advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

করোনাকালে চক্ষুরোগ, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস থেকে অন্ধত্ব বরণ

ড. রাশিদুল হক
১৩ জুলাই ২০২১ ১৮:১৪ | আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২১ ১৮:১৪
advertisement

২০০৩ এবং ২০১৩ সালের  SARS-CoV-1 এবং  MERS-CoV (মধ্য প্রাচ্যের) দ্বারা সংক্রমিত মহামারিতে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে গুরুতর তীব্র শ্বাসতন্ত্র সিন্ড্রোম দারুণ এক ভীতির সঞ্চার করেছিল। কিন্তু কেউ ভাবতেও পারিনি যে, মধ্য প্রাচ্যের মার্স-কোভ প্রাদুর্ভাবের মাত্র ৬-৭ বছর পর চীনের উহান শহর বা ল্যাব থেকে উদ্ভুদ সার্স গ্রুপের ভিন্ন একটি ভাইরাস (SARS-CoV-২) এ যাবৎ পৃথিবীর বুক থেকে সাড়ে ৪০ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়ে গেছে (সূত্র : ওয়ার্ল্ডোমিটার)। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মোট ১৬ হাজার ৮৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছেন ১২ হাজার ১৯৮ জন (সূত্র : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর)।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি জনস্বাস্থ্যমূলক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল, যেখানে সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের (পিপিই) পাশাপাশি চোখকে সুরক্ষার জন্য সানগ্লাসের ব্যবহার সুপারিশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। আমরা জানি যে, করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন এবং মানবকোষের আবরণীপৃষ্ঠে অবস্থিত এঞ্জিওটেনসিন-রূপান্তরকারী-এনজাইম-২রিসেপ্টর এবং TMPRSS2 (Serine protease) প্রোটিনগুলোর সমন্বিত বিক্রিয়ায় ফুসফুসসহ দেহের অন্য টিস্যু সংক্রমিত হয়। এসিই-২ হচ্ছে রেনিন-অ্যাঞ্জিওটেনসিন সিস্টেমের (RAS) একটি প্রোটিন, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অন্তঃক্ষরা (এন্ডোক্রাইন: রক্তে নিঃসৃত হওয়ার পর সুনির্দিষ্ট কোষকে প্রভাবিত করে) ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া নির্দিষ্ট টিস্যুগুলোর মধ্যে জটিল অটোক্রাইন (যে কোষ থেকে নিঃসৃত হয় তাকেই প্রভাবিত করে) ভূমিকাও রয়েছে।

বলা বাহুল্য, রেনিন-অ্যাঞ্জিওটেনসিন সিস্টেম মূলতঃ বৃক্ক ও কার্ডিওভাস্কুলার সিস্টেমের একটি অংশ, কিন্তু মানুষের চোখের মধ্যে (intraocular) নিজস্ব  RAS আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে আমরা বিষ্মিত হয়েছি। আমার গ্রূপসহ বিশ্বের অনেক নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সুবিদিত ল্যাবে এ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। প্রায় এক যুগ ধরে চক্ষু-বিজ্ঞানীদের মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, চোখের মধ্যে রেনিন-অ্যাঞ্জিওটেনসিন সিস্টেমের ভূমিকা কী হতে পারে?

গ্লুকোমা রোগীদের চোখের ইন্ট্রাঅক্যুলার চাপকে কি এই সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করে? না, রক্তচাপের মতো চোখের অভ্যন্তরীণ (ইন্ট্রাঅক্যুলার) চাপের সঙ্গে RAS-এর সে ধরনের কোনো উল্ল্যেখযোগ্য ভূমিকা নেই। চোখের অভ্যন্তরীণ চাপের কারণ ভিন্ন এবং এই উচ্চচাপ-সৃষ্ট গ্লুকোমার ফলে প্রথমে পার্শ্বীয় দৃষ্টি, তারপর কেন্দ্রীয় দৃষ্টি নষ্ট হয়ে অন্ধত্ব বরণ করতে হয়। যাই হোক, চোখের বিভিন্ন টিস্যু এবং কোষগুলো নিয়ে গবেষণার পর RAS-এর কার্যকারিতা নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আবিষ্কার হয়েছে, যা বিভিন্ন রিসার্চ জার্নালেও প্রকাশ পেয়েছে।

ফুসফুস, অন্ত্রনালী, হার্ট এবং কিডনি টিস্যুগুলোর মতো চোখের কনজাংটিভা, কর্নিয়া, রেটিনা, আরপিই-সহ অন্য টিস্যুতেও এসিই-২ রিসেপ্টর (Haque R et al., J Recept Signal Transduct Res, 2017; Zhou L, The Ocular Surface, 2020) এবং TMPRSS2 প্রোটিন (Sungnak, W et al., Nat Med, 2020) বিদ্যমান থাকার ফলে ওইসব টিস্যুর কোষগুলো সহজেই করোনাভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে। এমনকি, চোখ-নাকের যোগাযোগ নালীর মাধ্যমে শ্বাসনালীতে করোনাভাইরাস পৌঁছাতে পারে কি না-এ নিয়েও যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে (Qing et al, Acta Ophthalmol, 2020)।

যদিও প্রাথমিকভাবে ফুসফুস কোভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং গুরুতর নিউমোনিয়াসহ তীব্র শ্বাসকষ্টের সিন্ড্রোম পরিলক্ষিত হয়,  তবুও শ্বাসনালী যে একমাত্র সংক্রমণের পথ নয়, তা এখন প্রমাণিত। খুব স্বাভাবিক কারণেই জীবন-হুমকির বিষয়টি প্রাধান্য পেয়ে করোনাভাইরাস-সম্পর্কিত বেশিরভাগ গবেষণাই হয়েছে শ্বাসনালী ও ফুসফুস কেন্দ্রিক! হয়তো সে কারণেই বিশ্বের সর্ববৃহৎ মেডিক্যাল ডাটাবেজে (https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/) ‘ফুসফুস এবং কোভিড-১৯’ নিয়ে মোট ৯ হাজার ১৩৯টি গবেষণা প্রবন্ধ উদ্ধৃত হয়েছে, যেখানে ‘চোখ এবং কোভিড-১৯’ সম্পর্কিত মাত্র ১ হাজার ৬৩১টি গবেষণা প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে।

চোখ আমাদের অতি সংবেদনশীল এবং গঠনের দিক থেকে জটিল একটি অঙ্গ, যা পারিপার্শিক একটিমাত্র ত্রিমাত্রিক উচ্চ-রেজল্যুশন ছবি গঠন করে; এতটা জটিল যে মানবচোখ ভ্রূণতাত্ত্বিক বিকাশ থেকে শুরু করে চোখের ভিন্ন-ভিন্ন কাজের জন্য মোট ৪ হাজার ৫০টি ভিন্ন ধরনের প্রোটিন সংশ্লেষণ করে (Semba et al., Proteomics Clin Appl, 2015) তার মধ্যে শুধুমাত্র রেটিনাই সংশ্লেষণ করে ১ হাজার ৬৮০টি প্রোটিন (Skele and Mahajan, Plos One, 2013)।

চোখের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো হলো শ্বেতমন্ডল, কনজাংটিভা, কর্নিয়া, সিলিয়ারি বডি, অ্যাকুয়াস হিউমার ও ভিট্রেয়াস হিউমার, আইরিশ, পিউপিল, লেন্স, কোরয়েড, আরপিই, রেটিনা, ফোবিয়া ও অন্ধবিন্দু এবং অপটিক স্নায়ু। রেটিনার গ্যাংলিওন কোষের অ্যাক্সন ফাইবার দ্বারা গঠিত হয় অপটিক স্নায়ু। এ ছাড়াও রেটিনাকে আবৃত করে অতি দীর্ঘকায় বিশেষ এক ধরনের কোষ থাকে, যাকে ম্যুলার কোষ বলে।  [ সংযুক্ত ছবিটি দেখুন]। 

কোভিড-১৯ রোগীদের কনজাংটিভাজনিত লক্ষণ এবং চোখের পানিতে করোনাভাইরাসের উপস্থিতিতে চোখের স্বাস্থ্য নিয়ে এক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে (Lu et al., Lancet, 2019)। এসিই-২ প্রোটিন বিদ্যমান থাকায় চক্ষুগোলকের সম্মুখভাগে অবস্থিত কনজাংটিভা এবং কর্নিয়ার কোষগুলো করোনাভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে। সংক্রমণের ফলে কোভিড-১৯ রোগীদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য যে লক্ষণগুলো দেখা গিয়েছে তা হলো চোখ লাল হয়ে যাওয়া, চোখ থেকে অতিরিক্ত পানি ঝরা, চোখ জ্বলা, বা অনেক সময় চোখের উপরিভাগে ব্যথা অনুভব করা।

কনজাংটিভা এক ধরনের ঝিল্লী, যা চোখের সাদা অংশের আবরক হিসেবে কাজ করে। কনজাংটিভার কোষগুলো মিউকাস ও অশ্রু তৈরির মাধ্যমে চোখের আর্দ্রতা ও পিচ্ছিলতা ধরে রাখে এবং চোখে জীবাণু প্রবেশে বাধা দেয়। উল্লেখিত উপসর্গগুলো ছাড়াও চোখ থেকে শ্লেষ্মাজাতীয় পদার্থ বের হয়ে পুঁজের সৃষ্টি হয় এবং চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা হয়ে যায়। কনজাংটিভার প্রদাহকে বলা হয় কনজাংটিভাইটিস, যা জটিল এবং অত্যান্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ। ২০টি গবেষণার একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, ৩ হাজার ৩৮৩ জন কোভিড-১৯ রোগীদের উপসর্গগুলোর মধ্যে কনজাংটিভাইটিস হলো সবচেয়ে সর্বজনীন। কোভিড-১৯ রোগীদের তীব্র কনজাংটিভাইটিসের প্রকোপ প্রায় ৩১.৬%, (Wu P et al., JAMA Ophthalmology, ২০২০), এমনকি ৬০% (Zhou Y et al., Ophthalmology, 2020) পর্যন্ত সংক্রমণ দেখা গেছে।

কর্নিয়া হচ্ছে চোখের স্বচ্ছ অংশ, যা চোখের সামনের অংশগুলোকে (যেমন: চোখের কেন্দ্রস্থলে একটি ছিদ্র বা পিউপিল, চোখের রঙিন অংশ বা আইরিশ  এবং তরল পদার্থে ভরা চোখের সম্মুখভাগের কক্ষ) ঢেকে রাখে। আলোকরশ্মিকে প্রতিবিম্বিত ও প্রতিসৃত করানো হচ্ছে কর্নিয়ার মূল কাজ। কর্নিয়ায় কোনো রক্তজালিকা নেই। যেহেতু কনজাংটিভা ও কর্নিয়া কোষগুলোর পৃষ্ঠে ACE2 এবং TMPRSS2 প্রোটিন বিদ্যমান (Zhou L et al., The Ocular Surface, 2020), কাজেই কোভিড-১৯ পজিটিভ দাতাদের কর্নিয়া অন্য দেহে স্থাপন বা ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা যাবে কি না-এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ১৩২টি কোভিড-১৯ পজিটিভ দাতাদের কর্নিয়াসহ, শ্বেতমন্ডল এবং আইরিস টিস্যুগুলোর পোস্ট-মর্টেম পরীক্ষা করে করোনাভাইরাস RNA এবং ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন শনাক্ত হওয়ায় (Sawant O et al, The Ocular Surface, 2021) প্রমাণিত যে, চোখের সম্মুখভাগের এই টিস্যুগুলো (কনজাংটিভা  এবং কর্নিয়ার) করোনাভাইরাস দ্বারা সংক্রমণের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ ছাড়া কর্নিয়ার লিম্বাসে এসিই-২ এবং টিএমপিআরএসএস-২ উভয় প্রোটিন বিদ্যমান থাকায় করোনাভাইরাস চোখ থেকে সরাসরি রক্তে পরিবাহিত হয়ে দেহের অন্যান্য অঙ্গে সংক্রমিত করতে পারে কি না, এ নিয়ে একটি আশঙ্কাও রয়ে গেছে।

রেটিনা হচ্ছে চক্ষুগোলকের পেছনের দিকে অবস্থিত পাঁচ ধরনের বিভিন্ন স্নায়ুকোষ ও রক্তনালিকা-সমন্বিত একটি পাতলা স্তর, যা আলোকরশ্মিকে তড়িৎ সংকেতে রূপান্তর করে অপটিক স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পাঠায়।  এসি-২ প্রোটিন বিদ্যমান থাকায় রেটিনা রক্তনালিকার এন্ডোথেলিয়াল কোষগুলো (রক্তনালীর প্রাচীরের তিনটি স্তরের মধ্যে রক্তের সাথে সরাসরি সংস্পর্শে থাকা ভিতরের স্তর) করোনাভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে। সংক্রমণের ফলে রেটিনাস্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়, যা রেটিনা রক্তনালিকাগুলোর, বিশেষত কেন্দ্রীয় শিরায় রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে (Thromboembolism/ Central retinal vein occlusion) ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পায় এবং অবশেষে অন্ধত্ব বরণ করতে হয় (Walinjkar et al., Indian J Ophthalmol. 2020)।

উচ্চ রক্তচাপ, গ্লুকোমা বা ডায়াবেটিস রোগীদের এ ধরনের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। এ ছাড়া করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে ম্যাকুলার নিউরোরেটিনোপ্যাথি এবং অপটিক নিউরাইটিস জাতীয় কঠিন রোগ চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টি-সক্ষমতা হারাতে পারে। স্নায়ুকোষ সম্বলিত রেটিনার পশ্চাদ্ভাগে ‘রেটিনা পিগমেন্ট এপিথেলিয়াম’ (RPE) নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ কোষের স্তর রয়েছে। রেটিনা এবং আরপিই  কার্যত ওতপ্রতোভাবে জড়িত। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে রেটিনা এবং ‘রেটিনা পিগমেন্ট এপিথেলিয়ামে’ ইমিউন (প্রতিরোধ) কোষের অনুপ্রবেশ ঘটে, যার থেকে তৈরি প্রদাহী-সাইটোকাইন এবং অটোএন্টিবডি ভুলবশতঃ রেটিনার ফটোরিসেপ্টর কোষ (রড কোষ এবং কোন কোষ) এবং গ্যাংলিওন কোষগুলির অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করে। ফলশ্রুতিতে কোভিড-১৯ রোগীর দৃষ্টি  হারানোর  সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

কোভিড-১৯ রোগীদের চোখ গৌণ সংক্রমণ হিসেবে (secondary infection) অনেক ক্ষেত্রে একটি অতি ভয়াবহ রোগ ‘মিউকর্মাইকোসিস’ বা ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হয়। এটি সাধারণত একটি বিরল রোগ। মিউকোর নামে এই ছত্রাকের সংস্পর্শে এলে এই সংক্রমণ হয়। আগ্রাসী এই ছত্রাক নাক, চোখ এবং কখনো কখনো মস্তিষ্কেও ছড়িয়ে পড়ে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, ক্যান্সারসহ কোভিড-১৯ রোগীদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার কারণেই বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাস দ্বারা তারা খুব সহজেই সংক্রমিত হয়।  তাছাড়া, করোনোভাইরাস চিকিৎসার জন্য স্টেরয়েডের দীর্ঘসময় বা অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণেও রোগীদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। তাদের রক্তে সিডি ৪+ এবং সিডি ৮+ জাতীয় লিম্ফোসাইটস কমে যাওয়ার কারণে তারা অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। জীবন বাঁচাতে রোগীদের চোখ ফেলে দেওয়া ছাড়া আর অন্য কোনো কার্যকর চিকিৎসা নেই।

ডায়াবেটিস, ক্যান্সার বা এইচআইভি/এইডস যাদের আছে, কিংবা কোনো রোগের কারণে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই কম তাদের এই মিউকোর থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। মিউকরমাইকোসিসে আক্রান্তদের মৃত্যুহার প্রায় ৫০ শতাংশের মতো (Sen M et al., Indian J Ophthalmol. 2021)। ইতিমধ্যে, ভারতের অনেক রাজ্যে কালো ছত্রাককে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করেছে। ভারতে অনেক রোগী একটি করে চোখ হারিয়েছেন। বাংলাদেশেও কালো ছত্রাক শনাক্ত হওয়ায় জনগণের মনে আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে। এই রোগীদের অধিকাংশই মধ্যবয়সী এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং কোভিড–১৯ থেকে সেরে ওঠার দুই সপ্তাহের মধ্যে মিউকরমাইকোসিসে আক্রান্ত হয়। উপসর্গ হিসেবে নাক দিয়ে রক্ত পড়া, চোখ ফোলা ও চোখে ব্যথা, ঝাপসা দেখা এবং দৃষ্টিশক্তি হারানো উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি, ব্ল্যাক ফাঙ্গাস থেকে অধিক শক্তিশালী ‘হোয়াইট’ ফাঙ্গাস শনাক্ত হওয়ায় ভারতে আরও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সাদা ছত্রাকের আক্রমণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

যেহেতু করোনাভাইরাস মানবচোখে সংক্রমণ ঘটাতে পারে, কাজেই চোখের বিভিন্ন টিস্যুতে কোভিড-১৯ রোগের বহিপ্রকাশ কনজাংটিভাইটিস এবং  উভিয়াইটিস (Uveitis: উভিয়ার প্রদাহ) থেকে রেটিনাইটিস (Retinitis: রেটিনার প্রদাহ) এবং অপটিক নিউরাইটিসের (অপটিক স্নায়ুর প্রদাহ) মতো দৃষ্টি-হুমকির পরিস্থিতিগুলোকে উপেক্ষা করা যায় না। এমনকি আক্রান্ত ব্যাক্তিদের দৃষ্টিশক্তিও সম্পূর্ণভাবে হারাতে পারে। তবে বিজ্ঞানের আলোকে একটি বিষয় এখনো পরিষ্কার নয় যে, করোনাভাইরাস সংক্রমিত চোখ শরীরের অন্যান্য অঙ্গে সংক্রমণ করতে পারে কি না-সে বিষয়ে চক্ষু বিশেষজ্ঞদের আরও গবেষণা করা প্রয়োজন, যা নাক এবং মুখের মতো সংক্রমণের পথ হিসেবে চোখের ভূমিকা আরও স্পষ্ট করতে সহায়ক হবে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের হাত থেকে চোখকে বাঁচাতে হবে। কাজেই চোখের সুরক্ষা কেবল সমস্ত স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের জন্যই নয়, ঝুঁকিতে থাকা বিভিন্ন শ্রেণির ব্যক্তিদের জন্যও চোখের সুরক্ষা দেওয়া বাঞ্ছনীয়। সেক্ষেত্রে মাস্কের মতোই সানগ্লাস বা সাধারণ চশমার ব্যবহার অন্য স্বাস্থ্যবিধির মতোই জরুরি।

অধ্যাপক ড. রাশিদুল হক : উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী। সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অব মেডিসিন, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

advertisement