advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

সময়ের আর্জি, মায়ের সমীপে

মোহাম্মদ আসাদ উজ জামান
২৮ নভেম্বর ২০২১ ০৯:৪৭ পিএম | আপডেট: ২৮ নভেম্বর ২০২১ ০৯:৪৯ পিএম
advertisement

মা, তুমি তোমার সন্তানের দিকে তাকাও। সময় নিয়ে তোমার চারপাশের সবার দিকেই তাকাও। যাদেরকে দেখতে পাচ্ছ, তারা সবাই মায়ের সন্তান।  তুমি যাদেরকে দেখতে পাচ্ছ, এক সময় সবার মা থাকলেও, এখন অনেকেরই মা আর বেঁচে নেই। কিন্তু সন্তান রয়ে গেছে। যাকে তুমি নিজের সন্তান বলে দাবি করছ, এ তোমার সন্তান নয়, এ সময়ের সন্তান। কিন্তু এ সন্তান তোমার জীবনে শ্রেষ্ঠ উপহার, যা তোমার গর্ভে এসেছে, তুমি ওকে যত্ন করে গড়ে তুলবে এবং রেখে যাবে পৃথিবীর ভবিষ্যত হিসেবে, যে হবে বিশ্বের এবং ভবিষ্যতের সম্পদ।

মা, তুমি একটু বেশি সময় দিয়ে সবার দিকে তাকাও, সবাই কোনো না কোনো মায়ের সন্তান। কিন্তু সবাইকে কি বিশ্বের সম্পদ বলে ভাবতে পার?  যারা মিথ্যা বলা থেকে শুরু করে নানা ধরনের অপরাধ করছে, তুমি ওদেরকে সম্পদ বলে ভাবতে পারবে না। নিজের সন্তান হলে হয়তো তুমি ওদেরকে নিজের সম্পদ বলে ভাবতে পারবে, কিন্তু ওরা কখনোই সময়ের সম্পদ নয়! পৃথিবীতে আজ অনেক মায়ের সন্তানের ভেতর দানব বাস করছে। তাই পৃথিবীটা দিনে দিনেই হয়ে যাচ্ছে বসবাসের অনুপযোগী। নানান দানবীয়তায় মানব জীবন হয়ে যাচ্ছে অস্থির, পরিবেশ এবং সমাজ হয়ে যাচ্ছে অসহনীয়, তিক্ততা এবং উগ্রতা ছড়িয়ে পড়ছে ব্যক্তি জীবন থেকে সবখানে!

মানুষ নেশা করছে, পুরুষ নারীকে এবং নারী পুরুষকে অপমান করছে, ব্যক্তি স্বার্থে রাষ্ট্র বা সমাজের সম্পদের অনৈতিক ব্যবহার করছে মানুষ, শিক্ষা জগতে নকল, প্রশ্ন ফাঁস, ব্যক্তি জীবনে আত্মসম্মানবোধহীনতা, সামাজিক জীবনে অসহিষ্ণুতা, অফিসে ঘুষ দুর্নীতি, ব্যাংক শেয়ার বাজারে অন্যের টাকা মেরে দেওয়া, পারিবারিক অঙ্গনে ভাই বোনের অধিকার কেড়ে নেওয়া, অন্ধকার জগতে নারী পুরুষের বেচাকেনা... আজকের এই সমস্ত কিছুর মূলে আছে সন্তানকে ঠিকভাবে শিক্ষা না দেওয়া। কিন্তু এই সন্তানকে শিক্ষা দেওয়ার কথা কাকে বলতে পারি!    

স্কুল-কলেজ লেখাপড়ার বাইরে ছাত্রদের অন্য দায় সহজে নিতে চায় না। বলতে গেলে সমাজই হয়ে পড়ছে দিশেহারা, যেমন খুশি ভাবে এগিয়ে যাওয়ার অসম একটি প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে, অনেকের মাঝেই সুবিধাটা কেড়ে নেওয়ার অশুভ প্রবণতা বেড়েছে, রাষ্ট্র যন্ত্রের মাঝেও খোপে খোপে ঘুণ পোকার কথা শোনা যায়। তাহলে সন্তানকে শিক্ষা দেবে কে!

মা, যে সন্তান সময়ের সম্পদ, বিশ্বের সম্পদ, সে তোমার গর্ভে এসেছে বলে তুমি তার জন্যে সবই করতে পার; সন্তান এক নৈসর্গিক উপহার। আজ তাই তোমাকেই অনুরোধ করে লিখছি। শিক্ষার মাধ্যমে সন্তানকে গড়ে দিয়ে যাও, সময়ের জন্যে, এই বিশ্বের জন্যে, এবং সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যে। মা, তোমাকে প্রথমেই অনুরোধ করছি, সন্তানকে মিথ্যে বলতে দিও না। এর জন্যে সন্তানকে সময় দিতে হবে, তোমার নিজেকে মিথ্যে কথা বলা ছাড়তে হবে। মা বলেই তুমি পারবে, প্রায় সোয়া ৯ মাসের গর্ভধারণের শক্তি যার আছে, তার পক্ষে মিথ্যা ছেড়ে দেওয়ার শক্তি অর্জন করা খুবই সহজ, বিশেষ করে এই মিথ্যা ছেড়ে দেওয়ার শক্তি থেকে যখন নিজের শ্রেষ্ঠ উপহার থেকে মিথ্যা দূর হয়ে যাবে। সমস্ত সময় আর শক্তি দিয়ে সন্তান থেকে মিথ্যা দূর করে দাও।

মা, সন্তানকে পরিষ্কার হতে শেখাও। চারদিকের যে ময়লা, সেগুলো সত্যিকারের ময়লা নয়, সত্যিকারের ময়লা মানুষের ভেতর, তার চিন্তায়। সন্তানকে পরিষ্কার হতে শেখালে বাইরের ময়লা দূর হয়ে যাবে। সন্তানকে চোখ পরিষ্কার রাখতে শেখাও, তার চিন্তা পরিষ্কার রাখতে শেখাও। তুমি সন্তানকে অভিযোগ করতে শিখিও না। অভিযোগ মানেই নিজের ওপর নিজের অভিশাপ। সন্তানকে অভিশপ্ত হতে দিও না। সন্তানকে নিয়ম মানতে শেখাও, তাকে প্রয়োজন বুঝতে শেখাও, তার মাঝে অধিকারবোধ ঢুকিয়ে দাও। তুমি মা, একমাত্র তুমিই পারবে সন্তানকে এগুলো শেখাতে।

মা, তুমি শ্রেষ্ঠ শিক্ষক; তাকে দুধ খেতে শিখিয়েছ, হাসতে শিখিয়েছ, কাঁদতে শিখিয়েছ, হাঁটতে শিখিয়েছ, ... নিজের বুকের গভীর ভালোবাসায় তাকে ভালবাসতেও শিখিয়েছে। সন্তানের শিক্ষার ভার আবার নিজের কাঁধে তুলে নাও। ওর হাতে বই দাও, ধীরে ধীরে ফেলে দাও নোট বই। তাই বলে কিছুই ওর কাছ থেকে কেড়ে নিতে যেও না, তাহলে ও তোমাকেও ভুল বুঝতে পারে, ওর পাশে থেকে, ওকে সময় দিয়ে তবেই নোট বই থেকে ওরে দূরে রাখ। ওর হাতে বই দিয়ে ওকে পড়তে দাও। তুমি পড়তে না পারলেও সমস্যা নেই, সন্তান পড়বে তুমি শুনবে। এর মাঝেই সুন্দর বিশুদ্ধ একটি স্বপ্ন বুনে দাও ওর মাঝে, ও যেন ভবিষ্যতে বিকশিত হতে পারে, নিজেকে গড়ে তুলতে পারে, এমনকি ও যেন সময়টাকেও গড়ে তুলতে পারে। যে শিক্ষক তার নিজের কাছে প্রাইভেট না পড়লে ছাত্রকে ফেল করিয়ে দেন, যে স্কুল নিজের কোচিং-এ কোচিং না করলে ছাত্রকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন, ... অর্থের মোহে তো ওরা দানব হয়ে গেছে, মা, একমাত্র তুমিই পার এসব দানব থেকে সন্তানকে মুক্ত করতে, গর্ভে ধারণ করা সন্তানকে নিয়ে তোমাকেই লড়াই করতে হবে!

মা, তাকিয়ে দেখ সন্তানের হাতে ফোন। ওকে ফোনের ব্যবহার শেখাও। এই ফোনের ভেতরে অনেক বিকৃতমনা দানব বাস করে। ওকে যদি ফোনের যথাযথ ব্যবহার না শেখাও, তাহলে এই বিকৃত মনা দানবগুলো বের হয়ে আসবে, দখল করবে সন্তানের মনোজগত। ফলে গর্ভে ধারণ করা তোমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহারের ভেতর নানান সামাজিক পোকা ঢুকে পড়বে। সন্তান হয়ে উঠবে সমাজের বোঝা, অন্যের জীবনে হয়ে উঠতে পারে মূর্তিমান আতংক!  

মা, তোমার সন্তানের হাত আর চোখের দিকে তাকাও। সন্তানরা নেশা করছে। কিন্তু সন্তান নেশাগ্রস্থ নয়, ওদের নেশা করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু ওদের হাতে নেশার উপাদান দেওয়া হয়েছে। অনেক মায়ের অযত্নে, অবহেলায়, অথবা অসচেনতায় অনেক সন্তানের ভেতর অনেক বড় বড় দানব বাস করে। ওদের একটি অংশ নিজেদের বিকৃত স্বার্থে এবং অর্থের লোভে, নেশার উপাদান ছড়িয়ে দিচ্ছে সন্তানের হাতে হাতে। মা, সন্তানকে সময় দাও, ওকে নেশা মুক্ত করে দাও!

মা, সন্তানের হাত থেকে মোবাইল ফোন সরালেই দেখতে পাবে ওদের খেলার মাঠ নেই। ওদের খেলার মাঠ ফিরিয়ে দাও। অতিরিক্ত টাকার মোহে খেলার মাঠ, সবুজ ঝোপ, পুকুর ডোবা, পাখি, পোকা মাকড়, ... সব খেয়ে ফেলা হয়েছে। আসলে সন্তানের ভবিষ্যতটাই খেয়ে ফেলা হয়েছে। খেলার মাঠ দিয়ে শুরু করে আস্তে আস্তে সন্তানের জীবনটাই ওর কাছে ফিরিয়ে দিতে পারবে, স্বতঃস্ফূর্ত জীবনে বাঁচার আনন্দ একবার পেয়ে বসলে সন্তান আর মা মিলেই তৈরি হবে এক বিশাল জগত। দুই শ বা চার শ বাড়ির মা একত্রে একবার দাঁড়িয়ে গেলে কারোর সাধ্যি নেই তোমাদের থামাবে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শক্তি হল মাতৃত্ববোধ, যা তোমাদের দখলে। সন্তানের জন্যে যখন তোমরা তোমাদের সময় আর জীবন উৎসর্গ করেছে, তখন নিজের কিছু অর্থ বা জমি দিয়ে কি ওদের খেলার মাঠটা ফিরিয়ে দিতে পারবে না, যেখানে থাকবে প্রকৃতি আর ভবিষ্যত! সন্তানের সঙ্গে প্রকৃতির যোগ যত বেশি থাকবে, ওরা তত বেশি জীবন বুঝতে পারবে, মানুষ বুঝতে পারবে, এবং ওরা তত বেশি সময়কেও ধরতে পারবে। ওরা হয়ে উঠবে বিশ্ব মানবতার!  

মা, ওদেরকে যত্ন নিতে শেখাও। নিজের যত্ন, ভাইবোনের যত্ন, বাড়ির কাজের লোকদের যত্ন, এবং পাড়া প্রতিবেশীর যত্ন। সবার যত্নের মাঝেই পড়ে আছে ওর নিজের যত্ন। শুধু মানুষের যত্ন নয়, ঘরের সম্পদ থেকে রাষ্ট্রের সম্পদের যত্ন নিতে হবে। ওদেরকে যত্নের সঙ্গে জীবনের প্রয়োজন শেখাতে পারলে ওদের জীবন থেকে অপচয় দূর হয়ে যেতে পারে। 

মা, পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখ। দিনে দিনেই মানুষ মানুষকে পণ্য বানিয়ে ফেলছে। দিশেহারা মানুষজন জীবন-জীবিকার তাগিদে নিজের দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে ভিনদেশে। মানুষ মানুষকে উৎখাত করছে নিজের দেশ থেকে, একুশ শতকের সভ্যতায় পৃথিবীর অনেক মানুষই আজ পরিচয়হীন! মা, তাকিয়ে দেখ, দায়সারা সমাজের কারণে কত নারী এবং কত পুরুষ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে, নানা কারণে ওরা জড়িয়ে পড়ে অপরাধের সঙ্গে, ... জীবনের ভার বহন করতে না পেরে অনেকেই ঝড়ে পড়ে অকালে! বলতে পার ওরা কারা? ওরাও যে সন্তান।  কোনো এক কালে মায়ের অসাবধানতায় সমাজের ভেতর বাস করা দানবেরা লুফে নিয়েছে সে সুযোগ, ওদেরকে বানিয়ে ফেলেছে দানবের হাতের পুতুল!       

মা, জীবনবোধ দিয়ে সন্তান তৈরি কর। যে সন্তান একজন শিক্ষক হবে, যার কাছে প্রাইভেট না পড়লেও ছাত্রকে ফেল করিয়ে দেবে না। যে নিজের অর্থ মোহে অন্যের হাতে নেশার উপাদান দেবে না, ব্যাংকে গচ্ছিত অন্যের টাকা লোপাট করে বিদেশে যাবে না, খাবারে ভেজাল দেবে না, রাষ্ট্র বা সমাজ সম্পদের যথার্থ দেখভাল করবে, মানুষকে পণ্য বানাবে না, ... যার উপস্থিতিই হয়ে উঠবে নির্মল এবং বিশুদ্ধ আনন্দের উৎস, সন্তানকে এমনভাবে তৈরি করে যাও। এর জন্যে সন্তানকে সময় দিতে হবে। শুদ্ধ ভাবনায় পরিচ্ছন্ন সন্তান বানানোর কারিগর হতে পারলে তোমার সময়টাও যে আনন্দময় হয়ে উঠবে। সন্তান গড়ার মাঝেই তুমি তোমার জীবনকে উপভোগ করে নাও, সন্তানের নামে ভবিষ্যৎ গড়ার চেয়ে উপভোগ্য জীবন আর কি হতে পারে!  

মা, তুমি সমাজ হয়ে ওঠ, সন্তানকে বিকশিত হতে দাও। মা, তুমি ঈগল হয়ে ওঠ, সন্তানের দিকে দাও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, সমস্ত অনিষ্ট আর দানবীয়তা থেকে ওকে মুক্ত কর। মা, তুমি রাষ্ট্র হয়ে ওঠ, সন্তানের সমস্ত দায়ভার তুমি নাও! তুমি একবার রাষ্ট্র হতে পারলে, তুমি সমাজ হতে পারবে, তুমি সমাজ হতে পারলে, তুমি সন্তানের জিম্মাদার বলে একজন পরিপূর্ণ মা হতে পারবে, আর তুমি মা হতে পারলে তবেই সন্তান মানুষ হয়ে উঠবে। যেদিন সন্তান মানুষ হবে, সেদিন এই পৃথিবীতে মিথ্যা থাকবে না, খাবারে ভেজাল থাকবে না, ... পৃথিবীটা হয়ে উঠবে মানুষের আবাস্থল। দেখবে সেদিন কেউ আর অস্তিত্বহীন থাকবে না, নারী বা পুরুষ সবারই একটি সম্মান থাকবে, যে সম্মান আর কিছু নয়, মানুষের সম্মান!    

মা, তুমি আকাশের দিকে তাকাও, তুমি দিনের বেলায় দেখবে সূর্য আর রাতের বেলায় দেখবে তারা। যেখানে আলোর ভেতর রয়ে গেছে সময়, কিন্তু মানুষ নেই। তুমি সন্তানের জীবন আলোকিত করে যাও, ও যেন মানুষের জীবনে আলোর মতো সুন্দর সময় হয়ে উঠতে পারে। ও যেন নিজেকেসহ অন্যদের আলোর পথ দেখাতে পারে। আজকের এই পৃথিবীতে তুমি যদি অসহায় বোধ কর, সন্তান বা নিজের জন্যে দুশ্চিন্তা কর, তবে আজকেই তুমি বসে পড় সন্তান নিয়ে! সন্তান গড়ে দিতে পারলে ভবিষ্যতের মায়েদের আর অসহায় হতে হবে না, নিজের বা সন্তানের জন্যে ওদেরকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। এই সুন্দর পৃথিবীটা প্রাণের আবাস্থল। একে উপভোগ করতে গেলে দরকার এর যত্ন। নিজের জীবন উপভোগের নামে সন্তান যেন এই পৃথিবীর যত্ন নিতে পারে! আর নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে একজন আদর্শ এবং পরিপূর্ণ মায়ের সন্তান হিসেবে। সেই সঙ্গে দিনের সূর্য আর রাতের তারারাও জানুক, যে পৃথিবীতে মা আছে সেই পৃথিবী কখনো পথ হারাতে পারে না। আজকের মায়েরা জ্বলতে শুরু করলেই আগামীর সন্তান থেকে বের হয়ে আসবে তারার আলোর মতো ঝকঝকে আলো আর পৃথিবীটা হয়ে উঠবে প্রতিটি মায়ের এবং প্রতিটি সন্তানের আবাসস্থল। 

(মোহাম্মদ আসাদ উজ জামান : শিক্ষক ও লেখক) 

 

 

advertisement
advertisement