advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের সংঘর্ষে সুপ্রিমকোর্ট এলাকা রণক্ষেত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ মে ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৭ মে ২০২২ ০৩:১০ এএম
advertisement


একদিন না যেতেই ফের সংঘর্ষে জড়িয়েছে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল। গতকাল বৃহস্পতিবার এ সংঘর্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসের দোয়েল চত্বরে শুরু হয়ে হাইকোর্ট এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ে। দুপুর ১২টার দিকে শুরু হওয়া এ সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টাধাওয়ায় গোটা এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় গুলির শব্দও শোনা যায়। উচ্চ আদালত এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ায় আগামী রবিবার থেকে সুপ্রিমকোর্টে নিরাপত্তা কড়াকড়ি করা হবে বলে জানা গেছে। এর আগে মঙ্গলবার টিএসসি ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় সংঘর্ষে জড়িয়েছিল সংগঠন দুটি। গতকালের সংঘর্ষের জন্য উভয় সংগঠনই একে অন্যকে দুষছে। ছাত্রলীগের হামলায় অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে বলে দাবি করেছে ছাত্রদল। শাহবাগ থানার ওসি মওদুত হাওলাদার আমাদের সময়কে বলেন, সংঘর্ষের সময় ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে আটক করা হয়েছে। তবে রাত ৯টা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। সংঘর্ষ ও হামলার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা জোনের উপকমিশনার সাজ্জাদুর রহমান বলেন, হাইকোর্ট এলাকায় দুটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হাইকোর্টসংলগ্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাচ্ছিলেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তারা ক্যাম্পাসের দোয়েল চত্বরে গেলে সেখানে অবস্থান নিয়ে থাকা ছাত্রলীগ
নেতাকর্মীরা হকিস্টিক, রামদা, রড, লাঠি নিয়ে ধাওয়া দেন। এতে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে তাদের ধরে ধরে বেধড়ক পেটানো হয়। এ সময় সেখান থেকে গুলির শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। ধাওয়া খেয়ে একপর্যায়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হাইকোর্ট এলাকায় ঢুকে পড়েন। পরে সেখানে ঢুকেও আটকেপড়া ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। সেখানে ছাত্রদলের ২ জনকে বেধড়ক মারধর করতে দেখা যায়। মারধরের একপর্যায়ে তারা অচেতন হয়ে পড়েন।
মঙ্গলবারের সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শৃঙ্খলা ও সম্পদ’ নষ্টের অভিযোগে অজ্ঞাতনামা তিন থেকে চারশজনকে আসামি করে শাহবাগ থানায় মামলা করেছে ঢাবি প্রশাসন।
গতকাল ঢাবি ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ছাত্রদল বন্দুকসহ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের বাধা দেয়। বাধা দিতে গিয়ে অন্তত ১০ জন সাধারণ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, গত কয়েক দিনের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার ছাত্রদল দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও বহিরাগত নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করে। শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের প্রতিহত করেছে।
হামলাকারীদের অনেকের মাথায় হেলমেট ছিল জানিয়ে ঢাবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক আকতার হোসেন বলেন, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ছাত্রদলের মিছিলে গুলি ছোড়ে। জীবন রক্ষার্থে নেতাকর্মীরা হাইকোর্ট এলাকায় অবস্থান নিলে সেখানেও ছাত্রলীগ হামলা করে। ছাত্রলীগ ওই এলাকা ছেড়ে যাওয়ার পর বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে অবরুদ্ধ নেতাকর্মীরা হাইকোর্ট চত্বর থেকে বেরিয়ে আসেন। পরে আহত নেতাকর্মীদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আকতার বলেন, ছাত্রদল নেতা শাহীনুর রহমান, সাহাবুদ্দিন আহমেদ, আবদুল কাউয়ুম, নাহিদ চৌধুরী, রাজু হাসান রাজন, আরিফুল ইসলাম, শাকির আহমেদ তানভীর আজাদীসহ কয়েকজনকে চাপাতি দিয়ে কোপানো হয়েছে। এদের অবস্থা গুরুতর। এ ছাড়া রড, হকিস্টিক, লাঠিসোটা দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে ৪০-৫০ জনকে আহত করা হয়েছে।
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, অছাত্রদের নিয়ে গড়া ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল। চাচ্চুদের নিয়ে গড়া এ অছাত্রদের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বাঁশ হাতে নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়েছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো চাচ্চু এসে যদি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়, তা হলে শিক্ষার্থীরা ছাড় দেবে না।
রাতে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, গত মঙ্গলবারের হামলায় আহতদের রক্ত শুকাতে না শুকাতেই আজ (গতকাল) আবারও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ছাত্রদলের মিছিলে আক্রমণ চালায়। ছাত্রদল নেতারা হাইকোর্ট চত্বরে আশ্রয় নিতে গেলে সেখানেও ছাত্রদল ও আইনজীবীদের ওপর রক্তাক্ত হামলা হয়। ছাত্রলীগের হামলা থেকে রক্ষা পাননি সাধারণ আইনজীবীরাও।
সুপ্রিমকোর্টের নিরাপত্তায় কড়াকড়ি
ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের সংঘর্ষ গতকাল সুপ্রিমকোর্ট এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় বহিরাগতরা যাতে কোনোভাবেই আদালত প্রাঙ্গণে ঢুকতে না পারে সে জন্য কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। রবিবার থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। বিচারপ্রার্থীরা যাতে হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়টি মাথায় রেখে আইনজীবী, বিচারকসহ আদালত অঙ্গনের নিরাপত্তার বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। গতকাল দুপুরে সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বজলুর রহমান, পুলিশের রমনা অঞ্চলের ডিসি সাজ্জাদুর রহমান, আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার, সুপ্রিমকোর্টের উভয় বিভাগের কর্মকর্তাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠকের পর আপিল বিভাগের রেজিস্ট্রার ও সুপ্রিমকোর্টের মুখপাত্র সাইফুর রহমান জানান, বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী রবিবার থেকে সুপ্রিমকোর্টের নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। সুপ্রিমকোর্টের গেটগুলো দিয়ে যাতে বহিরাগত প্রবেশ করতে না পারে, বিচারপ্রার্থী, আইনজীবীরা যাতে সুপ্রিমকোর্টে নির্বিঘেœ, স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের বিক্ষোভ
সুপ্রিমকোর্ট এলাকায় ছাত্রদল কর্মীদের মারধরের খবর পেয়ে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা সেখানে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ করেন। মিছিলে নেতৃত্ব দেন বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতা আবদুল জাব্বার ভুইয়া প্রমুখ।
নয়াপল্টনে বিএনপির মিছিল : ছাত্রদলের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করে বিএনপি ও অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা নিপুণ রায় চৌধুরী, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক গোলাম মাওলা শাহীন, সদস্য সচিব খন্দকার এনামুল হক এনামসহ কয়েকশ নেতাকর্মী অংশ নেন।
ছাত্রদলের দুদিনের কর্মসূচি
ছাত্রলীগের গুলিবর্ষণ ও সশস্ত্র হামলার প্রতিবাদে দুদিনের বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ছাত্রদল। আগামীকাল শনিবার দেশের সব জেলা ও মহানগর এবং রবিবার সব উপজেলা থানা পৌরসভা এবং কলেজে বিক্ষোভ করবে সংগঠনটি। গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচিতে ঘোষণা করেন ছাত্রদলের সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবন ও সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল। গতকালের হামলায় ছাত্রদলের ৪৭ নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে তারা দাবি করেন।
৯০-এর ডাকসু ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের বিবৃতি
ঢাবিতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘চরম নির্লিপ্ততায়’ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ৯০’র ডাকসু ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতারা। গতকাল এক বিবৃতিতে এ ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিদাতারা হলেন- আমান উল্লাহ আমান, হাবিবুর রহমান, খায়রুল কবির খোকন, ফজলুল হক মিলন, জহির উদ্দিন স্বপন, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, নাজিম উদ্দিন আলম, সাইফুদ্দিন মনি, খন্দকার লুৎফর রহমান, আসাদুর রহমান খান প্রমুখ।
বিরোধী মত দমনের বহির্প্রকাশ : বিবৃতিতে আট ছাত্র সংগঠন
ঢাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের ওপর ছাত্রলীগের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আট ছাত্র সংগঠন। গতকাল আট ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময় ছাত্র সংগঠনগুলো ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে শিক্ষার্থীদের সামনে প্রমাণ করেছে। সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের নির্মম হামলা ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের জন্য এক ভীতিকর ও অনিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। ক্যাম্পাসজুড়ে এই সন্ত্রাসী কর্মকা- চলমান থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুতুল প্রশাসনের ভূমিকা পালন করছে। অবিলম্বে পরিবেশ পরিষদের সভা আহ্বানের দাবি করে নেতারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিষদ অকার্যকর হয়ে রয়েছে। ক্যাম্পাসে একটি সন্ত্রাসমুক্ত, নিরাপদ পরিবেশ তৈরির জন্য পরিবেশ পরিষদের কাজ করার কথা থাকলেও প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় পরিষদটির অস্তিত্বের কথা শিক্ষার্থীরা ভুলতে বসেছে। অবিলম্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে পরিবেশ পরিষদের সভা আহ্বান করে ক্যাম্পাসে একটি নিরাপদ ও সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।
আট ছাত্র সংগঠনের পক্ষে বিবৃতিদাতারা হলেন- বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নজির আমিন চৌধুরী জয়,
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. জয়দীপ ভট্টাচার্য, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি সাদেকুল ইসলাম সোহেল, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সভাপতি আরিফ মঈনুদ্দিন, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি মশিউর রহমান খান রিচার্ড, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ সভাপতি সুনয়ন চাকমা, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি মিতু সরকার ও বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাওফিকা প্রিয়া।

advertisement