advertisement
advertisement

সব খবর

advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

জীবনবোধের অফুরান শক্তিতে জেগে উঠুক সব মানুষ

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
১২ জানুয়ারি ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০২২ ১০:৩৯ পিএম
advertisement

পৃথিবীতে অদ্ভুত কিছু বিষয় আছে- যেটাকে অনুভব করা যায়। কিন্তু চোখ দিয়ে দেখা যায় না। অদৃশ্য থেকে তা আমাদের কোনো মহামূল্যবান বার্তা দিতে চায়। সেটির কতকটা আমরা বুঝি, কতকটা বুঝি না- তা হয়তো অমীমাংসিতই থেকে যায়। তার পরও অদৃশ্য বিষয়গুলো জীবনের গভীর থেকে গভীরে প্রবেশ করে জলছবির মতো ছাপ রেখে যায়। যে জলছবির রঙগুলো মাটিতে গড়িয়ে পড়ে অদৃশ্য হয়ে যায়, মাটির গন্ধ টেনে নিয়ে সে অদৃশ্য মাটির গন্ধের সঙ্গে মিশে যায়। সূর্যের অদৃশ্য আলোটা সেখানে এসে নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করে। সেটি কতটা পারে, কতটা পারে না- যারা অদৃশ্যের ভেতরে ঢুকে নিজের দেহ থেকে অদৃশ্যমান কঙ্কালটা বাইরে বের করে আনে, তারাই হয়তো জানে। যতটা জানতে পারে, ততটাই আবার স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। যেমন- ঘুমের ভেতরে স্বপ্নের কাছাকাছি পৌঁছেও মানুষ স্বপ্নকে হারিয়ে ফেলে। ঘুমের ভেতরে মানুষ সমনিলোকুইতে আক্রান্ত হয়। তখন ঘুমের মধ্যে মানুষ কথা বলে। অথচ ঘুম থেকে জেগে উঠলে সে কথাগুলো মনে রাখতে পারে না। কোনো কোনো জায়গায় মানুষ এমন অদৃশ্য অসহায়ত্বের সম্মুখীন হয়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এটি মানসিকভাবে অতটা গুরুতর নয়- যতক্ষণ না ঘুমের মধ্যে থাকা মানুষ কোনো গোপন কথা ফাঁস না করে দেয়। গোপন কখনো কখনো মাটির গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে এভাবেই সত্যটা হয়তো জানিয়ে যায়- যদিও সত্য গোপনের এক ধরনের মনোভাব মানুষের ভেতর কাজ করে। মিথ্যা তখন সত্যের চেয়ে অনেক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তবে সত্যের অদৃশ্য সত্যটা তখনো থেকে যায় নীরবে, নিভৃতে। খুব জটিল দর্শন হয়তো এটা। তবে যেটি যত বেশি জটিল, সেটি তত বেশি সরল। যে যার মতো করে ব্যাখ্যা করে। কেউ কেউ অদৃশ্যের বিষয়টার গভীরে ঢোকে, কেউ গভীর থেকে গভীরে ঢোকে আবার কেউ কেউ বাইরে থেকে বিষয়টা দেখার চেষ্টা করে। কারণ অনুভূতির দৃষ্টিভঙ্গিটা একেকজন মানুষের একেক রকম হয়। অনুভূতির গভীরতাটাও একেকজনের একেক রকম হয়।

আলো দেখা যায়, নাকি আলো মানুষকে পথ দেখায়? যে আলো মানুষকে পথ দেখায়- সে আলোকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, বন্দি করা যায় না। তার পরও মানুষ আলোর অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয়। খুব অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু মেনে নিতে হয়। অন্ধকার আছে বলেই আলো এত মূল্যবান। অন্ধকার বাড়তে বাড়তে যতটা পথ অতিক্রম করে, অন্ধকারকে আলো অনুসরণ করে সে পথকে আলোকিত করতে করতে ততটা পথ অতিক্রম করে। এক সময় এমন করেই অন্ধকারের ভেতরে আলো ডুবে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। কেউ কেউ বিপরীত যুক্তি নিয়ে বলতে পারে- অন্ধকারে আলো ডুবে যায় না, বরং আলোয় অন্ধকার ডুবে যায়। সবকিছুই অনুভূতির ব্যাপার, অনুভূতির বৈচিত্র্যের ব্যাপার। কোনো একটা বিষয়কে সব মানুষ যখন একইভাবে না ভেবে ভিন্ন ভিন্নভাবে ভাবার শক্তি অর্জন করে, তখন অনুভূতির শক্তিটা আরও অনুভূতিপ্রবণ ও সৃষ্টিশীল হয়ে উঠে- যদিও ভাবনা ও অনুভূতি নিজেরাও দৃশ্যমান নয়। মানুষ সূর্যের আলো দেখে আলো আবিষ্কারের কথা ভেবেছে। এ দেখাটা অনুভূতির বিষয় হয়তো বা। কারণ অনুভূতি থাকলে মানুষ অদৃশ্যকেও দেখতে পায়। অনুভূতিও তো অদৃশ্যমান। তবে সেটিকে দেখতে হলে আরও সংবেদনশীল অনুভূতি নিয়ে দেখতে হবে। এভাবে অনুভূতির পর অনুভূতিকে দেখার বিষয়টা অনেকটা অধরাকে ধরব ধরব করে না ধরতে পারার আজীবনের অতৃপ্তির মতো।

১৮০০ সালে ইতালীয় বিজ্ঞানী আলেসান্দ্রো ভোল্টা থেকে শুরু করে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী হামপ্রে ড্যাভি, হেনরি উডওয়ার্ড ও ম্যাথু ইভান্স পর্যন্ত অনেকেই চেষ্টা করেছেন বৈদ্যুতিক বাতি তৈরি করার। কিছু ক্ষেত্রে তারা সফল হলেও তা আলোকে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি করার মতো ছিল না। এর পর টমাস আলভা এডিসন সফলভাবে বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেন। তবে প্রচলিত আছে, টমাস আলভা এডিসনকেও সফলভাবে বৈদ্যুতিক বাতি বানাতে গিয়ে ১০ হাজারবার ব্যর্থ হতে হয়েছিল। এ ব্যর্থতাকে তিনি সফলতা হিসেবে অনুভব করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘আমি ১০ হাজারবার ব্যর্থ হইনি। আমি এটি কাজ না করার ১০ হাজারটি কারণ বের করেছি।’ মানুষ অনুভূতির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে চিন্তাশক্তি তৈরি করতে পারে। সেই চিন্তাশক্তি আলোর মতো আপাত দৃশ্যমান অদৃশ্য শক্তিকেও সৃষ্টি করতে পারে।

একটা শিশু মাতৃগর্ভ থেকে বের হয়ে যদি চিৎকার করে কেঁদে ওঠে, তা হলে সেটি আনন্দ উদযাপনের উৎসবে পরিণত হয়। সমীকরণটা খুব বিস্ময়কর- যেখানে মনে হতে পারে, কান্নার মতো একটা বেদনা কীভাবে আনন্দের জন্ম দেয়! যদি সেই কান্নাটা ইতিবাচক অনুভূতির জন্ম দেয়, তা হলে সে আনন্দ মহামূল্যবান হয়ে ওঠে। মানুষ যখন অতিআনন্দিত হয়, তখন হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলে। হাসি যতটা না শক্তিশালী, কান্না এর থেকেও বেশি শক্তিশালী। মানুষের হাসি আর কান্না কি দেখা যায়? হাসি আর কান্না কখনো শব্দের হয়, কখনো শব্দহীন হয়। শব্দকে দেখা যায় না, শব্দহীন নীরবতাকেও দেখা যায় না। নির্বাক চলচিত্র শব্দহীন নীরবতার মতোই- যেখানে না আছে কথা, না আছে সংলাপ। চার্লি চ্যাপলিন ‘দ্য ইমিগ্র্যান্ট’, ‘দ্য কিড’, ‘দ্য গোল্ড রাশ’, ‘সিটি লাইটস’, ‘মডার্ন টাইমস’ ও ‘দ্য গ্রেট ডিরেক্টর’-এর মতো বিখ্যাত চলচ্চিত্রগুলোয় অভিনয় করেছেন। এই চলচ্চিত্রগুলোয় অভিনয় করতে গিয়ে একটা কথাও বলেননি। তার পরও পৃথিবীর মানুষকে হাসিয়েছেন। কিন্তু নিজে ভেতরে ভেতরে কেঁদেছেন। সেই বোবা কান্নাটা অদৃশ্যই থেকে গেছে সারাজীবন। মানুষ তার মুখের হাসিটা দেখে তাকে বিচার করেছে, ভেতরের কান্নাটা কখনো দেখেনি। তার অভিনয় দেখে সবাই হেসেছে, কাঁদেনি একজনও। হয়তো কান্নাকে লুকাতে গিয়েই তিনি বলেছেন, ‘আমি বৃষ্টিতে হাঁটতে ভালোবাসি। কারণ তখন কেউ আমার কান্না দেখতে পায় না।’ খুব অদ্ভুত একটা বিষয় হয়তো এটা।

চোখের জল বৃষ্টিতে তার অস্তিত্ব হারায়। যেমন- নদীর জল তার অস্তিত্ব হারায় সমুদ্রে। এমন করেই হয়তো মানুষ মানুষের স্বার্থের ভিড়ে হারিয়ে যায়। মানুষ লোভের চোরাবালিতে ডুবতে ডুবতে হারিয়ে যায়। মানুষ কখনো নিজের সঙ্গে লড়তে লড়তে হারিয়ে যায়। তখন দেহটার ওপর ভর করে মানুষটা হয়তো থাকে। তবে মানুষটার ভেতর থেকে মহামূল্যবান মনুষ্যত্ব হারিয়ে যায়। এমন করে হারিয়ে যেতে যেতে অনেক সময় চেনা জিনিসগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়- যেগুলো এক সময় দৃশ্যমান ছিল। হয়তো এই দায় সময়ের- যে সময় নিজে অদৃশ্য থেকে মানুষকে চেনায়। মানুষের মুখোশটা টেনে বের করে এনে মুখটা দেখায়। মুখোশটা কখনো দৃশ্যমান থাকে না। তার পরও অনুভূতির উত্থান-পতনে কেমন করে যেন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সবখানে এখন আর মানুষ দেখা যাচ্ছে না। সব যেন আজ মুখোশ মানুষ। সুখের সময় চেনা মুখগুলো দুঃসময়ে কেমন অচেনা হয়ে যায়। বিশ্বাসে কেমন করে যেন মরিচা পড়েছে। বিশ্বাসঘাতকদের মুখ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে, মানুষের মুখ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। সব যেন সময়ের খেলা, প্রকৃতির খেলা। প্রকৃতিও সব জিনিস দেখাতে চায় না। প্রকৃতি যতটা দৃশ্যমান থাকে, তার থেকেও বেশি অদৃশ্যমান থাকতে ভালোবাসে। প্রকৃতির অদৃশ্যমান শক্তিকে অনুভব করতে হলে নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলোকে চিনতে হয়। অনুভূতি খুব অলস আর ভোঁতা হয়। অনুভূতি সব সময় ঘুমিয়ে থাকতে ভালোবাসে। অনুভূতি ঘুমিয়ে পড়লে মানুষও ঘুমিয়ে পড়ে। তখন মানুষ নিজেকে জানতে পারে না, চিনতে পারে না। মানুষ নিজেকে চিনতে ও জানতে না পারলে অন্যের ভেতরের অদৃশ্যমান অনুভূতিগুলোকেও চিনতে ও জানতে পারে না। তখন মানবিক বিপর্যয় ঘটে।

প্রতিদিন মানুষের জীবনে সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা জন্ম নেয়; মরেও যায়। প্রতিদিন মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহানুভূতি, মানবিকতা, উদারতা জন্ম নেয়; মরেও যায়। প্রতিদিন মানুষ দাসত্ব, পরাধীনতা, অস্তিত্ব ও ব্যক্তিসত্তা হারায়; খুঁজেও পায়। এসবই অদৃশ্যমান। যেগুলো চোখের দেখায় দেখা হয়ে ওঠে না, রোদে পুড়তে পুড়তে ঝুলন্ত মন যখন মাটিতে এসে বসতি গড়তে পারে- তখন তা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সবাই সবকিছু দেখতে পায় না, কেউ কেউ পায়। যারা দেখতে পায়, তারাই জীবনবোধের শক্তিতে জেগে ওঠে। এমন জীবনবোধের অদৃশ্য শক্তিতে জেগে উঠুক সব মানুষ।

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : শিক্ষাবিদ, লেখক ও অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

advertisement
advertisement