advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

বিপদ সংকেতের নাম ডেঙ্গু

ইকবাল খন্দকার
১৯ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২১ ১১:০৮ পিএম
advertisement

আমার পরিচিত একজন কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলেন- আচ্ছা, কামানের দাম কী রকম হতে পারে? প্রশ্নটাকে উদ্ভট এবং অপ্রাসঙ্গিক বিবেচনা করে নিরুত্তর থাকলাম এবং অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ভদ্রলোক নাছোড়বান্দা। উত্তর তার চাই-ই চাই। তাই প্রশ্নটা তিনি আবার করলেন। এবার আমি কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লাম- কেন বলেন তো? কামান কিনবেন নাকি? ভদ্রলোক গোঁফের নিচ দিয়ে হাসলেন। বললেন- আরে না। জাস্ট একটু মিলিয়ে দেখব, ঢাকা শহরের মশা মারতে ওষুধ কেনার জন্য যত টাকা বরাদ্দ, তা দিয়ে ঠিক কতটা কামান কেনা সম্ভব। আমি তো মনে করি, অনেকগুলো কামানই কেনা যাবে। তা হলে ‘মশা মারতে কামান দাগা’ কথাটাকে তাচ্ছিল্যের অর্থে ব্যবহারের যুক্তি কী? না, কোনো যুক্তি নেই। যখন কথাটার প্রচলন হয়েছিল, তখন হয়তো যুক্তি ছিল। যেহেতু তখন মশা ছিল অত্যন্ত অবহেলিত একটা প্রাণী। এই প্রাণীর জন্য কামানের মতো দামি অস্ত্র দাগা? নিঃসন্দেহে এটা এই অস্ত্রের অবমাননা। অসম্মান। আর এখন? কামান কেন, আরও দামি, আরও শক্তিশালী অস্ত্র দাগাতেও মানুষ রাজি, তবু যদি মশার বংশ ধ্বংস হয়। কিন্তু ধ্বংস তো দূরের কথা, মশা যে একটু নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তাও থাকছে না। এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, কামড়িয়ে কামড়িয়ে রোজ রেকর্ডসংখ্যক রোগী পাঠাচ্ছে হাসপাতালে। আমরা বসে বসে রোগী আর মৃতের সংখ্যা গুনছি। সঙ্গে গুনছি প্রমাদ। কী করব, উপায় তো নেই। কোনো ওষুধই মশাদের আস্তানায় মোক্ষম আক্রমণটি চালাতে পারছে না। অথচ এই জিনিস ছিটানো হচ্ছে নিয়মিতই। ওষুধ ছিটানো হচ্ছে নিয়মিত অথচ মশা মরছে না- এহেন দৃশ্য দেখে জনৈক রসিকের বক্তব্য- মশার শরীরে মনে হয় অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গেছে। হতেই পারে। আবার এটাও হতে পারে, ওষুধটা তেমন মানের নয়। তাই মশারা পাত্তা দিচ্ছে না। যেভাবে পাত্তা দিচ্ছিল না কৌতুকের সেই ব্যক্তির কয়েলকে। এক লোক কয়েল জ¦ালিয়ে বসে আছে। কিন্তু ঘুমাতে পারছে না মশার ভয়ে। তাকে বসে থাকতে দেখে তার বন্ধু জিজ্ঞেস করল- কিরে, কয়েল জ¦ালিয়ে বসে থাকার মানে কী? যদি কয়েলে কাজই না করে, তা হলে নিভিয়ে ফেল। আর যদি মনে করিস কাজ করছে, তা হলে শুয়ে পড়। লোকটা এবার কিছুক্ষণ বন্ধুর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল- আসলে হয়েছে কী, আমার ঘুমাতেই ইচ্ছে করছে না। আমি আসলে দেখছি কয়েলে বসে মশারা কীভাবে আগুন পোহায়। আর ভাবছি, মশারা কীভাবে বুঝল কয়েলটা যে কম দামি। তা হলে কি প্যাকেটের গায়ে লেখা মূল্যটা পড়ে ফেলল? কিন্তু আমি তো প্যাকেটটা ছিঁড়ে ফেলেছিলাম। জি না, মূল্য পড়তে হয় না। মশারা গন্ধ শুঁকেই বুঝে ফেলে কোন কয়েলটা কম দামি আর কোনটা বেশি দামি। কোন ওষুধটা নামমাত্র ওষুধ আর কোন ওষুধটা কাজের। দুঃখজনক হলেও সত্য, ঢাকা শহরে যেসব ওষুধ ছিটানো হয়, যেসব ওষুধ ছিটানোর পরও মশা বহাল তবিয়তে থেকে যায়, অবশ্যই সেটা ‘নামমাত্র ওষুধ’। তবে টাকাটা অবশ্যই নামমাত্র নয়। ঠিকই রাষ্ট্রীয় কোষাগারের একটা অংশ খালি হয়ে যাচ্ছে মশার ওষুধ কিনতে কিনতে। অথচ মশা বাড়ছে বৈ কমছে না। আর তার প্রমাণ- ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যার ঊর্ধ্বগতি। এই ঊর্ধ্বগতি কিংবা মশার বংশ বিস্তারকে অস্বীকার করে নিজেদের ব্যর্থতাকে আড়াল করার অপচেষ্টা সংশ্লিষ্টরা করে আসছেন সেই প্রথম থেকেই। বরাবরই তারা দিয়ে আসছেন এই অজুহাত, সেই অজুহাত। কিন্তু দিনশেষে ওইসব অজুহাত স্থান পেয়েছে ওইসব হাস্যকর অজুহাতের তালিকায়। যে তালিকায় আছে এই অজুহাতটিও। কর্তাগোছের এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করা হলো- এই যে মশা বেড়েই যাচ্ছে, এর জন্য কে দায়ী বলে আপনি মনে করেন? কর্তাগোছের ব্যক্তিটি উত্তর দিলেন- অবশ্যই করোনা দায়ী। প্রশ্নকর্তা তো তাজ্জব- বলেন কী! মশা বৃদ্ধির জন্য করোনা কীভাবে দায়ী হয়? কর্তাব্যক্তি বললেন- কীভাবে দায়ী হয়, সেটা একটু মাথা খাটালেই বুঝবেন। কিন্তু আপনারা তো মাথা খাটাতে চান না। যাবতীয় দোষ আমাদের ঘাড়ে চাপাতে পছন্দ করেন। ঠিক আছে, আমিই বুঝিয়ে দিচ্ছি মশা বৃদ্ধির জন্য করোনা কীভাবে দায়ী। করোনার জন্য সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ছিল। রাইট? যদি করোনা না আসত, তা হলে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ হতো না। মানুষ সভা-সমাবেশে এসে নেতা-নেত্রীর বক্তৃতা শুনে প্রচুর হাততালি দিত। ব্যস, এক সমাবেশের লোকজনের হাততালিতেই মারা পড়ত কয়েক লাখ মশা। করোনার জন্য কতদিন এই গণমশা নিধন বন্ধ ছিল চিন্তা করেন! সত্যি কথা বলতে কী, হাস্যকর এসব অজুহাত যারা দেন, তারা মূলত নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনেন। কেউ কেউ আছেন, মশার বংশ বিস্তারের সমুদয় দায় যারা মেয়রের ওপর চাপিয়ে স্বস্তি বোধ করেন। একবারও ভাবেন না, নিজেরও কিছু দায়িত্ব আছে বা থাকতে পারে। আমি এমন একজনকে চিনি, যিনি নিচতলায় থাকেন, অথচ কয়েলও জ¦ালান না, মশারিও টানান না। আমি তাকে একদিন বললাম- মশারি অবশ্যই টানাবেন। ভদ্রলোক অজুহাত দাঁড় করালেন- কীভাবে টানাব? কোথায় টানাব? বাড়িওয়ালা তো ওয়ালে পেরেক ঠুকতে নিষেধ করে। আমি বললাম- তা হলে কয়েল জ¦ালান। ভদ্রলোক বললেন- কীভাবে জ¦ালাব? যদি আবার সেই ঘটনা ঘটে! আমি বললাম- কিসের ঘটনা? ভদ্রলোক বললেন- একবার হয়েছিল কী, কয়েলের আগুনে মাথার চুল পুড়ে গিয়েছিল। কয়েল জ¦ালাতে গেলেই সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতিটা মনে পড়ে। ভয়ে জ¦ালাতেই পারি না। জ¦ালালেও আতঙ্কে ঘুমাতে পারি না। কখন চুলে লেগে যায়। অবিশ^াস্য হলেও সত্য, এভাবেই একের পর এক অজুহাত দাঁড় করাতে করাতে শেষ পর্যন্ত আমরা দাঁড়িয়ে যাই মশার মুখোমুখি। আর মশা আমাদের ওপর আবির্ভূত হয় রক্তচোষা হিসেবে।

অবশেষে আমরা ঠাঁই নিই হাসপাতালের বিছানায়। সেখান থেকে কখনো জীবিত ফিরি, কখনো বা লাশ হয়ে। অথচ একটু সচেতন হলে মহামূল্যবান জীবনটাকে এমন ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় না। আমরা এতটাই বেখেয়াল যে, কর্তৃপক্ষের ওপর দোষ চাপানোর সময় দিব্যি ভুলে যাই, জীবনটা আমাদের। কর্তৃপক্ষের নয়। আজ আমার জীবনের বড় ক্ষতি হয়ে গেলে সেই ক্ষতি আমার পরিবারকেই পোহাতে হবে। কর্তৃপক্ষ হয়তো খুব বেশি হলে সহানুভূতি প্রকাশ করবে, দান হিসেবে কিছু টাকাও দিতে পারে, ব্যস। হ্যাঁ, কর্তৃপক্ষকেও দায় কিংবা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। নিজের এবং নিজের পরিবারের সদস্যদের জন্য সুরক্ষা নিশ্চিতের পর অবশ্যই লড়তে হবে দশের জন্য। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে সমস্যাগুলো কোথায়, কোন কোন সমস্যার সমাধান করলে মশার উৎপাত কমবে, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমবে। আর মনে রাখতে হবে, এমন সমস্যার সমাধান কেবল ওষুধ ছিটানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জলাবদ্ধতা দূরীকরণ কার্যক্রমের মধ্যেও বিস্তৃত। যা কোনোভাবেই ব্যক্তির কাজ নয়। অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের কাজ, রাষ্ট্রের কাজ। আর কোনো প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র যদি মশার বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়, তা হলে সেখানে ডেঙ্গু এমন আশঙ্কাজনক পর্যায়ে যেতে পারে না। না, এটা শুধু কথার কথা নয়। এটা আমাদের বিশ^াস। আর আমরা বিশ^াস করি, আমাদের বিশ^াস রক্ষিত হবে বিশ^স্ততার সঙ্গে।

ইকবাল খন্দকার : কথাসাহিত্যিক ও টিভি উপস্থাপক

advertisement
advertisement