advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

রাজনৈতিক অর্থনীতির নান্দীপাঠ

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
২৭ জানুয়ারি ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২২ ০৪:৪৮ এএম
advertisement

রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে কে বড় কে ছোট, কে কার দ্বারা কতখানি প্রভাবিত, উদ্বুদ্ধ কিংবা পরিচালিত হয় তা আজও বিশ্বব্যাপী কোথাও খোলাসা করা সম্ভব হয়নি। বরং দেখা যাচ্ছে পুঁজিবাদী ব্যবসায়ীরা অর্থলোভী রাজনীতিকের ওপর টেক্কা দিতে সফল হচ্ছে। শুধু বড় বড় গণতান্ত্রিক দেশেই শুধু নয়, ইদানীং উন্নয়নশীল দেশগুলোয়ও ধুরন্ধর ব্যবসায়ীর অর্থ অন্যায্য পটতার পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে স্বেচ্ছাচারী রাজনীতিবিদরা। চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের নামে বাণিজ্যযুদ্ধকে উপায় ও উপলক্ষ সাব্যস্ত করা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে কোনো কোনো বড় অর্থনীতিতে ধনীর রাজনীতি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আরও দরিদ্র হতে বাধ্য করছে। কেননা এ যাবৎ যুগে যুগে স্থান, পাত্র ও প্রক্রিয়াভেদে অর্থনীতি ও রাজনীতি অধিকাংশ সময় অনিবার্যভাবেই সমতালে ও সমভাবনায় এগিয়ে চলছে। কখনো-সখনো মনে হতে পারে বড্ড পরস্পরে প্রযুক্ত এরা। যেন দুজনে দুজনার। যদিও অনেক সময় এটাও দেখা গিয়েছে, রাজনীতি অর্থনীতিকে শাসিয়েছে, নিয়ন্ত্রণ করেছে : আবার অর্থনীতি রাজনীতিকে অবজ্ঞার অবয়বে নিয়ে যেতে চেয়েছে বা পেরেছে। গত শতকের শেষার্ধে রাজনৈতিক অর্থনীতির ধারণা বেশ ব্যাপ্তিলাভ করে। এ কথা ঠিক বহমান বর্তমান বিশ্বে, ক্রমেই অর্থনীতিই রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণের পথে নিয়ে যাচ্ছে। কেননা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান সবকিছুতেই নীতিনির্ধারণে অর্থ আজ নিয়ামক কিংবা প্রভাবকের ভূমিকায়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয় আর্থিক প্রভাবের ও সক্ষম-সম্ভাবনার নিরিখে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নীতি নির্ধারণ করে অর্থনৈতিক জীবনযাপনকে আয়-উপার্জন, ব্যয়-বরাদ্দকে জবাবদিহির আওতায় এনে সুশৃঙ্খল, সুশোভন, সুবিন্যস্ত করবে এটাই এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত সাব্যস্ত ছিল। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও নীতিবান ন্যায়নিষ্ঠবানের হাতে অর্থনীতি তথা ভোগ-ভাগবাটোয়ারার দায়-দায়িত্ব অর্পণের কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু নীতিনির্ধারকের স্বস্বার্থবাদিতায় যদি সম্পদ বণ্টন বৈষম্য সৃষ্টি ও বৃদ্ধির কারণে অর্থনৈতিক টানাপড়ন সৃষ্টি হয়, তখন আমজনতার অর্থনৈতিক জীবনযাপন সহায়ক (ভধপরষরঃধঃবফ, ংঁঢ়ঢ়ড়ৎঃবফ) হওয়ার পরিবর্তে দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে। নির্বাহী নীতিনির্ধারক নেতৃত্ব যদি নিজস্ব তাগিদে ও প্রয়োজনে নিজস্ব উপায়ে সম্পদ ও স্বার্থ সংগ্রহে আত্মসাতে ব্যাপৃত হয় তখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের এখতিয়ার ও ক্ষমতা খর্ব হয়। আইনসভায় নীতিনির্ধারক বিধিবিধান তৈরি করবেন সবার জন্য প্রযোজ্য করে, নিরপেক্ষভাবে, দূরদর্শী অবয়বে। কিন্তু সেই আইন প্রয়োগে নীতিনির্ধারক নিজেই নিজেদের স্বার্থ অধিকমাত্রায় দেখতে থাকেন তাদের খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে, প্রতিপক্ষরূপী বিরুদ্ধবাদিদের বঞ্চিত করতে স্বেচ্ছাচারী অবস্থান গ্রহণ করেন তখন ওই আইনের প্রয়োগে নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয়-সন্দেহ তৈরি হয়। আস্থার অভাব দেখা দেয়। অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ততার অবয়বে, নৈতিকতার অবক্ষয়জনিত পরিবেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আমজনতার আগ্রহ নেতিবাচক মনোভাবে চলে যেতে পারে ও সর্বোপরি সবাই রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলতে পারে। অথচ যে আস্থার সরোবরে গণতান্ত্রিক ও সেবাধর্মী রাজনৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ ও টেকসই হওয়া নির্ভরশীল।

দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে উন্নয়ন ভাবনা ও কর্মসূচি পরিপালিত হবে দলমত নিরপেক্ষভাবে, কারও প্রতি অনুরাগ কিংবা বিরাগের বশবর্তী হয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ সুযোগ-সুবিধা, অধিকার আদান-প্রদান, নীতি-নিয়মকানুন ও আইনশৃঙ্খলার বিধানাবলি বলবৎ, প্রয়োগ ও বাস্তবায়নযোগ্য হবে না এটাই সব নাগরিকের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার, সাংবিধানিক সত্য ও প্রথা। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি উৎপাদনে সম্পদে সংসার সমাজসহ নীতিনির্ধারক যেমন একটি রূপময়, বেগবান, ঐশ্বর্যমণ্ডিত ও আনন্দঘন সক্ষমতা নির্মাণ করবেন আবার রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকের একগুঁয়েমি তথা ভ্রান্ত পদক্ষেপের দ্বারা অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনাকে, সমৃদ্ধির সক্ষমতা ও সুযোগকে তেমন প্রশ্নবিদ্ধ-পক্ষপাতযুক্ত করে দুনীতিগ্রস্ত করে ফেলতে পারে। রাজনৈতিক কারণে পরস্পরের দোষারোপের দ্বারা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিবেশ বিপন্ন হলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা শুধু দ্বিধাগ্রস্ত নয়, হয় বাধাপ্রাপ্তও।

গণতন্ত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থাকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের। নির্বাচনের ইশতেহারে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচির নানান প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করে রাজনৈতিক দল। ভোটারকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় ক্ষমতায় গেলে এ জাতীয় উন্নয়নের বন্যায় ভেসে যাবে দেশ। কিন্তু নেতৃত্ব তা যদি যথাযথ বাস্তবায়ন করতে না পারে তা হলে ব্যর্থতার ও অভিযোগের তীর নিক্ষিপ্ত হয় খোদ রাজনীতির নেতিবাচক ধারণার দিকেই।

বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি নীতিনির্ধারক সরকার নেতৃত্বে এসেছে। প্রত্যেকের কিছু না কিছু অবদানে বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীদের সংখ্যা কমছে, দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে বা হচ্ছে। শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, মানুষের মাথাপিছু আয়ের পরিস্থিতিতে উন্নতি সাধিত হয়েছে। বাজেটের বপু বেড়েছে, এডিপির আকার বেড়েছে। এখানে স্বভাবত প্রশ্ন এসেছে, অর্থনীতির এই উন্নয়নে সরকারগুলোর একক কৃতিত্ব কতখানি। এসব সাফল্যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সৃজনশীলতা, নির্ভরযোগ্যতা, সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার ভূমিকা বেশি না আমজনতার অর্থনীতির স্বয়ংক্রিয় স্বচ্ছ সলিলা শক্তির (জবংরষরবহঃ ঢ়ড়বিৎ) বলে এটি বেড়েছে। এটাও দেখার বিষয় যে, পরিস্থিতি এমন হয়েছে কিনা আমজনতার নিজস্ব উদ্ভাবন প্রয়াসে অর্জিত সাফল্য বরং নীতিনির্ধারকের নিজেরি করণের দৃষ্টিভঙ্গি, ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের দ্বারা বরং বাঞ্ছিত উন্নয়ন অভিযাত্রা বাধাগ্রস্ত কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নাগরিকের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন প্রয়াসে তাদের কর্ম উন্মাদনা ও প্রেরণায় ক্ষমতালোভী দুর্নীতিদগ্ধ রাজনৈতিক অভিলাস বাধা সৃষ্টি করেছে কিনা কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও সেবাপ্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত কিংবা বিড়ম্বনাদায়ক হয়েছে কিনা।

সাম্প্রতিক এক গবেষণা হিসাবে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ ও অর্থনীতিতে কর জিডিপির রেশিও কাক্সিক্ষত সাধারণ মাত্রার (জিডিপির ১৫-১৬ শতাংশ) চাইতে যথেষ্ট কম। বর্তমানে কর জিডিপি রেশিও ৮-৯-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে অর্থাৎ জিডিপির ৫-৬ শতাংশ কর আওতার বাইরে বা সেখান থেকে রাজস্ব অনাহরিত থেকে যাচ্ছে। সেই টাকা হয় বিদেশে পাচার হচ্ছে নতুবা ন্যায়নীতিনির্ভরতার পরিবেশকে কলুষিত করছে। বলা বাহুল্য প্রতিবছর বাড়ানো বাজেটে জিডিপির ৪-৫ ভাগ পরিমাণ অর্থই ঘাটতি হিসেবে প্রাক্কলিত হতে হচ্ছে এবং এ ঘাটতি পরিমাণ অর্থ দেশি-বিদেশি ঋণ নিয়েই সেই বাজেট বাস্তবায়িত হয়। অর্থাৎ দেশে জিডিপির আকার অনুপাতে যথাপরিমাণ ন্যায্য কর রাজস্ব অর্জিত হলে ঘাটতি বাজেট হয় না এবং বাজেট বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ কিংবা নানান শর্তসাপেক্ষে বিদেশের কাছে হাত পাততে হয় না। গভীর অভিনিবেশ সহকারে বিচার-বিশ্লেষণের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়Ñ কেন ন্যায্য কর রাজস্ব আহরিত হয় না বা হচ্ছে না, কারা করনেটের বাইরে এবং তাদের করনেটে আনার পথে প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যা কোথায়? বিভিন্ন কৌনিক দৃষ্টিতে পরীক্ষা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশ, সমাজ ও প্রশাসন কর রাজস্ব সুষমকরণে পথে স্বচ্ছতার ন্যায়ানুগতা, পক্ষপাতহীন পদক্ষেপ নিতে অপারগ হয়েছে বা হচ্ছে। কর প্রদানে, আহরণে, এমনকি কর রেয়াত বা অব্যাহতি প্রাপ্তিতে অন্তর্নিহিত অপারগতা, অসামঞ্জস্যতা বা দুর্বলতা রয়েছে। সাধারণ ও অসাধারণ করদাতায় অসম বিভক্ত সমাজে, বণ্টন বৈষম্যের প্রক্রিয়ায় অসাধারণ করদাতারা শুধু একদাগে যে কর ফাঁকি দেয় সহস্র সাধারণ করদাতার ওপর তার চাপ পড়ে। বড় করদাতারা নীতিনির্ধারকের প্রশ্রয়ে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগে থাকলে কর প্রদান ও আহরণের সংস্কৃতি সুস্থ ও সাবলীল হতে পারে না। আইন প্রণেতাদের সিংহভাগ অংশ বৃহৎ করদাতা হলে ক্ষমতার বলয়ে বসবাসকারী হিসেবে রেয়াত ও ছাড় গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাপক কর রাজস্ব রাষ্ট্রের হাতছাড়া হয়ে যায়। যথাযথ কর রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। অথবা কথাটি এভাবে ঘুরিয়ে বলা যায় নীতিনির্ধারক নেতৃত্বের যে বলিষ্ঠ কমিটমেন্ট দরকার কর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যে, যে এনফোর্সমেন্ট, যে সুষম পরিবেশ, যে পক্ষপাতহীন আচরণ, যে দৃঢ়চিত্ত মনোভাবের প্রয়োজন তা যেন থেকেও থাকে না। আইনসভায় যে অর্থবিল উত্থাপিত ও গৃহীত হয় সেখানে পরীক্ষা-পর্যালোচনা-উত্তর ছাঁটাই প্রস্তাব পেশের কিংবা বিভিন্ন গঠনমূলক মতপ্রকাশ বা প্রস্তাবনা পেশের উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবস্থায় যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়। ফলে ফিসকেল মেজারসগুলো যা যা যেভাবে উত্থাপিত হয় তাই গৃহীত হয়। মূল বাজেটে আয়-ব্যয়ে প্রাক্কলিত বরাদ্দ যথাযথ অর্জিত হচ্ছে কিনা তার জবাবদিহিকরণের সুযোগ সেখানে অনুপস্থিত। করোনা ফিরে যেতে যেতে ফিরে এসেছে। অর্থবছরের অর্ধেক অতিক্রান্ত হয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সরকারের ঋণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে বলে মিডিয়ায় রিপোর্ট এসেছে। এ সময় করোনাবিধ্বস্ত সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় রাজস্ব আয় ও ব্যয় উভয় ক্ষেত্রেই সাশ্রয়ী, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অনিবার্যতা অনস্বীকার্য।

 

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান