advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আয়ুতে বায়ুর টান : শিকার বাংলাদেশ

মোস্তফা কামাল
৫ মার্চ ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৫ মার্চ ২০২২ ০৬:৪৫ পিএম
advertisement

উন্নত দেশগুলোর কারণে সৃষ্ট দূষিত বায়ু গোটা বিশ্বের মানুষের আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে। যার অন্যতম শিকার বাংলাদেশ। সম্প্রতি প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভাল্যুশনের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন তার প্রমাণ।

বায়ুদূষণ নিয়ে বৈশ্বিক এই প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর চতুর্থ প্রধান কারণ বায়ুদূষণ। এতে প্রতিবছর ৭০ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হয়। বায়ুদূষণ বিশ্বে মানুষের গড় আয়ু ১ বছর ৮ মাস কমিয়েছে। আর বাংলাদেশে কমছে প্রায় ৩ (২.৯৬) বছর। দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় বারবার উঠে আসে ঢাকার শীর্ষত্ব। নাম্বার ওয়ানও হয়ে গেছে কয়েকবার। চরম নিষ্ঠুরতা হচ্ছে, এ বায়ুদূষণে উন্নতদের তুলনায় বাংলাদেশের দায় অতিসামান্য। কথিত উন্নত দেশগুলোর মতো পরিবেশের ক্ষতি না করেও প্রথম সারির ভুক্তভোগী দেশের প্রথম সারির ভুক্তভোগী বাংলাদেশ।

উল্লিখিত গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে- চীন, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মিয়ানমার ও ভুটানের চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বায়ুদূষণের কারণে বেশি কমছে। চীনে মানুষের আয়ু গড়ে কমেছে ১ দশমিক ৮৫ বছর। ভারতে ২ দশমিক ৬৯ বছর। পাকিস্তানে ২ দশমিক ৮৩ বছর। আফগানিস্তানে ২ দশমিক ৬৬ বছর। মিয়ানমারে ২ দশমিক ৬১ বছর। ভুটানে ২ দশমিক শূন্য ৯ বছর। বায়ুদূষণের কারণে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আয়ু কমছে নেপালে ৩ দশমিক শূন্য ৫ বছর। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বায়ুদূষণে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আয়ু কমা দেশ পাপুয়া নিউগিনি ৩ দশমিক ২ বছর। তার পর নাইজার ৩ দশমিক ১ বছর ও সোমালিয়ায় ৩ দশমিক শূন্য ৪ বছর।

টানা গত কয়েক বছরে গড় আয়ুতেও বাংলাদেশের পজিশন ভালো। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের গড় আয়ু আরও বেড়ে এখন ৭২ বছর ৯ মাস। এ ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। আর সার্কভুক্ত দেশের মধ্যে তৃতীয়। গত ১৫ বছরে দেশের মানুষের গড় আয়ু ৬ দশমিক ৫৩ বছর বেড়েছে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও আফগানিস্তানের মানুষের গড় আয়ুর তুলনায় যা অনেক বেশি। ভারতে মানুষের গড় আয়ু ৬৮ দশমিক ৩, পাকিস্তানে ৬৬ দশমিক ৪, মিয়ানমারে ৬৬ দশমিক ৬, নেপালে ৬৯ দশমিক ২, আফগানিস্তানে ৬০ দশমিক ৫ বছর। তবে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের তুলনায় এগিয়ে আছে শ্রীলংকা ও মালদ্বীপ। দেশ দুটির মানুষের গড় আয়ু যথাক্রমে ৭৪ দশমিক ৯ ও ৭৮ দশমিক ৫ বছর। বাংলাদেশ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আন্তঃসীমান্ত বায়ুদূষণের শিকার। ইরান, মঙ্গোলিয়া, আফগানিস্তানের শুষ্ক মরু অঞ্চলের ধূলিকণা বাংলাদেশের বাতাসকে ঘায়েল করছে। পশ্চিমা লঘুচাপের মাধ্যমে ওই ধূলিকণাসহ বাতাস ভারতেও প্রবেশ করে। নভেম্বর থেকে ওই দূষিত বায়ু মাত্রা ছাড়িয়ে ঢোকে বাংলাদেশে। তা রোখা একার পক্ষে সম্ভব নয়।

বায়ু তথা পরিবেশ দূষণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরই সোচ্চার। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন আলোচনা ও বক্তৃতায় তিনি টেনে আনেন প্রসঙ্গটি। বিশ্বব্যাপী আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের মূল হোতা শিল্পোন্নত দেশগুলো। আর ভয়াবহতার শিকার উন্নয়নশীল দেশগুলো। হোতারা এর দায় নিচ্ছে না। মাঝে মধ্যে দান-অনুদানের নামে খয়রাতি কাণ্ড করে। চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিল, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কিছু দেশ এর অন্যতম। তারা কেউ দরিদ্র দেশ নয়। বিশ্বব্যাপী তাদের বিশাল অঙ্কের বাণিজ্য। এ দেশগুলোর সামরিক বাজেট পিলে চমকানো। যুক্তরাষ্ট্র এখন পারমাণবিক ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রধান হুমকি। দ্বিতীয় অবস্থানে চীন। ক্রমে উঠে আসছে ভারত। তাদের ক্রিয়াকর্মে ঘটে চলা পরিবেশ দূষণে স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসসহ রোগ-বিমারি লেগেই আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এসব কথাই বলে আসছেন অবিরত।

গত ২০ বছরে এই প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে আমেরিকা মহাদেশেও। বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচক (সিআরআই)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হন্ডুরাস, তার পরই আছে মিয়ানমারের নাম। চতুর্থ অবস্থানে আছে নিকারাগুয়া, পঞ্চম ফিলিপাইন ও ষষ্ঠ অবস্থানে বাংলাদেশ। গেল ২০ বছরে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের নানা কুফলে মারা যায় ৫ লাখ ২৮ হাজারেরও বেশি মানুষ এবং ৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (পিপিপিতে) ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আর এর সরাসরি ফলাফল হিসেবে আবহাওয়া বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে ১১ হাজারটি। ‘ইউএনইপি অ্যাডাপ্টেশন গ্যাপ’-এর ২০১৩ সালের রিপোর্টে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বা ফলাফলের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক খরচের পরিমাণ এখনকার চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশ মোটেই দায়ী নয়, বিষয়টি এমনও নয়। একেবারে দায় এড়ানোর মতো পর্যায়ে নেই। এক সময় দেশের কৃষি ছিল সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতিভিত্তিক। প্রকৃতিও উজাড় করে তার অফুরন্ত সম্পদ মানুষকে দিয়েছে। মানুষ তা ভোগ করেছে। এখন পুরোপুরি উল্টাচিত্র। ভিন্ন প্রেক্ষাপট। দেশে অধিক হারে মানুষ বাড়তে থাকা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণে জমির চাহিদা বাড়ছে। চাহিদা পূরণে নির্বিচারে বনাঞ্চল উজাড় করা হচ্ছে। ভরাট করা হচ্ছে নদী ও খাল। কলকারখানা ও যানবাহনে মাত্রাতিরিক্ত জ্বালানি পোড়ানো হচ্ছে। ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র তৈরি করার জন্য গাছপালা কেটে প্রাকৃতিক বন উজাড় করায় বায়ুম-ল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করার মতো পর্যাপ্ত গাছ আর থাকছে না। এতে বায়ুম-লে এ ক্ষতিকর গ্যাস বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে গাছপালা উজাড় করায় বায়ুম-লে অক্সিজেন যাচ্ছে কমে।

কলকারখানার বর্জ্য, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, বনভূমি ধ্বংস, নদ-নদী, জলাধার ভরাট, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার এসবই মানবসৃষ্ট। পরিণতি যা হওয়ার তাই হচ্ছে। চারপাশের পরিবেশ যে ক্রমেই অবনতি ঘটছে তাতে শঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত শিল্পবিকাশের ফলে সংকট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ বাতাস আর পানি সরবরাহে। দূষণের কারণে চাষের জমির গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বন-বনানী ধ্বংস হয়ে উদ্ভিদ, বন্যপ্রাণী আর মৎস্যসম্পদ নিঃশেষ হয়ে আসছে। পৃথিবীর নানা অঞ্চল এখন মরুর আগ্রাসনে। তার ওপর বিশাল আতঙ্কের মতো দেখা দিয়েছে গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার প্রভাব। ভূম-লের তাপমাত্রা গত দেড়শ বছর ধরে অব্যাহত গতিতে বাড়ছে। তার ফলে দেশে দেশে জলবায়ু বদলে যাচ্ছে, ক্রমে ফুঁসে উঠছে সাগর-মহাসাগর। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো নিচু ব-দ্বীপ অঞ্চলের দেশে যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব পৃথিবীর সব দেশের চেয়ে বেশি সেখানে গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার ফলাফল হবে সুদূরপ্রসারী। পরিবেশের যে নিদারুণ সংকট এক ভয়ঙ্কর দানবের মতো এগিয়ে আসছে ক্রমশ।

কিছুদিন আগে, ঢাকা ও এর আশপাশের ৫ জেলার ৩১৯টি অবৈধ ইটভাটার তথ্য আদালতকে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। জানিয়েছেন মানে জানাতে হয়েছে একটি রিট মামলার কারণে। বায়ুদূষণের প্রধান উৎসগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি দেশের সবচেয়ে দূষিত এলাকার তালিকা করা এবং দূষণ কমানোর পরিকল্পনা দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে হাইকোর্ট থেকে। উপযুক্ত স্থানে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত ‘কন্টিনিউয়াস এয়ার মনিটরিং স্টেশন’ বসানো এবং বিপজ্জনক-অস্বাস্থ্যকর বায়ু থেকে জনগণকে রক্ষায় ‘অ্যালার্ট’ (সতর্কবার্তা) পদ্ধতি চালু করার নির্দেশনা রয়েছে আদালতের।

এ ছাড়া পোড়ানো ইটের বিকল্প পদ্ধতির উন্নয়ন ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। আইন-আদালতি ফয়সালায় পরিবেশ বা বায়ুদূষণ কতটা রাখা সম্ভব, তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। তবে আদালতের তাগিদ একটি বিষয়। এ ছাড়া কিছু আইনও রয়েছে। গণসচেতনতা না এলে আইন কতটুকুই বা দূষণ রুখতে পারবে? আরেকটি বাস্তবতা হচ্ছে, নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষসহ জীববৈচিত্র্যে খরার টান বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়া জরুরি নয়। সাধারণ কা-জ্ঞানের যে কারও কাছেই তা বোধগম্য।

 

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক-কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন