advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আতঙ্কে সুবিধাভোগী প্রভাবশালীরা

শাহজাহান আকন্দ শুভ
১৬ মে ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৬ মে ২০২২ ১১:৩৮ এএম
advertisement

পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদারের সুবিধাভোগী প্রভাবশালী কুশীলবরা আতঙ্কে আছেন। গত শনিবার পিকে হালদার পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তারের পর বাংলাদেশ ও ভারতে থাকা তার সুবিধাভোগী ও আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া গডফাদারদের মধ্যে এই আতঙ্ক শুরু হয়েছে।

ভারতের অর্থ-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) এর হাতে গ্রেপ্তারের পরই ৩ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে পিকে হালদারকে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় পিকে হালদার কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। তিনি অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার, আশ্রয়-প্রশ্রয়দানকারী সুবিধাবাদীদের নাম, কোথায় কী পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়েছেন তার বিস্তারিত তথ্য অকপটে স্বীকার করছেন জিজ্ঞাসাবাদে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পিকে হালদার স্বীকার করেছেন হুন্ডির মাধ্যমেই তিনি ভারতে অর্থ পাচার করেন। ভারতীয় গণমাধ্যম, গোয়েন্দাসহ বিভিন্ন সূত্রে এ খবর পাওয়া গেছে।

advertisement

জানা গেছে, পিকে হালদার ছাড়াও উত্তম মিত্র, স্বপন মিত্র, প্রীতিশ হালদার ও তার জামাতা সঞ্জীব হালদারকে কলকাতার সল্টলেকের পূর্বাঞ্চলীয় সিজিও কমপ্লেক্সে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। শনিবার গভীর রাতে পিকে হালদারসহ ছয়জনকে ব্যাঙ্কশাল সিবিআই কোর্টে হাজির করা হয়। এরপর আদালত তাদের তিনদিন করে রিমান্ড দেন। পিকে হালদারের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং ছাড়াও জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া পাসপোর্ট, আধার কার্ড, প্যান কার্ড ও রেশন কার্ড তৈরির অভিযোগও রয়েছে। ৩ দিনের রিমান্ড শেষ হলে অধিকতর তদন্তের জন্য তাকে সিবিআই রিমান্ডে নিতে পারে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, পিকে হালদার জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশে অর্থ আত্মসাৎ, বিদেশে টাকা পাচার, ভারত হয়ে কানাডায় গমন, জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া পাসপোর্ট, আধার কার্ড, প্যান কার্ড ও রেশন কার্ড তৈরিসহ পশ্চিমবঙ্গে তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া প্রভাবশালীদের বিষয়ে পিলে চমকানো তথ্য দিচ্ছেন। আর নিজের কৃত কর্মের জন্য অনুতাপও করছেন। প্রাথমিক তদন্তে পশ্চিমবঙ্গে পিকে হালদারের ২০০ কোটি টাকার সম্পদের হদিস পেয়েছে ইডি। প্রাপ্ত তথ্যের বিষয়ে পিকে হালদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পিকে হালদার বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সক্রিয় হুন্ডি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই তিনি ৩ বছর আগে ভারতে টাকা পাচার করেন। এই পাচারকাজে দুই দেশের যেসব হুন্ডি ব্যবসায়ী তাকে সহযোগিতা করেছেন, তাদের নামধামও জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন তিনি।

সূত্রের খবর, পিকে হালদার বাংলাদেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ অবৈধ টাকা পাচার করেছেন, সেই তথ্য বাংলাদেশ থেকেই পেয়েছিল ভারতের ইডি। বিলাসবহুল বাড়ি বানানোর তথ্যও বাংলাদেশ দেয়। দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সই হওয়া মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ক্রিমিনাল ম্যাটার্স চুক্তির আওতায় ভারতকে পিকে হালদারের বিষয়ে তথ্য দেয় দুদক। এ তথ্যের ভিত্তিতে ইডি অনুসন্ধান চালিয়ে পিকে হালদারসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করে।

সূত্র জানায়, পিকে হালদার ইডি কর্মকর্তাদের জেরার মুখে কারা তাকে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতে জড়িত হওয়ার মতো ভুল পথে পরিচালিত করেছিল তাদের নাম প্রকাশ করেছেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকজন রাঘববোয়ালের নাম বলে দিয়েছেন। যারা তাকে নাম পরিবর্তন করে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ভারতের নাগরিকত্বের কার্ডসহ অন্যান্য সুবিধা নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি শাসক দলের নেতাদের নামও বলে দিয়েছেন।

এদিকে, গ্রেপ্তার করা স্বপন মিত্রের স্ত্রী পূর্ণিমা মিত্র এবং উত্তম মিত্রের স্ত্রী রচনা মিত্র দাবি করেছেন তাদের স্বামীরা সরাসরি পিকে হালদারের অপরাধের সঙ্গে নন। তারা পশ্চিমবঙ্গে জমি, বাড়ি কেনার বিষয়ে সহযোগিতা করেছিলেন।

সূত্রের খবর, অপরাধের গুরুত্ব অনুধাবন করে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই ইডির পাশাপাশি তদন্তে যোগ দিতে পারে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা-সিবিআই ও সিরিয়াস ফ্রড ইনভেস্টিগেশন অফিস-এসএফআইও।

পিকে হালদারের সহযোগী সুকুমার মৃধার দক্ষিণ ২৪ পরগনার অফিসে তল্লাশি চালিয়ে বেশকিছু নথিপত্র জব্দ করা হয়েছে। সেসব নথিপত্র ইডি কর্মকর্তারা ঘেঁটে দেখছেন। সুকুমার মৃধা মাছের ব্যবসার আড়ালে বিপুল পরিমাণ বেআইনি টাকার লেনদেন করেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী খুরশীদ আলম বলেছেন, পিকে হালদারের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো হয়েছে, সেসব মামলায় রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তখন দেখা যাবে, এখানে আরও অনেক বড় রুই-কাতলা জড়িত রয়েছে। তাদের ধরা তখন সহজ হবে। তিনি কানাডা থেকে ভারতে চলে আসার বিষয়ে দুদকের কাছে কোনো তথ্য ছিল না বলেও জানান এই আইনজীবী।

দুদকের একজন কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ক্রিমিনাল ম্যাটার্স চুক্তির আওতায় পিকে হালদারের বিষয়ে ভারতের কাছে তথ্য চাওয়া হবে। বিশেষ করে রিমান্ডে পিকে হালদার যেসব তথ্য দিচ্ছেন, সেসব বিষয়ে তথ্য চাওয়া হবে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পিকে হালদারকে দ্রুত দেশে ফেরত এনে বিচারের মুখোমুখি করতে বাংলাদেশের কৌশল নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। এছাড়া দুদকের একটি টিম ভারতে পাঠানো যায় কিনা, এ বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের একজন কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, ২০১৪ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার খাগড়াগড় বোমা বিস্ফোরণ ঘটনার পর তদন্তে বাংলাদেশ থেকে একটি টিম পাঠানো হয়েছিল। যে টিমের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বর্তমানে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের অতিরিক্ত আইজি (গ্রেড-১) মনিরুল ইসলাম।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, পিকে হালদারকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে ভারত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারকে কিছু জানায়নি। ভারত এ ব্যাপারে জানালেই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পিকে হালদার ওয়ান্টেড ব্যক্তি, ইন্টারপোলের মাধ্যমে অনেক দিন ধরে তাকে চাচ্ছি। ‘সে গ্রেপ্তার হয়েছে, তবে আমাদের কাছে এখনো (ভারত থেকে) অফিসিয়ালি কিছু আসেনি।’

সূত্র জানায়, ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে পিকে হালদারের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানানোর পরই তাকে বাংলাদেশের হাতে বহিঃসমর্পণ চুক্তির আওতায় হস্তান্তর করতে চিঠি দেওয়া হবে। এ নিয়ে কূটনৈতিক চ্যানেলে দিল্লির সঙ্গে আলোচনাও শুরু করবে ঢাকা। কূটনৈতিক চ্যানেল ছাড়া বিকল্প চ্যানেলে ফেরত আনা যায় কিনা, এ দিকটিও ভাবা হচ্ছে। বিকল্প চ্যানেলে ভারত থেকে বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ দাগি আসামিদের ফেরত আনার অনেক নজির রয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান।

advertisement