advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

পাঠকের লেখা
প্লাস্টিক দূষণ রোধ করতে হবে

ড. লিটন মহন্ত
১৪ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২১ ১১:০১ পিএম
advertisement

বর্তমান পৃথিবীর মানুষ বহুমাত্রিক দূষণ দ্বারা আক্রান্ত। প্রায় সব ধরনের দূষণের জন্য আমরাই দায়ী। আমরাই এ পৃথিবীর পরিবেশ দূষিত করে মানুষের বসবাস অযোগ্য করে গড়ে তুলছি। এ কারণে পৃথিবীতে বসবাসরত প্রতিটি জীব এই দূষণের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের যদি মানুষের মতো মুখে ভাষা থাকত, তা হলে অবশ্যই তারা এতদিনে পৃথিবীর মানুষকে ধিক্কার জানাত।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৫০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে পৃথিবীতে জমা হওয়া প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ ছিল ৬৩০ কোটি টন। অবাক হওয়ার তথ্য হচ্ছে, জমা হওয়া ওই বর্জ্যরে ৭৯ শতাংশ এখনো পৃথিবীতে বিদ্যমান আছে। আর যদি প্লাস্টিক বর্জ্যরে এ ধারা অব্যাহত থাকে, তা হলে ২০৫০ সালে প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ ১ হাজার ২০০ টনে গিয়ে দাঁড়াবে। তা পৃথিবীতে বসবাসকারী জীবের জন্য হুমকিস্বরূপ। প্লাস্টিকের অপব্যবহারের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের জলজপ্রাণী আজ হুমকির মুখে। কারণ আমরা রাস্তঘাট ও ড্রেন যে প্লাস্টিক বর্জ্যগুলো ফেলি, তা বৃষ্টির পানিতে ভেসে নদীপথ হয়ে সোজা সমুদ্রে পতিত হয়। আর এই প্লাস্টিকগুলো সমুদ্রে বছরের পর বছর ধরে বিদ্যমান থাকে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিমিনিটে সাগরে পতিত হওয়া প্লাস্টিক বোতল ও ব্যাগের সংখ্যা প্রায় ৩৩ হাজার ৮০০টি। প্রতিবছরে তা ১৩ মিলিয়ন টনে গিয়ে দাঁড়ায়। এভাবে চলতে থাকলে দেখা যাচ্ছে, ২০৫০ সালে মাছের চেয়ে সমুদ্রে প্লাস্টিকের তৈরি দ্রব্যাদি বেশি থাকবে।

আমাদের অতিরিক্ত প্লাস্টিক ব্যবহার করা অনেকটা ‘নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার মতো।’ বাজার থেকে মাছ, মাংস, ডিম কিনে আনার পর প্লাস্টিকের পাত্রভরে আমরা রেফ্রিজারেটরে রেখে দিই। কিন্তু এই পাত্র পোড়ালে তা থেকে নির্গত স্টাইরিন গ্যাস নিঃশ্বাসের মাধ্যমে বা লোমকূপ দিয়ে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে এবং মাথাধরা, ক্লান্তি, দুর্বলতা, এমনকি স্নায়ুতন্ত্র বিকল হওয়ার মতো জটিল রোগের সৃষ্টি করে। সমুদ্রে জমে থাকা প্লাস্টিকের ওপর যখন সূর্যের আলো পড়ে, তখন সেটি মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। আর এই মাইক্রোপ্লাস্টিক মাছের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে।

সময় এসেছে প্লাস্টিক দূষণ তীব্রতর রূপ ধারণের আগে এটিকে প্রতিহত করার। প্লাস্টিক দূষণ রোধে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে রিসাইক্লিং। মানে, একবার ব্যবহার করা হয়েছে তেমন প্লাস্টিকগুলো ফেলে না দিয়ে আবার ব্যবহার করা। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে জাপান। তা ছাড়া ৫০ মাইক্রনের কম পুরু প্লাস্টিকগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা এখন সময়ের দাবি। প্লাস্টিক ব্যাগের পরিবর্তে কাপড় বা পাটের তৈরি ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যেমন জরুরি, ঠিক তেমনিভাবে এই প্লাস্টিক দূষণের মারাত্মক ক্ষতির দিক জনগণের সামনে তুলে ধরাও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ^বিদ্যালয়ের গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকা শহরের চারপাশের জলাশয়ে যেসব মাছ পাওয়া যায়, এগুলোর মধ্যে কিছু প্রজাতিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এ বিষয়টি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সময়মতো আমাদের সচেতনতার অভাবে খাদ্যচক্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক ঢুকে গেছে। এই খাদ্যচক্রে দূষণের পরিণতি কতটা ভয়াবহ, তা আমরা বুঝতে পারছি না। বিভিন্ন দূষণের কারণে মানুষের মধ্যে যেমন মারাত্মক সব রোগের মাত্রা বেড়ে গেছে, ঠিক তেমনিভাবে নবজাতকদের মানসিক বিকাশের অভাব বা প্রতিবন্ধী শিশুর জন্মের হার অনেক বেড়ে গেছে।

পরিবেশকে আমরা যতখানি দেব, পরিবেশ ঠিক আমাদের ততখানিই ফেরত দেবে।

আমরা হয়তো পুরোপুরি প্লাস্টিকর দুনিয়া থেকে বের হয়ে আসতে পারব না। কিন্তু এটি ব্যবহারে আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারব। এক সময় আমরা ছোটবেলায় দেখতাম আমাদের বাবা-কাকারা ছটের ব্যাগ হাতে বাজারে যেতেন আবার বাজার শেষে ওই ব্যাগ ধুয়ে রোদে শুকাতে দিতেন। কিন্তু এখন ওই দৃশ্য দেখা বড়ই দুরূহ। আসুন, আমরা সবাই নিজেদের অবস্থান থেকে অন্তত একটি চটের ব্যাগ কিনে বাজারে যাই এবং ওই ব্যাগে বাজার করি। আপনাকে দেখে হয়তো অন্যরাও অনুপ্রাণিত হবেন। পরিবেশের জন্য আপনার এই মহৎ উদ্যোগটুকু আপনার মনের ভেতর যে ভালো লাগা তৈরি কবে, তা সত্যিই অনন্য ও অসাধারণ। আসুন, অন্তরে ওই আনন্দটুকু দীর্ঘ সময় ধরে জিইয়ে রাখি।

ড. লিটন মহন্ত : গল্পকার

advertisement