advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সেতুর উদ্বোধন ঘিরে পদ্মাপারে জয়গান

নাদিম হোসাইন,মুন্সীগঞ্জ ও সম্পা রায়,শিবচর (মাদারীপুর)
১৮ মে ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৮ মে ২০২২ ১০:১৫ এএম
advertisement

ঈদের ছুটি শেষে বরগুনা থেকে বাইকে চড়ে ঢাকা ফিরছিলেন মো. আবু আলম। বাংলাবাজার ঘাটে তীব্র গরমে ফেরির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা। ঘাটের এই বিলম্ব ছাড়া এখন বাড়ি যেতে তেমন সময় লাগে না। পদ্মা সেতুর মসৃণ এক্সপ্রেস হাইওয়ে ধরে মাত্র সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টায় পৌঁছে যান। তার ধারণা, স্বপ্নের পদ্মা সেতু খুলে দিলে আরও কম সময়েই বাড়ি পৌঁছতে পারবেন তিনি। ফেরি-লঞ্চের জন্য আর অপেক্ষায় থাকতে হবে না। বৈরী আবহাওয়াতেও গাড়ি ছুটবে প্রমত্তা পদ্মার বুক চিরে। এভাবেই দেশের এই দীর্ঘ সেতুটি বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে গুচ্ছ গুচ্ছ স্বপ্নের জাল বুনছেন দক্ষিণাঞ্চলবাসী। পদ্মাপাড়ের মানুষের স্বপ্নটা আরও বড়। কেননা এক্সপ্রেস হাইওয়ে সংলগ্ন শিবচরের প্রত্যন্ত এলাকায় গড়ে উঠেছে অত্যাধুনিক শপিংমল। বসেছে নতুন নতুন হাটবাজার। এক সময়ের প্রত্যন্ত জনপদে ইতোমধ্যে জমির দাম বেড়েছে ১০-১৫ গুণ। পদ্মা সেতুকে ঘিরে সরকার হাতে নিয়েছে বৃহৎ আবাসন প্রকল্প, বিসিক শিল্পনগরীসহ নানান পদক্ষেপ। এদিকে দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশদ্বার মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় অবতারণা হবে এক নৈসর্গিক দৃশ্যের। খুলে যাবে পর্যটনের অপার সম্ভাবনার দ্বার। পাল্টে যাবে রাজধানীর কাছের এ অঞ্চলের অর্থনীতির চিত্রও। ফলে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে পদ্মা সেতুকে ঘিরে।

উপজেলা প্রশাসনসহ একাধিক সূত্রে জানা যায়, বহুল কাক্সিক্ষত সেতুটি বাস্তবায়নকে ঘিরে এক সময়ের অবহেলিত পদ্মার পাড় এখন কর্মব্যস্ত অর্থনৈতিক ঝলমলে আলোক উজ্জ্বল জনপদের নাম। ঢাকা থেকে শুরু হওয়া পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেস হাইওয়ে শিবচর হয়ে পৌঁছেছে ফরিদপুরের ভাঙ্গায়। এ পথেই রেললাইন বিস্তৃত হচ্ছে যশোর পর্যন্ত। শিবচরে দুটি স্টেশন, জাজিরায় একটি স্টেশনসহ জংশন রয়েছে ভাঙ্গায়। এক্সপ্রেস হাইওয়ের শিবচরের পাচ্চর মোড় নামক স্থানে গড়ে উঠেছে অন্তত পাঁচটি শপিংমল। যেখানে রয়েছে ক্যাপসুল লিফটসহ আধুনিক সুবিধাদী। আরও কয়েকটি মার্কেট নির্মাণও প্রক্রিয়াধীন। শিবচর অংশের এক্সপ্রেস হাইওয়ের পাশে গড়ে উঠেছে নতুন অন্তত ৮-১০টি হাট-বাজার। নতুন রেলস্টেশন ঘিরেও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে অর্থনীতি।

advertisement

পদ্মা সেতুসংলগ্ন শিবচরে ১০৮ একর জায়গায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী, ১৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। হারিয়ে যাওয়া তাঁতশিল্পের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন তাঁতীসহ কাপড় ব্যবসায় জড়িতরা। দাদাভাই হাউজিং প্রকল্প নির্মাণ শেষে সহস্রাধিক প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যেখানে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। শিবচর ইউনিয়নে বিসিক শিল্পনগরী স্থাপনের জন্য ৪০০ একর জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। অলিম্পিক ভিলেজ নির্মাণেও জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে এক্সপ্রেস হাইওয়ে সংলগ্ন শিবচর, ভাঙ্গা ও সদরপুরে আড়িয়াল খাঁ তীরবর্তী এলাকায়। এ ছাড়া শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, বিনোদন, খেলাধুলা, আবাসনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে এই জনপদে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগও চোখে পড়ার মতো।

প্রমত্তা পদ্মার অভূতপূর্ব দৃশ্য অবলোকনে এ সেতুও হয়ে উঠবে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। সেতু সৌন্দর্র্য যেমন দৃষ্টি কাঁড়বে, তেমনই পদ্মার স্বচ্ছ জলরাশিও টানবে সবার মন-প্রাণ। আবার পদ্মা সেতু চালুর মধ্য দিয়ে দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থার আমূল উন্নয়ন ঘটতে যাচ্ছে। এতে করে মুন্সীগঞ্জের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার সহজ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠতে যাচ্ছে। আর ২ শতাংশ কাজ বাকি। দ্রুতই তা শেষ করে আগামী মাসে খুলে দেওয়া হবে স্বপ্নের পদ্মা সেতু।

শিবচরের মোল্লাকান্দির বাসিন্দা জয়নাল আকন বলেন, ‘পদ্মা সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক ও রেললাইনে আমাগো পরিবারের বসতভিটাসহ ৭৬ শতাংশ জমি গেছে। দেশের স্বার্থে আমরা সর্বস্ব দিছি। আগে এই এলাকায় যে জমির দাম ছিল ৩-৪ লাখ টাকা বিঘা। সেই জমির দাম এখন ৬০-৭০ লাখ টাকা।’ এক্সপ্রেস হাইওয়ের পাশে গড়ে ওঠা মোল্লার বাজারের মুদি দোকানি হাসান মিয়া বলেন, ‘আগে পাটুরিুয়া ফেরিতে দোকান করতাম। এখন নতুন মহাসড়কের পাশে নতুনবাজারে মুদি দোকান দিছি। পরিবার-পরিজন নিয়া একসঙ্গে আছি। প্রতিদিন ৩-৪ হাজার টাকা বেচাকেনা হয়।’ ইনসান মাদবর নামে এক ট্রলারচালক বলেন, ‘পদ্মা সেতু দেখতে অনেক মানুষ বিভিন্ন এলাকা থেকে আহে। আমরা তাদের নিয়ে ঘুরি। দিন যাওয়ার সাথে সাথে পর্যটক সংখ্যা আরও বাড়তাছে। আমাগো ইনকামও বাড়তাছে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানান, দেশের সর্ববৃহৎ সেতুটিকে ঘিরে পদ্মাপাড়ের এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বেড়েছে কয়েকগুণ। সরকারের বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে।

এদিকে বিশে^র সবচেয়ে ব্যয়বহুল সড়ক ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের পাশে মনোরম পরিবেশ যে কাউকে পদ্মাতীরে ছুটে আসতে আগ্রহ সৃষ্টি করবে। পদ্মার বুকে জেগে ওঠা চরের মধ্যে হোটেল-মোটেল গড়ে ওঠারও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মাত্র ৩৫ কিলোমিটার সড়ক পাড়ি দিয়ে রাজধানী ঢাকা থেকে যে কেউ পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে ছুটে আসতে পারবেন। ইট-পাথরের নগরজীবন থেকে মুক্ত পরিবেশে সেতু ও পদ্মা নদীর সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারবেন ঢাকাবাসী। আবার ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের সুন্দর পরিবেশও দেখা যাবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ ছাড়াও পদ্মাপাড়ে ভোরের ইলিশের হাটে অন্যরকম। পদ্মার তাজা ইলিশ কেনাও আরেক ভালো লাগা। আর রেস্টুরেন্টে বসে বন্ধুবান্ধব নিয়ে পছন্দের ইলিশ ভেজে গরম গরম স্বাদ গ্রহণ তো আরও লোভনীয়। তাই ইলিশের রেস্টুরেন্টে ভরে গেছে এলাকা। তাই দেশের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটক আসছেন এখানে। উদ্যোক্তারা বলছেন, রুপালি ইলিশের পাশাপাশি পদ্মা সেতু ঘিরে নিরাপদ মানসম্মত ‘রিভার টুরিজম’ আরও আকর্ষণ বাড়াতে পারে।

অপরদিকে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের আওতায় গড়ে উঠছে একটি ব্যতিক্রমী প্রাণী জাদুঘর। পদ্মা সেতুর কাজের পাশাপাশি জেলার শ্রীনগরের দোগাছি পদ্মা সেতু সার্ভিস এরিয়া-১ এ প্রাণী ও প্রাকৃতিক সম্পদ। এটি দেখতেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসবে। জানা গেছে, ২৮ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর ৮৩টি, ১৬১ প্রজাতির পাখির ৩৯৮টি, ২৬ প্রজাতির উভচর প্রাণীর ৫৩টি নমুনা, ৩২১ প্রজাতির মাছের ৩৩৬টি, ৩০৬ প্রজাতির শম্বুকজাতীয় কোমলাঙ্গের প্রাণীর ৩০৮টি, ৫৯ প্রজাতির কঠিন আবরণযুক্ত জলজ প্রাণীর ৬৩টি, ১৮৩ প্রজাতির প্রজাপতি ও মথের ২২৮টি এবং পোকামাকড়ের মোট ২২২ প্রজাতির ৩৬১টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

advertisement