advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

হৃদয় মণ্ডলকে মুক্তি দিয়ে আমাদের লজ্জামুক্ত করুন

ড. কাজল রশীদ শাহীন
১০ এপ্রিল ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২২ ১০:১৬ এএম
advertisement

হৃদয় মণ্ডলের সঙ্গে যারা করা হয়েছে- তা শুধু অন্যায় নয়, অপরাধও বটে। অথচ অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছে হৃদয় মণ্ডলকেই। কিন্তু কেন, হৃদয় মণ্ডলদের অপরাধ কী? হৃদয় মণ্ডলদের অপরাধী সাব্যস্ত করা আমাদের কাছে পান্তাভাতের মতোই সহজপাচ্য হয়েছে বলেই কি সাম্প্রতিক সময়ে এই ববরতার উল্লম্ফন দেখতে হচ্ছে আমাদের? তা হলে আমরা কবে মানবিক হব? কবে জ্ঞান কাঠামোর ভিত্তিতে সবকিছুর ফায়সালা করার মতো সভ্য হয়ে উঠতে পারব? একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দ্বিতীয় দশকে এসেও যে চিত্র দেখতে হচ্ছে এ দেশে- তা শুধু বেদনার নয়, লজ্জারও। কবে আমাদের খাসলত হবে যে, সবকিছু এক নয়। জগৎসংসারে সবই প্রয়োজনীয় এবং মাত্রাভেদে সবার অবস্থানই যথার্থ।

ধর্ম, বিজ্ঞান ও দর্শনকে আমরা যেন কখনই এক পাল্লায় না মাপি। এক নিক্তিতে দেখার বিষয় এগুলো নয়। মনে রাখতে হবে- আমরা আলু যে পাল্লায় ওজন করি, যে বাটখারা ব্যবহৃত হয়; স্বর্ণ সেই পাল্লা ও বাটখারায় মাপা হয় না। তা হলে ধর্ম, বিজ্ঞান ও দর্শনকে কেন এক করে দেখছি বা সেভাবে দেখার প্রাণান্ত চেষ্টা চলছে। এই চেষ্টা যে প্রকারান্তরে বুদ্ধিহীনতার নামান্তর, সেটি কেন আমরা ভুলে যাচ্ছি। এটি যদি অব্যাহত থাকে- তা হলে মূর্খতায় উৎপাদিত হবে, অন্যকিছু নয়।

সবার আগে আমাদের কাছে পরিষ্কার হতে হবে ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞান কী। ধর্ম হলো পুরোপুরি বিশ^াসের ব্যাপার। দর্শন হলো যুক্তি। সে যুক্তি দিয়েই সবকিছু বিচার করতে চাই। বিজ্ঞান পুরোটাই প্রমাণসাপেক্ষ। এগুলোর অবস্থান ও পরিচয় স্পষ্ট এবং এখানে কোনো চাপানউতোরের ব্যাপার নেই। সমস্যা হলো আমাদের- আমরা নানাভাবে এগুলোকে ব্যবহার করি এবং সেটি করতে গিয়েই বাধে নানা ধরনের ঝামেলা। কারণ তখন স্বার্থ যুক্ত হয়ে যায়। স্বার্থের জন্য তাদের যে পরিচয়, সেই পরিচয়কে স্বার্থ সাপেক্ষে ব্যবহৃত হয়। ফলে তারা যাÑ সেটি হয় কখনো লঘু হয়ে দাঁড়ায়, কখনো বা গরিষ্ঠ হয় কিংবা ভুল পরিচয়ে মহিমান্বিত হয়। তখনো সমস্যা বাধে এবং সমস্যা কেন্দ্র করে সুবিধাবাদী মহল নিজেদের সুবিধা লুটে নেই; ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রে বড় রকমের ক্ষতি সাধন করে।

মুন্সীগঞ্জের হৃদয় মণ্ডলকে নিয়ে যে ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, তার পেছনে ধর্ম ও বিজ্ঞান মোটেই দায়ী নয়। বরং এখানে ধর্ম ও বিজ্ঞানকে ব্যবহার করা হয়েছে এবং অত্যন্ত সুচতুরভাবে এ ঘটনার স্ক্রিপ্ট তৈরি করে সেই অনুযায়ী পুরো গেমটি সাজানো হয়েছে। এই ঘটনার শিকড় যে অনেক গভীরে, সেটি যদি আমরা একটু ভালোভাবে খেয়াল করি- তা হলে খুব সহজেই বিষয়টি ধরা যায়।

হৃদয় মণ্ডলকে বিনোদপুর স্কুলে কারা রাখতে চাই না, সেটি খুঁজে বের করা দরকার। হৃদয় মণ্ডলই কেন টার্গেটে পরিণত হলেন, তার শানে-নজুল খুঁজে পেতে বেগ পাওয়ার কথা নয়। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের জনসংখ্যা যেখানে কেবলই ঊর্ধ্বমুখী, সেখানে কেন হিন্দু সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা অস্বাভাবিক হারে কমে যাচ্ছে- তার একটি কেস স্টাডি হতে পারে হৃদয় মণ্ডলের ঘটনা।

এই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে তিনটি ঘটনা সবার মুখে মুখে। এক. টিপ কাণ্ড- যাতে ড. লতা সমাদ্দারকে হতে হয়েছে অপমানিত। দুই. একজন বিজ্ঞান শিক্ষকের বক্তব্যে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ- যা গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত এবং হৃদয় মণ্ডলকে করা হয়েছে কারান্তরীণ। তিন. শিক্ষার্থীদের স্কুল ড্রেসকে নিয়ে সৃষ্ট জটিলতাকে দেওয়া হয়েছে হিজাবের মোড়ক। শিক্ষক স্কুল ড্রেস পরে ক্লাসে না আসায় করেছেন শাসন। সেটিকে বলা হচ্ছে হিজাব পরে স্কুল আসায় করা হয়েছে মারধর। মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে দাউল বারবাকপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আমোদিনী পালের বিরুদ্ধে। লক্ষণীয়, তারা তিনজনই শিক্ষক ও হিন্দু ধমাবলম্বী। প্রশ্ন হলো, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশে কি খুব সহজ হয়ে গেছে? তা না হলে এসব ধৃষ্টতা আসে কোথা থেকে! কে বা কারা পেছন থেকে কলকাঠি নাড়াচ্ছে? কারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ওপর মিথ্যা কলঙ্ক তিলক পরানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। শুধু উত্তর খোঁজা নয়, ভেতরের চিত্র তালাশ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ আশুকর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ব্যাপারে যত গড়িমসি কিংবা শৈথিল্য প্রদর্শন করা হবে, পরিস্থিতি ক্রমেই তত ঘোলাটে হবে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা অবশ্য এটিই বলছে। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা থাকার পরও কেন দুষ্কৃতকারীরা এতটা প্রশ্রয় পাচ্ছে এবং এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছে, সেটিই ভাবনার বিষয়।

আমাদের বেশির স্কুলে নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে। দুর্নীতি সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে রয়েছে। স্কুলে দালান কাঠামো তৈরিতে দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, এমনকি স্কুলের নৈশপ্রহরী নিয়োগেও রয়েছে দুর্নীতির লাগামহীনতা। আমাদের শিক্ষার্থীরা এসব নিয়ে কোনো প্রতিবাদ করেছে বলে সংবাদপত্রে দেখা যায় না কখনই। কিন্তু তারা ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে ঠিকই তাদের শিক্ষককে কারাগারে পাঠাতে বাধ্য করেছে। এ জন্য মিছিল করেছে, ক্লাস বন্ধ করেছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা যদি বাস্তবিকই এ বয়সে এতটা সচেতন হতো, তা হলে আমরা নিশ্চয় বড় করে একটি হাততালি দিতাম। ভাবতাম, আহা! সোনার বাংলার ছেলেরা সত্যিই সোনা হয়ে উঠছে। কিন্তু তারা তো স্কুলের কোনো দুর্নীতির ব্যাপারে এতটা সোচ্চার নয়। শিক্ষকরা ঠিকমতো না পড়ালে, শ্রেণিকক্ষে না পড়িয়ে প্রাইভেট-কোচিংয়ে পড়ানোর ফাঁদ পাতলেও তারা টুঁ শব্দ করে না। অথচ একজন হৃদয় মণ্ডলকে কারাগারে পাঠাতে তারা এতটা বাহাদুর হয়ে উঠল কীভাবে- এই প্রশ্নের উত্তর কি মিলবে কখনো? ওই বয়সী শিক্ষার্থীরা কি আদৌ বোঝে ধর্ম অবমাননা কি? ধর্মকে কেউ চাইলেই কি অবমাননা করতে পারে? শিক্ষার্থীরা তো শিক্ষকের কাছে থেকেই বুঝবে বিষয়গুলো কী, নাকি শিক্ষার্থীরাই বোঝাবে শিক্ষককে? আমরা কি একবারের জন্যও ভেবে দেখেছি, হৃদয় মণ্ডল কত সুন্দর করেই না বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থায় না গিয়েও কীভাবে সত্যের আশ্রয় নেওয়া যায়, তার অনন্য নজির স্থাপন করেছেন তিনি। তাকে তো আমাদের স্যালুট জানানো উচিত।

হৃদয় মণ্ডলকে আরও নানা কারণে স্যালুট জানানো উচিত। তার চাকরি জীবনের রেকর্ড তেমনটাই বলে। তিনি অনেক ক্ষেত্রেই সত্যের প্রতীক। ক্লাসে কখনো নিজে দেরি করে আসেন না, অন্যকে আসতেও প্রশ্রয় দেন না। পরীক্ষায় কেউ ৩২ পেলে তিনি ৩২ দেন। নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো প্রকার করুণা দেখান না। প্রশংসা পাওয়ার জন্য সত্যের বরখেলাপ করেন না। তার ২২ বছরের শিক্ষকতা জীবনের যে রেকর্ড- তা শুধু বিনোদপুর স্কুলের শিক্ষকদের ইতিবাচক রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো শুধু নয়, বাংলাদেশের অন্যসব শিক্ষককে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো। তাকে তো দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের মর্যাদা দেওয়া উচিত।

হৃদয় মণ্ডলকে কারান্তরীণ করা নিয়ে মুহম্মদ জাফর ইকবাল যে মন্তব্য করেছেন, তা প্রণিধানযোগ্য। তিনি হৃদয় মণ্ডলের কোনো অপরাধ খুঁজে পাননি। উপরন্তু ওনার মনে হয়েছে, হৃদয় মণ্ডলের কথাগুলো তার নিজেরও কথা। একজন বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে তিনিও এ কথাগুলো বলতেন এবং বলেন। এ কারণে মুহম্মদ জাফর ইকবাল মনে করেন, হৃদয় মণ্ডলকে যদি কারাগারে রাখা হয়, তা হলে তাকেও যেন কারাগারে নেওয়া হয়। কারণ তিনিও একই অপরাধে অপরাধী এবং নবম-দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ে সম্পাদনাও ওনার করা।

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কী চাই। হৃদয় মণ্ডলের ব্যাপারে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হতাশার এবং শোচনীয়ও বটে। রাষ্ট্র কি একজন হৃদয় মণ্ডলকে কারাগারে রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপদ বোধ করছে? যদি এমনটি মনে করে, তা হলে বলতে হয়Ñ এই নিরাপদবোধ সাময়িক স্বস্তি দিলেও আখেরে বড় রকমের অনিরাপত্তার জন্ম দেবে। রাষ্ট্রের উচিত নিজে থেকেই পুরো ঘটনার সঠিক তদন্ত ও হৃদয় মণ্ডলকে সসম্মানে মুক্তি দিয়ে সম্মানিত এবং এই ঘটনার নেপথ্যে যারা কলকাঠি নেড়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করা। হৃদয় মণ্ডল যদি পরাজিত ও পর্যুদস্ত হনÑ তা হলে আখেরে আমরা সবাই পর্যুদস্ত হব, পরাজিত হবে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু শৈশবে তার স্কুলের ছাদ মেরামতের জন্য সোচ্চার হয়েছিলেন। সোহরাওয়ার্দীর পথ আগলে দাঁড়িয়েছিলেন। আর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর শুভক্ষণ পেরোনোর পরের বছরে এ দেশের স্কুলের শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকের নামে মিথ্যা অভিযোগ এনে তাকে জেলে পাঠানোর জন্য মিছিল করে, অবরোধ করে, একাট্টা হয়। যে শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই শিক্ষকের বক্তব্য রেকর্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করল, তারা এই দুঃসাহস এবং শিক্ষা কোথা থেকে পেল? এর পর তারা যদি মা-বাবার সঙ্গে কথোপকথনও যদি রেকর্ড ও ভাইরাল করে এবং মা-বাবার বিরুদ্ধে এ রকম কোনো অভিযোগ আনে- তা হলে আমাদের আশ্চর্য হওয়ার কোনো কারণ থাকবে কি?

 

ড. কাজল রশীদ শাহীন : লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক