advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

রফিকুল ইসলাম
সংস্কৃতিচর্চায় নতুন মহিমা

শেখ মেহেদী হাসান
২ ডিসেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২ ডিসেম্বর ২০২১ ০৯:৩০ এএম
advertisement

 

বাংলা একাডেমির সভাপতি, শিক্ষাবিদ রফিকুল ইসলাম (১৯৩৪-২০২১) চলে গেলেন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে। কীর্তিমান এই মানুষটি শিক্ষকতা, গবেষণা, সংস্কৃতি-সাধনায় জীবন কাটিয়েছেন। বাঙালির জাতীয় জীবনের গৌরবময় অনেক ঘটনায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী। উপমহাদেশের সংস্কৃতি গবেষণা, নজরুলচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ। আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলন খুব কাছে থেকে দেখেছেন, প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেছেন। একজন শৌখিন ফটোগ্রাফার হিসেবে ওই আন্দোলনের ছবি তুলে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী এই প্রত্যক্ষ সাক্ষী যেসব ইতিহাস গ্রন্থিত করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যের জন্য অমূল্য সম্পদ।

অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের জন্ম ঢাকার বাইরে চাঁদপুরে। ১৯৪২ সাল থেকে তিনি ঢাকার রমনার বাসিন্দা। আসাম-বাংলার রাজধানী করার জন্য পুরান ঢাকার নবাবপুর রেলগেটের অপর পারে গড়ে তোলা হয়েছিল মনোরম রমনা অঞ্চল। এখনকার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, পুরনো হাইকোর্ট ইত্যাদির পাশাপাশি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়। চমৎকার এক পরিবেশে গড়ে ওঠেন তিনি। তার পড়াশোনা শুরু হয় সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে। বারবার দাঙ্গায় ¯ু‹ল বদলে বাংলা মাধ্যমে। পরে ঢাকা কলেজ থেকে আইএ ও গ্র্যাজুয়েশন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৬ সালে বাংলায় এমএ। শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, মুহম্মদ আবদুল হাই, মুনীর চৌধুরীর মতো কিংবদন্তিদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ শেষে ১৯৫৭ সালে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন বাংলা বিভাগে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, কাজী দীন মুহম্মদ, মুহম্মদ আবদুল হাই, মুনীর চৌধুরী, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আনিসুজ্জামান প্রমুখের নিবিড় সান্নিধ্যে বাংলা বিভাগের মহিমা বাড়িয়ে দেন। ১৯৬০ সালে ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বে এমএ করেন। অতঃপর মিশিগ্যান-অ্যান আরবর বিশ্ববিদ্যালয়, হাওয়াই ইস্টওয়েস্ট সেন্টারসহ আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীকালে কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও কবিতা নিয়ে লাভ করেন পিএইচডি ডিগ্রি। রফিকুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রথম নজরুল অধ্যাপক এবং এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের প্রথম পরিচালক। অধ্যাপক আবদুল হাইর সঙ্গে বের করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ গবেষণা পত্রিকা সাহিত্য পত্রিকা। এ জার্নালটি আমাদের জ্ঞানচর্চায় প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে।

রফিকুল ইসলাম বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও সভাপতি, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। ২০১৮ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে সম্মানিত করে। তিনি নজরুল ইনস্টিটিউটের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।

নজরুলের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে গবেষণা করেছেন পাঁচ দশক। ‘নজরুল নির্দেশিকা’, ‘নজরুল-জীবনী’, ‘কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও কবিতা’, ‘নজরুল প্রসঙ্গে’, ‘কিশোর কবি নজরুল’, ওহঃৎড়ফঁপঃরড়হ ঃড় ঊধংঃবৎহ ইবহমধষর উরধষবপঃ, গড়হড়মৎধঢ়য (১৯৬৩), ভাষাতত্ত্ব (১৯৭০), অহ ওহঃৎড়ফঁপঃরড়হ ঃড় ঈড়ষষড়য়ঁরধষ ইবহমধষর (১৯৭০), বীরের এ রক্তস্রোত মাতার এ অশ্রুধারা (১৯৭৩), বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম (১৯৮১), ভাষা আন্দোলন ও শহীদ মিনার (১৯৮২), বাংলা ভাষা আন্দোলন (১৯৮৪), শহীদ মিনার (১৯৮৬), আবদুল কাদির (১৯৮৭), আমাদের মুক্তিযুদ্ধ (১৯৯১), ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য (১৯৯৩), ভাষাতাত্ত্বিক প্রবন্ধাবলী (১৯৯৮), স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (২০০৩), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর (২০০৩), ঢাকার কথা (২০০৫)।

সাহিত্যচর্চা ও গবেষণায় অবদানের জন্য ২০১২ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। এ ছাড়া তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, নজরুল একাডেমি পুরস্কার এবং মাতৃভাষা সংরক্ষণ, পুনরুজ্জীবন, বিকাশ, চর্চা, প্রচার-প্রসারে অবদান রাখায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক লাভ করেছেন। এই গুণী লেখক ও গবেষকের সাহিত্যকর্ম বাঙালি জাতিকে সব সময়ই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে। তিনি মনেপ্রাণে জাতির পিতার আদর্শকে ধারণ ও লালন করতেন। তার সফল নেতৃত্ব আমাদের গবেষণা ও সংস্কৃতিচর্চায় নতুন মহিমা দিয়েছে। বাংলা সাহিত্য ও গবেষণায় তিনি একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন।

 

শেখ মেহেদী হাসান : গবেষক, সাংবাদিক ও গল্পকার

 

 

 

advertisement
advertisement