advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

যেভাবে শিশুদের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে করোনাভাইরাস

জান্নাতুল ফেরদৌস মোহনা
২৭ আগস্ট ২০২১ ০২:৫৯ পিএম | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২১ ০৩:৪১ পিএম
ছবি : সাদমান হোসেন
advertisement

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মহামারি ও আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরী অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২০২০ সালের শুরু থেকেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে এই ভাইরাস। এমন এক মহামারি, যা পুরো পৃথিবীকেই করে দিয়েছে নিশ্চল ও অসহায়। শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক, সবার মাঝেই এর প্রভাব পড়েছে বিস্তরভাবে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিশুদের আক্রান্তের হার অনেকাংশেই বেশি দেখা যাচ্ছে। শিশুদের দেহে শারীরিকভাবে সংক্রমণ কম হলেও মানসিক দৃষ্টিগুণ থেকে শিশুদের বিকাশে ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা।

করোনাকালে শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে বাধা

করোনাকালীন সময়ে লকডাউনের জন্য শিশুদের সারাদিনই কাটাতে হচ্ছে বাসায় বসে। প্রথম দিকে নানা রকমের গেমস ও ক্রাফটসের দিকে ঝোঁক থাকলেও এখন তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে অনীহা। দীর্ঘদিনের এই আবদ্ধতা নষ্ট করছে শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে উঠা। খেলাধুলা, হাঁটা চলা, নাচ-গান করেই শিশুরা বেড়ে ওঠে। এই শারীরিক সক্রিয়তা সাহায্য করে শিশুর শারীরিক বিকাশে। লকডাউনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিশুর সৃজনশীলতা। একাকিত্বে ভুগছে বয়সে ছোট থেকে কিশোর-কিশোরীরও।

শিশুদের আচরণগত পরিবর্তন

প্রাণবন্ত, উৎফুল্ল অনেক শিশুই এই মহামারিতে হয়ে পড়েছে অন্তর্মুখী। সামাজিকতা থেকে সরে যাচ্ছে অনেক দূরে, বেশির ভাগ সময়ই একা কাটাতে পছন্দ করছে তারা। আবার ভিন্নচিত্রও দেখা যাচ্ছে। অনেক শিশুরাই হয়ে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়া আসক্ত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যবহার করছে টিকটক, লাইকির মতো বিভিন্ন অ্যাপস। ফেসবুকে পেজ খুলে আসছে লাইভেও। অনেক বাচ্চারাই মোবাইলে সময় দিতে বেশি সাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। অনলাইনের পড়াশোনার জন্য অনেক বাবা-মা তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে মোবাইল ফোন। তাতে পড়াশোনা ছাড়াও মোবাইলে সারাদিন সময় কাটাচ্ছে অনেকেই। শিশুদের এসব ছোট ছোট বিষয়গুলো আস্তে আস্তে বড়রূপ ধারণ করে প্রভাব ফেলছে তাদের আচরণগত পরিবর্তনে।

করোনা শুধু যে আমাদের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলেছে তা কিন্তু নয়, বরং পৃথিবীর অর্থনীতিতেও ফেলেছে বিরূপ প্রভাব। হাজার মানুষ হয়েছে চাকরিচ্যুত। ব্যবসায় নেমেছে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা। এইরকম সময়ে অনেক পরিবারই দু-বেলা খাবারের যোগান দিতে খাচ্ছেন হিমশিম। বেঁচে থাকা হয়ে উঠেছে ব্যয়বহুল। বাসা ভাড়া, খাওয়া দাওয়া ও দৈনন্দিন কাজ করাই যেখানে দুর্বিষহ সেখানে শিশুর শারীরিক চাহিদার উপর নজরদারি করার মতো অবস্থা অনেক পরিবারেরই নেই।

বিশেজ্ঞদের মতে, একটি শিশুরা সঠিক নিয়মে পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার না পেলে বাধাগ্রস্থ হবে তার বেড়ে ওঠা। বর্তমানে পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থার অবনতি তাদের এই সুষমপুষ্টি থেকেও বঞ্চিত করছে। যার ফলে শুধু শিশুর নির্দিষ্ট একটা সময়ের বিকাশ না বরং ভবিষ্যতে তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বিকাশেও পোহাতে হবে নানাবিধ ঝুঁকি। শুধু তাই নয়, আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেক পরিবারই শিশুকে ভালো স্কুলে দিতে ভয় পাচ্ছে।

লকডাউনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা অপারগতা

লকডাউন ঘোষণার কিছু সময় পর থেকেই খুলে দেওয়া হয়েছিলো অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম। স্কুলের যাবতীয় পড়াশোনা শিখানো হচ্ছে অনলাইনের মাধ্যমে। অধিকাংশ শিশু এই অনলাইন মাধ্যমে খাপ খাইয়ে নিতে পারলেও পারেনি অর্ধসংখ্যক শিশুই। দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপে তাকিয়ে থাকার কারণে শিকার হচ্ছে নানা রকম সমস্যার। অনেক শিশুই বুঝতে পারছে না পড়াশোনার বিষয়গুলো। গুগলফর্ম, ডক্স এর ব্যবহার বেশি করায় বাচ্চাদের হাতের লেখায় হচ্ছে অপারদর্শী। বেছে নিচ্ছে নানা রকম প্রতারণার উপায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে ক্লাস নিলেও পারছেনা শিশুদের খাপ খাইতে নিতে বরং অনেকক্ষেত্রেই করছে বাচ্চাদের হয়রানি। অনলাইনে ক্লাস করলেও দিতে হচ্ছে পুরো মাসের বেতন এবং বাড়তি খরচ, যা না পোষাতে পেরে পড়াশোনার দুয়ার বন্ধ করেছে হাজারও শিক্ষার্থী, এগিয়ে আসেনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও।

যেভাবে বেড়েছে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম

এমন একটি সময় পার করছি আমরা, যার শেষ কেমন হবে তা নিয়ে আমাদের ধারণা খুবই অস্পষ্ট। অর্থনৈতিক অবস্থায় শোচনীয় হওয়ার অধিকাংশ শিশুই হারাচ্ছে তাদের মৌলিক অধিকার। মেয়ে শিশুদের পড়াশোনার খরচ চালানো কঠিন হচ্ছে বিধায় পরিবার তাদেরকে বাল্যবিবাহের দিকে ধাবিত করছে। অনলাইন পড়াশোনা ব্যয় বহুল, কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তার নেই কোনো নিশ্চয়তা, পরিবারের আয়ের অবস্থা নিম্ন, এমন সময় পরিবারের একজন সদস্যকে কমিয়ে বেঁচে থাকা খুব সহজ এক পদ্ধতি। এই বিষয়গুলোর জন্য দোষ না থাকা সত্ত্বেও বাল্যবিবাহের শিকার হাজার হাজার কিশোরী। অপরদিকে পরিবারে চালানো কষ্টসাধ্য হওয়ায় অনেক শিশুকে বেছে নিতে হচ্ছে বইয়ের বদলে কাজ। চারপাশে দেখলেই বোঝা যাচ্ছে করোনায় শিশুশ্রম বেড়েছে দ্বিগুণ। এই থেকে পরিত্রাণের উপায় তাদের জানা নেই। নিয়তি ভেবেই মেনে নিয়েছে অনেকেই।

ভিক্ষাবৃত্তি ও শিশু পাচার

বাড়িতে খাবারের অভাব কিংবা করোনায় পরিবারের স্বজন হারিয়ে অনেক শিশুই বেছে নিয়েছে ভিক্ষাবৃত্তি। মাথার উপর ঠাঁই নেই। রাস্তার পাশেই বসবাস করছে অনেক শিশু। করোনা ভয়াবহতার প্রথম দিকে নানা সংস্থা থেকে রাস্তার খাবার বিতরণের খাবার খেয়েও বেঁচে ছিল অনেক শিশু। এই দুঃসময়ে অর্থের নানাবিধ লোভ নিম্ন আয়ের পরিবারকে দেখিয়ে, বাচ্চাদেরকে ভুলিয়ে ভালিয়ে শিশু পাচারকারীদের সংখ্যাও উঠেছে মাথা নাড়া দিয়ে। ভয়াবহ এক সময়ের মধ্য দিয়ে বসবাস করছে এমন অনেক পরিবার।

পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে পিছিয়ে পড়া শিশুদের পরিসংখ্যান বাড়তে পারে আরও বেশি। এই মহামারীর সময়ে একে অপরকে সাহায্য ছাড়া কীভাবে আমরা মোকাবিলা করবো তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে বেশ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও মানুষের জীবনে একটা বড় পরিবর্তন ও মানসিক আঘাত হিসেবে থেকে যাবে এই করোনা ভাইরাসের দিনগুলো। তাই সকলের সহযোগিতায় শিশুরা ফিরে পেতে পারে সুন্দর ভবিষ্যত।

জান্নাতুল ফেরদৌস মোহনা : শিক্ষার্থী, পরিবেশ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

advertisement