advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement

১৫ মাসে চার আমির-মহাসচিবের মৃত্যু
‘মুরব্বিশূন্য’ হয়ে যাচ্ছে হেফাজতে ইসলাম

মো. মহিউদ্দিন,চট্টগ্রাম
৩০ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৩০ নভেম্বর ২০২১ ০৮:৪২ এএম
advertisement

দেশের মাদ্রাসাগুলো পরিচালিত হয় জ্যেষ্ঠ আলেমদের নেতৃত্বে। কওমি অঙ্গনে তারা আখ্যায়িত হন ‘মুরব্বি’ হিসেবে। সবাই প্রজ্ঞাবান এই মুরব্বি হুজুরদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে ধরে নেন শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসে। অতীতে কওমি মাদ্রাসা ও পরিচালকরা আলোচনায় না থাকলেও ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’ নামে সংগঠন গড়ে ২০১৩ সালে প্রথম আলোচনায় আসেন শাপলা চত্বরের সমাবেশ ঘিরে। কওমি ঘরানার মাদ্রাসার প্রধানদের সর্বাত্মক সমর্থন নিয়ে আমিরের আসনে বসেছিলেন হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিচালক আল্লামা আহমদ শফী। যদিও মৃত্যুর আগে নিজ মাদ্রাসার ছাত্রদের আন্দোলনের মুখেই দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন তিনি। এর কিছু দিন পরই মারা যান বহুল আলোচিত এ হেফাজত নেতা।

আহমদ শফীর মৃত্যুর পর তাকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়। এ বিষয়ে একটি মামলা এখনো চলমান। নানা সমীকরণ, বাদবিবাদের পর আমিরের পদে আসেন প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী। বছর না যেতে তিনিও মারা যান। বিগত ১৫ মাসে হেফাজতে ইসলামের একে একে চার আমির ও মহাসচিবের মৃত্যু হয়েছে। বাকি দুজন হলেন- হেফাজতের সাবেক মহাসচিব নূর হোসাইন কাসেমী ও নুরুল ইসলাম জিহাদী। অরাজনৈতিক সংগঠন দাবি করে আত্মপ্রকাশ করা হেফাজতে ইসলামে এখন ‘মুরব্বিশূন্যতা’।

শীর্ষ আলেমদের মৃত্যুতে সংগঠনের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত কওমি আলেমরাও। এ ছাড়া সাম্প্রতিক নেতৃত্ব নিয়ে ভাঙনেরও সৃষ্টি হয়েছে। তাই সংগঠনের নেতৃত্ব নির্ধারণ ও সংগঠনকে টিকিয়ে রাখার মতো মুরব্বি খুঁজে বের করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে হেফাজতের সামনে। আবার সংগঠন নিয়ে ব্যস্ত হওয়ায় আর্থিক সংকটের মুখে হাটহাজারী মাদ্রাসা। তাই সংগঠন বাদ দিয়ে জ্যেষ্ঠদের মাদ্রাসা নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন কেউ কেউ। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, রাজনৈতিক কর্মকা-ে সক্রিয় হওয়ার পর থেকে মাদ্রাসায় অনুদান কমেছে। দাতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আত্মবিশ্বাস ও ভক্তি কমে যাওয়ায় আজ এ অবস্থা।

শাহ আহমদ শফীর মৃত্যু হয় ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। এর কয়েক দিন আগে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিচালকের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, ভাঙচুর ও বিক্ষোভের মুখে পদ ছেড়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন হেফাজতের আমির। প্রথমে তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় নেওয়া হলেও আর বাঁচানো যায়নি। দেশের বয়োজ্যেষ্ঠ এই আলেমের মৃত্যুর পর তাকে হত্যার অভিযোগ এনে ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের আদালতে নালিশি মামলা করেন তার শ্যালক মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন। আগামী বছরের ২ মার্চ এ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

এদিকে মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার এক মাসের মাথায় ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর মারা যান নূর হোসাইন কাসেমী। ফুসফুসের জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ৭৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। অথচ অসুস্থ হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে হেফাজতে ইসলামের সম্মেলনে মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছিলেন নূর হোসাইন কাসেমী। অবশ্য সংগঠন প্রতিষ্ঠার পর থেকে নায়েবে আমির ও ঢাকা মহানগরীর আমিরের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল অ্যারাবিয়া বাংলাদেশের সিনিয়র সহসভাপতি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব, জামেয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদ্রাসার মহাপরিচালকের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। হেফাজতের ভাস্কর্যবিরোধী কর্মসূচি ঘিরে নতুনভাবে আলোচনায় এসেছিলেন এই আলেম।

আল্লামা শফীর মৃত্যুর পর হেফাজত আমিরের দায়িত্ব নেওয়া প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী মারা যান গেল ১৯ আগস্ট। অসুস্থ হয়ে তিনি চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তার কমিটির মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদী গত শনিবার অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। গতকাল সোমবার দুপুরে তিনি মারা যান। এশার নামাজ শেষে ঢাকা থেকে তার মরদেহ চট্টগ্রামে আনা হয়। হাটহাজারী মাদ্রাসার মসজিদের পাশে তাকে সমাহিত করা হবে বলে আমাদের সময়কে জানান হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদ্রিস। জানাজায় হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী অংশ নেন।

ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব সাজিদুর রহমান : হেফাজতে ইসলামের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে মনোনীত হয়েছেন মাওলানা সাজিদুর রহমান। এর আগে তিনি সংগঠনটির প্রথম যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্বে ছিলেন। ঢাকার একটি মাদ্রাসায় গতকাল তাৎক্ষণিক বৈঠকে বসেন হেফাজত নেতারা। সেখানে সবার সম্মতিক্রমে সাজিদুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করা হয়। বর্তমানে হেফাজতে ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া শাখার আমিরের দায়িত্বেও রয়েছেন তিনি। হেফাজতের প্রচার সম্পাদক মুহিউদ্দিন রাব্বানি এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ‘নিয়মানুয়ায়ী সংগঠনের শূন্যপদ পূরণ করতে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে শূরা কমিটির বৈঠক করে এ সিদ্ধান্ত নিই। সংগঠনের সিনিয়র সদস্য হিসেবে সাজিদুর রহমানকেই সবাই মহাসচিবের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ জানান।’