advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

জয় হোক মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের

টোকন ঠাকুর
৪ ডিসেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৩ ডিসেম্বর ২০২১ ১১:১২ পিএম
advertisement

স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে যে গণযুদ্ধ করে স্বাধীন হলো বাংলাদেশ, পঞ্চাশ বছরে তার চেহারায় চাক-চিক্কণ এসেছে। স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশের রাস্তাঘাট আর স্বাধীন বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা এক নয়। খাল, বিল ও নদীর এই দেশে অনেক ব্রিজ হয়েছে। শহরে অনেক বিল্ডিং হয়েছে। কলকারখানা, শিল্প উন্নয়ন হয়েছে। উন্নয়নের বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। মানুষের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে, তাও সত্য।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন চলছে- এই লগ্নে বলা যায়, শতভাগ নাগরিকই কি গত পঞ্চাশ বছরে সমানভাবে সমান সমান স্বাধীনতা ভোগ করে আসতে পারলেন কিংবা আগামী পঞ্চাশ বছরেও তা পারবেন? যদি পারতেন, তা হলে খুব ভালো হতো। দুঃখের বিষয়, সাংবিধানিকভাবে নাগরিকের স্বাধীনতা সবার জন্য সমান বলা হলেও কার্যত দেখা যায়- কিছু নাগরিকের স্বাধীনতা এমন যে, দেশটাই তাদের। তারা বাদে বাকি যারা মানুষ, তারা দেশে আশ্রিত। কোনোমতে মাথা গুঁঁজে টিকে থেকে জীবনটা পার করে যাওয়াই যেন তাদের মানবজীবনের নৈমিত্তিক বাস্তবতা। বিশেষ করে বাংলাদেশ একটি গ্রামনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার অধিকাংশ মানুষই গ্রামের বাসিন্দা। সেই গ্রাম থেকে শহর কতদূর? ঢাকা শহর তো আরও কতদূর। একটা বিস্তর পার্থক্যখচিত গ্রাম ও শহরের জীবনযাপন। গ্রামের ছেলেমেয়েরা গ্রামের স্কুলেই পড়ছে। গ্রামের অসুস্থ মানুষের জন্য স্থানীয় গঞ্জের বাজারের ‘চাঁদসী’ চিকিৎসক, বড়জোর উপজেলা সদর হাসপাতালের ওয়ার্ড কিংবা বারান্দা- এটুকুই তো দৌড়? সেই একই দেশের নাগরিক হিসেবে ঢাকায় রয়েছে কত বড় বড় হাসপাতাল, কত বড় বড়ো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শহর ও গ্রাম, কেন্দ্র ও বিকেন্দ্রের এই ব্যবধান স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে কতটুকু ঘুচেছে। শিক্ষা ও চিকিৎসা বাদেও জীবনের আর যা যা অনুষঙ্গ, তাতেও কি বিস্তর ব্যবধান রচিত হয়ে নেই? তা হলে স্বাধীনতার সুফল গ্রামীণ মানুষ কতটুকু পেল আর শহরের নাগরিক কতটুকু পেল? গ্রামের জোতদার মহাজন বা ভূস্বামী ও তার পরিবারের জন্য কতখানি স্বাধীনতা বরাদ্দ আর কতটুকু বরাদ্দ দিনমজুর, ভূমিহীন বর্গাচাষি কিংবা যে কোনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য? স্বাধীনতার কতখানি বরাদ্দ শহরের শিল্পপতি, আমলা বা কথিত উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্তদের জন্য আর কতটুকু বরাদ্দ বস্তিবাসী, ছিন্নমূল, ভাসমান, পোশাকশ্রমিকদের জন্য? কতটুকু স্বাধীনতা বরাদ্দ পাশের বাসার গৃহকর্মীর জন্য? কতটুকু স্বাধীনতা বরাদ্দ ইটভাটার শ্রমিক, ভ্যান-রিকশাচালক বা নগরের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য? কতখানি স্বাধীনতা বরাদ্দ নগরের অভিজাত বলে কথিক এলাকার বাসিন্দাদের জন্য? কতখানি স্বাধীনতা বরাদ্দ সরকারি দলের নেতাকর্মীদের জন্য আর কতটুকু স্বাধীনতা বরাদ্দ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের জন্য?

মাতৃজঠর থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়াই মানবশিশুর স্বাধীনতার প্রথম প্রয়াস। তার পর দোলনা ছেড়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে ঘর-বারান্দা-উঠান, উঠান হয়ে রাস্তা ছাড়িয়ে বড় রাস্তায় যেতে যেতে স্বাধীনতার সাধ আরও বেড়ে যায়। সেই সাধ বা স্বাধীনতার স্বাদ কে না পেতে চায়? কিন্তু জোটে কি? জুটেছে কি গত পঞ্চাশ বছরে সবার জন্য সমান সমানভাবে?

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসনের বন্দুকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল বাঙালি। ত্রিশ লাখ বাঙালির প্রাণ মাত্র ৯ মাসেই বলিদান দিতে হলো। দুই লাখেরও অধিক নারীকে ধর্ষিতা হতে হলো। দেড় কোটি লোক উদ্বাস্তু হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিল। মানবেতর জীবন ভোগ করল। হাজারো ঘরবাড়ি, স্থাপনা পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে গেল। সেদিনের সেই ত্যাগের বিনিময়েই বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। স্বাধীন বাংলাদেশে রচিত হলো বাংলাদেশের সংবিধান। সেই সংবিধানে লেখা হলো, এ দেশের মালিক জনগণ। কয়েকটি দলের শাসন-শোষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পার হলো পঞ্চাশটি বছর। আজ আমরা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারব, জনগণ দেশের মালিক হয়েছে? আইন ও বিচার বিভাগ সবার জন্য সমানুপাতিক নজর দিতে পেরেছে? গ্রামের গরিব কৃষক ও শহরের বস্তিবাসীর ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যেতে পারছে? একটা বিপুল অংশের নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেই জীবনের জন্য প্রয়োজন এমন অনেক কিছুই। গরিব মানুষের চিকিৎসার সুযোগ নেই ভালো হাসপাতালে শুধু অর্থের জন্য। অর্থাৎ তাদের বেঁচে থাকার সুযোগ ধনীদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে সীমিত। তা হলে সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে কারা কীভাবে আনন্দিত হবে। স্বাধীনতার বেনিফিসিয়ারি যারা, তাদের জন্য যে আনন্দ সুবর্ণজয়ন্তীতে- ধুঁকে ধুঁকে নিঃশেষ হতে থাকা শ্রমজীবী মানুষের জন্যও কি সেই আনন্দের? জাতিসংঘ সনদে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও এ দেশের দরিদ্র শ্রেণির মানুষের ছেলেমেয়েরা শিশুশ্রমে যুক্ত রয়েছে- এটাই সত্য। তা হলে ঈদ, পূজা, বড়দিন, পহেলা বৈশাখ, ২৬ মার্চ বা নানা উৎসবের দিনে দরিদ্র শ্রেণির শিশুরা কীভাবে উৎসব পালন করে আর ধনীদের শিশু কীভাবে উৎসব পালন করে? স্বাস্থ্যব্যয় ধনীদের জন্য কত আর গরিবদের কত?

যখন একটি দেশের সব নাগরিকের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটে, তখনই দেশটা এগিয়ে যায়। একটা অংশ সুবিধাপ্রাপ্ত আর বিপুল একটি অংশ সুবিধাবঞ্চিত- এটা কোনো ভারসাম্যমূলক উন্নয়ন নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রধান দুটি সেক্টর হচ্ছে পোশাক রপ্তানি ও বিদেশে বসবাসরত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এখন মোটা দাগে পোশাকশ্রমিকের আয় কীভাবে হয়, সেটি দেখা যাক। পৃথিবীর উন্নত দেশের মানুষ গায়ে পোশাক পরে অফিস করবে, জীবনযাপন করবে- সেই পোশাক রপ্তানি হবে বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশ থেকে কেন? কারণ বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের পারিশ্রমিক বা বেতন সবচেয়ে কম। অর্থাৎ দেশের বিপুল একটি শ্রেণির মানুষের, বিশেষ করে নারীদের হাড়ভাঙা পরিশ্রম শুষে নিয়ে পোশাকশিল্পের কলকারখানার মালিকরা সে পোশাক বিদেশে রপ্তানি করে লাভবান হচ্ছেন। সেই লাভ থেকে সরকার ট্যাক্স পাচ্ছে। এদিকে পোশাকশ্রমিকরা শারীরিকভাবেই দুর্বল ও পা-ুর রোগে জীবনকে মানিয়ে নিচ্ছেন শুধু বেঁচে থাকার জন্য। মহান স্বাধীনতার এই কি সুবিচার? বিদেশে যারা শ্রমিক, দেশের প্রিয়জনের সঙ্গ ত্যাগ করে জীবন সামান্য একটু উন্নত করার জন্য কী পরিশ্রমটাই না করে যাচ্ছেন! এক কথায় যাকে আমরা বলি অড জব, সেই ‘অড জব’ই বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রধান কাজ। তা হলে কি বাংলাদেশের অর্থ উপার্জনের প্রধান দিক একুশ শতকে এ রকম দর্জিগিরি করে যাওয়া, বিদেশিদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন করে যাওয়া? বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যাবে।

আমার বন্ধু ভালো থাক। তবে আমার চেয়ে যেন বেতন কম পায়। বন্ধুর ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়–ক আমি চাই। কিন্তু আমার ছেলেমেয়ে পড়ুক কানাডা বা আমেরিকায়। আমার ভাইয়ের বাড়ি হোক আমি চাই। তবে আমার বাড়ির চেয়ে একতলা কম হোক। যে কোনো ক্ষুধার্ত লোক খাবার পাক, আমি চাই। কারণ আমি মানবিক। কিন্তু লোকটির চেয়ে আমি যেন একটু বেশি খেতে পারি। প্রেসক্লাব, শাহবাগে আমিই দাঁড়িয়ে যাব প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে- ‘নারী নির্যাতন বন্ধ কর’। আবার আমিই বাসার কাজের গৃহকর্মীকে কখনই ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে বলব না, তুমিও খাও। দেশের সব লোকের বাসস্থান হোক, সেও আমি চাই। কিন্তু আমার একটা বাড়ি হোক কানাডার বেগমপাড়ায়। দেশের লোকরা চিকিৎসা পাক থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, সদর হাসপাতালে। কিন্তু আমার পরিবারের চিকিৎসা বিদেশে না করলে কীভাবে হবে! পঞ্চাশ বছরের বাংলাদেশে এই রকম মানসিকতারও সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব পালিত হচ্ছে। তা হলে কবির ভাষায় প্রশ্ন করি- ‘কতদূর এগোলো মানুষ? কতদূর প্রতিষ্ঠিত হলো মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার? কতখানি সম্মানিত হলো ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত, দুই লক্ষ নারীর ত্যাগ বিসর্জন, দেড় কোটি শরণার্থীর বিচ্যুত জীবন?’

এক কথায় কি আমরা এ কথা বলে পার পেতে পারব, সবই রাজনীতির ব্যর্থতা? রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঘটেছে সত্য। কিন্তু সেই রাজনীতিতে যুক্ত কারা, সেই রাজনীতি করছেন কারা? বারবার যে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়, সেই চ্যাম্পিয়নশিপের ভাগীদার কারা? কোনো বিশেষ গোষ্ঠী, নাকি সুযোগ পেলে কমবেশি সবাই আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত? দুর্নীতিকে কি আমরা সৃজনশীল রূপদান করে ফেলছি না বা দুর্নীতিকে কি বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলা হয়নি? এ জন্য তো আমরা দায়ী, নাকি? তা হলে সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে আমাদের অর্জন বা বিসর্জন কীভাবে আমরা নিরূপণ করতে পারি? কীভাবে আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত, মিথ্যা কথা বলা ও একে অন্যকে ঠকানোর জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে পারি? নাকি বেরোনোর কিছু নেই? যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলতে থাকুক? প্রলয় বন্ধ থাকবে না জেনেও অন্ধ হয়ে থাকব আমরা!

বঙ্গোপসাগরের কোলে পা দুলাচ্ছে ছোট্ট মেয়ে, বাংলাদেশ। সুখীজনে যারা, তারা বলবে- দুঃখী মেয়ে বাংলাদেশ। এই দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামের বাসিন্দা। তারা গরিব গরিব মানুষ, দুঃখী দুঃখী মানুষ, অভাবগ্রস্ত মানুষ, মলিন পোশাকের মানুষ, ক্ষুধা লাগা মানুষ। তবুও তাদের মুখের হাসিটি খুব সরল। লাউডগার মতো সরল, কুমড়ো ফুলের মতো সরল। গ্রাম থেকে শিক্ষা নিতে ছেলেমেয়েরা শহরে চলে যাচ্ছে। শহর থেকে আরও বড় শহরে চলে যাচ্ছে। তার পর বড় দুর্নীতিগ্রস্ত জীবিকায় নিজেকে বাঁচাতে চাচ্ছে। তার নিজেকে বাঁচানো আড়ালে অনেক মানুষের মুখ ম্রিয়মাণ হয়ে উঠছে। মৃত্যু তরান্বিত হচ্ছে। সভ্যতার এই এক নিষ্ঠুর চাকা হাজার বছর ধরে সমাজব্যবস্থার এই এক রূপ। এর মধ্যেও স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা নিয়ে মুক্তির লড়াইয়ে ১৯৭১ সালে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাঙালি। অনেক ক্ষয়ক্ষতির পর একটা দেশও আমরা পেলাম এবং আজ সেই দেশের পঞ্চাশ বছর বয়স, সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব। মিরাকল কিছু ঘটবে না। কিন্তু যে কোনোভাবেই হোক আস্তে আস্তে দিনে দিনে শুধরাতে হবে আমাদের। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু যেমন বলেছেন, ‘আমি পেয়েছি চোরের জাত- সেই অনুতাপ থেকে আমরা আর কোনোদিন বেরোতে পারব না।’

২০২১ সাল প্রায় শেষ। কয়দিন পর আসছে একটি নতুন অব্দ- ২০২২। মোচনের ভার নিয়ে যদি দুর্বলতা কাটানোর দায় আমাদের থাকে- তা হলে উদ্ধার হবে, তা হলে একটি নতুন বাংলাদেশ আমরা পাব। যেখানে চৌর্যবৃত্তির দায় নিয়ে নাগরিকদের বাঁচতে হবে না, সেদিনের অপেক্ষায় আজকের দিন কাটাই।

জয় হোক বাংলাদেশের। জয় হোক মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের। জয় হোক বাংলাদেশের বঞ্চিত প্রান্তিক মানুষের।

টোকন ঠাকুর : কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

advertisement
advertisement