advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

আমাদেরও ভাবার সুযোগ এসেছে

দুই সাংবাদিকের নোবেল

বিভুরঞ্জন সরকার
১০ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৯ অক্টোবর ২০২১ ১১:০৮ পিএম
advertisement

এবার শান্তির নোবেল পেলেন দুজন সাংবাদিক। তারা হলেন ফিলিপাইনের মারিয়া রেসা এবং রাশিয়ার দিমিত্রি মুরাতোভ। বাংলাদেশের কারও নাম থাকলে অবাকই হতাম। কারণ আমাদের দেশে গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকের সংখ্যা বাড়লেও সৎ ও সাহসী সাংবাদিকতায় ঘাটতি রয়েছে প্রচুর। সাংবাদিকতার পরিবেশ আমাদের দেশে মুক্ত নয়। বাধা বা ভয় শুধু সরকারের দিক থেকে নয়। আমাদের দেশে মুক্ত সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে অনেক উপাদান কাজ করে। সাংবাদিকদের নিজেদের দায়দায়িত্বও কম নয়। নানাবিধ স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও টানাপড়েন আমাদের দেশে এক ধরনের সমঝোতার সাংবাদিকতার ধারা তৈরি করেছে। অনিয়ম-দুর্নীতির খবর প্রচার সহজ নয়। কারণ যারা এসব অপকর্ম করে তাদের খুঁটির জোর প্রবল। সরকারকে অখুশি না করার একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রবণতাও কারও কারও মধ্যে আছে। এখন গণমাধ্যমের মালিকানা বড় বড় বিজনেস হাউসের হাতে। ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত না করে যতটুকু খবর প্রকাশ করা যায় ততটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে আমাদের। প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়তে হলে সাহসের সঙ্গে একটু খেপাটে মনোভাব বা পাগলামিও লাগে। একই সঙ্গে খেপাটে এবং সাহসী মানুষ।

তার পরও সীমিত সুযোগের সদ্ব্যবহার করে কেউ কেউ যে স্রোতের বিপরীতে হাঁটেন না, হাঁটার চেষ্টা করেন না তা নয়। তবে কর্তৃত্ববাদী মনোভাব যদি সরকার ছাড়া গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়, তা হলে পরিস্থিতি জটিল হয়। আমাদের দেশের গণমাধ্যম এক বিচিত্র সময় অতিক্রম করছে। নোবেল তালিকায় পৌঁছতে আমাদের আরও বহুদূর যেতে হবে।

আমি নিজে একেবারেই সাহসী মানুষ নই। কেউ পেশার ক্ষেত্রে সাহসের পরিচয় দিলে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কুণ্ঠাবোধ করি না। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে জড়িত আছি বলেই হয়তো বহু বছর পর দুই সাহসী সাংবাদিকের নোবেল জয়ে যেন একটু বেশিই আনন্দিতই হয়েছি। ৮৫ বছর পর নোবেলজয়ী হিসেবে সাংবাদিকের নাম উঠল। এর আগে ১৯৩৫ সালে জার্মান সাংবাদিক কার্ল ফন ওজিয়েতস্কি শান্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি এই দুই সাংবাদিকের নাম ঘোষণা করে বলেছে, ফিলিপাইন ও রাশিয়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় সাহসী লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবে এরা শান্তি পুরস্কার পাচ্ছেন।

ফিলিপাইনের অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম র‌্যাপলারের সহপ্রতিষ্ঠাতা মারিয়া রেসা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, নোবেল জয়ের খবর তাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই পুরস্কারকে সাংবাদিকতার স্বীকৃতি হিসেবে দেখার কথা জানিয়ে তিনি বলেছেন, প্রকৃত ঘটনা ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়, বাস্তব চিত্র ছাড়া একটি পৃথিবী মানে সত্য আর বিশ্বাসহীন একটি পৃথিবী।

বিবিসি লিখেছে, ফেসবুকে র‌্যাপলারের ৪৫ লাখ অনুসারী রয়েছেন। মেধাবী বিশ্লেষণ আর কৌশলী অনুসন্ধানের কারণে পরিচিত হয়ে উঠেছে সংবাদমাধ্যমটি। ফিলিপাইনের মাত্র অল্প কয়েকটি সংবাদমাধ্যম প্রেসিডেন্ট রদরিগো দুতার্তে এবং তার নীতির খোলাখুলি সমালোচনা করে। সেখানে দুতার্তের বিতর্কিত ও সহিংস মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে সবিস্তারে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে র‌্যাপলার। এ ছাড়া প্রেসিডেন্টের নারী বিদ্বেষ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দুর্নীতিরও খবরও প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যমটি।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারের ছড়ানো মিথ্যা প্রচারের বিষয়ে নিজেই প্রতিবেদন লিখেছেন মারিয়া রেসা। তাকে বেশ কিছু মামলারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। তার ভাষায়, এসব মামলা ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’।

শান্তিতে নোবেল পাবেন- এমন প্রত্যাশা রুশ সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতোভেরও ছিল না। টেলিগ্রাম চ্যানেল পডিয়মকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই পুরস্কার রাশিয়ার নিষ্পেষিত সাংবাদিকতার জবাব।

দিমিত্রি মুরাতোভ রাশিয়ার অনুসন্ধানী সংবাদপত্র নোভায়া গেজেতার সহপ্রতিষ্ঠাতা। ১৯৯৩ সালে প্রকাশের পর থেকেই তিনি এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাশিয়ার ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের এবং বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের কড়া সমালোচক গুটিকয় সংবাদপত্রের একটি এই নোভায়া গেজেতা। পত্রিকাটি সপ্তাহে ছাপা হয় তিনবার, তাতে নিয়মিতভাবে দুর্নীতির অভিযোগ এবং শাসকদের নানা অনিয়মের বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবদেন থাকে। তুলে ধরা হয় নির্যাতনের শিকার সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের চিত্র।

সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের তথ্য অনুযায়ী, নোভায়া গেজেটার অন্তত ছয়জন সাংবাদিককে প্রাণ দিতে হয়েছে সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে। চেচনিয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে প্রতিবেদনসহ আরও বেশ কিছু সংবাদের কারণে পত্রিকাটিকে হেনস্তা এবং হুমকি মোকাবিলা করতে হয়েছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্ভাচেভের পর সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতোভ হলেন প্রথম রুশ নাগরিক, যিনি শান্তিতে নোবেল পেলেন।

৫৯ বছর বয়সী মুরাতোভ দেশটির অনুসন্ধানী সংবাদপত্র নোভায়া গেজেটার প্রধান সম্পাদক। গর্ভাচেভ ১৯৯০ সালে তার নোবেল পুরস্কারের অর্থ দিয়ে পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছিলেন। সেই টাকায় কেনা একটি কম্পিউটার এখনো পত্রিকাটির অফিসে প্রদর্শনী হিসেবে রাখা আছে।

মারিয়া রেসাকে পুরস্কার দেওয়ার বিষয়ে নরওয়ের নোবেল ইনস্টিটিউট বলেছে, ফিলিপাইনে ক্ষমতার অপব্যবহার, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা এবং কর্তৃত্ববাদী সরকারের মুখোশ উন্মোচনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার শক্তিকে ব্যবহার করেছেন এই ফিলিপিনো সাংবাদিক। একজন সাংবাদিক এবং র‌্যাপলারের সিইও হিসেবে রেসা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষের একজন নির্ভীক যোদ্ধা হিসেবে। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ডিজিটাল মাধ্যম র‌্যাপলারের সহপ্রতিষ্ঠাতা মারিয়া এখন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান। মারিয়া রেসা প্রায় দুই দশক অনুসন্ধানী প্রতিবেদক হিসেবে মার্কিন সম্প্রচার মাধ্যম সিএনএনে কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক প্রতিবেদক। ২০২০ সালে ফিলিপাইনের বিতর্কিত অ্যান্ট-সাইবার ক্রাইম আইনে অভিযুক্ত হয়েছিলেন রেসা। এ আইন দিয়ে ফিলিপাইন সরকার মূলত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে দমাতে চেয়েছিল। ২০১৮ সালে মিথ্যা খবরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য টাইমস পারসন অব দ্য ইয়ারে নাম ওঠে রেসার। প্যারিসভিত্তিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের শীর্ষ ২৫ ব্যক্তিত্বের মধ্যে অন্যতম মারিয়া রেসা।

প্রেসিডেন্ট দুতার্তের বিতর্কিত মাদকবিরোধী অভিযানে হত্যার ঘটনাগুলো তুলে ধরতে র‌্যাপলারের সাহসী ভূমিকার কথা তুলে ধরে নোবেল কমিটি বলেছে, নিহতের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে, ওই মাদকবিরোধী অভিযান নিজের দেশের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের রূপ পেয়েছিল। তা ছাড়া ভুয়া খবর ছড়াতে, সরকারবিরোধীদের নাজেহাল করতে, জনমতকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রভাবিত করতে কীভাবে সেখানে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করা হয়েছে, তাও তুলে ধরেছেন রেসা এবং র‌্যাপলার।

দিমিত্রি আন্দ্রেইভিচ মুরাতোভকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে নোবেল কমিটি বলেছে, রাশিয়ায় ক্রমাগত বাড়তে থাকা চ্যালেঞ্জিং এক পরিস্থিতির মধ্যে কয়েক দশক ধরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই করে আসছেন নোভায়া গেজেটার এই প্রধান সম্পাদক। নোভায়া গেজেটা বর্তমানে রাশিয়ায় সবচেয়ে স্বাধীন সংবাদপত্র এবং ক্ষমতাকেন্দ্রের বিরুদ্ধে তাদের মৌলিক সমালোচনার ভূমিকা রয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা এবং একনিষ্ঠ পেশাদারিত্বের মাধ্যমে এ সংবাদপত্রটি তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে, যেখানে রুশ সমাজের প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে খুব কম সংবাদমাধ্যমই সে ভূমিকা রাখছে।

নোবেল কমিটি বলছে, ১৯৯৩ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে দুর্নীতি, পুলিশের সহিংসতা, বেআইনি গ্রেপ্তার, ভোট জালিয়াতি এবং রাশিয়ার ভেতরে ও বাইরে রুশ সেনাবাহিনীর অনলাইন অপপ্রচার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে নোভায়া গেজেটা। সেজন্য নোভোয়া গেজেটার কর্মীদের হেনস্তা, হুমকি, সহিংসতা এবং হত্যার শিকারও হতে হয়েছে। এ সংবাদপত্রের যে ছয়জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে চেচনিয়া যুদ্ধের আসল পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন লেখা আনা পলিতকোভস্কায়াও রয়েছেন।

নোবেল কমিটি বলেছে, হত্যা আর হুমকির মধ্যেও প্রধান সম্পাদক মুরাতোভ সংবাদপত্রটির স্বাধীন নীতিমালা ত্যাগ করেননি। তিনি ধারাবাহিকভাবে সাংবাদিকতার অধিকারের জন্য লড়েছেন, সাংবাদিকতার পেশাদার এবং নৈতিক মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে যে কোনো কিছুই লিখতে চেয়েছেন, যা তারা লিখতে চান।

দিমিত্রি মুরাতভ ১৯৯৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত রুশ নোভায়া গেজেটা পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ছিলেন। দিমিত্রি মুরাতোভের সময়ে নোভায়া গেজেটাকে রাশিয়ার সত্যিকারের একমাত্র সমালোচনামূলক সংবাদপত্র বলা হতো। পত্রিকাটি সরকারের বিভিন্ন দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে প্রতিবেদন ছাপানোর জন্য খ্যাতি পেয়েছিল। দিমিত্রি মুরাতোভ ২০০৭ সালে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টের ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ফ্রিডম অ্যাওয়ার্ড জেতেন। ২০১০ সালের ২৯ মে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় অবদানের জন্য নেদারল্যান্ডসের ফোর ফ্রিডম অ্যাওয়ার্ড জেতে দিমিত্রি মুরাতোভের সম্পাদিত নোভায়া গেজেটা পত্রিকা।

নোবেল কমিটি বলছে, ‘আজকের এই সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর মুক্ত সংবাদপত্র ছাড়া দেশে দেশে মৈত্রী, নিরস্ত্রীকরণ কিংবা বিশ্বজুড়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে সফলভাবে এগিয়ে নেওয়া কঠিন। তাই এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কারের যে ঘোষণা, তা আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। নোবেল কমিটির প্রধান বেরিট রেইস-অ্যান্ডারসেন বলেন, বিশ্বে গণতন্ত্র আর সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যখন ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে; তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যারা এই আদর্শের জন্য লড়াই করে চলেছেন, সেসব সাংবাদিকের প্রতিনিধিত্ব করছেন মারিয়া রেসা ও দিমিত্রি মুরাতোভ।

মারিয়া রেসা এবং দিমিত্রি মুরাতোভের নোবেল জয় কি আমাদের দেশের গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের জন্য কোনো বিশেষ বার্তা দিতে পারছে? আমাদের দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত, নাকি অবারিত তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। আমাদের দেশে সরকার, বিরোধী দল, উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীÑ কেউ সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না। যুক্তির শক্তির চেয়ে গায়ের জোরের শক্তি দিয়ে জয়ের চেষ্টা চলায় কার্যত দেশে ভয়ের সংস্কৃতির বিস্তার ঘটছে। গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের জন্য মুক্ত পরিবেশের কথা এখনো অনেকটা কথার কথা হয়ে আছে। এবার নোবেল শান্তি পুরস্কার দুই সাংবাদিক পাওয়ায় অনেক কিছু ভাবার সুযোগ সামনে এসেছে।

বিভুরঞ্জন সরকার : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক। সহকারী সম্পাদক, আজকের পত্রিকা

advertisement