advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

নববর্ষে আর্থসামাজিক পুনরুদ্ধার

ড. আতিউর রহমান
১৪ এপ্রিল ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২২ ১১:০৭ এএম
ড. আতিউর রহমান
advertisement

বাঙালির আত্মপরিচয় সন্ধানের বড় মাইলফলকের নাম পহেলা বৈশাখ। ঘটা করে জাতীয়ভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের শুরুটা হয়েছিল ষাটের দশকে পাকিস্তান আমলে। সে সময়ে নিজেদের বাঙালি হিসেবে দাবি করাটাই সাহসের কাজ ছিল। নিঃসন্দেহে আমাদের সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে পহেলা বৈশাখ বরণ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু সেই ইতিহাস আমাদের অনেকের কাছেই অজানা। ১৯৬১ সালে একদিকে পাকিস্তান আমলের দমবন্ধ পরিবেশ, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির স্বাধিকারের আন্দোলনের মধ্যেই এসেছিল রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ। রবীন্দ্রনাথ বাঙালির অস্তিত্বের প্রতীক। দলমত, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি নির্বিশেষে একত্রে বেড়ে ওঠার অনুপ্রেরণার উৎস তিনি। তাই স্বৈরাচারী ও গণবিরোধী পাকিস্তান সরকার অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করে এই উদযাপনের ওপর। এর প্রতিবাদে গণমুখী আঙ্গিকে সুর ও সংগীতকে উপস্থাপন করার লক্ষ্যে সন্জীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক, মোখলেসুর রহমান (সিধু ভাই), আহমেদুর রহমানসহ (‘ভিমরুল’) অনেকেই সম্মিলিত উদ্যোগ নেন। এভাবেই প্রতিষ্ঠা লাভ করে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ছায়ানট। মূলত ছায়ানট সংগঠকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক, হাইকোর্টের বিচারপতি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক গুণীজনরা ঐক্যবদ্ধভাবে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালন করতে এগিয়ে আসেন। ‘আমরা রবীন্দ্রসংগীত গাইবই’ বলে সেদিন জোর সংকল্প প্রকাশ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। একই সঙ্গে তিনি নজরুলকে খ-িতভাবে উপস্থাপনেরও বিরুদ্ধে ছিলেন। আর সে কারণেই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধ মিলেমিশে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে পোক্ত করা সম্ভব হয়েছিল পাকিস্তানি সেই আঁধার যুগেও।

সাংস্কৃতিক আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠার ধারা বিবরণীটি ঠিক সেভাবে আমাদের সন্তানদের বলে উঠতে পারিনি আমরা। তাই বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশে সাংস্কৃতিক আন্দোলন নির্মাণের রাজনৈতিক যুদ্ধের ভিত গড়তে, সাংস্কৃতিক কর্মীরা, বিশেষ করে ‘ছায়ানট’ সংগঠক ও কর্মীদের অবিস্মরণীয় ভূমিকা আজকের তরুণ প্রজন্মকে জানানোর প্রয়োজন রয়েছে। সুর দিয়ে মানুষের মনের গভীরতর স্বপ্নকে প্রভাবিত করার এ প্রচেষ্টাকে আরও সক্রিয় করার অভিপ্রায়েই ১৯৬৭ সালে রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেন ছায়ানট সংগঠকরা। প্রয়াত ড. নওয়াজেশ আহমদ ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমিক একজন বিজ্ঞানী। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এক স্মারকবক্তৃতায় (২০০৭) তিনি বলেছিলেন কীভাবে রমনা বটমূলের পহেলা বৈশাখের সূত্রপাত হয়। সন্জীদা আপার মুখেও এ কথা বহুবার শুনেছি। ড. নওয়াজেশ সেদিন বলেন, “১৯৬৭ সনে ওয়াহিদুল এবং সন্জীদা আমাকে বলল, ‘এবার আমরা বাংলা নববর্ষ বাইরে করব। তুমি একটা গাছ দ্যাখো।’ আমার উপর ভার দিল ওয়াহিদুল। আমি ওয়াহিদুলকে রমনা বটমূলের কথা বললাম।”

স্বাধীন বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতির অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। রমনা বটমূলের এই নববর্ষ উদযাপন এখন সারাদেশ ও বাঙালি অধ্যুষিত বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। লাখো বাঙালি বাংলা নববর্ষে পথে নেমে পড়ে। নতুন জামাকাপড় পরে এক উজ্জ্বল সকালে তাদের আনন্দঘন উপস্থিতি বাঙালির অস্তিত্বের জানান দেয়। এর পাশাপাশি চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশের এক অসাধরণ অগ্রযাত্রার প্রতীক বাঙালির এসব সাংস্কৃতিক আয়োজন। কিন্তু তা সত্ত্বেও সম্প্রতি ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে আমাদের আলোর পথযাত্রাকে পুরনো সেই সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো অন্ধকারাচ্ছন্ন করতে চাইছে। অযথা বাঙালির দীর্ঘদিনের ঐক্যবদ্ধ পথচলায় কাঁটা বিছাতে চাইছে। গত বছর দুর্গাপূজা উদযাপনের সময় আমরা কিছু জায়গায় ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর অপতৎপরতা দেখেছি। তখন ছায়ানটসহ সব সাংস্কৃতিক সংগঠন এই হীন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। কোমলমতি তরুণদের বিভ্রান্ত করার বিরুদ্ধে সেই প্রতিবাদ আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি। অথচ সেই কত আগে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘যে দেশে প্রধানত ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্য কোন বাঁধনে তাকে বাঁধতে পারে না, সে দেশ হতভাগ্য। সে দেশ স্বয়ং ধর্মকে দিয়ে যে বিভেদ সৃষ্টি করে সেইটে সকলের চেয়ে সর্বনেশে বিভেদ। মানুষ বলেই মানুষের যে মূল্য সেইটেকেই সহজপ্রীতির সঙ্গে স্বীকার করাই প্রকৃত ধর্মবুদ্ধি’ (রবীন্দ্র রচনাবলী, দ্বাদশ খ-, পৃষ্ঠা ৬৬৬)। সেই পরিপ্রেক্ষিত মনে রেখেই এবারের বাংলা নববর্ষে আমরা স্মরণ করব বাঙালির পঞ্চাশ বছর ধরে সাহসের সঙ্গে স্বকীয় সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার পক্ষে এগিয়ে যাওয়ার এই অবিস্মরণীয় কাহিনি।

করোনা-পরবর্তী বাংলা নববর্ষের পুরোদমে উদযাপন নিশ্চয়ই আবারও আমাদের সাহস জোগাবে আগামীর চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে এগোনোর জন্য। বাংলা নববর্ষ ঘিরে সব উদযাপনের মূল কথা বাঙালির আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান ও অসাম্প্রদায়িকতার মর্মবাণী তুলে ধরা। আগের দুটি নববর্ষ আমরা করোনা মহামারীর কারণে সেভাবে উদযাপন করতে পারিনি। তাই এ কথা মানতেই হবে যে, এবারের নববর্ষ উদযাপন হবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ বছর আবার বর্ষবরণ হবে রমনা বটমূলে। গত দুবছর ধরেই আমরা ঘরবন্দি ছিলাম। সে সময়টায় বিশ^ব্যাপী নেমে এসেছিল ‘মানবিক, সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়।’ সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে আলোর পথে হাঁটতে এবার বাঙালি সমবেত হতে চাইছে নববর্ষে রমনার বটমূলে। শত দুঃখ সত্ত্বেও নিশ্চয় এবারের নববর্ষে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি নির্বিশেষে সবাই যুক্ত হবেন এই আনন্দযজ্ঞে। নব আনন্দে জাগবে মানুষ। আমার দৃঢ়বিশ^াস, এবারের পহেলা বৈশাখে ঘটবে মুক্তমনের প্রবল বিস্ফোরণ। নতুন করে বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা আরও জোরদার হবে এই শুভদিনে।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, নববর্ষের এই উদযাপনের সাংস্কৃতিক গুরুত্বের পাশাপাশি রয়েছে অর্থনৈতিক গুরুত্বও। ভেবে দেখুন, এই সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উদযাপন কেন্দ্র করে করোনাজনিত অর্থনৈতিক অচল আবস্থায় ঝিমিয়ে পড়া খাতগুলোয় গতি সঞ্চার হলে তা পুরো অর্থনীতির জন্য কতটা ইতিবাচক হতে পারে! মধ্য ও উচ্চবিত্তের কথা না হয় না-ই বা বললাম, শহরের নিম্নআয়ের মানুষ যারা- ধরা যাক গার্মেন্ট শ্রমিকদের কথা, তারা সবাই যদি পরিবারের জন্য নববর্ষ উপলক্ষে কিছু কেনাকাটা করেন; তা হলে এতে কয়েক হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হওয়ার কথা। গ্রামেও তো এখন সেবা খাতের ব্যাপ্তি বিশাল। গ্রামীণ আয়ের ৬০ শতাংশই আসছে অকৃষি খাত থেকে। কাজেই নববর্ষ কেন্দ্র করে গ্রামের অকৃষি খাতের উদ্যোক্তারাও বাড়তি বেচাকেনার মুখ দেখবেন। দেশব্যাপী টাকার এই লেনদেনের ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদেরও আয়-রোজগার বাড়বে। তাদের জন্য নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপ মোকাবিলা কিছুটা হলেও সহজতর তো হবেই। করোনার দুর্দশা কাটিয়ে দুবছর পর পুরোমাত্রায় বাংলা নববর্ষ উদযাপন অর্থনীতির জন্য সুখবরই বটে।

দশ-পনেরো বছর আগেও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে পোশাক কেনা অত বেশি ছিল না। কিন্তু করোনা আসার আগে আগে ২০১৯ সালের পহেলা বৈশাখ ঘিরে ১৫ হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন অভ্যন্তরীণ পোশাক প্রস্তুতকারক মালিক সমিতি। এই পোশাক কেবল বিপণি বিতানে বিক্রি হয়েছে এমন নয়, বরং ফুটপাথের বিক্রেতাসহ অনানুষ্ঠানিক বিক্রয়কেন্দ্র থেকেও এর একটি বড় অংশ বিক্রি হয়েছে। ২০১৯ সালের আগের হিসাব বলছে, এই বিক্রির পরিমাণ বছরে গড়ে ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। করেনাকালে এই প্রবৃদ্ধি নিশ্চয়ই ধাক্কা খেয়েছে। তবে এবারের নববর্ষে হয়তো আমরা পুরোপুরি আগের ধারায় না ফিরলেও গত দুই বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পোশাক ও ভোগ্যপণ্য বিক্রি বাড়তে দেখব। কেবল ছোট পোশাক প্রস্ততকারকরাই নন, বড় বড় ফ্যাশন হাউসগুলোও জানিয়েছে, তাদের মোট বিক্রির এক-চতুর্থাংশের বেশি হয় এ বাংলা নববর্ষেই। এর মানে, একমাত্র পোশাক বিক্রি হবে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার। আর শুধু পোশাক বিক্রি কেন, হালখাতা অনুষ্ঠানের জন্য মিষ্টি দোকানের যে ব্যবসা হয়- তাও তাদের সারাবছরের বিক্রির চার ভাগের এক ভাগ। সরকারের ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ নীতি আর ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর কারণে গ্রামাঞ্চলে উৎসবকেন্দ্রিক চাহিদা দ্রুত আরও বাড়বে। ফলে আগামীতে পহেলা বৈশাখ ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রবৃদ্ধির উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। আর মধ্যবিত্তের রেস্তোরাঁয় খাওয়ার যে অভ্যাস গড়ে উঠেছে, তারও প্রভাব অভ্যন্তরীণ ভোগবাণিজ্যে নিশ্চয় পড়বে।

এবারের বাংলা নববর্ষের সপ্তাহ দুয়েক পরই আবার ঈদুল ফিতর। কাজেই বলা যায় চলতি এপ্রিল মাসের দ্বিতীয়ার্ধজুড়েই বাজার সরগরম থাকবে। ঈদের ব্যবসা-বাণিজ্যের সুফলও পৌঁছে যাবে সবস্তরে। আমাদের ক্ষুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তারা দুটি উৎসবের চাহিদা মাথায় রেখেই পণ্য সরবরাহের প্রস্তুতি নিয়েছেন। ফলে অর্থনীতির গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় এ দুটি সপ্তাহ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হবে। নিঃসন্দেহে করোনা-পরবর্তী রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এই বাংলা নববর্ষ উদযাপন আমাদের আর্থসামাজিক পুনরুদ্ধারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে। সব চ্যালেঞ্জের মধ্যেই সম্ভাবনার বীজ লুকিয়ে থাকে। আসছে বাংলা নববর্ষে সম্ভাবনার গেন বীজ থেকে বাঙালির ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন পল্লবিত হোক। শুভ নববর্ষ।

ড. আতিউর রহমান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর