advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

অবরুদ্ধ শৈশব : পড়ার ফাঁকে খেলা নয়, খেলার ফাঁকে পড়া

সজীব সরকার
১ অক্টোবর ২০২১ ০৫:২৪ পিএম | আপডেট: ১ অক্টোবর ২০২১ ০৫:২৪ পিএম
advertisement

নির্লজ্জভাবে বলা হয়, এখন সময়টা ‘প্রতিযোগিতার’। সব ব্যাপারেই। প্রতিযোগিতার এই সংস্কৃতি মানুষে মানুষে ব্যবধান বাড়াচ্ছে, বিদ্বেষ বাড়াচ্ছে, বিচ্ছেদ বাড়াচ্ছে। অথচ ইতিহাস সাক্ষি, প্রতিযোগিতা নয় বরং সহযোগিতার বদৌলতেই মানবজাতি শত-সহস্র বছর ধরে প্রতিকূল হাজারো দুর্যোগ মোকাবিলা করে এই পৃথিবীর বুকে টিকে রয়েছে।

প্রতিযোগিতা অর্থাৎ অন্যকে প্রতিপক্ষ বা শত্রু ভাবার এই শিক্ষা একেবারে শৈশব থেকে শুরু হয়। শিশুদের নিষ্পাপ মনে কলুষতার এই চাষাবাদ শুরু করেন মূলত অভিভাবকেরা; সমাজের অন্যরাও এতে পানি ও সার ঢালতে কার্পণ্য করে না! ভুল এই ‘চাষাবাদ প্রক্রিয়ার’ কারণে শিশুদের চোখে তাদের ক্লাসের বন্ধুরা ক্রমেই হয়ে উঠতে থাকে তাদের প্রতিপক্ষ, শত্রু। অন্যকে ঠেকিয়ে, সবাইকে ডিঙ্গিয়ে ‘আমাকেই’ জিততে হবে- বোধোদয় ঘটবার আগে থেকেই শিশুদের মনে এই প্রবণতার বিষ ঢালতে শুরু করে সবাই। ফলে সদ্ভাব ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষা শিশুরা পায় না। আর এ কারণে অনিবার্যভাবেই জীবনের প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের বদলে ডিগ্রি ও বৈষয়িক সাফল্য অর্জন মুখ্য হয়ে ওঠে; বন্ধুত্ব-সম্পর্ক-সহমর্মিতা স্বভাবতই উপেক্ষিত হয় এবং ব্যক্তি আত্মম্ভর ও স্বার্থপর হয়ে ওঠে।

এমন যখন জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, শৈশব তখন অনিবার্যভাবেই একটি ‘কারাগার’ হয়ে ওঠে; স্কুল আর পড়ার বাইরে শিশুদের জীবন থাকতে পারে- এমন কথা অভিভাবকরা ভাবতে নারাজ। সারা দিন কারণে-অকারণে পড়া, আর অভিভাবক নিতান্ত সদয় হলে পড়ার ফাঁকে এক-আধবেলা খেলার অনুমতি - এই হলো এখনকার শৈশব। অনেক অভিভাবকের ফিলসফি হলো, বাচ্চারা নিশ্চয়ই খেলবে, তবে পড়ার ফাঁকে। বিষয়টি কি আসলে এমন হওয়ার কথা ছিল? শিশুরা খেলবে, অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশবে, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া হবে আবার ঝগড়া মিটিয়ে মিলেমিশে থাকতে শিখবে - এভাবেই তো জীবন থেকে শিখবে তারা! শিশুরা মূলত খেলবে আর খেলার ফাঁকে ফাঁকে কিছু পড়াশোনা করবে। এই তো হওয়া উচিত শৈশব!

কাকডাকা ভোরে উঠে ঘুম জড়ানো চোখে স্কুলে যাওয়া, স্কুল শেষে কোচিং, বাসায় ফিরে গৃহশিক্ষকের কাছে পড়া... এই ‘কারাবাস’ একটি শিশুর জীবন হতে পারে না। শৈশবের নির্দোষ চাওয়া-পাওয়া মেটাতে দেওয়া জরুরি; না হলে পরিণত বয়সে ব্যক্তিত্বের সংকট দেখা দিতে পারে। ক্লাসরুমে আর পাঠ্যবইয়ের মধ্যে শিশুদের অবরুদ্ধ না রেখে তাদের মধ্যে জীবন ও জগত সম্পর্কে কৌতূহল জাগানো, প্রশ্ন করে জানার আগ্রহ ও নিজস্বতা গড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে হবে। খেলাধুলার মাধ্যমে শরীর ও মনের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সামাজিকতা শেখার সুযোগ তাদের দিতে হবে। ‘এখন পড়াশোনা, পরে অবসর’ - এই ফাঁকি দিয়ে আর কতদিন চলবে? শৈশবের আনন্দ পরিণত বয়সে ফিরেও আসে না, আর একে ওই বয়সে উপভোগও করা যায় না; আর পরিণত বয়সে থাকে জীবিকার চাপ। বার্ধক্যে অবসর পাওয়া যায় বটে, তবে তা কাটে রোগ-শোক-একাকিত্বে। এভাবে সারাজীবন মানুষ কেবল জীবিকার পেছনে ছোটে, জীবনের পেছনে নয়।

শিশুর জীবনকে কারাগার নয়, আনন্দমেলায় পরিণত করা দরকার। শিশুরা স্বস্তি পেলে, গুরুত্ব পেলে, আনন্দে সময় কাটালে আর জীবন-জগতকে খেলাচ্ছলে শিখতে পারলে জীবিকা কোনো সংকট হবে না।

লেখক : সজীব সরকার : সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারপারসন, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি। প্রতিষ্ঠাতা : মিডিয়াস্কুল ডট এক্সওয়াইজেড।

advertisement