advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

উন্নয়নশীল বিশ্বের সংকট বাস্তবতা এবং করণীয়

এইচ এম নাজমুল আলম
১৭ মে ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৭ মে ২০২২ ১২:১২ এএম
advertisement

দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলংকা তাদের ইতিহাসের ভয়াবহতম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের সম্মুখীন। ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি দেশটি। শ্রীলংকার এই অর্থনৈতিক সংকট রাতারাতি তৈরি হয়নি। ১৫ বছর ধরে এ সমস্যা ধীরে ধীরে পুঞ্জীভূত হয়েছে। ক্ষমতাসীন রাজাপাকসে পরিবারের ব্যাপক দুর্নীতি, অনুৎপাদনশীল বৃহৎ ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, অহেতুক কর হার হ্রাস, উন্নয়ন তরান্বিত করার উচ্চাকাক্সক্ষায় মুদ্রা ছাপানো, অর্গানিক কৃষির জন্য সার ও কীটনাশকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করায় উৎপাদন হ্রাস, রেমিট্যান্স এবং পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল দেশটির ওপর করোনার অভিঘাতে আয় কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ঋণের মাধ্যমে আলঙ্কারিক ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ ইত্যাদি কারণে প্রায় শতভাগ শিক্ষিত জনসংখ্যার দেশ শ্রীলংকা আজ গভীর সংকট আর অনিশ্চিয়তায় দিকভ্রান্ত। প্রায় দুই বছরের বেশি চলমান করোনার অভিঘাতে এমনিতেই পুরো বিশ্বের অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বিশেষ করে উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশই এখন পর্যন্ত করোনার অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি। এর ওপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও খাদ্যশস্য সংকটের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি অনেক দেশের জন্যই ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট অব্যাহত থাকলে বিশেষত উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোয় যে অদূর ভবিষ্যতে গৃহযুদ্ধসহ সরকারবিরোধী আন্দোলনের সম্ভবনা রয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।

advertisement

শ্রীলংকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে তুলনা করে আমাদের দেশের অনেক জ্ঞানী-গুণী বোদ্ধা ইতোমধ্যেই আলোচনার টেবিলে ঝড় তুলছেন বাংলাদেশের অবস্থা শ্রীলংকার মতো হবে কিনা। আমাদের মনে রাখতে হবে- প্রায় প্রতিটি দেশেরই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং বিশেষ করে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিটি দেশের ডেভেলপমেন্ট মডেলও একই রকম নয়। বাংলাদেশের এ যাবৎকালের অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিশ্চয়ই শ্রীলংকার বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর কিংবা ফ্লাইওভার নির্মাণের মতো নয়। তা যাই হোক, বাংলাদেশ কখনো শ্রীলংকা হবে কি না, ওই বিতর্কে নতুন করে না জড়িয়ে আমাদের বরং দেখা উচিত শ্রীলংকার বর্তমান পরিস্থিতি থেকে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কী শিক্ষা নেওয়ার রয়েছে।

প্রথমত, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনপ্রিয়তা কখনো ধ্রুব নয়। কিন্তু নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করার পর তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের ক্ষমতাসীনরাই এ বাস্তবতা ভুলে যান কিংবা অস্বীকার করতে চান। যদিও তৃতীয় বিশ্বের ‘গণতান্ত্রিক’ নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে তর্কবিতর্ক, সমালোচনা কম নয়- তবুও যতটুকু অবশিষ্ট থাকে, সেটি নিয়েই চলতে হয় আমাদের। আজ আপনি জনপ্রিয়তার নিরিখে শীর্ষে অবস্থান করছেন। এর মানে এই নয় যে, বছরের পর বছর আপনার ওই জনপ্রিয়তা অটুট থাকবে। দূরদর্শিতার সঙ্গে দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হলে, দুর্নীতি-অপশাসন ও স্বজনপ্রীতিতে সরকার কাঠামো ডুবে গেলে আপনার জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবেই।

দ্বিতীয়ত, মানুষের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন সে প্রতিবাদী হয়ে উঠবেই। উন্নয়নশীল বিশ্বের সাধারণ জনগণ সম্পর্কে ক্ষমতাসীন সরকার প্রায়ই মিস ক্যালকুলেশন করে ফেলে। জনগণ সর্বংসহা নয়। তারা চরম ধৈর্যশীল। তাদের এ ধৈর্যকেই ক্ষমতাসীনরা দুর্বলতা ভেবে বসেন। একবার যদি জনগণের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়, তা হলে এর চরম মূল্য দিতে হয় অপশাসকদের।

তৃতীয়ত, কোনো একটি বা দুটি বিশেষ খাতের ওপর নির্ভর করে কোনো দেশের অর্থনীতি বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কোনো একটি বিশেষ খাতে একটি দেশের অবস্থান ভালো। এর মানে এই নয় যে, ওই খাতে অদূর ভবিষ্যতে প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হবে না। কখনো ওই বাজার হারিয়ে ফেললে বিকল্প কোনো খাত যেন অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে পারে, এই ব্যবস্থাও আগে থেকে তৈরি করে রাখতে হয়। আমরা আগেই আলোচনা করেছি, অপ্রত্যাশিত করোনার অভিঘাতে শ্রীলংকার পর্যটন ও রেমিট্যান্সপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ওপর দেশটির নির্ভরতা ছিল সর্বাধিক। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল দুটি স্তম্ভ পোশাকশিল্প ও রেমিট্যান্স। দুটি খাতেই বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। তবে আমাদের বিকল্প খাতেও অধিক নজর দিতে হবে। পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়ের বর্তমান অবস্থানের পেছনে এ দেশের সস্তা শ্রম নিঃসন্দেহে অনেক বড় বাস্তবতা।

চতুর্থত, উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতায় অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণ ও আমদানিনির্ভরতা কখনই দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না, বরং তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। একটি দেশের কতটুকু অর্থনৈতিক সক্ষমতা রয়েছে, সেটি যাচাই না করে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে মাত্রা অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি গভীর সংকটে পতিত হয়। আবার আমদানিনির্ভরতার ফলে বৈশ্বিক সংকটে চরম মূল্য দিতে হয় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে। বিষয়টি শুধু শ্রীলংকার ক্ষেত্রেই নয়, বরং তৃতীয় বিশ্বের প্রতিটি দেশের জন্যই ধ্রুব সত্য।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কিছু আলোচনা না করলেই নয়। দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিশ্বদরবারে প্রশংসনীয় অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য গর্বের বটে। তবে আমাদের ভুলে গেলে গেলে চলবে না, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার করলেও আমাদের সমস্যা-সংকটের অন্ত নেই। কাগজ-কলমে আমাদের মাথাপিছু আয় বাড়লেও একই সঙ্গে বেড়েছে আয়বৈষম্য। বিশ্বে দ্রুত কোটিপতি তৈরি হওয়া দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে থাকলেও টিসিবির লাইনে মধ্যবিত্তদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। করোনার অভিঘাতে অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেটি সামলে ওঠায় বেশ কৃতিত্ব দেখিয়েছে বটে। তবে চলমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে যেভাবে বিশ্ব বাজারে খাদ্যশস্য-জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এতে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় যেভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, এতে আরও সংকট অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। দেশের নীতিনির্ধারক যারা রয়েছেন, তাদের এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে এবং বাস্তবতার নিরিখে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এইচ এম নাজমুল আলম : প্রভাষক, আইইউবিএটি ইউনিভার্সিটি

advertisement