advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

ছড়াসাহিত্যের জাদুকর রফিকুল হক দাদুভাই

আমীরুল ইসলাম
১২ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২১ ১১:৫৭ পিএম
advertisement

আমার অতিপ্রিয় এক ছড়াকবির নাম রফিকুল হক। পঞ্চাশের দশকে তার লেখালেখির সূচনা। দীর্ঘজীবন তিনি ছড়ার সঙ্গে যুক্ত। তার রক্তে ছড়ার সুর প্রবহমান। তিনি ছড়ার ছন্দে কথা বলেন। তিনি ছড়ার মতোই জীবনযাপন করেন। রাজসিক এবং বর্ণাঢ্য তার জীবন। লৌকিক ঐতিহ্যের সুরে রঙ মিশিয়ে তিনি আধুনিক ছড়া রূপায়িত করেন। মূল ধারার প্রকৃত ছড়াকবি তিনি। তিনি আজীবন সৎ ছড়া লিখেছেন। কখনো ভেজাল ছড়া লেখেননি। বিপুল বিস্তারিত তার ছড়ার পৃথিবী। অজস্র লিখেছেন। লিখেছেন বলা ঠিক হবে না। তিনি ছড়া বানিয়ে তোলেন। মায়ের হৃদয়ের আকুতি তার ছড়ার ছত্রে ছত্রে। ভালোবাসার গন্ধ পাওয়া যায় রফিকুল হক দাদুভাইয়ের ছড়ায়। আশ্চর্য রকমের মৌলিক তার ছড়া। কখনো মনে হয় না যে এসব ছড়ার কোনো লেখক আছে। যেন শত শত বছর ধরে মায়েদের মুখে মুখে তৈরি হওয়া ছড়া। রফিকুল হক তাই প্রকৃত ছড়াকার। বাঘের ছাল পরিধান করে তিনি বাঘের দলে প্রবেশ করেন না। বাঘের মতোই তিনি ছড়ায় গর্জন করেন। আমাদের কালে ছড়া নিয়ে সবচেয়ে বেশি উচ্চকণ্ঠ ছিলেন রফিকুল হক দাদুভাই। ছড়ার প্রতি তীব্র আসক্তি ও ভালোবাসায় সমগ্র জীবন তিনি কাটালেন। তার এক পোশাকি নাম দাদুভাই। চাঁদের হাট সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসাবে তিনি আমাদের সবার প্রিয় দাদুভাই। তিনি শিশুসাহিত্যের পাতা সম্পাদনা সূত্রে অনেক লেখক তৈরি করেছেন। তার ¯েœহছায়ায় লালিত-পালিত হয়েছেন, প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন আজকের অনেক খ্যাতনামা লেখক। আমিও সেই মিছিলের শেষ সারির একজন সৈনিক। দাদুভাইয়ের ব্যক্তিগত মধুর ব্যবহারে আমরা মুগ্ধ হতাম। তিনি নিরাভরণ, সহজ শিশুতোষ, আন্তরিক এক ব্যক্তি। রাশভারি গুরুগম্ভীর চেহারায় দাদুভাইকে কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। দেশের সব শিশু-কিশোর ছিল তার কাছে চাঁদমনি। চাঁদের হাটের বন্ধু। দাদুভাই খুব অমায়িক। কখনো ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি। বাংলা একাডেমি পুরস্কারও পেয়েছেন তার শিষ্যদের প্রাপ্তির পরে। তা নিয়ে তার কোনো খেদোক্তি শুনিনি। শিষ্যদের সাফল্যে তাকে আনন্দিত হতে দেখেছি। এমন সদগুণসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব আমাদের সমাজে খুব কম আছে। এক সময় সারাদেশে চাঁদের হাট সংগঠন খুব জোরদার ছিল। দাদুভাই সব চাঁদের হাটের শাখার কর্তাব্যক্তিদের নামে চিনতেন। অসম্ভব স্মৃতিধর তিনি। তার ভা-ারে জমা থাকত অনেক গল্প। তিনি তার পূর্ববর্তী অগ্রজ লেখকদের কাছে প্রিয়পাত্র ছিলেন। অনুজ লেখকদের কাছে প্রেরণাদাতা হিসেবে অকুণ্ঠ ভালোবাসা পেয়েছেন।

রফিকুল হক দাদুভাইয়ের নানামাত্রিক পরিচয়। তিনি প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে জড়িত। তিনি দৈনিক পত্রিকায় ছোটদের পাতার সম্পাদক হিসেবেও সুখ্যাত। ছোটদের একমাত্র কিশোর সাপ্তাহিক ‘কিশোর বাংলা’র তিনি দীর্ঘদিন সম্পাদক

ছিলেন। তিনি চাঁদের হাট শিশু সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। এতসব বড় বড় পরিচয়ের বাইরে তার আসল পরিচয় একজন নিবেদিতপ্রাণ ছড়াকার হিসেবে। প্রায় ষাট বছর ধরে তিনি ছড়া লিখে চলেছেন। অন্নদাশঙ্কর রায় ছাড়া এত দীর্ঘকাল কোনো ছড়াকার ছড়াচর্চা অব্যাহত রাখেননি। দাদুভাইয়ের রক্তে ছড়ারা প্রলয় নৃত্য করে। তিনি ছড়াসর্বস্ব প্রাণ। তার তুলনা তিনি নিজেই।

দুই ছড়ার আইকন বলে যদি কিছু বোঝায় তবে সেটা রফিকুল হক দাদুভাই। তিনি আমার আদর্শ ছড়াকবি। দূর শৈশবে দাদুভাইয়ের ছড়ার আনন্দ রস উপভোগ না করলে হয়তো আমরা ছড়াই লিখতাম না। আমাদের ছড়াপ্রেম তৈরির নেপথ্যে দাদুভাইয়ের সরব প্রভাব রয়েছে।

দ্বিধাহীনভাবে স্বীকার করি যে, আমার ছড়া রচনার গুরু প্রকৃতপক্ষে রফিকুল হক দাদুভাই। স্কুলজীবনে যখন ছড়া লেখা শুরু করি তখন আমাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করে রফিকুল হকের ছড়া। তখনো তার কোনো ছড়াগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। পুরনো টাপুর টুপুর, কিশোর বাংলা, শিশু, সাত ভাই চম্পায় তার ছড়া পড়তাম। জাদুকরী, মোহনীয় শক্তি ছিল তার ছড়ায়। একটা ছড়া দু-তিনবার পাঠ করলেই কিছু পঙ্্ক্তি চিরকালের জন্য স্মৃতিতে গেঁথে থাকত। দাদুভাই সহজ সরল সৎ ছড়া লিখেছেন। লোকছড়ার সুর ও ছন্দে তিনি আধুনিক কালের ভাবনাকে তুলে ধরেছেন। তার ছড়ায় চিরকালের সম্বন্ধযুক্ত। চকিত চটুল যে উজ্জ্বলতা দাদুভাইয়ের ছড়া পড়লে সেটা উপলব্ধি করা যায়। দৈনিক পত্রিকায় প্রতিদিন ছড়া লেখার প্রচলন দাদুভাইয়ের হাত দিয়ে। সমকালীন বিষয় নিয়ে তিনি ফোঁড়ন কেটে ছড়া লিখে থাকেন। দাদুভাইয়ের এই তরুণ তাজা হৃদয়কে আমরা ঈর্ষা করি। তার ছড়ার সতেজতায় মুগ্ধ হই। তিনি কোনো উপাধি পাননি। ছড়াসম্রাট, ছড়ার জাদুকর এমন কোনো উজ্জ্বল বিশেষণে তিনি ভূষিত নন। কিন্তু আমরা জানি যে, তিনিই প্রকৃত ছড়াকার। তিনিই ছড়া কেটে কেটে জীবনকে পূর্ণভাবে উপভোগ করেছেন।

আশি ঊর্ধ্ব একজন তরুণ বন্ধু আমাদের রফিকুল হক দাদুভাই। পঁচাশি ছুঁই ছুঁই তরুণ ছিলেন তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিয়মিত অফিস করেছেন। সুঠাম দেহের অধিকারী। ঢাকার বাইরে যে কোনো ছড়া উৎসবে তিনি সশরীরে উপস্থিত হতেন। হইচই আনন্দে তার দিন কাটত।

কবি আসলাম সানী তার বন্ধু। আবার কবি আল মাহমুদও তার বন্ধু ছিলেন। ইমরান পরশ, মামুন সারওয়ারও তার তরুণ বন্ধু। এক আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব দাদুভাই। বয়স তার কাছে কোনো বাধা ছিল না। ৮০ ঊর্ধ্ব বয়সেও গোগ্রাসে পোলাও বিরানি খেতেন। পারিবারিক শাসন তিনি মানতেন না। বাংলা আধুনিক ছড়ার সাফল্যের সঙ্গে দাদুভাইয়ের নাম প্রথম পঙ্্ক্তিতে যুক্ত হয়ে আছে। দাদুভাই, আপনাকে শত সহস্র শ্রদ্ধা ভালোবাসা। আমাদের অনন্ত শোকের সাগরে ভাসিয়ে কোথায় গেলেন আপনি।

আমীরুল ইসলাম : শিশুসাহিত্যিক

advertisement