advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

নারী নির্যাতন : মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ করতে হবে

সেলিনা হোসেন
৪ ডিসেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৩ ডিসেম্বর ২০২১ ১১:১২ পিএম
advertisement

মানুষের মূল্যবোধের জায়গা দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগেই পত্রিকায় দেখলাম একজন ষাট বছরের লোক সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণ করেছে। প্রায় নিত্যই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে নারী ও শিশু নির্যাতন-নিপীড়নের খবর। তবে এই বাস্তবতা অস্বীকার করা যাবে না, সব খবরই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে না। অনেক খবর থেকে যায় খবরের আড়ালে। সমাজে নারী নির্যাতনের বহুমাত্রিক চিত্র সভ্যতার ও মানবতার কলঙ্ক- এ নিয়ে দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ নেই। শুধু নারীই নয়, সমান্তরালে চলছে শিশু নির্যাতনও, বিশেষ করে কন্যাশিশু নির্যাতন। নির্যাতন-নিপীড়নের অহরহ ঘটে চলা ঘটনাগুলো বলে দেয়, আমাদের সংস্কৃতি অপরাজনীতি ও একই সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনার কাছে পরাজিত হচ্ছে। পিছু হটছে চিরকালীন মূল্যবোধ।

২৫ নভেম্বর নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালিত হয় বিশ্বব্যাপী। এ দিবস উপলক্ষে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান সূত্রে ভয়াবহ তথ্য জানা যায়। তাদের পরিসংখ্যান হলো- গত ১০ মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক হাজার ১৭৮ নারী, ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে ২৭৬ নারীর ওপর, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৩ জনকে, ধর্ষণের পর লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহত্যা করেছেন আটজন, শারীরিক নির্যাতনে হত্যা করা হয়েছে ৬৩ জনকে ও অ্যাসিডে ঝলসে দেওয়া হয়েছে ২০ নারীর শরীর। এ ছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মোট ঘটনা ছিল ২১ হাজার ৭৮৯টি। তা এর আগের অর্থবছরে ছিল ১৮ হাজার ৫০২টি। এই হিসাবে মহামারীতে এক বছরে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে ১৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যা কারও কাম্য নয়। নারী নির্যাতনের পেছনে অনেক ক্ষেত্রেই মুখ্য ভূমিকা রয়েছে বৈষম্যের। সামাজিক বৈষম্যের ছায়া যত বিস্তৃত হচ্ছে, নারী নির্যাতন তত বাড়ছে। সর্বসাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া আরও একটি ঘটনা তা-ই সাক্ষ্য দেয়। ২০ নভেম্বর বদরুন্নেসা কলেজের এক শিক্ষার্থী রাজধানীর ঠিকানা পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন, তার গন্তব্যে পৌঁছার লক্ষ্যে। ওই শিক্ষার্থী তার অধিকারবলে অর্ধেক ভাড়া দিতে চাইলে ওই বাসের হেলপার তাকে ধর্ষণের হুমকি দেয়! আমরা জানি, গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়ার আইনি বিধান না থাকলেও এ তাদের অধিকার এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রচলিতও। একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে গণপরিবহনের হেলপারের এমন ঔদ্ধত্য ফের আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল মূল্যবোধের অবক্ষয় কীভাবে ঘটেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ওই বাসে অন্য যাত্রীরা একজন নারী এমন নিপীড়নের শিকার হওয়ার পরও তারা কেন তাদের দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে তখনই কঠোর প্রতিবাদ করলেন না? খবরটি ছড়িয়ে পড়লে ঢাকার বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসেন, তারা অপরাধীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে রাস্তা অবরোধ করেন। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে র‌্যাব নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকা থেকে ওই বাসের চালক ও তার সহকারীকে গ্রেপ্তার করে। র‌্যাব সদস্যদের এমন তৎপরতায় আমরা স্বস্তি পেলেও গণপরিবহন নারীর জন্য ক্রমেই যেভাবে অনিরাপদ হয়ে উঠছে তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না।

কয়েকদিন ধরে গণপরিবহন খাতের নৈরাজ্য আমরা দেখছি। এর আগেও তাদের অন্যায়-অযৌক্তিক আস্ফালন আমরা দেখেছি। তাদের ওই বৈরী কর্মকা-ের যথাযথ প্রতিকার হয় না বিধায় তারা জনগণকে বারবার জিম্মি করার ধৃষ্টতা দেখায়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তাহীনতা ক্রমেই বাড়লেও সেভাবে দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার নিশ্চিত হচ্ছে না। আমাদের মনে আছে রূপার কথা। চলন্ত বাসে ধর্ষণের শিকার রূপা পৈশাচিকতা-বর্বরতার ছোবলাক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন। সিরাজগঞ্জের রূপা বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে বাসের মধ্যে চালক ও তার সহযোগীদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। তখন এ কলামেই লিখেছিলাম, মূল্যবোধের ধস ঠেকাতে কোনো টোটকা দাওয়াইয়ে কাজ হবে না, এর জন্য জরুরি যথাযথ আইনি প্রতিবিধান। এর পরও গণপরিবহনে নারী নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে।

সরকার নারী শিক্ষা ও নারীদের স্বাবলম্বী করতে নীতিগতভাবে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। অথচ এখনো গণপরিবহনে যাতায়াতে নিরাপত্তাহীনতার ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে উৎকট চিত্র। শুধু যে গণপরিবহনেই নারীকে হয়রানি-নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তা-ই নয়, অনেক ক্ষেত্রেই মার্কেটে, কর্মস্থলে, পথে-ঘাটে এমন হয়রানির চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। নৈতিক অবক্ষয়ের এ কোন উৎকট রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করছি? দেশের সব এলাকায় নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, উত্ত্যক্তকরণের ঘটনা ঘটছেই। এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে সমাজের ভঙ্গুর দশাই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সমাজে কীভাবে অবক্ষয়ের ছায়া বিস্তৃত হচ্ছে, এর কুনজির যেন মেলে ক্ষণে ক্ষণে। নৈতিকতার বালাইহীন ও সামাজিক ভয়ভীতি এবং অনুশাসনহীন এমন সমাজ তো কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। আমি মনে করি, সরকার ও প্রশাসন তো বটেই, সুশীল সমাজকেও এসব বিষয়ে গভীর গুরুত্ব দিয়ে সোচ্চার হতে হবে। এই অবক্ষয়ের ধস ঠেকাতেই হবে।

আমাদের সমাজ বাস্তবতায় যেন প্রতীয়মান হয়, ক্ষয়ের ভাগ বেশি নির্মাণের অংশ ধীর। আমরা দেখছি, ঢাকা মহানগরীর অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা নেই। আবার এখানে শিক্ষার্থীর জন্য নেই আলাদা গণপরিবহন ব্যবস্থাও। শুনেছিলাম, কিছুদিন আগে তাদের জন্য বিআরটিসির কয়েকটি বাস চালু করা হয়েছিল। পরে জেনেছি, তা বেশিদিন চলেনি। গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি যেভাবে ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, এর দায় কি সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা এড়াতে পারেন? কোনো সভ্য সমাজে এমনটি চলতে পারে না। গণপরিবহনে শিক্ষার্থীর সঙ্গে সর্বসাম্প্রতিক যে ঘটনাটি ঘটল, তা কোনোভাবেই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। মনে করি, দেশে গণপরিবহনে নারী যাত্রীদের হয়রানি, যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনা সবকিছু যুক্ত করে বহুপক্ষীয় আলোচনাক্রমে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের দায় যে অনেক বেশি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

চলন্ত বাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল চট্টগ্রামেও। এক নারী পোশাককর্মী কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে এমন বীভৎসতার শিকার হয়েছিলেন। হয়তো অনেকেরই মনে আছে, একজন সমাজবিরোধী দুর্বৃত্ত তার সাঙ্গপাঙ্গকে নিয়ে এতটাই ক্ষমতাবলয় গড়ে তুলেছিল, বাসের অন্য যাত্রীদের নামিয়ে শুধু ওই পোশাককর্মীকে নিয়ে তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে যায় এবং তার ওপর হামলে পড়েছিল। নিকট-অতীতে এক সমীক্ষায় উঠে এসেছিল, ২০১৩ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত গণপরিবহনে যত ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে, এর মধ্যে ধর্ষণের পর ১৩ শতাংশ নারীকে হত্যা করা হয়েছে। একজন কর্মজীবী নারী কিংবা ছাত্রীর জন্য তার যাতায়াতের পথ কী ভয়াবহ বিপদসঙ্কুল হয়ে উঠেছে! আমরা সংগতই প্রত্যাশা করেছিলাম, ধর্ষণের প্রতিকারে প্রণীত আইনটির আলো সমাজে প্রতিভাত হবে। নারী নির্যাতন-নিপীড়নের মাত্রা হ্রাস পাবে। দুষ্কর্মকারীরা হাত গোটাবে। কিন্তু সবই যেন দুরাশা।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, গুরুতর অপরাধের মামলাগুলোর নিষ্পত্তির গতিও ধীর। আবার মামলা গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের অনেকেরই রয়েছে নানা গাফিলতি কিংবা স্বেচ্ছাচারিতা। আমরা জানি, বিলম্বিত বিচার ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার মূলে কুঠারাঘাত করে। বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়। এই পরিস্থিতি থেকে আমরা কিছুটা বের হয়ে আসতে পারলেও এর নিরসন ঘটানো যাচ্ছে না বলেই অন্ধকার জিইয়ে আছে। স্বীকার করি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে অনেক মানবিক ও দায়িত্বশীল সদস্য রয়েছেন। সাম্প্রতিকের ঘটনায়ও এর সাক্ষ্য মিলেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এ-ও বলতে হয়, তাদেরই কারও কারও দুষ্কর্মের খতিয়ানও রয়েছে। এ-ও সত্য, আইন অপরাধীকে

শাস্তি দিলেও মানবিক করতে পারছে না। এজন্য বিশেষ কর্মপরিকল্পনা নেওয়া জরুরি বলে মনে করি। নারী-পুরুষের একসঙ্গে নিরাপদ অবস্থান সব ক্ষেত্রে মানবিক শ্রেয়বোধের আলোয় আলোকিত হবে- এই প্রত্যাশা কবে পূর্ণতা পাবে? সেই সময় তৈরি করতে হবে আমাদেরই। সব অপশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে যূথবদ্ধভাবে। সবার যূথবদ্ধ প্রয়াসেই নিষ্কণ্টক করতে হবে মানুষের জীবনযাপনের সব পথ। তবেই জীবন মুক্ত হবে রাহুগ্রাসের থাবা থেকে। সামাজিক মূল্যবোধগুলোকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে এ ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করা যাবে না। অবশ্যই আশা করব, এ ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি নির্মূলে যা যা করণীয় সবকিছু দ্রুততার সঙ্গে নিশ্চিত করা হবে। বিশেষ করে আমরা যদি সামাজিকভাবে প্রতিরোধ তৈরি করতে পারি তা হলেই ধর্ষণ বন্ধ করা সম্ভব।

সেলিনা হোসেন : কথাসাহিত্যিক

advertisement
advertisement