advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূমিপুত্রদের কান্না

ড. মো. গোলাম সারয়ার
১০ এপ্রিল ২০২২ ১১:০৫ এএম | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২২ ১১:০৫ এএম
advertisement

প্রাচীন জনপদ বরেন্দ্র। প্রাচীন বাংলায় ৪০০ বছর রাজত্বকারী পাল রাজাদের ‘জনকভু’ বা পিতৃভূমি হলো বরেন্দ্রভূমি। এই বরেন্দ্রভূমির দেওপাড়াতে পাওয়া গেছে বিজয় সেনের দেওপাড়া লিপি। ঐতিহাসিকরা ধারণা করেন, সেন রাজা বিজয়সেনের রাজধানী বিজয়নগর এ অঞ্চলেই গড়ে উঠেছিল। প্রাচীন বাংলার ঐতিহাসিক সন্ধ্যাকর নন্দী রামচরিত গ্রন্থে প্রাচীন বরেন্দ্রের ঐশ্বর্যের বর্ণনা দিয়েছেন ছত্রে ছত্রে।

কালের পরিক্রমায় প্রাচীন-মধ্যযুগ পেরিয়ে এখন আমরা আধুনিক চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছি। উপনিবেশিক ব্রিটিশ, পাকিস্তানি আমল পার হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেরও পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু বরেন্দ্র অঞ্চলে বসবাসকারী প্রাচীন জনজাতি আদিবাসীদের জীবনে আসেনি কোনো পরিবর্তন। ঐতিহাসিককাল থেকেই বরেন্দ্র অঞ্চলে সাঁওতাল, রাজবংশী, মুণ্ডা, পাহাড়ি, ওঁরাও প্রভৃতি আদিবাসী জনজাতির বসবাস। কিন্তু প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে করতে তাদের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে।

advertisement 3

আদিবাসীদের প্রতি নিপীড়নের অন্যতম প্রমাণ হলো এই বরেন্দ্র অঞ্চলের দেওপাড়া ইউনিয়নের নিমঘুটু গ্রামের আদিবাসী প্রান্তিক কৃষক রবি মার্ডি ও অভিনাথ মার্ডির বিষপানে আত্মহত্যার ঘটনা। অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম কনক, অধ্যাপক সৌভিক রেজা, শিক্ষার্থী আব্দুল মজিদ অন্তর, অরিফ ইথার ও কাজী কিরণসহ আমরা কয়েকজন গত ৫ এপ্রিল নিমঘুটু আদিবাসী পল্লীতে গিয়ে সেখানকার আদিবাসীদের বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করি।

advertisement 4

পাম্প অপারেটরদের শোষণ ও কৃষি জমিতে পানি না পাওয়া তাদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেখা যাচ্ছে, কৃষি জমিতে সামান্য পানির জন্যও পরিচয়টা গুরুত্বপূর্ণ। মূলত আদিবাসী হওয়ার কারণেই তারা যে অবহেলায় শিকার হচ্ছেন, তার উত্তর কারও কাছে নেই।

দেখা যাচ্ছে, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) যথাযথ নজরদারির অভাব ও অবহেলার কারণে অনেক গভীর নলকূপ অপারেটর এ অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকদের সেচের নায্য পানি থেকে বঞ্চিত করছে। গ্রীষ্ম মৌসুমে যখন ভূগর্ভস্থ পানির সংকট দেখা দেয়, তখন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নলকূপ অপারেটররা আদিবাসী প্রান্তিক কৃষকদের সেচের পানির জন্য দিনের পর দিন ঘোরাতে থাকে। অপারেটররা পাম্প থেকে পানি দিতে দেরি করে। এতে আদিবাসী কৃষকেরা ফসলের ক্ষতির মুখে পড়তে থাকে। এভাবে তারা ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে না। তখন মহাজনের কাছে দাদন বা এনজিওর দারস্থ হতে হয়।

আত্মহত্যাকারী অভিনাথ ১০ হাজার টাকা কর্জ করেছিল ঈশ্বরীপুর গ্রমের সামীমের কাছ থেকে। এই ঋণের বিনিময়ে মহাজন ধান উঠলে ৬০০-৭০০ টাকা মণ দরে তার কাছে ধান নিবে। কিন্তু সেসময় বাজার হয়তো ধানের প্রকৃত দর থাকবে ১৩০০-১৪০০ টাকা মণ। আর এভাবে এই চক্রের মধ্যে আদিবাসী প্রান্তিক কৃষক হয়ে পড়ছে নিঃস্ব। একটা পর্যায়ে সে বাধ্য হচ্ছে নিজের জমি বিক্রি করে দিতে বা অন্যের কাছে লিজ দিতে। ক্রমান্বয়ে সে পরিণত হচ্ছে দিন মজুরে। অনেক ক্ষেত্রে নলকূপ অপারেটররা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা এই জমিগুলো কিনে নিচ্ছে। এভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলের আদিবাসীরা উচ্ছেদের শিকার হচ্ছেন।

ব্রিটিশ আমলের রেকর্ডে ও পাকিস্তান আমলের মাঝামাঝি পর্যন্তও দেখা যায়, এসব অঞ্চলে আদিবাসীদেরই ভূমির পরিমাণ ছিল বেশি। কিন্তু বর্তমানে তারা পরিণত হয়েছে প্রান্তিক চাষিতে। ভূমি ও কর্ম হারিয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে বা দেশান্তরী হয়ে তারা ভারতে চলে যাচ্ছেন।

বাঙালি মধ্য চাষি বা ব্যবসায়ী যারা অনেক জমি লিজ নিয়ে কৃষি কাজ করছে, নলকূপের অপারেটররা অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে তাদের সময়মতো সেচের পানি দেয়। আর ক্ষুদ্র কৃষকরা হয় বঞ্চিত। এমন গভীর নলকূপ চালক সাখাওয়াতের দিনের পর দিন হয়রানির প্রতিবাদে নিমঘুটু গ্রামের অভিনাথ মার্ডি (৩৬) ও রবি মার্ডি (২৭) ঈশ্বরীপুরে গভীর নলকূপের পাশেই বিষপান করেন। অভিনাথ সেরাতেই মারা যান। হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু হয় রবি মার্ডির।

আদিবাসীরা মূলত পুরো এলাকার ধান চাষের সঙ্গেই জড়িত। কৃষি শ্রমিক হিসেবে বাঙালিদের জমির ধান লাগানো, কেটে দেওয়া সব কাজই তারা করে থাকেন। আর নলকূপ অপারেটরা তাদের জমিতে এক রকম ফ্রি খাটায় আদিবাসীদের।

এই গ্রামের অধিবাসী সুদক্ষণ টপ্পর কথাতে অপারেটর সাখাওয়াতের অত্যাচারের চিত্রই উঠে এসেছে। পানির চক্রে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সাখাওয়াত আদিবাসীদের দিয়ে ঘর-গেরস্থালির প্রায় সব কাজই ফ্রিতে করিয়ে নেন। অপারেটরদের জমিতে ধান লাগানো, থেকে কেটে ঘরে তুলে দেওয়া পর্যন্ত সব কাজ করে দিতে হয় নামমাত্র মূল্যে।

আদিবাসী মহেশন মুর্মূ আমাদের কাছে বলেন, সাখাওয়াত তাকেও পানির জন্য দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে। তার জমিও ফেটে গিয়েছিল। তার বাড়িতে গিয়ে পানির জন্য কথা বললে মহেশনকে ধরে মারধার করে।

এভাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আদিবাসীদের উপর অপারেটরদের দৌরাত্ম্য লক্ষণীয়। আজ এই মৃত্যুর ঘটনার মধ্য দিয়ে বিষয়টি সামনে এসেছে। বিএমডিএর বেশিরভাগ সেচ ব্যবস্থাপনাতে এই চিত্র পাওয়া যাবে।

আদিবাসীরা জানিয়েছেন, জমি তৈরির সময় অপারেটর জমিতে পানি দেওয়ার কথা বলে তার নিজস্ব জমিতে কাজ করিয়ে নেয়। আবার এদের  দৌরাত্ম্য এতই যে, আদিবাসী কৃষক যদি অন্য কোনো ব্যক্তির কৃষিযন্ত্র দিয়ে চাষ করায় তাহলে পানি দিতে চায় না। তাদের বেশি টাকায় অপারেটরের পছন্দের ব্যক্তির কাছ থেকে কৃষি যন্ত্র নিতে হয়। আবার দিনের পর দিন পানির জন্য ঘুরতে ঘুরতে প্রন্তিক আদিবাসী দিনমজুরীর কজসহ পারিবারিক অন্য কাজগুলো করতে পারে না। এভাবে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে থাকে।

এভাবেই বিএমডিএর পানিকে কেন্দ্র করে এখানে এক ধরনের সামন্ততন্ত্র গড়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যোগসূত্রর আছে ক্ষমতা, পুলিশ ও আমলাতন্ত্রের। সেই রাতেই অভিনাথ মার্ডির মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যরা পুলিশকে জানিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ কোনো সহযোগিতা করেনি। এই সুযোগে সাখাওয়াত লোকজন জড়ো করে ভয়ভীতি দেখিয়েছে। আবার পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে বলেছে যে, সাখাওয়াতকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আর এখন যখন নানা দিক থেকে আন্দোলন শুধু হয়েছে, তখন তাকে ধরা হলো। সুতরাং ক্ষমতাতন্ত্রের সঙ্গে সাখাওয়াতের যোগসাজস অনেকটাই স্পষ্ট।

স্থানীয় আদিবাসীদের অনেকই অভিযোগ করেছেন, সাখাওয়াত ইউপি চেয়ারম্যানের কাছের লোক। চেয়ারম্যান সাখাওয়াতের পক্ষ নিয়েছে। চেয়ারম্যান প্রথম দিকে বলেছেন, তার কাছে কেউ পানির ব্যাপারে অভিযোগ জানায়নি। আবার তিনি বলেছেন, এরা নেশা খেয়ে মরেছে। কিন্ত আদিবাসীরা বলছেন, তারা একাধিকবার চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন।

বাস্তবতা হলো, আদিবাসীরা নিজেরাই লড়াই করছে। কোনো বড় রাজনীতিবিদ এগিয়ে আসেনি বলে তারা জানিয়েছেন। বরং নানাভাবে মীমাংসার জন্য চাপ দিয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান শুধু মৃত্যুর দিন এসেছিল।

মৃত রবি মার্ডি অবিবাহিত আর অভিনাথের দুই সন্তান ও স্ত্রী রয়েছে। তারা সামনের দিকে অন্ধকার দেখছে। আদিবাসীদের প্রতি সহমর্মিতা দেখায় নানা এনজিও, বুদ্ধিজীবী, লোক গবেষক, নৃবিদ্যার গবেষক, মিডিয়া কর্মী প্রমুখ। কিন্তু এত বড় মর্মান্তিক ঘটনায় সাড়া মিলেছে খুব অল্প সংখ্যক ব্যক্তি ও সংগঠনের কাছ থেকে। আপাতত বিএমডিএর সেচ ব্যবস্থায় শৃংখলা ফিরিয়ে আনা জরুরি। সাখাওয়াতসহ অন্য নিপীড়ক অপারেটরদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। বিএমডিএর অব্যবস্থাপনাকে চিহ্নিত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

সর্বোপরি বিবেকবান, প্রগতিশীল ব্যক্তি ও সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে।  নিপীড়নমূলক এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র-সমন্ততন্ত্রের অবসন ছাড়া এই আদিবাসীদের মুক্তি নাই।

ড. মো. গোলাম সারয়ার: সহযোগী অধ্যাপক,  ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement