় এটা (ক) বিভিন্ন মানসিক সিদ্ধান্তের অনুমান ও মেনে নেওয়ার সাথে সম্পর্কিত। (খ) আবার এটা দক্ষতার একটি অংশ, যা বিভিন্ন সামাজিক ঘটনা ও প্রেক্ষাপটে কিভাবে ব্যক্তিকে অংশগ্রহণ করতে হয় তা নির্দেশ করে। দক্ষতার এই দ্বিতীয় অংশটি ব্যক্তিকে তার সামাজিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে সহায়তা করে, যার মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক পরিস্থিতিতে অন্যের অনুভূতি, চিন্তাভাবনা এবং আচরণ বোঝার দক্ষতাও অন্তর্ভুক্ত। আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি বা দলগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে সামাজিক বুদ্ধিমত্তার অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো আমাদের মধ্যে উপস্থিত থাকা খুবই জরুরি বলে মনে করছি।

মনোবিজ্ঞানী অ্যাডওয়ার্ড থর্নডাইক সামাজিক অন্তর্দৃষ্টি উপলব্ধি করেছিলেন এবং তিন ধরনের বুদ্ধির কথা বলেন। যেমন বিমূর্ত, যান্ত্রিক এবং সামাজিক। তিনি সামাজিক বুদ্ধিমত্তাকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেছেন, এটা একজন ব্যক্তির সাথে আরেকজন ব্যক্তির যোগাযোগ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা; এটা অপরকে বুঝতে পারার দক্ষতা এবং সামাজিক পরিস্থিতিতে অন্যদের সাথে আচরণগত দক্ষতা। থর্নডাইক (১৯২০) উল্লেখ করেছেন, ‘সামাজিক বুদ্ধির অভাবে কোনো কারখানার সেরা মেকানিক ফোরম্যান হিসাবে ব্যর্থ হতে পারে।’ এটি মানুষের ভালোবাসা, আনুগত্য এবং অংশীদারিত্ব অনুভব করার এবং তাদের জীবনের দিক ও ক্রিয়াকলাপ পরিচালনা করার প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত করে।

১৯৪৩ সালে আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম হ্যারল্ড মাসলো তার তত্ত্ব মানুষের প্রয়োজনের পিরামিডে এই ধারণাটি উপস্থাপন করেছেন, যেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে, সাধারণভাবে মানুষেরা নিজের মধ্যে একনিষ্ঠতা, আনুগত্য এবং প্রেমের প্রয়োজন বোধ করে। এই প্রয়োজন তাকে সংবেদনশীল সমর্থন এবং আত্মবিশ্বাস প্রদান করবে। অন্যদিকে, লোকেরা যখন দক্ষতার সাথে তাদের প্রয়োজনীয়তা না পান, তখন তারা আরও উদ্বিগ্ন, হতাশাগ্রস্ত এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন। এই উদ্বেগ ও হতাশা মানুষকে খুন করার মতো জঘন্য কাজে প্ররোচিত করতে পারে। সংঘাত ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুরোধে আমাদের মধ্যে সামাজিক বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটানোর প্রবল প্রয়োজনীয়তা অনুভন করছি।

অনেক বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকরা মনে করেন, সামাজিক বুদ্ধিমত্তার বিকাশে কিছু সামাজিক উপাদান অবদান রাখে।  সেগুলো হল :

সামাজিকীকরণ : মানুষের সামাজিকীকরণ মূলত পরিবার থেকই শুরু হয়। একটি ভালো সামাজিকীকরণ সামাজিক অবদান এবং সামাজিক মান শেখানোর পদ্ধতি, যা দ্বারা ব্যক্তিকে নিজের এবং অন্যের প্রতি তার দায়বদ্ধতাবোধ সম্পর্কে জ্ঞাত করে তোলা হয়। এই ভূমিকাগুলি ব্যক্তিকে গ্রহণযোগ্য সামাজিক আচরণের দিকে পরিচালিত করে।

সামাজিক যোগাযোগ বা মিথস্ক্রিয়া : সামাজিক মিথস্ক্রিয়া মূল্যবোধ, রীতিনীতি এবং দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের পদ্ধতি হিসাবে পরিচিত হতে পারে এবং এই পদ্ধতিতে ব্যক্তি এবং গোষ্ঠী সামাজিক সম্পর্কের সংগঠিত বিভিন্ন আচরণের নিদর্শনগুলো শিখতে পারে। এর ফলে যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যক্তির আচরণ সামাজিক মূল্যবোধ ও প্রচলিত রীতিনীতি দ্বারা নির্ধারিত হয়।

ডিলিংয়ের নমনীয়তা : আমাদের সমাজে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যোগাযোগ, বিনিময় বা লেনদেনের ক্ষেত্রে আচরণগত নমনীয়তা। নমনীয় আচরণ গুণাবলী কোনো মানুষের মধ্যে থাকলে যেকোনো সামাজিক পরিস্থিতির মোকাবিলায় আচরণ করার ক্ষেত্রে সে যাচাইকরণ বা চিন্তা-ভাবনা করে সামাজিক বাধ্যবাধকতা ও মূল্যবোধ দ্বারা বিচার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।

গ্রহণযোগ্যতা : অন্যের প্রতি ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি তার সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি গড়তে সাহায্য করে। এ ছাড়া অন্যকে বোঝা ও ভালোবাসা, অন্যের প্রতি সহানুভূতি এবং তাদের স্বাচ্ছন্দ্য এবং কল্যাণে আগ্রহী হওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ও গ্রহনযোগ্যতার মাত্রা নির্ধারণ করে।

সোহেল রানাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। তার রেখে যাওয়া সন্তানদের কী হবে, আমরা তাও বলতে পারি না। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আমাদেরকে যাতে আর দেখতে না হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে রাষ্ট্রের কাছে বিনিত অনুরোধ জানাচ্ছি। পাশাপাশি পারিবারিক পর্যায়ে সামাজিক বুদ্ধিমত্তার বিকাশে পিতামাতা ও অভিভাবকদের কার্যকরি ভূমিকা পালনের উদাত্ত আহ্বান রাখছি। সবকিছু মিলে আমরা সামাজিকভাবে বুদ্ধিমান ও দক্ষ মানুষ দেখতে চাই। তাহলেই মানুষে মানুষে সামাজিক সম্পর্ক ভালো হবে এবং সমাজে দ্বন্দ্ব সংঘাত কমবে।

মো. খোবাইর হোসেন : ফ্রিল্যান্স রিসার্চার ও সাবেক শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement