advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

নারী নিপীড়ন রোধে আইনের প্রয়োগ জরুরি

সঙ্গীতা ইমাম
১২ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২১ ১১:৫৭ পিএম
advertisement

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি মামলার বিষয়ে ৪ অক্টোবর বিচারিক দৃষ্টান্ত আমরা দেখলাম। প্রথমটি রায় ঘোষণা সংক্রান্ত এবং দ্বিতীয়টি রায় কার্যকর সংক্রান্ত। ২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাসপুর ইউনিয়নের জয়কৃষ্ণপুর গ্রামে এক নারীর ওপর বীভৎস নির্যাতনের মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। আর ওইদিন রাত পৌনে ১১টাতেই কার্যকর হয়েছে ১৮ বছর আগের একটি নারী নির্যাতন ও হত্যা মামলার সর্বোচ্চ শাস্তির রায়। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ঘটনাটি আমরা কমবেশি জানি- যেহেতু নিকট অতীতের ঘটনা। কিন্তু ২০০৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর চুয়াডাঙ্গার আমলডাঙ্গা উপজেলার জোরগাছা হাজিরপাড়া গ্রামে সংঘটিত নারকীয় হত্যাকা-ের ঘটনাটি হয়তো অনেকেরই মনে নেই। দুই নারীকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করেছিল মৃত্যুদ-ের শাস্তিপ্রাপ্ত অপরাধীরা। ঘটনার পরদিন মামলা করা হলেও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুন্যাল আদালত তিন ধর্ষক সুজন, আজিজ ও মিন্টুকে মৃত্যুদ-ের সাজা দেন ২০০৭ সালের ২৬ জুলাই। অর্থাৎ মামলা হওয়ার প্রায় চার বছর পর। তার পর উচ্চ আদালতে আসামিদের আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে মামলা চলে আরও ১৪ বছর। সবশেষে চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ দুই আসামির মৃত্যুদ-ের রায় বহাল রাখেন এবং ৪ অক্টোবর ওই রায় কার্যকর করা হয়।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ঘটনায় অপরাধীদের শাস্তির বিষয়টি নিঃসন্দেহে অনেক দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে। এক বছরে ১২ কার্যদিবসে ধর্ষণ মামলাটির রায় ঘোষিত হয়। এই রায়ে আসামি দেলোয়ার ও আবুল কালামের যাবজ্জীবন কারাদ- প্রদান করেন আদালত। এই মামলা এবং দ্রুত সময়ে রায় ঘোষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কেননা এই ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, নারী নির্যাতনের অপরাধ মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রতা বিচার বিভাগের সদিচ্ছার জোরেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। যে দীর্ঘ সময় ধরে চুয়াডাঙ্গার আমলডাঙ্গায় সংঘটিত অপরাধীদের বিচারকাজ চলেছে, এতে অনেক সময় বিচারের সূত্রই হারিয়ে যায়। এভাবেই বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে বহু নারী নিপীড়ন মামলার কোনো সুষ্ঠু বিচার হয়নি। বহু অপরাধী আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে গেছে এবং আবারও অপরাধ সংঘটনের ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে। এখনো যে এমনটা হচ্ছে না, এ কথা কি জোর দিয়ে বলা যায়? গত এক দশকে ঘটে যাওয়া কয়টি ধর্ষণ মামলার কার্যক্রম সমাপ্ত হয়েছে? কোনো কোনো ঘটনা তো ধামাচাপাই পড়ে গেছে নানা প্রভাবশালী মহলের জোরে। ফলে বেগমগঞ্জে সংঘটিত এই নৃশংস অপরাধের রায় যে আমরা দ্রুততম সময়ে পেলাম এবং কুখ্যাত দেলোয়ার বাহিনীর ধর্ষকরা যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেয়েছে, এ বিষয়টি নিশ্চয়ই আশা জাগায়। এ ছাড়া এ রায় ধর্ষণের শিকার নারী এবং তাদের পরিবারকে প্রতিবাদী হতে সাহস ও শক্তি জোগাবে বলে বিশ্বাস করি।

দুই. আমাদের দেশে ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। নারীর প্রতি অবমাননা, তাচ্ছিল্য, নারীকে হেয় করার পারিবারিক, সামাজিক এবং কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় প্রবণতাও এ জন্য দায়ী। ধর্ষণের মতো অপরাধ সংঘটনের পেছনে অপরাধীদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে নিয়ে কাজ করেছেন অনেক গবেষক। তাদের নানা আলোচনায় একটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, ধর্ষণের পেছনে পুরুষের আধিপত্যবাদী মনোভাব প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল থাকে। এ অপরাধীদের সিংহভাগই মৃত্যুদ-ের সাজা ঘোষণার সময়ও তাদের অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হয় না অর্থাৎ ন্যূনতম বিবেক বা সুস্থ মানসিকতা তাদের মধ্যে বিরাজ করে না, এমনকি কারাগারে কিংবা বিচার প্রক্রিয়া চলার সময়ও সেটি গড়ে ওঠে না। ফলে কেবল ধর্ষণই নয়, নারীর বিরুদ্ধে যে কোনো যৌন নিপীড়নের ঘটনা বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায়- অপরাধীরা এক ধরনের পুরুষতান্ত্রিক আগ্রাসী মনোভাবের কারণেই এ ধরনের অপরাধ সংঘটন করে থাকে। আর এ পুরুষতান্ত্রিক আগ্রাসী মনোভাবটি তৈরি হয় আমাদেরই চারপাশের পরিবেশ থেকে। ব্যক্তির জীবন, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, এমনকি আন্তর্জাতিক পরিম-লও এর বাইরে নয়।

বাংলাদেশেই কেবল নয়, পৃথিবীর যে কোনো রাষ্ট্রেই পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশ, ভারত বা দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পরিবারের প্রভাব সম্ভবত একটু বেশি ও স্বতন্ত্র। এ রাষ্ট্রগুলোয় ব্যক্তির বিকাশ পর্বে পরিবারই মূল ভূমিকা পালন করে থাকে বা পরিবারের কাছেই ব্যক্তি বারবার ফিরে আসে। ফলে পারিবারিক জীবনযাপন, চর্চা বা পরিবার থেকে শেখা দাম্পত্যজীবনের নানা বিষয়েই ব্যক্তির ওপর প্রভাব ফেলে।

পরিবারে প্রতিনিয়ত নারীকে মানসিকভাবে নির্যাতিত বা অসম্মানিত হতে দেখলে সেটি যেমন পরিবারের শিশুদের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে, তেমনি যেসব পরিবারে নারী শারীরিকভাবে নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত হন- ওইসব পরিবারের শিশুদের বিকাশ কেবল বাধাগ্রস্তই হয় না, বিকৃতও হয়। পরিবারের পুরুষ শিশু ধরেই নেয়, নারীর প্রতি পুরুষ আচরণ এমন জঘন্য হবে। আর নারীশিশু ধরেই নেয় তার ভবিষ্যৎও এমনটি হওয়াই স্বাভাবিক। তাই পরিবারই হচ্ছে নারীর প্রতি আচরণ শিক্ষার প্রথম প্রতিষ্ঠান। শিশুকাল থেকেই যদি নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণগুলো যে অন্যায়, তা একজন শিশুকে বোঝানো যায়- তা হলে সে বড় হয়ে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে এবং তার ব্যক্তি ও দাম্পত্যজীবনে এই আদর্শের চর্চা করবে। মানুষের প্রতি মানুষ কখনো আগ্রাসী হতে পারে না, সব মানুষই সমান- এ বোধটি শিশুর মধ্যে তৈরি করার প্রাথমিক দায়িত্ব পরিবারের।

পরিবারের পরেই আসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম এখন অনেকটাই পাল্টেছে। শিক্ষা প্রদানের গতানুগতিক মুখস্থনির্ভর ধরনের বাইরে সৃজনশীল ধারার বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধারায় শিক্ষালাভ করা শিক্ষার্থীরা কি পরিপূর্ণ মনুষ্যত্ববোধ নিয়ে বেড়ে উঠতে পারছে? শিক্ষা ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের যে বৈষম্যটি আমরা দেখতে পাই- এর সূত্রপাত যদিও ঘটে পরিবার থেকে, তবুও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই বৈষম্য বিলোপের চেতনা নির্মাণ করা। এ ক্ষেত্রে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যবইয়ের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।

তিন. নারীর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অপরাধ সংঘটিত হলে আমাদের সমাজেই একদল মানুষ পাওয়া যায়- যারা সমস্যাটির সমাধান না খুঁজে বা অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিষয়ে আলোচনা না করে উল্টো অপরাধের শিকার নারীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান। এই বিভ্রান্তিকর মানসিকতার মূলেও রয়েছে নারীর প্রতি সমাজের আধিপত্যবাদী মনোভাব। এ মনোভাব যে দিনে দিনে কত প্রকট হয়ে উঠছে, এর প্রমাণ মেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা জায়গায়। ধর্ষণের মতো নৃশংস ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য নারীর পোশাক বা জীবনাচরণের খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করানো মানুষও যে শেষ পর্যন্ত ওই অপরাধেরই সমার্থক- এ কথা স্পষ্টই বোঝা যায়। মানুষের পোশাক বা জীবনাচরণের একটি ব্যক্তিগত দর্শন থাকে। সব সময় তার সঙ্গে ভৌগোলিক সংস্কৃতি বা জীবনাচরণ মিলবে- এ কথা বলা যায় না। কিন্তু এসব ঊনযুক্তি দিয়ে নারীর প্রতি নিপীড়নকে বৈধ করার যে অপচেষ্টা, তা রুখে দেওয়াটা কেবল আইনের পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য সামগ্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষণকারীদের বিচারের রায় হওয়ার ঘটনা সত্যিকার অর্থেই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। ধর্ষণের শিকার নারীর পক্ষে রায় পেতে দেখে অনেকেই ধর্ষণকারীর বিরুদ্ধে আইনি লড়াইটি চালিয়ে যেতে মানসিক ও সামাজিক সমর্থন পাবেন বলে মনে করি। তা ছাড়া চুয়াডাঙ্গার আমলডাঙ্গার ঘটনায় যে ধর্ষণের শাস্তির রায় কার্যকর হয়েছে (১৮ বছর পর হলেও হয়েছে), এটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। অপরাধীদের অনেকে মনে করে, কোনোভাবে ধামাচাপা দিতে পারলেই বুঝি পার পাওয়া যাবে। কিন্তু আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে যে সেটি সম্ভব নয়, এর প্রমাণও আমাদের হাতে আছে। তবে তা সংখ্যায় খুব কম।

সঙ্গীতা ইমাম : কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী

advertisement