advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

‘গেইন অভ ফাংশন’ রিসার্চ কি কোভিড-১৯ মহামারির জন্য দায়ী?

ড. রাশিদুল হক
২ জুলাই ২০২১ ১২:৪৩ | আপডেট: ২ জুলাই ২০২১ ১২:৪৩
advertisement

কোভিড-১৯-এর বৈশ্বিক মহামারিতে এখন পর্যন্ত ১৮ কোটি মানুষ সংক্রমিত এবং ৩৯ লাখ মানুষ অনন্তনিদ্রায় শায়িত। মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে আমরা এ ধরনের ভয়ংকর মহামারির কথা শুনেছি, যেমন বাইজেন্টাইন (পূর্ব রোমান) সাম্রাজ্যের ‘জাস্টিনিয়ার প্লেগ’, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলায় রাজা শশাঙ্ক রাজ্যের ‘গৌড় শহরের প্লেগ’,  চতুর্দশ শতাব্দীর ইউরেশিয়ার  ‘The Black death’ নাম খ্যাত প্রাণঘাতী প্লেগ এবং ১৯১৮ সালের ভয়াবহ স্প্যানিশ flu (H1N1 ইনফ্লুয়েঞ্জা A ভাইরাস) মহামারি।

তবে এটা অনস্বীকার্য যে, বায়ো-মেডিকেল বিজ্ঞানের বৈপ্লবিক অগ্রগতি এবং ভ্যাকসিনের আবিষ্কার মহামারিজনিত মৃত্যুর হার এখন অনেক কমিয়েছে, কিন্তু কোভিড-১৯-এর কারণ সার্স-কোভি-২ (SARS-CoV-2)  ভাইরাসের উৎস নিয়ে স্পষ্ট চিত্র এখনো অধরা রয়ে গেছে। কারণ মহামারির ইতিহাসে এই ধরনের কৌশলী জীবাণু এর আগে দেখা যায়নি। গত ১০০ বছরের মধ্যে কোভিড-১৯ হচ্ছে সবচেয়ে ভয়াবহ মহামরি।

করোনাভাইরাস পরিবারের যে সদস্য ভাইরাসগুলো বিদ্যমান তারা হলো, আরএনএ (RNA) গ্রুপের ভাইরাস। সার্স-কোভি-২ ভাইরাসের ‘আরএনএ জিনোম’অনেক জটিল। এই জিনোম প্রায় ৩০ হাজার ক্ষারকবিশিষ্ট নিউক্লিওটাইড (এডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন ও থায়ামিন) নিয়ে গঠিত, যা ভাইরাসের ২৯টি প্রোটিন তৈরি করতে সক্ষম।

আমাদের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে ভাইরাসের ‘স্পাইক প্রোটিন’ (Spike protein, সংক্ষেপে ‘S’), যা মানবজাতির অস্তিত্বের হুমকিস্বরূপ। করোনাভাইরাসকে মানবকোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করানোর জন্য কোষের দুটি প্রোটিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো আমাদের কোষের আবরণীপৃষ্ঠে (cell membrane) অবস্থিত ‘অ্যাঞ্জিওটেনসিন-রূপান্তরিত এনজাইম ২’ বা ACE-2 (এসিই-২) রিসেপ্টর প্রোটিন এবং অপরটি হলো ‘ট্রান্সমেম্ব্রেন প্রোটিএজ সেরিন 2’ (TMPRSS2), যা ভাইরাসের ‘স্পাইক প্রোটিন’কে উদ্দীপ্ত করে এসিই-২ প্রোটিনের সহযোগিতায় ভাইরাসকে কোষের ভিতরে প্রবেশ করার সুযোগ করে দেয়।

ভাইরাসের আবরণীঝিল্লিতে অবস্থিত স্পাইক প্রোটিনটি প্রাথমিক অবস্থায় নিষ্ক্রিয় থাকে। স্পাইক প্রোটিনে বিদ্যমান দুটি সেগমেন্ট ‘S1’ এবং ‘S2’ ভাইরাসটি মানবকোষের অভ্যান্তরে প্রবেশ করার প্রাক্কালে ‘ফিউরিন’ নামক একটি উৎসেচক দ্বারা বিভাজিত হয়ে সক্রিয় হওয়া আবশ্যক। S1/S2 বিচ্ছিন্নতার জন্য স্পাইক প্রোটিনের মাঝে ছোট্ট একটি সাইট/স্থান (ফিউরিন ক্লিভেজ সাই) উপস্থিত, যার কার্য-দক্ষতার ওপর নির্ভর করে S1 সেগমেন্ট দ্বারা মানবদেহে সংক্রমণশীলতার হার। সংক্রমণশীল S1 স্পাইক প্রোটিনের যে অংশটুকু অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইন (RBD: আরবিডি), যা এসিই-২ রিসেপ্টর প্রোটিনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে পুরো ভাইরাসকে কোষের অভ্যান্তরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।

উৎপত্তি তত্ত্ব

সার্স-কোভি-২ ভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে বিবাদমান দুটি তত্ত্ব: কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান নগরীতে প্রথমে শনাক্ত হয়। সার্স-কোভি-২ বেটাকরোনাভাইরাস (Betacoronavirus) গ্রুপের একটি নতুন ভাইরাস, যার উৎপত্তি সম্পর্কিত বিদ্যমান দুটি তত্ত্ব নিয়ে শিক্ষিত সমাজ ও বিজ্ঞানী মহলে অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রথম তত্ত্ব হলো যে, প্রকৃতিগতভাবে বাদুড় প্রাণীতে অবস্থান করা একটি ভাইরাস অন্তবর্তী কোনো প্রাণী যেমন আঁশযুক্ত পিপীলিকাভুক/প্যাঙ্গোলিন বা ‘ফেরেট/মিনক’ বেজিজাতীয় প্রাণীদের মাধ্যমে মানবদেহকে প্রথম সংক্রমিত করে, অর্থাৎ ভাইরাসটি প্রাণী থেকে মানবদেহে সরাসরি সংক্রমণ ঘটিয়েছিল। যেসব ভাইরাস প্রাণী থেকে মানবদেহে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম তাদেরকে ‘জুনোটিক’ (Zoonotic) ভাইরাস বলা হয়। চীন সরকার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আজ অবধি এই ‘নৈসর্গিক তত্ত্ব’টিকে খুব জোরাল সমর্থন দিয়ে আসছে।

আর দ্বিতীয় তত্ত্বটি হলো ‘ল্যাব-ফাঁস তত্ত্ব’, অর্থাৎ গবেষণারত ভাইরাসটি দৈবক্রমে ল্যাব থেকে বাইরে ছড়িয়ে পড়ার তত্ত্ব। দ্বিতীয় তত্ত্বটির সারমর্ম হলো যে, উহানের ভাইরোলজি ইনস্টিটিউটে বিজ্ঞানীরা বাদুড় থেকে প্রাপ্ত এই ভাইরাসটিকে কিভাবে আরও সংক্রামক করা যায় এ বিষয়ে গবেষণা চলাকালীন এই কৌশলী ভাইরাসটি বেরিয়ে গিয়ে প্রথমে ভাইরোলজি ইনস্টিটিউটের তিনজন গবেষককে সংক্রমিত করে এবং তারা ২০১৯ সালের নভেম্বরে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবাও নিয়েছিলেন (Dilanian K, nbcnews.com,May 24, 2021), যা পর্যায়ক্রমে উহান শহরসহ পৃথিবীর অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় উহান থেকে চীনের অন্যান্য শহরগুলির যোগাযোগ বন্ধ করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে উহান শহরের যোগাযোগ

রহস্যজনকভাবে উম্মুক্ত ছিল। করোনা মহামারি বিষয়ে চীনের তথ্য প্রকাশের আগেই এ ঘটনাগুলো ঘটেছিল। অর্থাৎ, এই বিতর্কিত ল্যাব-ফাঁস-তত্ত্বটির সঙ্গে উহান মাংস বাজারের কোনো সম্পর্ক ছিল না। দ্বিতীয় তত্ত্বটির সমর্থনকারীরা অভিযোগ করছেন যে, এই ব্যাপারটি ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ এবং চীন সরকার নাকি প্রথম থেকেই গোপন করার চেষ্টা করেছে।

তবে প্রথমবারের মতো ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি চীনের গবেষকেরা মানব-থেকে-মানব শরীরে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া সম্পর্কে নিশ্চিত হন বলে জানানো হয়েছিল। চীন যথাযথ পদক্ষেপ নিলে করোনার সংক্রমণ হয়তো শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল।

বৈশ্বিক মহামারি

২০২০ সালের ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোগটিকে একটি বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তখন থেকেই ইউরোপ-আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসের উৎস নিয়ে অনেক অজানা তথ্যের কথা লেখা হচ্ছে। ২০২০-এর মে মাসের প্রথম দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের গোয়েন্দা এজেন্সি দ্বারা সংকলিত ১৫ পাতার বহুজাতিক তথ্য সম্বলিত দলিলে (Dossier: ডসিয়ে) চীনের সন্ধিগ্ধ থিওরি ‘ব্যাটি বিজ্ঞান’ উন্মোচিত করেছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধারণাকে সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল যে, বেইজিং সরকার কোভিড-১৯-এর আসল উৎসের রহস্যটি গোপন করে রেখেছে (The Daily Telegraph, Australia, May 2, 2020)। এই দলিলটিকে চিহ্নিত করা হয়েছিল একটি ‘বোমশেল ডসিয়ে’ হিসেবে।

রিপোর্টে আরও বলা হয়েছিল যে, চীন ইচ্ছাকৃতভাবে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের প্রমাণলো লুকিয়ে রেখেছিল বা ধ্বংস করে ফেলেছিল। মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর খবর ৬ ডিসেম্বর জানা সত্ত্বেও ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত এই গুর্রুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মুখ খুলেনি এবং ওই অবহেলার কারণেই আজ বিশ্বজুড়ে ১৮ কোটি মানুষ সংক্রমিত হয়েছেন। মারা গেছেন ৩৯ লাখ মানুষ।  তখন পুরো ফেব্রুয়ারি মাসটায় চীন সরকার ইন্ডিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের কিছু দেশকে চাপ দিয়ে আসছিল, যাতে করে তাদের চায়না ভ্রমণের পথ বন্ধ না করা হয়, যদিও সেই সময় উহান থেকে চীনা অন্য শহরগুলোতে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। গত বছরের কোভিড-১৯-সংক্রান্ত সেই কালানুক্রমিক ঘটনাবলী হয়তো অনেকের মনে আছে। বহুজাতীয় ‘ডসিয়ে’ দাবি করছে যে, তাদের দলিল কোনো রাজনৈতিক প্রপাগান্ডার দলিল নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-সম্বলিত একটি দলিল।

মহামারিতে দেড় বছর অতিক্রান্ত হলেও এ পর্যন্ত মানবদেহে সক্রমণযোগ্য সার্স-কোভি-২ ভাইরাসের কোনো নিকটতম জাত/ধরণ এখনো বাদুড় অথবা অন্য কোনো প্রাণীর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে হর্স-সু (Horseshoe) জাতীয় বাদুড়ের মধ্যে থাকা একটি করোনাভাইরাসের ধরণ, RATG13-CoV (যার সঙ্গে সার্স-কোভি-২ ভাইরাসের ৯৬.২% জিনোম-সাদৃশ রয়েছে [Zhou et al., Nature, 2020]) হয়তো মানবদেহে প্রবেশ করে থাকতে পারে, যদিও এই ধারণার পেছনে কোনো শক্ত প্রমাণ নেই (Maxmen and Mallapaty, Nature.com, 2021)।

তাছাড়া, অন্তর্বর্তী হোস্ট প্রাণীর সন্ধানের জন্য চীনের গবেষকগণ ৮০ হাজার বন্য ও গৃহপালিত প্রাণী পরীক্ষা করেও সার্স-কোভি-২ ভাইরাসের কোনো ইতিবাচক প্রমাণ দেখাতে পারেনি। এমনকি, উহান মাংস বাজারে বিক্রয়ী প্রাণী থেকে সংগ্রহ করা ৩৩৬টি মাংস-নমুনার মধ্যে কোনটাই PCR পজিটিভ ছিল না (WHO final report, July 2020), অর্থাৎ সেই নমুনাগুলোর মধ্যে সার্স-কোভি-২ শনাক্ত হয়নি।

‘গেইন-অভ-ফাঙ্কশন রিসার্চ’: সার্স-কোভি-২ ভাইরাসের জিনোম কি শতভাগ নিসর্গীয়, নাকি ভাইরাসটিকে অধিকতর সংক্রামক করার লক্ষ্যে এই জিনোমের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ উহানের ল্যাবে সৃষ্টি-এ নিয়ে কৌতূহলী মহল এবং বিজ্ঞানীদের মনে অনেক প্রশ্ন জেগেছে। আনবিক জীববিজ্ঞানের গবেষণায় ‘গেইন-অব-ফাঙ্কশন’ নামে একটি প্রযুক্তি/কৌশল প্রচলিত, যার মাধ্যমে DNA বা RNA জিনোমে অবস্থিত কোনো জীনের বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে পরিবর্তন ঘটিয়ে তার স্বাভাবিক কার্যকে বহুগুণ বর্ধিত করা যায়।

জীবকোষে অবস্থিত একটি জীনের প্রকাশকে সঠিকভাবে জানার জন্য এই কৌশলটির প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা অহরহ এ ধরনের গবেষণা করে থাকেন, সেখানে সমালোচনার কিছু নেই। তবে এই কৌশলের মাধ্যমে কোনো জীনগত বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন ঘটিয়ে যদি একটি জীবাণুর সংক্রমণশীলতা অসদুদ্দেশ্যে বাড়ানো হয়, তখনই সেটা একটি সীমাহীন উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

অভিযোগ আছে যে, উহানের ভাইরোলজি ইনস্টিটিউটে ‘গেইন-অব-ফাঙ্কশন’ গবেষণার মাধ্যমে এরকমই একটা পরিবর্তন বাদুড়ে অবস্থিত বেটাকরোনাভাইরাস গ্ৰুপের কোনো একটি ভাইরাসকে (RaTG13-CoV অথবা ZXC21-CoV) টেমপ্লেট হিসেবে ব্যবহার ক’রে তার ‘স্পাইক’ প্রোটিনকে অধিকতর সংক্রমণশীল করা হয়েছে, যা মানবজাতির অস্তিত্বের ওপর আঘাত হেনেছে। 

নোবেল বিজয়ী ক্যাল টেক ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডেভিড বাল্টিমোর-সহ অনেক বিজ্ঞানী ভাইরাস উৎপত্তির দ্বিতীয় তত্ত্বের অনুকূলে বেশ কিছু প্রমাণও দেখিয়েছেন। বিস্ময়করভাবে সার্স-কোভি (SARS-CoV) ভাইরাস গ্রুপের (Pangolin-CoV, RaTG13-CoV, Bat-CoV) মধ্যে সার্স-কোভি-২ হচ্ছে একমাত্র করোনাভাইরাস, যার স্পাইক প্রোটিনে ‘ফিউরিন ক্লিভেজ সাইট (PRRA)’ বিদ্যমান (Coutard et al., Antiviral Res,2020)। তাদের দাবি এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ল্যাবে সংযোজিত হয়েছে। অতীতের একটি তথ্য থেকেও প্রমাণিত যে, উচ্চমাত্রায় সংক্রামক ইনফ্লুয়েঞ্জা A ভাইরাসেও ‘ফিউরিন ক্লিভেজ সাইট’-এর উপস্থিতি রয়েছে (Claas E et al., Lancet, 1998)।

বিজ্ঞানীদের মতে, অতিরিক্ত ‘ক্লিভেজ সাইটটি’ সংযোজনের ফলেই নাকি সার্স-কোভি-২ করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে গিয়ে দানবীয় হয়ে উঠেছে। এই সাইটটি সংযোজনার ফলে সংক্রমণশীলতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি হলো ‘গেইন অভ ফাঙ্কশন’। ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে এই ক্লিভেজ স্থানে প্রাকৃতিকভাবে মিউটেশন হওয়ার ফলে ‘ডেল্টা (B.1.617.2)’ ভারতীয় ভেরিয়েন্টের করোনাভাইরাস আরও মারাত্মক রূপ নিয়েছে।

সার্স-কোভি-২ স্পাইক প্রোটিনের ফিউরিন-ক্লিভেজ স্থানটি চারটি অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল অর্থাৎ প্রোলিন-আরজিনিন-আরজিনিন-আল্যানিন (PRRA)। স্পাইক প্রোটিনের S1 ও S2 খন্ডের বিচ্ছিন্নতার সক্ষমতা তথা সংক্রমণের হার বাড়ানোর জন্য ওই স্থানে আরজিনিনের উপস্থিতি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ, যার কারণে আরজিনিনকে ‘ডাবল ডোজে’ সার্স-কোভি-২ ভাইরাসে সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে।

তবে এই সংযোজন প্রোটিন পর্যায়ে করা হয়নি, বরং জীন পর্যায়ে খুব কৌশলের সাথেই করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, যেহেতু প্রোটিন তৈরির সংকেত (genetic code) তার স্বীয় জিনের মধ্যে অন্তর্নিহিত। কাজেই আরজিনিন সৃষ্টির পেছনে ‘স্পাইক জিন’-এর ফিউরিন ক্লিভেজ স্থানটিতে ১২টি নিউক্লিওটাইড (TCCTCGGCGGGC)-এর মধ্যে পাশাপাশি দুটি আরজিনিনের জেনেটিক কোড (CGG) জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। ফিউরিন ক্লিভেজ সাইট ছাড়াও স্পাইক জিনের ৪০টি জায়গায় CGG উপস্থিত।  ভিন্নজাতীয় একটি ভাইরাসের ফিউরিন ক্লিভেজ স্থানটিতে কেবলমাত্র একটি আরজিনিন কোড (CGG) যোজিত হবার কারণে সংক্রমণের হার ১০ গুণ বেড়ে যাওয়ার তথ্য অজানা নয় (Henrich S et al., Nat Struc Mol Biol, 2003)। ফিউরিন ক্লিভেজ সাইটটি পরিবর্তনের ফলে এসিই-২ রিসেপ্টর ছাড়াও মানবকোষের আবরণিঝিল্লিতে অবস্থিত আরও একটি প্রোটিন নিউরোপিলিন (Neuropilin: NRP1) রিসেপ্টরের সাথে সংযুক্ত হয়ে সার্স-কোভি-২ কোষের অভ্যান্তরে প্রবেশ করার সক্ষমতা অর্জন করায় মানবদেহে ভাইরাস দ্বারা সংক্রমণের হারও অনেক বেড়ে গেছে (Daly J et al., Science, 2020)।

নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন

কোভিড-১৯ শনাক্ত হওয়ার প্রায় দেড় বছর পরে ভাইরাসটি চীনা শহর উহানে কীভাবে প্রথম উদ্ভূত হয়েছিল, তা নিয়ে আবারও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রাণঘাতী ভাইরাস সার্স-কোভি-২ কোনো প্রাণীর শরীর থেকে মানুষে নাকি গবেষণাগারের দুর্ঘটনা থেকে ছড়িয়েছে, সে বিষয়ে আরও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ উপস্থাপন করে একটি নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন, যাতে করে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংক্রমণ মহামারী রূপ নেবার আগে শুরুতেই প্রতিহত করা যায়।

চীন সময়মত যথাযথ পদক্ষেপ নিলে এবারেও করোনার সংক্রমণ হয়তো শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল। উহান ভাইরোলজি ইনস্টিটিউটে সার্স-কোভি-২ ভাইরাসটির ‘গেইন-অভ-ফাঙ্কশন’ গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় অ্যালার্জি এবং সংক্রামক রোগ ইনস্টিটিউট (NIAID) অর্থায়ন করেছিল কি না, তা নিয়েও মার্কিন সিনেটসহ জনমনে অনেক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। উহান ভাইরোলজি ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন গবেষক ড. শি ঝেঙলী তার গবেষণা-প্রকাশনায় NIAID কর্তৃক অর্থায়নের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেল্থ (NIH) কম্প্লেক্সের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ‘জাতীয় অ্যালার্জি এবং সংক্রামক রোগ ইনস্টিটিউট (NIAID)’-এর প্রধান সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. এন্থোনি ফাউচি-র ভূমিকা নিয়েও অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

এ বছরের প্রথম দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) উহান ল্যাব পরিদর্শন করলেও তাদের রিপোর্টে ভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে কোনো সঠিক সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। একটি স্বাতন্ত্রিক আন্তর্জাতিক কমিটি কর্তৃক বিজ্ঞানভিত্তিক সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। করোনাভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে যেকোনো ধরনের রাজনীতি তদন্তপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং মহামানি প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী-প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

অধ্যাপক ড. রাশিদুল হক : উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী। সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অব মেডিসিন, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

advertisement